ঢাকা ৩১ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩, রোববার, ১৪ জুন ২০২৬

সর্বশেষ
ব্রাজিলের শুরুর একাদশে চমক অতিরিক্ত সময়ের গোলে সুইসদের রুখে দিয়ে কাতারের বাজিমাত ৯২ বছর ধরে বিশ্বকাপে প্রথম ম্যাচে হারেনি ব্রাজিল নেইমারকে ছাড়াই নামছে ব্রাজিল, ভাঙছে ৪০ বছরের ঐতিহ্য পেনাল্টিতে এমবোলোর গোল, এগিয়ে সুইজারল্যান্ড ফিটনেস প্রশ্নে রোনালদো, ‘আমাকে খেলতে দেখেননি?’ ‘জাপানি মেসি’র সঙ্গী উয়েদা এমবাপ্পের সমালোচনা ‘অতিরিক্ত ও অন্যায়’ দেড় দশকের জ্বালানিনীতি ছিল আমদানিনির্ভর: তথ্যমন্ত্রী ইরানের অনুশীলন মাঠের পাশে মরদেহ উদ্ধার ওয়ানডে সিরিজ বাংলাদেশ ইমার্জিংদের ঝিলিকের মৃত্যুর রহস্যে নতুন মোড়, গ্রেপ্তার স্বামী রক্তদান মহৎ কিন্তু নিরাপদ রক্ত আরও গুরুত্বপূর্ণ আদ্-দ্বীন হাসপাতাল কোটি কোটি টাকা নিয়ে ঘুরেছে: স্বাস্থ্যমন্ত্রী মরক্কোর বিপক্ষে ব্রাজিলের সম্ভাব্য একাদশ মার্তিনেজকে ঘিরে নতুন শঙ্কা শাহবাগে ছাত্রশিবিরের বিরুদ্ধে ছাত্রদলের বিক্ষোভ নাটোরে ৭০ দরিদ্র রোগীর বিনামূল্যে ছানি অপারেশন চাকরি মেলায় সাড়া, রাজশাহীতে ৫০ শতাংশ প্রার্থীর তাৎক্ষণিক নিয়োগ ইনজুরিতে ছিটকে গেলেন মাইকেল অলিভার ‘ফেনীর সাংবাদিকতার ইতিহাসে উজ্জ্বল অধ্যায় ওছমান হারুন মাহমুদ দুলাল’ পেকুয়া পৌরসভার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করলেন প্রধানমন্ত্রী গ্রিন ইউনিভার্সিটির সাংবাদিকতা বিভাগে নবীনবরণ অনুষ্ঠিত মিসরকে কেন জার্সি পরিবর্তন করতে বলল ফিফা? রবিবার বিশ্ব রক্তদাতা দিবস যে সম্পদ চোখের পলকে ধ্বংস হয়ে যায় রাজধানীতে প্রান্তিক গ্রামের ফুটবল উন্মাদনা, আর্জেন্টিনা–ব্রাজিল ম্যাচ একদিনে ৫ মরদেহ উদ্ধার, বরগুনায় চাঞ্চল্য ও উদ্বেগ দাউদকান্দিতে শিবির নেতার বিচারের দাবিতে বিক্ষোভ প্রলোভন দেখিয়ে ভোট আদায়কারীরা জনগণের বন্ধু নয়: তারেক রহমান
Nagad desktop

মর্জিনার শূন্য যাত্রা

প্রকাশ: ০৬ নভেম্বর ২০২৫, ০৬:০৬ পিএম
আপডেট: ০৮ নভেম্বর ২০২৫, ০৭:২০ পিএম
মর্জিনার শূন্য যাত্রা
অলংকরণ: মেহেদী হাসান

লাল গেঞ্জি পরা ছেলেটির দিকে আমি তাকিয়েছিলাম। আমার মতো আরও দু-একজন দেখছিল ছেলেটিকে। ছেলেটি রাস্তার পাশের ছোট্ট চায়ের দোকানটির সামনে দাঁড়িয়ে চা-ওয়ালার সঙ্গে কি নিয়ে যেন তর্কে জড়িয়ে গিয়েছে। কিছুটা দূর থেকে ঠিক বুঝতে পারছিলাম না আসলে তর্কটা কি নিয়ে হচ্ছে!
অমল আমার পাশে পাশে হাঁটছিল।আমার দিকে একবার তাকিয়ে, একটু থেমে হাত ধরে টান দিল, কি দেখতেছেন, ওর মাথাটা একটু গরম আছে, একটু পরে সব ঠিক হয়ে যাবে’- 
ছেলেটা কে ?
ওরে আপনি চিনবেন না। মাঝের চরের মর্জিনার পোলা, কয়েকদিন হয় এইখানে আসছে, দুই চার দিন পর আবার খুলনায় চলে যাবে, ও ওর বউ নিয়া ওই খানেই থাকে, বাপ নাই, সে মরছে সিডরে । এখানে এখন ওর মা একা থাকে, তাকে দেখবার জন্য মাঝে মাঝে আসে, টাকা পয়সা দিয়া যায়।’
সামনের দিকে পা বাড়াই। সূর্যের আলোর তাপ বাড়ছে। ছায়ায় যাওয়া দরকার। 
সকালের দিকটা এরকম ছিল না। আবহাওয়া ছিল বেশ ঠাণ্ডা। শান্ত পরিবেশে আশপাশে দাঁড়িয়ে থাকা ছোট বড় গাছগাছালির সবুজ পাতায় সকালের লালচে সূর্যের আলো ঝিলিক দিচ্ছিল । তবে সে আলোয় তাপের আভাস ছিল। বোঝা যাচ্ছিল, সূর্য ওপরে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে ধীরে ধীরে তাপ বাড়বে। কিছুদিন ধরে এমনটাই চলছে ।
গ্রামের বাড়িতে এসেছি দিন চারেক হলো। ভেবেছিলাম, গ্রীষ্মের দাবদাহ চলছে, এই সময়টা গ্রামীণ পরিবেশে কাটিয়ে গেলে ভালোই হবে।
এখানে আসার পরে দু-তিন দিন বাড়ির আশপাশেই ঘোরাঘুরি করেছি । আজকে অমলকে নিয়ে চলে এসেছি নদী তীরবর্তী বন্দরের দিকে। 
কিছুটা দূরের আত্মীয় অমল আমাদের বাড়িতেই থাকে। আর অনেকদিন ধরে থাকার জন্য এদিকের সবকিছুই তার চেনাজানা হয়ে গেছে । বয়স তেমন বেশি নয়, তবে স্বভাবগতভাবে বেশ বুদ্ধিমান, চালাক চতুরও। 
ওই ছেলেটা কোথায় থাকে যেন বলছিলে ? আমি অমলের দিকে তাকাই।
ওই তো মাঝের চরে। নদীর ওপারের দিকে ইঙ্গিত করে অমল। বলে, অনেক আগে একবার গেছিলেন না ওই খানে, মনে নাই ?
অনেক দিনের ভুলে যাওয়া কিছু ঘটনার কথা হঠাৎ যেন মনের মধ্যে চলে আসে। 
তাইতো, দক্ষিণাঞ্চলের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া সেই ভয়াবহ ‘সিডর’র ধ্বংসযজ্ঞের কথা তো এ অঞ্চলের মানুষ এখনো ভোলেনি । একটি বিদেশি বার্তা সংস্থায় কাজ করার সুবাদে সেবার সিডরের পরে আমিও তো একবার এখানে এসেছিলাম। সেটাই বা আমি ভুলে গেলাম কি করে! 
একটু দূরেই নদীর পাড়। তাই এদিকে কোথাও না দাঁড়িয়ে সোজা চলে গেলাম নদীর পাড়ে। একটা গাছের ছায়ার নিচে গিয়ে দাঁড়ালাম। বেলা বেড়েছে । মাথার ওপরের আকাশ থেকে যেন আগুনের হলকা নেমে আসছে। মাঝে মাঝে তার স্পর্শ পাওয়া যাচ্ছে। গরম হাওয়া উড়ে যাচ্ছে নদীর দিকে। প্রখর রৌদ্রের মধ্যে আশপাশে দাঁড়িয়ে থাকা গাছগুলোর পাতার নিচে নাম না জানা কিছু পোকা এসে ছায়ায় লুকিয়েছে। 
সামনে কল কল ছল ছল শব্দে বয়ে চলেছে বলেশ্বর নদী। নদীতে তেমন ঢেউ নেই, কিন্তু স্রোত আছে বেশ। নদীর জলে ভেসে বেড়াচ্ছে কয়েকটা মাছ ধরার নৌকা। ডান দিকে কিছু দূরে বরগুনা শহর । বাঁ দিকে কিছুদূর গিয়ে নদী বাঁক নিয়ে সোজা চলে গেছে উত্তর দিকে ।
মনে পড়ল, নদীর পাড়ে এখানেই ছিল লঞ্চঘাট। ছোটবেলায় এখান থেকে লঞ্চে উঠে বরিশালে যেতাম । সময় লাগতো দশ বারো ঘণ্টা।
অমল আঙুল তুলে দেখালো, ওই যে দেখেন নদীর মাঝ বরাবর বড় একটা চরের মতন এলাকা, অনেক গাছপালা, বাড়ি ঘর দেখা যাইতেছে, ওইটাই মাঝের চর । চরের ওই পাশে নদী আছে, সিডরের পর নতুন কইরা গাছপালা জন্মাইছে। গাছপালা বড় হওয়ার জন্য ওই পাশের নদীটা এখান থিকা দেখা যাইতেছে না। 
একটু থামে অমল,পরে আবার বলে, আমার কিন্তু সব মনে আছে, আপনে সেইবার সিডরের কয়দিন পর ক্ষয়ক্ষতির খবর নিতে এই দিকে আইছিলেন না ! ঠিক কি না ?
এবার যেন পরিষ্কার মনে পড়ে গেল সব, সেদিন এক মাঝ বয়সী মহিলাকে ওখানে দেখেছিলাম আরও কয়েকজনের সঙ্গে ।সে তার জীবনে ঘটে যাওয়া এক ভয়ংকর অভিজ্ঞতার কথা বলছিল দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে । তার কথা শুনে, সেদিন ওখান থেকেই তার সেই ভয়ংকর অভিজ্ঞতার বিষয় নিয়ে রিপোর্ট করেছিলাম। 
মনের ভিতরে হঠাৎ কি হলো কে জানে, অমলকে বললাম, চল তো, মাঝের চরে যাই…’
অমল তো অবাক, সে কি, এখন যাইবেন আবার ওই চরে ? চারদিকের কি অবস্থা দেখছেন ? 
প্রচণ্ড গরম, বৈরী আবহাওয়া, সব মিলিয়ে প্রতিকূল পরিবেশ, কিন্তু এসব দেখেও কিসের টানে কে জানে,অমলকে একটা নৌকা ডাকতে বললাম । 
আমার কথা শুনে আমার দিকে তাকিয়ে অমল কি মনে করলো,কে জানে ! তবে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে গজ গজ করতে করতে নদীর পাড় ঘেঁষে সামনে এগিয়ে গিয়ে কয়েক মিনিট পরে ছোট একটা নৌকা খুঁজে নিয়ে এলো ।
মাঝির সঙ্গে দু-চারটা কথা বলে দুজনেই নৌকায় উঠলাম। মাঝিকে বললাম একটু তাড়াতাড়ি যেতে, কিন্তু প্রচণ্ড স্রোতের কারণে সহজে এগোনো যাচ্ছিল না। 
ফলে চড়ে পৌঁছাতে বেশ কিছুটা সময় লাগলো। যখন মাঝের চরে এলাম তখন সূর্য একেবারে মাথার ওপরে । 
নৌকা ছেড়ে ওপরে উঠে এসে চারদিকে একবার তাকিয়ে দেখলাম। মনের মধ্যে এই চরের পুরোনো যে ছবিটা ছিল, তার সঙ্গে এখনকার চেহারাটা যেন ঠিক মিলাতে পারছিলাম না । কারণ সিডর হয়ে গেছে সেই প্রায় ১৫ বছর আগে । এই সময়ের মধ্যে অনেকটাই পরিবর্তন হয়ে গেছে সবকিছুতে। তখন এখানে এত ঘর বাড়ি ছিল বলে মনে পড়ে না। বড় বড় গাছের চাইতে কলাগাছের সংখ্যাই ছিল যেন বেশি । এখন বেশ বড় বড় গাছপালা হয়েছে। কলাগাছ তেমন চোখে পড়ল না । নদী তীর থেকে গাছগাছালির আশপাশ দিয়ে ভেতরের দিকে চলে যাওয়া মাটির রাস্তাটা প্রায় তেমনি আছে, তবে কিছুটা যেন চওড়া মনে হলো । রাস্তার পাশ ঘেঁষে কিছু দোকানপাট বসেছে, ভালো ঘর বাড়িও উঠেছে কিছু । দুই একটা ঘরের পাশে গরু ছাগল রাখার ঘর তোলা হয়েছে দেখলাম । 
দুপুর হয়ে যাবার কারণে রাস্তায় তেমন লোকজন নেই । মাথার ওপরে ঝকঝকে নীল আকাশ যেন আগুন ঢালছে। ছিঁটেফোঁটা মেঘ দেখা যাচ্ছে না কোথাও । মনে হচ্ছে, বৃষ্টি আসতে আরও কিছু সময় লাগবে।
রাস্তা ধরে কিছুটা এগিয়ে এসে একটা গাছের নিচে দাঁড়িয়ে নিজেকে বড় বোকা মনে হলো । অমল কোনো কথা বলছে না । বুঝতে পারছি, মনে মনে সে বেশ ক্ষিপ্ত হয়ে আছে আমার এই পাগলামি দেখে ।
আসলেই তো তাই, কি কারণে আর কিসের টানে হঠাৎ করে এই সময়ে এখানে আসার সিদ্ধান্তটা নিয়ে নিলাম, কে জানে ! এখন কোথায় পাব আমি সেই মহিলাকে ? তার নামটাও তো এই মুহূর্তে ঠিক মনে পড়ছে না । মরিয়ম, মর্জিনা নাকি ফাতেমা, এমনি ধরনের একটা নাম বিদ্যুৎ ঝিলিকের মতো কখনো কখনো স্মৃতিতে উঠে আসছে।
আর সেই কবে এখানে কোথায় দাঁড়িয়ে কথা বলেছিলাম,তাও তো ঠিক চিনতে পারছি না। 
এবার অনন্যপায় হয়ে অমলের শরণাপন্ন হলাম। আস্তে জিজ্ঞেস করলাম, এখানের কাউকে তুমি চেন, অমল ? 
অমল একটু নরম হলো যেন বলল, বন্দরে যাওয়া আসা করে এমন দু-একজনের নাম জানি, কিন্তু এখানে কে কোথায় থাকে জানি না। তবে ওই বাদশারে তো চিনি। 
একটু আগে যারে চায়ের দোকানে দেখলেন। 
বাদশা ! বাহ, নামটা তো চমৎকার । বললাম, ওদের ঘরটা খুঁজে পাওয়া যাবে ?
আপনে খারান, বলে অমল একটু দূরে একটা ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা একজন বয়স্ক মানুষের কাছে গিয়ে মিনিট দশেকের মতো কথাবার্তা বলে ফিরে এসে বলল, ওই বাঁদিকের চার পাঁচটা ঘর পরে যে ঘরটার পাশে দুইটা কলাগাছ দেখতেছেন, সেই ঘরটা বাদশাদের। 
সময় নষ্ট না করে গাছের ছায়ায় ছায়ায় আমরা চলে গেলাম বাদশাদের ঘরের দিকে। ঘরের সামনে গিয়ে ভেতরের দিকে উঁকি দিয়ে দেখলাম ভেতরে কেউ নেই । 
‘ঘরের পিছনের দিকে পাকের ঘরে কেউ থাকতে পারে, অমল বলে ওঠে, দেইখা আসি…’ বলে ঘরের বাইরে কলাগাছের পাশ দিয়ে সে পিছনের দিকে চলে গেল । বেশি সময় নিল না, কিছুক্ষণ পরে ঘরের ভেতর দিয়েই আবার সামনে চলে এলো। পেছনে পেছনে এল এক মহিলা ।-নেন কথা কন, এই হইল মর্জিনা । বাদশার আম্মা ।
আমি তাকালাম মর্জিনার দিকে । বছর ১৫ আগে দেখা সেই মানুষটাই কি এই ! মনে মনে সেদিনের সেই মর্জিনার সঙ্গে আজকের এই মর্জিনাকে মেলাবার চেষ্টা করি। কপালের ডানপাশে একটা কাটা দাগ ছিল যেন । লক্ষ্য করে দেখলাম, সেটাও আছে। ভাঙাচোরা শরীরে বয়সের ছাপ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। অযত্ন অবহেলা আর বয়সের ভারে কাহিল এক বৃদ্ধা যেন দাঁড়িয়ে আছে আমার সামনে । 
জিজ্ঞেস করি, আচ্ছা, একটা কথা বলতো, সিডরের সময় তুমি এখানে ছিলে? 
মাথা কাত করে মর্জিনা, অর্থাৎ ছিল। 
সেই দিন সন্ধ্যার পর সিডরের পানি তোমাকে এক টানে ভাসিয়ে নিয়ে গিয়েছিল এখান থেকে দশ পনেরো মাইল দূরে রামনার চরে ? সেই চরে শেষ রাতে, একেবারে ভোরের দিকে তোমার জ্ঞান ফিরেছিল, সেই রকম ভয়ংকর ঘটনাই তো ঘটেছিল সেই দুর্যোগের রাতে ? 
প্রশ্নটা শুনে চোখের ভুরু কুঁচকে যায় মর্জিনার । বলে, ঘটছিল তো, কিন্তু হেতে কি ?
আমার কথা মনে পড়ে তোমার, আমার দিকে তাকাও ? সিডরের তিন দিন পর তুমি তোমাদের বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে আমাকে বলেছিলে না কেমন করে ওইদিন সন্ধ্যায় প্রথমে প্রচুর গরম হাওয়া আসে, তারপর ঠাণ্ডা বাতাস বইতে থাকে, সেই সঙ্গে হঠাৎ করে দক্ষিণ দিক থেকে শোঁ শোঁ শব্দে বিরাট একটা জলের ঢেউ প্রচণ্ড বেগে এই চরের ওপর আছড়ে পড়ে। তারপর পলকের মধ্যে কেউ কিছু বোঝার আগেই চরের সব কিছু ডুবিয়ে দিয়ে অন্য পাশ দিয়ে বেরিয়ে যায়। পরদিন তোমার জ্ঞান ফিরে আসে একটা নদীর তীরে, রামনার চরে। এসব কথা মনে পড়ে ? 
এলোমেলোভাবে মাথা দোলাতে দোলাতে কোনো কথা না বলে শুধু অবাক চোখে আমার দিকে তাকিয়ে থাকে মর্জিনা । হয়তো সেদিনের কথা মনে করার চেষ্টা করে । 
এখন তুমি কেমন আছো, মর্জিনা ? আমি আবার বলি, থাক এসব পুরোনো কথা। 
কিন্তু এখন তোমার এই অবস্থা কেন ? তোমার ছেলে বাদশা তখন ছোট ছিল, এখন তো বড় হয়েছে । শুনলাম বাদশা খুলনায় থাকে । ওর তো বাপও নেই, তুমি এখন ওর কাছে গিয়ে থাকো না কেন, তাহলে তো তোমার এত কষ্ট হয় না!’ 
প্রথমে বুঝিনি। আমার এই সমবেদনার ভাষাটুকু মর্জিনা কীভাবে নিল, সেটা বুঝতে পারলাম একটু পরে । 
‘অর লগে কি জন্য থাকুম, হঠাৎ চিৎকার করে ওঠে মর্জিনা, ও তো সংসারের শনি,অর জন্যই তো অর বাপটা মরছে, আমি কেন মরলাম না, হায় হায়, আল্লায় আমারে কেন নিলনা...?’ 
এইটুকু বলতে গিয়েই যেন একেবারে ভেঙেচুরে যায় মর্জিনা। দীর্ঘদিন ধরে বুকের ভেতরে জমে থাকা দুঃখ কষ্ট আর ক্ষোভ যেন একসঙ্গে উঠে আসে বিকট চিৎকারের মধ্য দিয়ে। কোটরাগত চোখ আর ভাঙাচোরা মুখমণ্ডল ভেসে যায় চোখের জলে। ঠিকভাবে যেন দাঁড়িয়ে থাকতে পারছিল না মর্জিনা। আঁচলে চোখ মুছতে মুছতে এক সময় দ্রুত ঘরের ভেতরে চলে যায় ।

দিনাজপুরে কবি আযাদ কালাম রচিত ‘শব্দে গৈরিক তরঙ্গ’ কবিতা গ্রন্থের পাঠউন্মোচন অনুষ্ঠিত

প্রকাশ: ২৪ মে ২০২৬, ১০:১০ পিএম
‘শব্দে গৈরিক তরঙ্গ’ কবিতা গ্রন্থের পাঠউন্মোচন অনুষ্ঠিত
ছবি: সংগৃহীত

উত্তরতরঙ্গ সাহিত্য পরিষদের আয়োজনে এবং দিনাজপুর প্রেসক্লাবের সহযোগিতায় কবি আযাদ কালামের কবিতাগ্রন্থ ‘শব্দে গৈরিক তরঙ্গ’-এর পাঠউন্মোচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। 

গত ২২ মে স্থানীয় প্রেসক্লাব মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত এই পাঠউন্মোচন অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন উত্তরতরঙ্গ সাহিত্য পরিষদের সভাপতি কবি অধ্যাপক কামরুজ্জামান গোপন। প্রধান আলোচক ছিলেন কবি, কথাসাহিত্যিক ও প্রাবন্ধিক এমরান কবির।

অনুষ্ঠানের অন্যান্য আলোচক ছিলেন কবি অধ্যাপক মোজাম্মেল বিশ্বাস, সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক কবি ও প্রাবন্ধিক মাসুদ মুস্তাফিজ, কবি ও গবেষক চাষা হাবিব, কবি নিরঞ্জন হীরা এবং কবি কমল কুজুর। এছাড়া বক্তব্য রাখেন কবি অধ্যাপক জলিল আহমেদ, কবি ফরিদুল আজাদ মিলন, রেজাউর রহমান রেজু, গল্পকার মাহবুব আলী, কবি আজাহারুল আজাদ জুয়েল, প্রেসক্লাবের সভাপতি স্বরূপ বক্সী বাচ্চু এবং উত্তরতরঙ্গের নির্বাহী সম্পাদক রাজ্জাক কাঞ্চন প্রমুখ।

কবি আযাদ কালামের কবিতা আবৃত্তি করেন বিশিষ্ট বাচিকশিল্পী মোকাররম হোসেন, মীর শিরিন, সুবর্ণা মুখার্জী এবং ছড়াকার বিধান দত্ত।

প্রধান আলোচক এমরান কবির বলেন, ‘সাম্প্রতিক কবিতার বড় একটি ব্যর্থতা হলো এর কেন্দ্রহীনতা, পারম্পর্যহীন শব্দসমাবেশ এবং পঙ্ক্তির বিধ্বস্ত বিন্যাস। বিমূর্তায়ন ও বিচ্ছুরণের দিকে ধাবিত হতে গিয়ে সাম্প্রতিক কবিতা প্রায়ই কেন্দ্র থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছে। ফলে প্রকৃতপক্ষে কবিতা পড়া যাচ্ছে না। শব্দ থেকে শব্দের যোগাযোগহীনতা, পঙ্ক্তি থেকে পঙ্ক্তির পারম্পর্যহীনতা পাঠককেও যোগাযোগহীন করে তুলছে। এই যোগাযোগহীনতা বা সংযোগ স্থাপনের ব্যর্থতার কারণে কবিতা এখন সবচেয়ে কম পঠিত সাহিত্যধারাগুলোর একটি। আযাদ কালামের কবিতা পাঠ করতে গিয়ে দেখা যায়, এসব নেতিবাচক উপাদানের উপস্থিতি নেই। ফলে তার কবিতাগুলো পাঠযোগ্য। আর যদি কোনো কবিতা পড়া যায়, তাহলে বলা যেতে পারে সেই কবিতায় ‘কিছু একটা’ আছে। এই ‘কিছু একটা’ হলো কবিতার অধরা আলোর কাছে পাঠকের প্রত্যাশা। আযাদ কালামের কবিতা সেই প্রত্যাশা পূরণ করে। কেন্দ্র থেকে অনেক দূরে মফস্বলে অবস্থান করেও বৈশ্বিক কবিতার সমান্তরালে যে কবিতাচর্চা করা সম্ভব, আযাদ কালাম তা প্রমাণ করেছেন।’

কবি আযাদ কালাম তার কবিতাগ্রন্থ নিয়ে আলোচনা করার জন্য উপস্থিত সবার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।

অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন কবি ও শিল্পী কমল কুজুর।

সমধারার স্রোতে সৃজনের উচ্ছ্বাস: কবিতা, চেতনা ও আনন্দের মিলনমেলা

প্রকাশ: ১২ মে ২০২৬, ০৬:৫৪ পিএম
আপডেট: ১২ মে ২০২৬, ০৬:৫৯ পিএম
সমধারার স্রোতে সৃজনের উচ্ছ্বাস: কবিতা, চেতনা ও আনন্দের মিলনমেলা
প্রধান অতিথি অধ্যাপক ড. সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী উৎসবে বক্তব্য রাখেন। ছবি: সংগৃহীত

বিশ্ব যখন অমীমাংসিত যুদ্ধ, সংঘাত আর মানবিক বিপর্যয়ের ভারে ন্যুব্জ—
যখন বিশ্বমানবতা অশান্তি ও উদ্বেগের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে—
ঠিক সেই সময়ই অনিশ্চয়তা ও উৎকণ্ঠাকে দূরে সরিয়ে দেশের এক কোণে, সীমিত পরিসরে, এক অপার আনন্দময় আবহে ধানমন্ডির ছায়ানটে অনুষ্ঠিত হলো সমধারার দ্বাদশ কবিতা উৎসব ২০২৬।

 ২৫ এপ্রিল অনুষ্ঠিত আয়োজন কেবল আনন্দের উপলক্ষ নয়; বরং এটি এক চলমান সাংস্কৃতিক আন্দোলনের প্রাণস্পন্দন। “সমধারা”-নামটির মধ্যেই যেন প্রবাহমান সৃজনশীলতার ইঙ্গিত, আর সেই স্রোতধারায় যুক্ত হয়েছেন দেশের প্রথিতযশা ও নবীন কবি-সাহিত্যিকেরা। তাদের সম্মিলিত উপস্থিতিতে উৎসবটি হয়ে উঠেছিল এক অনন্য নান্দনিক মেলবন্ধন। সত্যিই, অনুভূতিটা ছিল অপার্থিব।

সমধারা এমন এক উন্মুক্ত প্ল্যাটফর্ম, যেখানে নবীন ও প্রবীণ-সব প্রজন্মের সাহিত্যসাধকরা মিলিত হন এক অভিন্ন সৃজনস্পন্দনে। উপস্থিত ছিলেন শিল্প সাহিত্যের দিকপাল বহুমাত্রিক লেখক অধ্যাপক ড. সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, জাতিসত্তার কবি মুহম্মদ নূরুল হুদা, কথাসাহিত্যিক মোস্তফা কামাল, কথাসাহিত্যিক-সাংবাদিক হারুন হাবীব, কবি-প্রাবন্ধিক ফরিদ আহমেদ দুলাল, কবি মজিদ মাহমুদ এবং লেখক-গবেষক ড. এমদাদ হাসনাইনসহ আরও অনেক গুণীজন।

অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী তার বক্তব্যে সাহিত্যচর্চার বহুমাত্রিক গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন-সাহিত্য কেবল আত্মপরিচয়ের বাহন নয়, এটি চর্চার মধ্য দিয়েই টিকে থাকে। অন্যদিকে, জাতিসত্তার কবি মুহম্মদ নূরুল হুদা বিশ্বজুড়ে যুদ্ধের দামামার মাঝেও কবিতা চর্চার এমন আয়োজনকে এক বিশাল প্রাপ্তি হিসেবে আখ্যায়িত করেন। কথাসাহিত্যিক-সাংবাদিক মোস্তফা কামাল সাহিত্যচর্চাকে তুলনা করেন প্রার্থনার সঙ্গে—যেখানে প্রতিদিনের সাধনাই লেখককে পরিপূর্ণ করে।

অন্যান্য কবি-সাহিত্যিকরাও তাদের বক্তব্যে সন্তুষ্টি ও প্রাপ্তির অনুভূতি প্রকাশ করেন।

এ উৎসব যেন নববর্ষের রেশ বহন করছিল। পহেলা বৈশাখের আবহ তখনও বাতাসে ভাসমান-চারদিকে বৈশাখি মেলার আমেজ, প্রকৃতিতে মধুমাসের আগমনী বার্তা, গাছে গাছে ফলের সমারোহ। সেই আবহকে ধারণ করেই লাল রঙে সজ্জিত কবিদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো, যেন উৎসবের রঙ আরও গাঢ় হয়ে উঠেছিল।

ফরিদ আহমেদ দুলালের সভাপতিত্বে এবং কথাসাহিত্যিক-সাংবাদিক হারুন হাবীবের উদ্বোধনে, সালেক নাছির উদ্দিনের সুচারু সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানটি প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে। সারা দেশ থেকে আগত কবিদের পদচারণায় মুখর হয়ে ওঠে ছায়ানটের প্রাঙ্গণ।

এবারের সমধারা পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন কথাসাহিত্যিক মোস্তফা কামাল। শিশু সাহিত্যিক ড. ধনঞ্জয় সাহা এবং কবিতা সাহিত্যে আদ্যোনাথ ঘোষও সম্মানিত হয়েছেন। তাদের প্রতি রইল অকুণ্ঠ অভিনন্দন, শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা।

সমধারার কর্ণধার সালেক নাছির উদ্দিন তার অক্লান্ত পরিশ্রম, প্রজ্ঞা ও নিষ্ঠার মাধ্যমে এই সংগঠনকে সুসংগঠিত করেছেন। নানা প্রতিকূলতার মাঝেও তিনি সমধারার যাত্রাকে অব্যাহত রাখার যে প্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছেন, তা সত্যিই প্রশংসার দাবিদার।

এবারের আয়োজন বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ ছিল আরেকটি কারণে-অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর উপস্থিতি। তিনি নিয়মিতভাবে সব অনুষ্ঠানে অংশ না নিলেও, সমধারায় এসে তিনি যেন লেখক-কবি সত্তাকে নতুন করে জাগ্রত করে তুললেন। তার উপস্থিতি সকলের মধ্যে দ্বিগুণ উৎসাহের সঞ্চার করেছে।

অনুষ্ঠানের শেষ পর্বে ছিল সাংবাদিক ও সাহিত্যিক মোস্তফা কামালের উপন্যাস “দেবো খোঁপায় তাড়ার ফুল” অবলম্বনে কাব্যগীতি নৃত্যনাট্য “প্রেমার্ঘ নৈবেদ্য”-যা ছিল এক অনবদ্য শিল্পসম্ভার।

সব মিলিয়ে, সমধারার দ্বাদশ কবিতা উৎসব ছিল এক সফল, অর্থবহ এবং শিক্ষণীয় আয়োজন। একটি অনুষ্ঠান শুধু উপভোগের বিষয় নয়-এর ভেতরে থাকে শেখার অসংখ্য উপাদান। গুণীজনদের কথা শোনা যেমন সৌভাগ্যের, তেমনি তাদের সান্নিধ্য পাওয়া এক বিরল প্রাপ্তি।

সৌভাগ্যক্রমে সেই প্রাপ্তির অংশীদার হতে পেরেছি-প্রিয় মানুষদের সঙ্গে দেখা হয়েছে, কথা হয়েছে, শুভেচ্ছা বিনিময় হয়েছে, আশীর্বাদ চেয়েছি আগামী পথচলার জন্য।

পরিশেষে, এই আয়োজনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সকলের প্রতি রইল আন্তরিক কৃতজ্ঞতা। বিশেষ ধন্যবাদ সালেক নাছির উদ্দিনকে। সব প্রতিকূলতা অতিক্রম করে-সমধারার এই সৃজনযাত্রা আরও বহুদূর এগিয়ে যাক।

এসএন/

বইয়ের প্রচ্ছদই পাঠককে ডাকে: আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ

প্রকাশ: ০৮ মে ২০২৬, ১২:০৫ পিএম
বইয়ের প্রচ্ছদই পাঠককে ডাকে: আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ
রাজধানীর একটি হোটেলে গতকাল ফরিদুর রেজা সাগরের নতুন বই ‘প্রিয়জন আপনজন’-এর প্রচ্ছদ উন্মোচন অনুষ্ঠানে লেখকসহ অতিথিরা ছবি: খবরের কাগজ

একটি বইয়ের পরিচিতি ও পাঠককে আকর্ষণের ক্ষেত্রে প্রচ্ছদই প্রধান ভূমিকা রাখে বলে মন্তব্য করেছেন বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ। তিনি বলেছেন, প্রচ্ছদ ছাড়া বই হয় না। প্রচ্ছদ ডাক দেয়, প্রচ্ছদ চিনিয়ে দেয়। প্রচ্ছদ বলে এসো- তারপরে না বই।

বৃহস্পতিবার (৭ মে) দুপুরে রাজধানীর একটি হোটেলে শিশুসাহিত্যিক ফরিদুর রেজা সাগরের নতুন বই ‘প্রিয়জন আপনজন’-এর প্রচ্ছদ উন্মোচন অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন। অন্যপ্রকাশ থেকে প্রকাশিতব্য এই বইটির প্রচ্ছদ করেছেন বরেণ্য শিল্পী ও অভিনেতা আফজাল হোসেন।

বই প্রকাশের আগেই ঘটা করে প্রচ্ছদ উন্মোচনের এই ব্যতিক্রমী আয়োজনকে লুইস ক্যারলের ‘অ্যালিস ইন ওয়ান্ডারল্যান্ড’-এর রূপকের সঙ্গে তুলনা করেন অধ্যাপক সায়ীদ। রসিকতা করে তিনি বলেন, ‘এ কেমন বই, যার বই নেই; কিন্তু প্রচ্ছদ আছে! এটি অনেকটা সেই অদৃশ্য বিড়ালের হাসির মতো।’ লেখক ফরিদুর রেজা সাগর সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘কেউ লেখক হওয়ার পরে লেখে, আর কেউ লিখতে লিখতে লেখক হয়। সাগরের ভেতরে আগে থেকেই লেখার রসদ তৈরি ছিল, যা এখন বই হয়ে প্রকাশ পাচ্ছে।’

অনুষ্ঠানে লেখক ফরিদুর রেজা সাগর জানান, ‘প্রিয়জন আপনজন’ বইটিতে শিল্প-সাহিত্য ও সংস্কৃতি অঙ্গনের ১০০ জন বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বের কথা তুলে ধরা হয়েছে। প্রচ্ছদ নিয়ে লেখক বলেন, শিল্পী আফজাল হোসেন আমার প্রায় ৩০টি বইয়ের প্রচ্ছদ করেছেন। তার একটি স্বভাব হলো কাজ দেরিতে করা। কিন্তু এবার তিনি বই লেখা শেষ হওয়ার আগেই একাধিক প্রচ্ছদ তৈরি করে ফেলেছেন। সেই আনন্দ থেকেই এই প্রচ্ছদ উন্মোচন অনুষ্ঠানের পরিকল্পনা।

আফজাল হোসেন বলেন, ‘বই প্রকাশের আগে প্রচ্ছদ উন্মোচন আমাদের দেশে নতুন ঘটনা। একটি সময়কে ধরে রাখার জন্য সাগর ভাই যেসব গুণী মানুষকে নিয়ে লিখেছেন, তা প্রশংসার দাবি রাখে।’

অন্যপ্রকাশের প্রধান নির্বাহী মাজহারুল ইসলামের স্বাগত বক্তব্যের মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া এই অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন কথাসাহিত্যিক ইমদাদুল হক মিলন, আনিসুল হক, সাংবাদিক মতিউর রহমান চৌধুরী, শাইখ সিরাজ, জিল্লুর রহমান, ছড়াকার আমীরুল ইসলাম ও গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব আবদুন নূর তুষার।

ফারজানা ব্রাউনিয়ার সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে সংগীত পরিবেশন করেন বিশিষ্ট নজরুল সংগীতশিল্পী ফেরদৌস আরা।

স্বাধীনতা-পূর্ব বাংলাদেশের কবিতা ও ‘জ্যোৎস্না অরণ্য’

প্রকাশ: ৩০ এপ্রিল ২০২৬, ০৮:১৬ পিএম
স্বাধীনতা-পূর্ব বাংলাদেশের কবিতা ও ‘জ্যোৎস্না অরণ্য’

সম্প্রতি শিল্প-সাহিত্যের সংগঠন সৃজনের মিরপুর কার্যালয়ে একক বক্তৃতা, একক কবিতাপাঠ এবং পাঠপর্যালোচনা অনুষ্ঠিত হয়েছে। কবি লুব্ধক মাহবুবের ‘জ্যোৎস্না অরণ্য’ কাব্যগ্রন্থ নিয়ে আলোচনা করেন বিশিষ্ট গবেষক ও গল্পকার প্রফেসর ড. আনোয়ারুল হক, বিশিষ্ট গবেষক প্রফেসর ড. সেলিম আকন্দ।

আনোয়ারুল হক বলেন, কবি লুব্ধক মাহবুব প্রেমের কবি। প্রবাসী জীবনের টানাপোড়েন তার কবিতার অন্যতম অনুষঙ্গ। ‘জ্যোৎস্না অরণ্য’ কাব্যগ্রন্থে এই কবি পরিণত এবং শব্দ চয়নে দক্ষতা তার কবিতাকে ভিন্নমাত্রা দিয়েছে। তার কবিতার বিষয়ে গভীরভাবে দেশের প্রতি ভালোবাসা স্থান পেয়েছে। দেশের রাজনীতি, অর্থনীতি এবং প্রকৃতিও বিশেষভাবে তার কবিতায় উঠে এসেছে। এই কবি যে দেশে না থেকেও দেশের সঙ্গে তার কবিতার মাধ্যমে গভীর সংযোগ রেখেছেন– এই বই তার সাক্ষ্য বহন করে।

প্রফেসর ড. সেলিম আকন্দ বলেন, ‘জ্যোৎস্না অরণ্য’ কাব্যগ্রন্থের কবি লুব্ধক মাহবুব একজন জাত কবি। ‘জ্যোৎস্না অরণ্য’ তার তৃতীয় কাব্যগ্রন্থ। আগের দুটি কাব্যগ্রন্থ থেকে এ গ্রন্থে তিনি অনেক বেশি পরিণত কবি। সুনির্বাচিত শব্দ চয়ন, অনুপ্রাসের কাব্যময় প্রয়োগ, বক্রোক্তি ও ব্যজস্তুতির বর্ণময় ব্যবহার, প্রাসঙ্গিক যথাযথ উপমা-উৎপ্রেক্ষা ও চিত্রকল্প এবং গদ্য ছন্দের অনবদ্য ব্যবহারের মাধ্যমে তিনি তার তৃতীয় কাব্যগ্রন্থে নিজের জন্য একটি নিজস্ব ভাষাশৈলী তৈরিতে দারুণভাবে সক্ষম হয়েছেন বলে মনে করি। আর বাংলায় লেখা এ গ্রন্থের ৮০টি কবিতায়ই বিষয় বৈচিত্র‍্যে বৈচিত্র্যময় ধারক হিসেবে কবিকে অনন্য বিশিষ্টতায় বিভূষিত করেছে। দীর্ঘ ৩৪ বছর বিদেশ বিভুঁইয়ে অবস্থান করেও নিজের মা-মাটি-মানুষকে তিনি যে ভুলে যাননি বরং গভীর ও প্রগাঢ় মমতায় তাদের বেঁধে রেখেছেন, এই কাব্যগ্রন্থের প্রতিটি কবিতা তার বড় প্রমাণ। বলা চলে স্রষ্টা প্রদত্ত কবি প্রতিভা আর গভীর অনুশীলন, অধ্যয়ন ও পরিচর্যার মাধ্যমে নিজেকে তিনি একজন উত্তর আধুনিক কবি হিসেবে এ কাব্যগ্রন্থে যেভাবে শিল্পশ্রীমণ্ডিতভাবে মেলে ধরেছেন তা অত্যন্ত প্রশংসনীয়।

অনুষ্ঠানের ‘স্বাধীনতা-পূর্ব বাংলাদেশের কবিতার গতি-প্রকৃতি’ বিষয়ের মূল বক্তব্যে লেখক ও গবেষক ড. কুদরত-ই-হুদা বলেন, সাতচল্লিশে পাকিস্তান রাষ্ট্র গঠনের সম্ভাবনা যখন তৈরি হয় তখন পূর্ববাংলার মুসলমান কমিউনিটি সাগ্রহে তাতে শামিল হয়েছে। এর কারণ যতটা বা ধর্ম তারচেয়ে বেশি অর্থনীতিকেন্দ্রিক। তিনি বলেন, চল্লিশের দশকে পাকিস্তানি জাতীয়তাবাদ নিয়ে প্রচুর কবিতা লেখা হয়েছে। ষাটের দশকে গিয়ে কবিদের এ বিষয়ে মোহভঙ্গ ঘটে।

অনুষ্ঠানের শেষ পর্বে আরিফ মঈনুদ্দীনের একক কবিতা পাঠ অনুষ্ঠিত হয়। পঠিত কবিতার ওপর আলোচনা করেন কবি ও কথাসাহিত্যিক আহমেদ বাসার, কবি ও কথাসাহিত্যিক নুসরাত সুলতানা এবং কবি ওয়াহিদ জামান। আরিফ মঈনুদ্দীনের কবিতা সম্পর্কে নুসরাত সুলতানা বলেন, কবিতা ব্যাখ্যার অতীত এক শিল্পকর্ম। শিশুর প্রথম কান্না যখন মা শুনতে পান সেই আনন্দ যেমন ব্যাখ্যা করা যায় না তেমনি কবিতাও ব্যাখ্যা করা যায় না। কেবল উপলব্ধি করা যায়। কবি আরিফ মঈনুদ্দীন কাব্যজগতে বহু পথ পেরিয়ে এসেছেন। প্রকাশিত হয়েছে ১৮টি কাব্যগ্রন্থ। এই কবির কবিতার শব্দ চয়ন যেমন নান্দনিকতার দাবি রাখে তেমনি তার গভীর উপলব্ধি ও পাঠকের মননকে নাড়া দেয়। কবির কবিতায় দর্শন ভাবনা, মনস্তত্ত্ব এবং জীবনের ভাঁজকে পরতে পরতে খুলে দেখার আকাঙ্ক্ষা আছে।

আরিফ মঈনুদ্দীনের কবিতা সম্পর্কে কবি ও কথাসাহিত্যিক আহমেদ বাসার বলেন, এ গ্রন্থের কবিতাগুলোতে মিস্টিক চেতনার প্রকাশ ঘটেছে। কবিতাগুলো হৃদয় নয় বরং মেধাশাসিত।

আলোচক কবি ওয়াহিদ জামান বলেন, আরিফ মঈনুদ্দীনের কবিতা সহজ-সরল, কিন্তু গভীর। জীবনের প্রতিটি অনুভবকে ধারণ করার প্রতিশ্রুতি আছে তার কবিতায়।

অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন- কবি লুব্ধক মাহবুব, কবি আরিফ মঈনুদ্দীন, কবি রমজান সরকার, কবি সাদমান সজীব, কবি শামস আরেফিন, কবি ও কথাসাহিত্যিক আকেল হায়দার, অনুবাদক মেজবাহ উদ্দিন, কবি, কথাসাহিত্যিক ও প্রাবন্ধিক আহমেদ বাসার, কবি জুননু রাইন, পরিবেশবিদ কবি শেখ আহমেদ ফরহাদ, কবি ও প্রবন্ধকার প্রফেসর ড. রকিবুল হাসান, প্রফেসর ড. ডি. এম, ফিরোজ শাহ, নাট্য নির্মাতা মিতুল খান, গবেষক হোসাইন মোহাম্মদ জাকি, কবি আহমেদ বাবু, কবি হাসিবুর রহমান জয়, মো. আরিফুল ইসলাম, কবি মুনযির সাদ, কবি ও ছড়াকার হুসাইন আলমগীর, কবি অঞ্জলী রাণী পূজা, কবি ও সাংবাদিক মাসুদ হাসান, কবি ও সম্পাদক বহ্নি কুসুম, কবি ও কথাসাহিত্যিক সাহিনা মিতা, কথাসাহিত্যিক ফরিদুল ইসলাম নির্জন, ড. সর্দার এ হায়দার, কবি রহিজ আলী সরদার, কবি বোরহান মাসুদ, কবি তৌহিদ আহাম্মেদ লিখন, কবি আহমেদ বাবুল, কবি ফরহাদুর রহমান, সোহাগ হাওলাদার, রাসেল প্রমুখ...।

একজন নাবিকের চোখ, কিছু প্রশ্ন এবং ‘অবাক পৃথিবীর যত রহস্য’

প্রকাশ: ২৫ এপ্রিল ২০২৬, ০৯:০৯ এএম
একজন নাবিকের চোখ, কিছু প্রশ্ন এবং ‘অবাক পৃথিবীর যত রহস্য’

সময়ের প্রবাহে মানুষ যত বেশি তথ্যের কাছে পৌঁছেছে, ততই যেন হারিয়ে ফেলেছে ভাবনার গভীরতা। জানা আর বোঝার ভিড়ে প্রশ্ন করার অভ্যাসটি ক্রমেই ম্লান হয়ে যাচ্ছে। এই বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে এক ভিন্নধর্মী চিন্তার দুয়ার খুলে দিতে বাজারে এসেছে নতুন বই ‘অবাক পৃথিবীর যত রহস্য’। যেখানে উত্তর নয়, বরং প্রশ্নই হয়ে উঠেছে মূল আলোচ্য।

বইটি ছাপিয়েছে পরিবার পাবলিকেশনস আর প্রচ্ছদ করেছেন মৌমিতা রহমান। এবারের অমর একুশে বইমেলায় বইয়ের মোড়ক উন্মোচন করা হয়। বর্তমানে অনলাইনে পাওয়া যাচ্ছে এই গ্রন্থ।

বইটির লেখক মোহাম্মদ জয়নাল আবেদীন একজন অভিজ্ঞ নৌ কর্মকর্তা, গবেষক ও শিক্ষাবিদ। সমুদ্রপথে দীর্ঘ যাত্রা, প্রকৃতির বিশালতা ও মহাবিশ্বের নীরব বিস্ময় তাকে বারবার দাঁড় করিয়েছে কিছু মৌলিক প্রশ্নের সামনে। সেই অভিজ্ঞতা, সেই উপলব্ধি এবং সেই প্রশ্নগুলোকেই তিনি শব্দে রূপ দিয়েছেন এই গ্রন্থে।

লেখকের ভাষায়, এই বই কোনো তর্ক জেতার জন্য নয়, কোনো মতবাদ প্রতিষ্ঠার জন্যও নয় বরং এটি এক ধরনের মানসিক যাত্রা। যেখানে পাঠককে আহ্বান জানানো হয় ভাবতে, প্রশ্ন করতে এবং চারপাশের দৃশ্যমান জগতের আড়ালে থাকা অদৃশ্য রহস্যগুলোকে অনুভব করতে।

বইটির সবচেয়ে বড় শক্তি হলো—এখানে সহজভাবে এমন কিছু প্রশ্ন তোলা হয়েছে, যা মানুষের ভাবনাকে গভীরভাবে নাড়া দেয়। কেন প্রকৃতির নিয়ম আছে? কেন মহাবিশ্ব এত শৃঙ্খলাবদ্ধ? সবকিছু কি কেবলই ঘটে গেছে, নাকি কোনো এক অদৃশ্য প্রজ্ঞা তা ঘটিয়েছে? এই প্রশ্নগুলোর কোনো চূড়ান্ত উত্তর বইটি দেয় না। বরং লেখক সচেতনভাবেই উত্তরহীনতার জায়গাটিকে উন্মুক্ত রাখেন। কারণ তার বিশ্বাস, প্রশ্নই মানুষকে এগিয়ে নিয়ে যায়, প্রশ্নই মানুষকে নতুন করে ভাবতে শেখায়।

মোহাম্মদ জয়নাল আবেদীনের জীবনের অভিজ্ঞতাও কম বিস্ময়কর নয়। ১৯৭২ সালে চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে জন্ম নেয়া এই নৌ কর্মকর্তা ১৯৯০ সালে বাংলাদেশ নৌবাহিনীতে যোগ দেন। দীর্ঘ কর্মজীবনে তিনি নৌবাহিনী ও কোস্ট গার্ডের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন। মিসাইল ফ্রিগেট বানৌজা ওসমানসহ একাধিক যুদ্ধজাহাজের অধিনায়ক হিসেবে তার নেতৃত্বের অভিজ্ঞতা যেমন সমৃদ্ধ, তেমনি জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে সুদান ও লেবাননে দায়িত্ব পালন তাকে দিয়েছে বৈশ্বিক বাস্তবতার কাছাকাছি থাকার সুযোগ।

একজন নাবিক হিসেবে তিনি যেমন বিশাল সমুদ্র দেখেছেন, তেমনি একজন গবেষক হিসেবে খুঁজেছেন তার অন্তর্নিহিত অর্থ। মিলিটারি ইনস্টিটিউট অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি (এমআইএসটি) থেকে এমবিএ এবং বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালস (বিইউপি) থেকে এমফিল ও পিএইচডি অর্জনের মধ্য দিয়ে তিনি জ্ঞানচর্চার পথেও নিজেকে সমৃদ্ধ করেছেন। বর্তমানে বাংলাদেশ মেরিটাইম ইউনিভার্সিটিতে শিক্ষকতা ও প্রকল্প পরিচালনার মাধ্যমে তিনি নতুন প্রজন্মকে জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে দিচ্ছেন।

‘অবাক পৃথিবীর যত রহস্য’ তাই শুধু একটি বই নয়, এটি এক ধরনের চিন্তার অনুশীলন। এটি পাঠককে কোনো নির্দিষ্ট সিদ্ধান্তে পৌঁছে দেয় না, বরং তাকে এমন এক মানসিক অবস্থানে নিয়ে যায়, যেখানে প্রতিটি দৃশ্য, প্রতিটি নিয়ম, প্রতিটি ঘটনা নতুন করে প্রশ্ন জাগায়।

এই বই যেন এক নীরব দরজা- যা খুললে হয়তো সব উত্তর মিলবে না, কিন্তু নিশ্চিতভাবে বদলে যাবে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি। আর সেই পরিবর্তিত দৃষ্টিই হয়তো আমাদের আবার ফিরিয়ে নিয়ে যাবে সেই হারিয়ে যাওয়া অভ্যাসে, ভাবনায়, প্রশ্নে কিংবা বিস্ময়ে।