‘আমায় ডেকেছে সে চোখ-ইশারায় পথে যেতে যেতে \
ঐ ঘাসের ফুলে মটরশুঁটির ক্ষেতে
আমার এ মন-মৌমাছি ভাই উঠেছে তাই মেতে \’
ছায়ানট কাব্যের এ কবিতার নামটা অ-কেজোর গান, অথচ সে কবিতার শেষ তিনটে পঙ্ক্তিতে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম অসাধারণ এক চিত্রকল্প আর আবেগ দিয়ে একসূত্রে গেঁথেছেন প্রকৃতি ও প্রেমকে, কাজের কথাগুলোকে। তার সেই প্রেমিকার পরনে অপরাজিতার নীলরঙা শাড়ি, নাকে হলদে ফুলের নাকছাবি, হলদে আঁচল তার জড়ায় অড়হর ফুলে, ঘাসের সঙ্গে মটরশুঁটি ফুলের মাতামাতি। শীতের এরূপ কাব্যিক দৃশ্য আছে আর কোথায়, কোন কবিতায়, কোন দেশে?
এ রকম এক কাব্যিক শীতের সকালে ঢাকা থেকে রওনা দিয়ে হাজির হলাম মানিকগঞ্জের ঘিওর উপজেলার বানিয়াজুরি গ্রামের এক মটরশুঁটির খেতে। সকালের হিমেল পরশ আর হীরের কুচির মতো শিশিরের কণামাখা মটরশুঁটির ফুলগুলো যেন নজরুলের সেই প্রেমপাগল করা প্রাকৃতিক শোভা। রোদ উঠতেই সেই প্রেমে সাড়া দিয়ে সেখানে উড়তে উড়তে চলে এল মৌমাছিদের দল। গুনগুনিয়ে সেসব ফুলের ঘুম ভাঙিয়ে লুটে নিল মধু। সুন্দরের ধর্মই যেন এই। মটরশুঁটির ফুল থেকে সবেমাত্র ফল গঠন শুরু হয়েছে, কচি নীলাভ সবুজ ছোট্ট শিমের মতো চ্যাপ্টা খোসার ভেতর বিন্দু বিন্দু পুঁতির মতো মটর ডালের দানা তৈরি হচ্ছে। কদিন পরই সেসব মটরশুঁটির সুগঠিত শক্ত দানা ডাল হতে মিলে চলে যাবে।
মটরশুঁটিকে গৃহস্থরা কলাই বলে। ছোটবেলায় কলাইখেত থেকে শুঁটিশুদ্ধ গাছ উপড়ে এনে খোসা ছাড়িয়ে তার কাঁচা ফল চিবিয়ে খেতাম মজা করে। এমনকি গাছ তুলে বাড়িতে নিয়ে এলে সেগুলো দলা করে জড়ো করতাম আর তাতে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে সেসব পোড়া বিচি খেতাম, শীতের রাতে আগুন পোহাতাম। মাঝে মাঝে মা মটরশুঁটির পাকা শিমগুলো পানিতে সেদ্ধ করে তা সামনে এনে দিতেন। তখন গ্রামে চিনাবাদাম ছিল না, ভাঁপে সেদ্ধ ওসব মটরশুঁটিই ছিল আমাদের স্ন্যাকস। আহা কী মজাই না ছিল সেসব দিন। আর কুমড়োর বড়ি-বেগুন দিয়ে রাঁধা কচি মটরশুঁটি শাক, দুপুরের খাওয়ায় তা যেন ছিল পরমান্ন। শীতের পড়ন্ত বেলায় উম উম ভাতের সঙ্গে মটরশুঁটির শাক যেন ছিল অমৃতের মতো।
মটরশুঁটির সেসব দিন আর সুখ যেন এখন আমরা হারিয়ে ফেলেছি। মাঠে যে মটরশুঁটির খেত, তাকে বলে মাঠ কলাই; যা থেকে রান্নার জন্য মটরের ডাল তৈরি করা হয়। এগুলো দেশি জাতের, বীজ ছোট। আমরা বিভিন্ন সবজি বা নুডুলস রান্নায় বড় বড় মুক্তোদানার মতো সুগোল সবুজ যেসব মটরশুঁটির গোটা খাই, সেগুলো উন্নত বা হাইব্রিড জাতের। এগুলোকেই আসলে আমরা বলি মটরশুঁটি। এগুলো এ দেশে আসার পর আমরা ধীরে ধীরে হারিয়ে ফেলছি আমাদের দেশি মটরকলাইকে। বাসায় এখন আমদানি করা মসুর ডাল রান্না হয়, কিন্তু উস্তে দিয়ে মটর ডালের রান্না হয় না, মটর ডাল বেটে বড়ি তৈরি হয় না। আমরা এখন ঝুঁকে পড়ছি গার্ডেন পি বা বড় বড় দানার মটরশুঁটি খেতে, ফিল্ড পি বা মাঠ মটর এখন অনেকেরই চাষের তালিকা থেকে উঠে গেছে।
মটর এ দেশে জনপ্রিয় শিম পরিবারের একটি শীতকালীন সবজি ও ডালের উৎস। মটরের ইংরেজি নাম Pea. ব্যবহারের ওপর ভিত্তি করে এ সবজিকে দুটি ভাগে ভাগ করা হয়েছে–Garden pea ও Field pea. যে মটর সবজির মতো কাঁচা বা রান্না করে খাওয়া হয় তাকে বলে মটরশুঁটি বা Garden pea এবং যে মটরের বীজ শুকিয়ে ডাল হিসেবে রান্না করে খাওয়া হয় বা ভেজে খাওয়া হয় তাকে বলে মাঠ মটর বা Field pea অথবা Dry pea। দুটি মটরের ফুলের রং আলাদা। গার্ডেন পির ফুল সাদা ও ফিল্ড পির ফুল রঙিন। মটর ফ্যাবেসি পরিবারের গাছ। বাংলাদেশে Pisum sativum প্রজাতিটি মটর নামে পরিচিত। এ প্রজাতির আবার দুটি উপ-প্রজাতি রয়েছে–Pisum sativum L subsp. sativum বা মাঠ মটর এবং Pisum sativum subsp. elatius বা বাগান মটর (মটরশুঁটি)। অনেকের ধারণা, মটরশুঁটির বীজ পেকে মটর ডাল হয়। মটরশুঁটি শুকিয়ে বুট হতে পারে, মটর ডাল হয় না।
মাঠ মটর (মটর ডাল) গাছ তুলনামূলকভাবে ছোট ও কিছুটা ছড়ানো, ফুল রঙিন, শুঁটি ও বীজ মটরশুঁটির চেয়ে ছোট। বাগান মটর (মটরশুঁটি) গাছ তুলনামূলকভাবে লম্বা, শুঁটি ও বীজ মাঠ মটরের চেয়ে বড়, ফুল সাদা। এ দেশে শীতকালেই প্রধানত ডালজাতীয় ফসলের চাষ হয়। মুগ, ছোলা ও মাসকলাই ডালের চাষ ভালো হলেও মটরের চাষ কমে যাচ্ছে। গবেষণাতেও মটরের দিকে নজর কম। এর মাত্র দুটি জাত উদ্ভাবিত হয়েছে, যা অন্য ডাল ফসলগুলোর তুলনায় বেশ কম। শুধু প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্যই না, মাটির উর্বরতা রক্ষা ও পুষ্টির জন্যও দরকার মটরশুঁটি।
লেখক: কৃষিবিদ ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞ