ফিলিস্তিনের অধিকৃত পশ্চিম তীরকে ‘জুড ও সামারিয়া’ নামকরণ করতে চান যুক্তরাষ্ট্রের পার্লামেন্টের নিম্নকক্ষ হাউস অব রিপ্রেজেনটেটিভসের স্পিকার মাইক জনসন। সোমবার (৪ আগস্ট) ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে পশ্চিম তীরের শিলোহ শহরে এক ঐতিহাসিক বৈঠকে অংশ নিয়ে তিনি এ মন্তব্য করেন। খবর জেরুজালেম পোস্ট।
ইসরায়েলের আরিয়েল শহর সফরকালে ট্রাম্প প্রশাসনের কর্মকর্তাদের প্রতিনিধি দল ও কংগ্রেস সদস্যদের সঙ্গে একটি বৈঠকে জনসন বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল (সোজা কথায় সরকারি পর্যায়ে) পর্যায়ে ওয়েস্ট ব্যাংক-শব্দটির ব্যবহার বন্ধ করতে তিনি কাজ করবেন। এর পরিবর্তে তিনি ‘জুড ও সামারিয়া’ শব্দযুগল প্রচলনের পক্ষে অবস্থান নেবেন।’
এই সফরের পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে ইসরায়েলের ডানপন্থী বসতিপন্থী সংগঠন ইয়েশা কাউন্সিল। সংগঠনটি পশ্চিম তীরকে ইসরায়েলের অন্তর্ভুক্ত করতে দীর্ঘদিন ধরে প্রচার চালিয়ে আসছে। কয়েক সপ্তাহ আগে তারা ‘জুড, সামারিয়া ও জর্দান উপত্যকা’কে ইসরায়েলের অবিচ্ছেদ্য অংশ দাবি করে একটি ঘোষণাপত্র পাস করে।
তবে, এই প্রস্তাব আন্তর্জাতিক মহলে সমালোচনার মুখে পড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় পশ্চিম তীরকে অধিকৃত এলাকা হিসেবে দেখে। তাই ‘জুড ও সামারিয়া’ নাম ব্যবহারকে অনেকেই রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে মনে করছেন।
জুড ও সামারিয়া শব্দটি বাইবেলে উল্লেখিত জর্ডান নদীর পশ্চিম এলাকাজুড়ে অবস্থিত একটি অঞ্চল। ১৯৪৮ সালের আরব-ইসরায়েলি যুদ্ধ শেষে ইসরায়েল এবং জর্ডানের মধ্যে ১৯৪৯ সালের যুদ্ধবিরতি চুক্তি হলে ইসরায়েল সরকার এটিকে পশ্চিম তীর নাম দেয়।
যুদ্ধের আগে এটি আরব শাসনাধীন ছিল। যুদ্ধের পরে জর্ডান এটিকে অধিগ্রহণ করলে জর্ডান নদীর পূর্ব তীরের জর্ডান অঞ্চল থেকে এই ভূখন্ডকে আলাদা করার জন্য তখন এটিকে ‘পশ্চিম তীর’ বলা হতো।
১৯৬৭ সালের জুনে ছয় দিনের যুদ্ধে ইসরায়েল প্রতিরক্ষা বাহিনী (IDF) পশ্চিম তীরের নিয়ন্ত্রণ নেয় এবং সেখানে সামরিক প্রশাসন প্রতিষ্ঠা করে, যা আজও বহাল রয়েছে।
নতুন সামরিক প্রশাসনের একটি সামরিক আদেশের (নং ১৮৭) মাধ্যমে ১৯৬৭ সালের ডিসেম্বরে ‘জুড ও সামারিয়া’ শব্দটি প্রথম উল্লেখ করা হয়, যা ইহুদি ইতিহাসে এই অঞ্চলের তাৎপর্য প্রতিফলিত করে। শব্দটি ইসরায়েলি রাজনীতিতে ডানপন্থীদের সঙ্গে সম্পর্কিত, যারা ইসরায়েলি-ফিলিস্তিনি সংঘাতের অবসান ঘটানোর লক্ষ্যে দ্বি-রাষ্ট্রীয় সমাধানের প্রস্তাবকে প্রত্যাখ্যান করে থাকে।
বিপরীতে, পশ্চিম তীর শব্দটির অনেক বিস্তৃত স্বীকৃতি রয়েছে, যা একাধিক আন্তর্জাতিক চুক্তির অন্তর্ভুক্ত, যেমন-ইসরায়েল সরকার এবং প্যালেস্টাইন মুক্তি সংস্থা (PLO) এর মধ্যকার অসলো চুক্তি।
জুডের ইতিহাস
বাইবেল অনুসারে, ফিলিস্তিনের তিনটি ঐতিহ্যবাহী বিভাগের মধ্যে জুড হল দক্ষিণতম অঞ্চল, যেখান থেকেই ইহুদি জনগণের ইতিহাস শুরু হয়েছিল। জুডিয়ান নামের একটি পাহাড়ি অঞ্চল এখানকার মূল অংশ চিহ্নিত করে, যা রামাল্লা থেকে বেরশেবা পর্যন্ত দক্ষিণে বিস্তৃত। পাশেই জেরুজালেম , বেথলেহেম এবং হেব্রন অবস্থিত।
জুড নামটি প্রাচীন ইসরায়েলি উপজাতি যিহূদার নাম থেকে নেওয়া হয়েছে, যারা খ্রিস্টপূর্ব দশম শতাব্দীর আগে লৌহ যুগের প্রথম দিকে এই অঞ্চলে বসতি স্থাপন করেছিল। একজন যিহূদী দাউদ, ইসরায়েলিদের রাজা হওয়ার পর, জুড ইসরায়েলের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয় ।
এর দুই প্রজন্ম পর, জুডিয়ায় একটি দক্ষিণ রাজ্য (যিহূদা) এবং সামেরিয়ায় একটি উত্তর রাজ়্যে (ইসরায়েল) বিভক্ত হয়। দায়ূদের বংশকে রাখা হয় যিহূদা রাজ্য, যা খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতাব্দীতে ব্যাবিলনীয় বন্দীদশা চলাকালীন ইহুদিদের জোরপূর্বক নির্বাসন পর্যন্ত সমৃদ্ধি লাভ করে ।
যদিও প্রায় অর্ধ শতাব্দী পরে ইহুদিদের জুডিয়ায় ফিরে আসার অনুমতি দেওয়া হয়, তবুও তারা বিদেশী শাসনের অধীন ছিল যতক্ষণ না ম্যাকাবিরা খ্রিস্টপূর্ব দ্বিতীয় শতাব্দীতে রাজ্যটি পুনরুজ্জীবিত করে ।
এরপর, রাজ্যটি খ্রিস্টপূর্ব ৬৩ সালে রোমান শাসনের অধীনে আসে এবং লাতিন এবং গ্রীক ভাষায় জুডিয়া (ইংরেজিতে জুডিয়াও বানান করা হয়) নাম থেকে জুড নামকরণ করা হয় ।
সামারিয়ার ইতিহাস
প্রাচীন সামারিয়া হল জুড এবং গ্যালিলির মধ্যবর্তী অঞ্চল যেটি পশ্চিম তীরের উত্তরে এবং আধুনিক ইসরায়েলের উত্তর অংশে অবস্থিত পরবর্তী অঞ্চল। সামেরিয়া শমেরিয়ান পাহাড়ের পাদদেশে গড়ে ওঠা একটি অঞ্চল, যার মধ্যে রয়েছে কারমেল, গিলবোয়া, এবাল এবং গেরিজিম এবং নাবলুস শহর। দীর্ঘকাল ধরে এটি এই এলাকার রাজনৈতিক ও বাণিজ্যিক রাজধানী হিসেবে কাজ করেছে। নব্য-অ্যাসিরিয়ান সাম্রাজ্য এটি দখল করে নিলে এটি তখন দুটি রাজ্যে বিভক্ত হয়ে যা।
এরপর সামেরিয়া কয়েক শতাব্দি ধরে অ্যাসিরিয়ান এবং ব্যাবিলনীয়রা শাসন করে। তাদের অধীনেই সামেরিয়ায় সামেরিয়ানিজম এবং জুডিয়ায় ইহুদি ধর্মের ধর্মীয় সম্প্রদায়গুলো আচেমেনিয়ান এবং পরে হেলেনিস্টিক শাসনে স্থানান্তরিত হওয়ার আগে স্বতন্ত্র রূপ নিতে শুরু করে।
সুলতানা দিনা/