যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট যখন জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব ও ট্রান্সজেন্ডার অধিকারের মতো অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং মেরুকরণ সৃষ্টিকারী ইস্যুগুলোতে ঐতিহাসিক রায় দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে, ঠিক তখনই এক নতুন জনমত জরিপ মার্কিন নাগরিকদের মনোভাব সামনে নিয়ে এসেছে। রয়টার্স/ইপসোস পরিচালিত এই জরিপে দেখা গেছে, অধিকাংশ আমেরিকানই জন্মসূত্রে নাগরিকত্ব প্রথা বিলুপ্ত করার বিরোধী।
যুক্তরাষ্ট্রে জন্ম নেওয়া যে কোনো শিশু স্বয়ংক্রিয়ভাবে দেশটির নাগরিকত্ব পাবে—এই দীর্ঘকালীন প্রথা বাতিলের জন্য ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে একটি নির্বাহী আদেশ জারি করেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তার এই সিদ্ধান্তকে আদালতে চ্যালেঞ্জ জানানো হলে বিষয়টি সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত গড়ায়। বর্তমানে দেশটির সর্বোচ্চ আদালত এই মামলার রায় দেওয়ার চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। রয়টার্স/ইপসোস-এর জরিপ বলছে, ৬৪ শতাংশ আমেরিকান এই নাগরিকত্ব সুবিধা বন্ধ করার বিপক্ষে, যেখানে মাত্র ৩২ শতাংশ মানুষ ট্রাম্পের পদক্ষেপকে সমর্থন করেছেন।
রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে এই ইস্যুতে বড় ব্যবধান দেখা গেছে। ৯১ শতাংশ ডেমোক্র্যাট এই প্রথা বহাল রাখার পক্ষে থাকলেও রিপাবলিকানরা নিজেদের মধ্যে দ্বিধাবিভক্ত। ৬২ শতাংশ রিপাবলিকান নাগরিকত্ব বাতিলের পক্ষে থাকলেও ৩৬ শতাংশ মনে করেন এটি আগের মতোই থাকা উচিত। যদিও সুপ্রিম কোর্টে ৬-৩ ব্যবধানে রক্ষণশীল বিচারপতিদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে, তবুও গত ১ এপ্রিলের প্রাথমিক শুনানি দেখে মনে করা হচ্ছে, আদালত হয়তো ট্রাম্পের এই কট্টর অবস্থানকে শেষ পর্যন্ত সমর্থন করবে না।
ট্রান্সজেন্ডার অধিকার ও ক্রীড়া বিতর্ক
আইডাহো এবং ওয়েস্ট ভার্জিনিয়া থেকে আসা মামলার পরিপ্রেক্ষিতে সুপ্রিম কোর্ট নারী ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় ট্রান্সজেন্ডার অ্যাথলেটদের অংশগ্রহণের ওপর বিধিনিষেধ নিয়ে রায় দেবে। এই বিষয়ে জনমত ট্রাম্পের মেয়াদের রাজনৈতিক অবস্থানের কাছাকাছি। জরিপে দেখা গেছে, নারী ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় ট্রান্সজেন্ডারদের অংশগ্রহণের ওপর নিষেধাজ্ঞাকে প্রায় ৬৭ শতাংশ আমেরিকান সমর্থন করছেন। রিপাবলিকানদের মধ্যে এই সমর্থনের হার ৯২ শতাংশ এবং ডেমোক্র্যাটদের মধ্যে ৪৪ শতাংশ।
নির্বাচনি বিধি ও ডাকযোগে ভোট
নির্বাচন ব্যবস্থার স্বচ্ছতা নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের আসন্ন রায় আগামী ৩ নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের ওপর বড় প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে নির্বাচনের দিনের মধ্যে পোস্টমার্ক করা ডাকযোগে পাঠানো ব্যালট (মেইল-ইন ব্যালট) কয়েক দিন পরে পৌঁছালেও তা গণনা করা হবে কি না—তা নিয়ে বিতর্ক চলছে। জরিপে অংশ নেওয়া ৬৫ শতাংশ নাগরিক এই বিলম্বিত ব্যালট গণনার পক্ষে মত দিয়েছেন। এর মধ্যে ৮৫ শতাংশ ডেমোক্র্যাট এবং ৫১ শতাংশ রিপাবলিকান এই প্রক্রিয়ার পক্ষে।
বর্ণ ও নির্বাচনি মানচিত্র বিতর্ক
লুইজিয়ানা অঙ্গরাজ্যের নির্বাচনি এলাকার সীমানা নির্ধারণ নিয়ে অন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মামলা আদালতে রয়েছে। সেখানে কৃষ্ণাঙ্গ ভোটারদের প্রতিনিধিত্ব বাড়াতে ডিস্ট্রিক্ট ম্যাপ পুনর্নির্ধারণ করা হয়েছিল, যা শ্বেতাঙ্গ ভোটারদের একটি অংশ বর্ণবাদী আখ্যা দিয়ে চ্যালেঞ্জ করেছে। জরিপের তথ্য অনুযায়ী, ৭৫ শতাংশ আমেরিকান (যার মধ্যে ৬৫ শতাংশ কৃষ্ণাঙ্গ) মনে করেন নির্বাচনি মানচিত্র তৈরির সময় বর্ণকে প্রাধান্য দেওয়া উচিত নয়। তবে অর্ধেকের বেশি মানুষ আবার মনে করেন, অভিন্ন বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন বা একই বর্ণের সম্প্রদায়ের মানুষ যেন একই ডিস্ট্রিক্টে থেকে তাদের প্রতিনিধি নির্বাচন করতে পারে।
আদালতের প্রতি জনআস্থার সংকট
গত পাঁচ বছরে মার্কিন সুপ্রিম কোর্টের প্রতি নাগরিকদের দৃষ্টিভঙ্গিতে চরম মেরুকরণ লক্ষ্য করা গেছে। বর্তমানে ৭০ শতাংশ রিপাবলিকান আদালতের কর্মকাণ্ডে সন্তুষ্ট হলেও ডেমোক্র্যাটদের ক্ষেত্রে এই হার মাত্র ২৭ শতাংশে নেমে এসেছে। ২০২২ সালে গর্ভপাতের অধিকার বাতিলের পর থেকেই আদালতের ওপর ডেমোক্র্যাট সমর্থকদের আস্থা দ্রুত হ্রাস পেতে শুরু করে।
৪,৫৫৭ জন মার্কিন নাগরিকের ওপর পরিচালিত এই জরিপটি আগামী কয়েক সপ্তাহে সুপ্রিম কোর্টের রায়ের প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।
সূত্র: রয়টার্স