ঢাকা ২৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩, সোমবার, ০৮ জুন ২০২৬

সর্বশেষ
ইংল্যান্ডের বিশ্বকাপ ঘাঁটির কাছে গোলাগুলি, আহত ৯ দেশে প্রথমবার রোবোটিক অ্যাসিস্টেড এমআরআই-ইউএসজি ফিউশন প্রোস্টেট বায়োপসি সম্পন্ন বাংলাদেশ সিরিজের আগে জোড়া ধাক্কা খেল অস্ট্রেলিয়া ইসরায়েলের পাল্টা হামলায় তেহরান-তেল আবিবে নতুন উত্তেজনা বিশ্বকাপে যুক্তরাষ্ট্রের ‘বাধা’ নিয়ে ক্ষোভ, মেক্সিকোয় পৌঁছেছে ইরান দল হামে ২৪ ঘণ্টায় ময়মনসিংহ মেডিকেলে ১ শিশুর মৃত্যু, ভর্তি ২৯ বিশ্ববাজারে ফের কমল স্বর্ণের দাম ভুয়া কমিটি ঘোষণা নিয়ে বিএনপি মিডিয়া সেলের সতর্কবার্তা ৯ অঞ্চলে ৬০ কিলোমিটার বেগে ঝড়ের আভাস স্পেন ও ইয়ামালের মাঝে বার্সা গুঞ্জন উড়িয়ে দিলেন সৌরভ-ইউসুফ, মমতার জন্য এমপি পদ ছাড়ার দাবি অস্বীকার বিচারপতি মোহাম্মদ আবদুর রউফ স্মারক গ্রন্থের জন্য লেখা আহ্বান মানিকগঞ্জে চুরির অভিযোগে গণপিটুনিতে নিহত ১ টিভিতে আজকের খেলা ফিলিপাইনে ৭.৮ মাত্রার ভূমিকম্প, সুনামি সতর্কতা জারি টেকনাফে বজ্রপাতে সাগরপারের দোকান ক্ষতিগ্রস্ত স্পেসএক্সের শেয়ার যেভাবে কিনবেন, ঝুঁকি কী গাইবান্ধায় প্রতিপক্ষের ছুরিকাঘাতে নিহত ছোট ভাই, আশঙ্কাজনক বড় ভাই ময়মনসিংহে ডিসি অফিসে বিএনপির বর্তমান ও বহিষ্কৃত নেতার হাতাহাতি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর পবিত্র হাত ও পায়ের গঠন কেমন ছিল? ঈশ্বরদীতে সড়ক দুর্ঘটনায় শিশুসহ নিহত ২ চুরি, সিস্টেম লস ও ভর্তুকিতে ঘুরপাক পঞ্চগড়ে ব্যর্থ হয়ে চার দিন পর ১০ জনকে ফিরিয়ে নিল বিএসএফ রামিসা হত্যা মামলার রায় যেভাবে কার্যকর হবে রৌমারী সীমান্তে বিএসএফের পুশইনের চেষ্টা মুক্তাগাছায় পানিতে ডুবে দুই শিশুর মৃত্যু পটুয়াখালীতে জলোচ্ছ্বাস ঠেকানো সবুজ দেয়াল বিলীন! আন্তর্জাতিক অঙ্গনে কাজী নজরুল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীর চলচ্চিত্র 'সাঁকোটা দুলছে' বিএনপির ১৩ নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন হবে ডেঙ্গু-চিকুনগুনিয়া প্রতিরোধে সরকারের ব্যাপক প্রস্তুতি
Nagad desktop

মনোলোভা মটরশুঁটির ফুল

প্রকাশ: ৩০ জানুয়ারি ২০২৬, ০৯:৩৭ এএম
মনোলোভা মটরশুঁটির ফুল
শীতের ফসল মটরশুঁটির ফুল। ছবি: লেখক

‘আমায় ডেকেছে সে চোখ-ইশারায় পথে যেতে যেতে \
ঐ ঘাসের ফুলে মটরশুঁটির ক্ষেতে
আমার এ মন-মৌমাছি ভাই উঠেছে তাই মেতে \’
ছায়ানট কাব্যের এ কবিতার নামটা অ-কেজোর গান, অথচ সে কবিতার শেষ তিনটে পঙ্‌ক্তিতে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম অসাধারণ এক চিত্রকল্প আর আবেগ দিয়ে একসূত্রে গেঁথেছেন প্রকৃতি ও প্রেমকে, কাজের কথাগুলোকে। তার সেই প্রেমিকার পরনে অপরাজিতার নীলরঙা শাড়ি, নাকে হলদে ফুলের নাকছাবি, হলদে আঁচল তার জড়ায় অড়হর ফুলে, ঘাসের সঙ্গে মটরশুঁটি ফুলের মাতামাতি। শীতের এরূপ কাব্যিক দৃশ্য আছে আর কোথায়, কোন কবিতায়, কোন দেশে? 

এ রকম এক কাব্যিক শীতের সকালে ঢাকা থেকে রওনা দিয়ে হাজির হলাম মানিকগঞ্জের ঘিওর উপজেলার বানিয়াজুরি গ্রামের এক মটরশুঁটির খেতে। সকালের হিমেল পরশ আর হীরের কুচির মতো শিশিরের কণামাখা মটরশুঁটির ফুলগুলো যেন নজরুলের সেই প্রেমপাগল করা প্রাকৃতিক শোভা। রোদ উঠতেই সেই প্রেমে সাড়া দিয়ে সেখানে উড়তে উড়তে চলে এল মৌমাছিদের দল। গুনগুনিয়ে সেসব ফুলের ঘুম ভাঙিয়ে লুটে নিল মধু। সুন্দরের ধর্মই যেন এই। মটরশুঁটির ফুল থেকে সবেমাত্র ফল গঠন শুরু হয়েছে, কচি নীলাভ সবুজ ছোট্ট শিমের মতো চ্যাপ্টা খোসার ভেতর বিন্দু বিন্দু পুঁতির মতো মটর ডালের দানা তৈরি হচ্ছে। কদিন পরই সেসব মটরশুঁটির সুগঠিত শক্ত দানা ডাল হতে মিলে চলে যাবে।

মটরশুঁটিকে গৃহস্থরা কলাই বলে। ছোটবেলায় কলাইখেত থেকে শুঁটিশুদ্ধ গাছ উপড়ে এনে খোসা ছাড়িয়ে তার কাঁচা ফল চিবিয়ে খেতাম মজা করে। এমনকি গাছ তুলে বাড়িতে নিয়ে এলে সেগুলো দলা করে জড়ো করতাম আর তাতে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে সেসব পোড়া বিচি খেতাম, শীতের রাতে আগুন পোহাতাম। মাঝে মাঝে মা মটরশুঁটির পাকা শিমগুলো পানিতে সেদ্ধ করে তা সামনে এনে দিতেন। তখন গ্রামে চিনাবাদাম ছিল না, ভাঁপে সেদ্ধ ওসব মটরশুঁটিই ছিল আমাদের স্ন্যাকস। আহা কী মজাই না ছিল সেসব দিন। আর কুমড়োর বড়ি-বেগুন দিয়ে রাঁধা কচি মটরশুঁটি শাক, দুপুরের খাওয়ায় তা যেন ছিল পরমান্ন। শীতের পড়ন্ত বেলায় উম উম ভাতের সঙ্গে মটরশুঁটির শাক যেন ছিল অমৃতের মতো। 

মটরশুঁটির সেসব দিন আর সুখ যেন এখন আমরা হারিয়ে ফেলেছি। মাঠে যে মটরশুঁটির খেত, তাকে বলে মাঠ কলাই; যা থেকে রান্নার জন্য মটরের ডাল তৈরি করা হয়। এগুলো দেশি জাতের, বীজ ছোট। আমরা বিভিন্ন সবজি বা নুডুলস রান্নায় বড় বড় মুক্তোদানার মতো সুগোল সবুজ যেসব মটরশুঁটির গোটা খাই, সেগুলো উন্নত বা হাইব্রিড জাতের। এগুলোকেই আসলে আমরা বলি মটরশুঁটি। এগুলো এ দেশে আসার পর আমরা ধীরে ধীরে হারিয়ে ফেলছি আমাদের দেশি মটরকলাইকে। বাসায় এখন আমদানি করা মসুর ডাল রান্না হয়, কিন্তু উস্তে দিয়ে মটর ডালের রান্না হয় না, মটর ডাল বেটে বড়ি তৈরি হয় না। আমরা এখন ঝুঁকে পড়ছি গার্ডেন পি বা বড় বড় দানার মটরশুঁটি খেতে, ফিল্ড পি বা মাঠ মটর এখন অনেকেরই চাষের তালিকা থেকে উঠে গেছে।

মটর এ দেশে জনপ্রিয় শিম পরিবারের একটি শীতকালীন সবজি ও ডালের উৎস। মটরের ইংরেজি নাম Pea. ব্যবহারের ওপর ভিত্তি করে এ সবজিকে দুটি ভাগে ভাগ করা হয়েছে–Garden pea ও Field pea. যে মটর সবজির মতো কাঁচা বা রান্না করে খাওয়া হয় তাকে বলে মটরশুঁটি বা Garden pea এবং যে মটরের বীজ শুকিয়ে ডাল হিসেবে রান্না করে খাওয়া হয় বা ভেজে খাওয়া হয় তাকে বলে মাঠ মটর বা Field pea অথবা Dry pea। দুটি মটরের ফুলের রং আলাদা। গার্ডেন পির ফুল সাদা ও ফিল্ড পির ফুল রঙিন। মটর ফ্যাবেসি পরিবারের গাছ। বাংলাদেশে Pisum sativum প্রজাতিটি মটর নামে পরিচিত। এ প্রজাতির আবার দুটি উপ-প্রজাতি রয়েছে–Pisum sativum L subsp. sativum বা মাঠ মটর এবং Pisum sativum subsp. elatius বা বাগান মটর (মটরশুঁটি)। অনেকের ধারণা, মটরশুঁটির বীজ পেকে মটর ডাল হয়। মটরশুঁটি শুকিয়ে বুট হতে পারে, মটর ডাল হয় না। 

মাঠ মটর (মটর ডাল) গাছ তুলনামূলকভাবে ছোট ও কিছুটা ছড়ানো, ফুল রঙিন, শুঁটি ও বীজ মটরশুঁটির চেয়ে ছোট। বাগান মটর (মটরশুঁটি) গাছ তুলনামূলকভাবে লম্বা, শুঁটি ও বীজ মাঠ মটরের চেয়ে বড়, ফুল সাদা। এ দেশে শীতকালেই প্রধানত ডালজাতীয় ফসলের চাষ হয়। মুগ, ছোলা ও মাসকলাই ডালের চাষ ভালো হলেও মটরের চাষ কমে যাচ্ছে। গবেষণাতেও মটরের দিকে নজর কম। এর মাত্র দুটি জাত উদ্ভাবিত হয়েছে, যা অন্য ডাল ফসলগুলোর তুলনায় বেশ কম। শুধু প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্যই না, মাটির উর্বরতা রক্ষা ও পুষ্টির জন্যও দরকার মটরশুঁটি। 

লেখক: কৃষিবিদ ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞ

সবজির শত্রু কাঁঠালে পোকা

প্রকাশ: ০৮ জুন ২০২৬, ০৮:১৯ এএম
আপডেট: ০৮ জুন ২০২৬, ০৮:৩২ এএম
সবজির শত্রু কাঁঠালে পোকা
ছবির: খুলনার দৌলতপুরে সম্প্রতি দেখা মিলনরত কাঁঠালে পোকা।

আতশ কাচ দিয়ে ছোট ছোট পোকামাকড় দেখার একটা মজা আছে। আমার এক ডাচ সহকর্মী হেইন বিলমেকারস তার দেশ নেদারল্যান্ডস থেকে একটা পকেট ম্যাগনিফাইং গ্লাস তথা আতশ কাচ এনে আমাকে উপহার দিয়েছিলেন। সেটা তিন ভাঁজ করে রাখা যেত, আবার ভাঁজ খুলে অণুবীক্ষণ যন্ত্রের মতো পেতে তার নিচে পোকার ডিম বা অত্যন্ত ক্ষুদ্র পোকা রেখে তার সর্বাঙ্গ নিখুঁতভাবে প্রায় দশ গুণ বড় করে দেখতে পেতাম। সেটা আমার একসময়ে গলার মালা হয়ে উঠেছিল। মাঠে ঘোরার সময় সেটা সব সময় গলায় ঝুলিয়ে রাখতাম। ২০১০ সালে বৈশাখের এক সকালবেলায় চাঁপাইনবাবগঞ্জের কল্যাণপুরে একটা বেগুন খেতের মধ্য দিয়ে হাঁটছিলাম আর পোকা খুঁজছিলাম। ক্ষতিকর পোকারা সহজে চোখের সামনে আসে না, আড়ালে লুকিয়ে থাকে। তাই কখনো কখনো পাতা উল্টিয়ে দেখছিলাম, সেখানে কিছু দেখা যায় কি না। 

অনুমান মিথ্যা না, কয়েকটা চকচকে হলুদ ডিমের একটা গাদা পেলাম। ডিমগুলো লম্বা, হলুদ ও অনেকটা চুরুট আকৃতির, মাথা কিছুটা সরু। সঙ্গে সঙ্গে আতশ কাচ বের করে সে ডিমগুলোকে আরও বড় দেখতে পেলাম। কী যে সুন্দর! আলো পড়ে ডিমগুলো চকচক করছে, মনে হলো কেউ যেন কাঠির মতো হলদে-কমলা রসালো মিষ্টি খাড়া করে পাতার নিচে সাজিয়ে রেখে গেছে। কিসের ডিম? সেটা নিশ্চিত হওয়ার জন্য কাঁচি দিয়ে পাতাসহ ডগাটি কেটে নিয়ে এলাম। একটা ছোট বয়ামে পানি দিয়ে তার গোড়াটা ডুবিয়ে দিলাম। ঘরে ফিরে ডিমসহ পাতাটা সাবধানে রেখে অন্য পাতাগুলো ছেঁটে দিলাম। ডগা-পাতাসহ ছোট বয়ামটা রেখে দিলাম আর একটা বড় বয়ামের ভেতর। মুখের ঢাকনি ফেলে দিয়ে সেখানে মশারির জাল দিয়ে ঢেকে বেঁধে দিলাম। রোজ সকাল-বিকেল দেখতে থাকলাম, ডিম ফুটেছে কি না। তিন দিন পর ডিম ফুটে ছানারা বেরিয়ে এল। ক্ষুদ্র সেসব ছানার রং সাদাটে হলুদ, গায়ের দুপাশে সারি বাঁধা কাঁটা, শরীরটা চ্যাপ্টা। ছানাদের চেহারা দেখেই চিনে গেলাম। ওগুলো এপিলাকনা বিটলের ডিম ছিল।

পরদিনই দেখলাম ছানারা সেই বেগুনপাতা খাওয়া শুরু করেছে। খাওয়ার ধরনটা বেশ চমৎকার। পাতার সবুজ অংশ বা ত্বক কুরে কুরে খেয়ে পাতাকে স্বচ্ছ জালের মতো করে ফেলছে। কিন্তু ফুটো করছে না। খাওয়া অংশটা ইটের গাঁথুনির মতো লাগছে। ধীরে ধীরে ছানারা বড় হয়, রং বদলায়, হলদে হয়। ওদের এই কাঁটাওয়ালা দেহের জন্য এ পোকার বাংলায় নামকরণ করা হয়েছে কাঁটালে পোকা। আবার রংটা পাকা কাঁঠালের কোয়ার মতো হলুদ সে জন্য কৃষকরা বলেন কাঁঠালে পোকা। ছানাগুলো ১১ দিন পর পুত্তলির রূপ ধারণ করল ও পাতার সঙ্গে প্রায় নির্জীব অবস্থায় আটকে শান্তিঘুমে গেল। এখন দেখার পালা কয় দিনে ওই পুত্তলিগুলোর ঘুম ভাঙে। আর সেখান থেকে কী পোকা বের হয়। 

অবশেষে সাত ও আট দিন পর পাঁচটা পুত্তলি থেকে পাঁচটা পূর্ণাঙ্গ পোকা বেরিয়ে এল। একবার মনে হলো, লেডি বিটল না তো? এর মধ্যে একবার আরও একটা নতুন পাতাসহ ডগা ছোট বয়ামে ঢুকিয়ে দিয়েছি। পোকাগুলো বেরিয়েই সেসব নতুন সতেজ পাতার ওপরে ঘুরে ঘুরে ছানাদের মতোই পাতা ঝাঁঝরা করে খাওয়া শুরু করল। চেহারা ভালো করে পর্যবেক্ষণ করেই নিশ্চিত হলাম যে ওটি এপিলাকনা বিটলই। এপিলাকনা ও লেডি বিটল দুটি পোকাই একই গোত্রের, চেহারার সঙ্গেও বেশ মিল আছে। লেডি বার্ড বিটল পত্রভুক নয় আর এরা পত্রভুক স্বভাবের। তা ছাড়া লেডি বিটলের পাখার রং উজ্জ্বল লাল, চকচকে, বিচিত্র রকমের দাগ থাকে বা থাকে না। কিন্তু এপিলাকনা বিটলের পাখার রং ঘোলাটে লাল, চকচকে না ও গোল গোল কালো রঙের ফোঁটার মতো দাগ থাকে। কালো ফোঁটার সংখ্যার ওপর ভিত্তি করে দুই রকমের এপিলাকনা বিটল এ দেশে পাওয়া গেছে। একটির সামনের এক জোড়া ডানায় থাকে ১২টি ফোঁটা এবং অন্যটির ডানা দুটিতে থাকে ২৮টি ফোঁটা। এদের প্রজাতিগত নাম Henosepilachna vigintioctopunctata, উভয় প্রজাতিই কলিওপ্টেরা বর্গের কক্সিনেলিড গোত্রের পোকা। এ পোকাদের ইংরেজি নাম হড্ডা বিটল। পশ্চিমবঙ্গের কৃষকরা বলেন গুটিপোকা।

এ বছরের ২৯ মে খুলনার দৌলতপুরে একটি ঝোপ-জঙ্গলের মধ্যে বুনো কিছু বেগুনগাছে বারো ফোঁটার সে পোকাকে দেখতে পেয়ে পুরোনো সেই স্মৃতিগুলো যেন জেগে উঠেছিল। একটি মেয়ে ও একটি পুরুষ পোকা মিলনে রত। মেয়েটির আকার বড়। তার পিঠে চড়ে বসেছে অপেক্ষাকৃত ছোট আকারের পুরুষ পোকাটি। দুটি পোকাই দেখতে ধূসর লাল বা গাঢ় তামাটে রঙের ও গোলাকার। মিলনের পর মেয়ে পোকা অন্তঃসত্ত্বা হয় ও পাতার ওপর দিকে গাদা করে ডিম পাড়তে শুরু করে। প্রতিবারে বা প্রতি গাদায় ২০ থেকে ৫০টি করে ডিম পাড়ে। একটি স্ত্রী পোকা তার সারা জীবনে কয়েক দফায় ৪০০টি পর্যন্ত ডিম পাড়ে।

পৃথিবীর বেগুন উৎপাদনকারী সব দেশেই এ পোকার আক্রমণ লক্ষ করা যায়। বেগুন ছাড়াও এ পোকা কুমড়াজাতীয় সবজির যথেষ্ট ক্ষতি করে থাকে। বিশেষ করে করলা পাতা ও শসা পাতা এদের দ্বারা বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। মার্চ থেকে মে পর্যন্ত সাধারণত এদের দেখা যায়। জুলাই-আগস্টে এদের আক্রমণ সবচেয়ে বেশি লক্ষ করা যায়।

মৃত্যুঞ্জয় রায়/খাদিজা রুমি/

রাতারগুলে প্ল্যাস্টিক বর্জ্য ধ্বংস করে বৃক্ষরোপণ

প্রকাশ: ০৭ জুন ২০২৬, ১১:২৩ এএম
আপডেট: ০৭ জুন ২০২৬, ১১:৫৮ এএম
রাতারগুলে প্ল্যাস্টিক বর্জ্য ধ্বংস করে বৃক্ষরোপণ
রাতারগুল জলার বন এলাকায় বাড়ন্ত বৃক্ষরোপন, প্লাস্টিক বর্জ্য ধ্বংস করে জনসচেতনতামূলক সভা করে ধরিত্রী রক্ষায় আমরা (ধরা)। স্থানীয় মানুষজনকে সম্পৃক্ত করে। শনিবার দিনভর এ কর্মসূচি পালন হয়। -খবরের কাগজ

সিলেটের পর্যটনকেন্দ্র রাতারগুলে বিশ্ব পরিবেশ দিবস উপলক্ষে বৃক্ষরোপণ ও প্লাস্টিক বর্জ্য অপসারণ কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়েছে।

সিলেটের জলার বন রাতারগুলে নয়া ‘জ্বালা’ হিসেবে দেখা দিয়েছে প্লাস্টিক বর্জ্য। সেখানে বেড়াতে যাওয়া মানুষজনের যত্রতত্র ফেলা প্ল্যাস্টিক বর্জ্যসহ সাম্প্রতিক সময়ে মাছ শিকারে ব্যবহার হচ্ছে প্লাস্টিকের তৈরি নানা রকম ফাঁদ। 

এর বিরুদ্ধে সামাজিক সচেতনতার মাধ্যমে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে প্ল্যাস্টিক বর্জ্য সংগ্রহ করে পুড়িয়ে দিয়ে রোপণ করা হয়েছে বাড়ন্ত বৃক্ষ।

শনিবার (৬ জুন) দিনভর বিশ্ব পরিবেশ দিবস উপলক্ষে পরিবেশাবাদী সংগঠন ‘ধরিত্রী রক্ষায় আমরা’ (ধরা), সিলেট শাখা এবং পরিবেশ ও ঐতিহ্য সংরক্ষণ ট্রাস্ট সিলেটের যৌথ উদ্যোগে এ কর্মসূচি পালিত হয়। এরপর স্থানীয়দের নিয়ে একটি সচেতনতামূলক সভা করা হয়।

সংগঠনের পক্ষ থেকে সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, রাতারগুল জলার বনের মাঝের ঘাটে ফলজ, ঔষধি ও বনজ প্রজাতির প্রায় অর্ধ-শতাধিক গাছের চারা রোপণ করা হয়। গাছের এসব চারা বাড়ন্ত। ফলে রোপণ করার পর গাছগুলো পরিপক্ক হওয়ার সুযোগ রয়েছে।

বৃক্ষরোপণের পর বন থেকে পাঁচ বস্তারও বেশি প্লাস্টিক ও পলিথিন বর্জ্য জড়ো করে তা পুড়িয়ে ধ্বংস করা হয়েছে।

বাড়ন্ত বৃক্ষ-রোপণ ও প্লাস্টিক বর্জ্য অপসারণ এবং ধ্বংসের পর অনুষ্ঠিত জনসচেতনতামূলক আলোচনা সভায় সভাপতিত্ব করেন ধরিত্রী রক্ষায় আমরা (ধরা) সিলেট শাখার আহ্বায়ক ও পরিবেশ ঐতিহ্য সংরক্ষণ ট্রাস্ট, সিলেটের সভাপতি ডা. মোস্তফা শাহজামান চৌধুরী বাহার। 

সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন মেট্রোপলিটন ইউনিভার্সিটি সিলেটের ভাইস চ্যান্সেলর ও ধরার সংগঠক প্রফেসর ড. মোহাম্মদ জহিরুল হক।

পরিবেশ আন্দোলনের সংগঠক আব্দুল করিম চৌধুরী কিম স্বাগত বক্তব্য দেন। তিনি বলেন, ১৯৭২ সালে জাতিসংঘের উদ্যোগে সুইডেনের স্টকহোমে অনুষ্ঠিত পরিবেশ সম্মেলনের সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতে ১৯৭৪ সাল থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে বিশ্ব পরিবেশ দিবস পালিত হয়ে আসছে। 

পরিবেশ সংরক্ষণ, জীববৈচিত্র্য রক্ষা, দূষণ ও বৈশ্বিক উষ্ণতা নিয়ন্ত্রণ, পরিবেশ ও প্রতিবেশ বিধ্বসী কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ এবং টেকসই উন্নয়ন সম্পর্কে বিশ্বব্যাপী জনসচেতনতা বৃদ্ধি হলো এ দিবসের মূল উপজীব্য। জীববৈচিত্র্য, বনজসম্পদ, পাহাড় ও টিলার জন্য সিলেট বাংলাদেশের মধ্যে বিশেষ স্থান দখল করলেও আমরা সেই ঐতিহ্য হারাতে বসেছি।

প্লাস্টিক ও পলিথিন বর্জ্য শহর-নগর পেরিয়ে প্রত্যন্ত গ্রাম এলাকায় তথা পাহাড়, বন, জঙ্গল; এমনকি একমাত্র মিঠাপানির বন রাতারগুলের পরিবেশকে সংকটাপন্ন করে তুলেছে উল্লেখ করে পরিবেশাবাদী এই সংগঠক আরও বলেন, "আমরা এসব প্লাস্টিক ও পলিথিন বর্জ্য কুড়িয়ে জড়ো করে তা ধ্বংসের মাধ্যমে প্রতীকী কর্মসূচি পালন করে পর্যটক ও এলাকার জনসাধারণকে সচেতন করার উদ্যোগ নিয়েছি। সরকারকেও এ ব্যাপারে কার্যকর ভূমিকা পালন করতে হবে।"

প্রফেসর মোহাম্মদ জহিরুল হক বলেন, ভৌগলিক অবস্থানগত কারণে বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তন ও বৈশ্বিক পরিবেশ বিপর্যয়ের জন্য সংকটাপন্ন। এ সংকট থেকে রক্ষা পেতে অনেকগুলো কার্যকর ও সহজ উপায়ের একটি হলো বৃক্ষরোপণ ও বন সংরক্ষণ।

বাংলাদেশের জন্য অন্তত ২৫ শতাংশ বনভূমি থাকার কথা থাকলেও প্রকৃতপক্ষে এর তিনভাগের একভাগও কার্যকরী বন নেই। সরকারি দলিলপত্রে বনভূমি থাকলেও তাতে বৃক্ষ নেই। তাই অবিলম্বে বনভূমির এলাকাসমূহে কার্যকর বন সৃষ্টি করে পুরো দেশকে সবুজায়নের আওতায় নিয়ে আসতে হবে।

রাতারগুল প্রাকৃতিক পর্যটন এলাকা হওয়ায় এখানে পর্যটকদের ভ্রমণ ও বনের ভেতর পরিদর্শনের সময় বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। টেকসই পর্যটন হলো পরিবেশবান্ধব। জীববৈচিত্র্য অস্তিত্বের জন্য সংবেদনশীল কাজ থেকে পর্যটকদের বিরত থাকতে হবে।  

বিশেষায়িত বন এলাকা হিসেবে রাতারগুলের আশপাশ থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন সভাপতি ডা. মোস্তফা শাহজামান চৌধুরী বাহার।

তিনি বলেন, এখানকার ভূমিকে নদীভাঙনের শিকারে পরিণত করা হয়েছিল। প্লাস্টিক ফাঁদের মাধ্যমে মাছ শিকার করে বিভিন্ন দেশিয় প্রজাতির জলজ প্রাণ ধ্বংসের কর্মকাণ্ডে অনেকে জড়িত। আমরা এদের বিরুদ্ধেও কর্মসূচি গ্রহণ করেছি।

এ জলাবন কেবল একখণ্ড ভূমি নয়; এটি জীববৈচিত্র্যের আধাঁর। এ বনকে সংরক্ষণ করতে হবে। এখানকার পর্যটন হতে হবে পরিবেশবান্ধব ও টেকসই। সবুজায়ন কর্মসূচির মাধ্যমে এখানে নতুন বন সৃজন ও বিদ্যমান বন সংরক্ষণ জরুরি।  

কর্মসূচিতে অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন- রাজনৈতিক ও নাগরিক আন্দোলনের সংগঠক কমরেড উজ্জ্বল রায়, ট্যুরিস্ট পুলিশের উপ-পরিদর্শক সঞ্জয় কুমার রায়, পরিবেশ ঐতিহ্য সংরক্ষণ ট্রাস্টের ট্রাস্টি রেজাউল কিবরিয়া, ধরা সিলেট শাখার সদস্য নাহিদ পারভেজ বাবু ও সোনা মিয়া, স্থানীয় ফতেহপুর ইউপি সদস্য ফখরুল ইসলাম চৌধুরী, রাতারগুল গ্রামের আমির আলী, আরব আলী, মিনহাজ উদ্দিন, ফজলু মিয়া প্রমুখ।

রাতারগুলে প্লাস্টিক বর্জ্যের আগ্রাসন নিয়ে পরিবেশবাদী সংগঠন ধরার প্রথম দফা কর্মসূচির পরিপ্রেক্ষিতে গত ২১ মে ‘জলার বনে নয়া ‘জ্বালা’ শিরোনামে খবরের কাগজে একটি সচিত্র প্রতিবেদন প্রকাশ হয়েছিল।

তামান্না রুপা/অমিয়/

কৃষ্ণচূড়ার রাঙা মঞ্জরি

প্রকাশ: ০৫ জুন ২০২৬, ০৮:৪৮ এএম
আপডেট: ০৫ জুন ২০২৬, ০৯:১১ এএম
কৃষ্ণচূড়ার রাঙা মঞ্জরি
ঢাকার রমনা উদ্যানে ফোটা কৃষ্ণচূড়া ফুল। ছবি: লেখক

যুবক বয়সে শোনা লতা মঙ্গেশকরের একটি গানের পঙ্‌ক্তিগুলো এখনো কানে বাজে যখন চোখের সামনে পড়ে কৃষ্ণচূড়া ফুলেরা। গানটি হলো–‘কৃষ্ণচূড়া শোন শোন শোন।/ সারাবেলা দোলায় তোকে/ ক্ষ্যাপা হাওয়া যে!/ ক্ষ্যাপা হাওয়া যে!/ তার পায়ের শব্দ যায় না শোনা/ পাতার আওয়াজে,/ তোর পাতার আওয়াজে।’ কবি কাজী নজরুলের গানেও শুনি সে সুরের আভাস, কথার ইন্দ্রজাল–‘পিয়াল বনে উঠল বাজি তোমার বেণু ছড়ায় পথে কৃষ্ণচূড়া পরাগ-রেণু’ নজরুলের অন্তত ৯টি কবিতা ও গানে কৃষ্ণচূড়া ফুলের উল্লেখ পাওয়া যায়। 

কবি নজরুলের অন্য একটি গানে কৃষ্ণচূড়া ফুল যতটা খ্যাতি পেয়েছে, ততটা খ্যাতি মনে হয় আর কোনো গান বা কবিতায় পায়নি, গানের পঙ্‌ক্তিগুলো হলো–‘কৃষ্ণচূড়ার রাঙা মঞ্জরি-কর্ণে।/ আমি ভুবন ভুলাতে আসি গন্ধে ও বর্ণে / মোরে চেন কি?/ মোর আঁচলে চাঁপা, হেনা যুঁই অতসী।/ মোর বনের সাজিতে ভরা পলাশ বকুল/ নব আমের মুকুল,/ মম উত্তরী ঝলমল কিশলয় পর্ণে /’

কদম যেমন বর্ষার দূত, কৃষ্ণচূড়া তেমন গ্রীষ্মের। পঞ্জিকার পাতা না দেখে ফুল ফোটা কৃষ্ণচূড়া গাছ দেখে বোঝা যায় গ্রীষ্ম এসেছে। রৌদ্রদগ্ধ তপ্ত দিনের উত্তাপ যেন কৃষ্ণচূড়া ফুলেরা আরও বাড়িয়ে দেয়। লাল ও কমলা লাল ফুলগুলোকে দেখে মনে হয় কৃষ্ণচূড়া ফুল যেন কারও লজ্জা চুরি করে হয়েছে রক্তিম লাজবতী অথবা রোদ মেখে হয়েছে রৌদ্রবতী। কৃষ্ণচূড়া ফুল একদিকে যেমন প্রেমের, অন্যদিকে দ্রোহের প্রতীক। নজরুলের একটি অগ্রন্থিত ‘আবীর’ কবিতায় সে দ্রোহের ইশারা দেখি–
‘আবীর ছড়াও, আবীর ছড়াও, হে বীর তরুণদল,
নিরক্ত এই ধরা হোক পুন রক্তাক্তোজ্জ্বল।
পুষ্পাকীর্ণ পন্থা দেখাও কন্থা-জড়িত জীবে;
জ্বালাও অশোক কৃষ্ণচূড়ার শিখা, দীপ গেছে নিভে।’ 

ঢাকা শহরটি বড়ই অদ্ভুত ও আশ্চর্যময়। কৃষ্ণচূড়া ফুল ফোটার দিনে সড়ক-মহাসড়কগুলো যেন সেজে ওঠে সেসব রক্তিম ফুলে। নবীন সবুজ চিরল চিরল পাতার ফাঁকে ফাঁকে দলা দলা ফুল আর ফুল–আহা কি দাহ দিনের উষ্ণ আমন্ত্রণ! মুগ্ধ বিস্ময়ে শুধু তাকিয়ে থাকি সুবিশাল বৃক্ষের চূড়ায় পরা ফুলগুলোর দিকে। চন্দ্রিমা উদ্যান ও তার পাশের সড়ক, হাতিরঝিলের পাড় ধরে হাঁটতে থাকলে মনে হয় এ শহর বুঝি কৃষ্ণচূড়ার। আমাদের দেশের গাছ না সে, এসেছে সুদূর আফ্রিকার মাদাগাস্কার থেকে। ১৮২৪ সালে মাদাগাস্কার থেকে কৃষ্ণচূড়া যায় মরিশাসে, সেখান থেকে ইংল্যান্ড এবং আরও পরে বিস্তার ঘটে দক্ষিণ এশিয়ায়। অথচ বিদেশি গাছ হয়েও কীভাবে সে মানিয়ে গেছে এ দেশের প্রকৃতিতে, মনে হয় যেন সে আমাদেরই গৃহকন্যা।

কৃষ্ণচূড়া বিশাল বৃক্ষ, গোড়ায় ডানাওয়ালা অধিমূল, মাথায় ছাতার মতো ছড়ানো ডালপালা। তবে বছরের সব সময় গাছের চেহারা পত্রসুশোভিত ছত্রাকার থাকে না। শীতে সব পাতা ঝরে যায়। নিষ্পত্র সেসব গাছ দেখে মন খারাপ হয়ে যায়। শীতের শেষে বসন্তে আবার গাছ ভরে ওঠে কচি পত্রপল্লবে। বসন্তের পর গ্রীষ্মে ফুলগুলোর কাছ থেকে শোনা যায় গ্রীষ্মের আগমনী গান। চিরল চিরল সবুজ পাতা আর উজ্জ্বল লাল রঙের থোকা ধরা ফুল বড়ই মনোমুগ্ধকর। ফুলের পাঁচটি পাপড়ির মধ্যে চারটি পাপড়ি এক রকম, কিন্তু মাঝখানের একটি বড় ও অন্য রকম, হলদে-সাদা ছোপযুক্ত। শিগোত্রীয় গাছ, তাই বড় চ্যাপ্টা শিমের মতো ফল হয়, ফলের ভেতর বাদামি রঙের বীজ হয়। বীজ থেকে সহজে চারা হয়। বাগানের জন্য এ গাছ ভালো হলেও পথতরু হিসেবে ঝুঁকিপূর্ণ, কেননা এর ডালপালা খুব নরম। ঝড়-বাতাসে সহজে ভেঙে পড়ে। এতে পথচারীরা হতাহত হতে পারেন।

কৃষ্ণচূড়া গাছের ডালপালা চারদিকে ছড়ানো। গাছ ১০ থেকে ১৮ মিটার লম্বা হয়। থোকা ধরে টকটকে লাল রঙের ফুল ফোটা শুরু হয় এপ্রিলে, বর্ষাকালেও কিছু ফুল দেখা যায়। ফুল শেষে শিমের মতো চ্যাপ্টা বাদামি ও কাষ্ঠল বড় ফলের ভেতরে বীজ গঠিত হয়। বীজ থেকে গাছ হয়। পথতরু ও উদ্যানতরু হিসেবে লাগানো হয়। কৃষ্ণচূড়ার ইংরেজি নাম পিকক ফ্লাওয়ার, উদ্ভিদতাত্ত্বিক নাম Delonix regia ও গোত্র ফ্যাবেসি, উপগোত্র সিসালপিনিয়েসি। ডেলোনিক্স গ্রিক শব্দ, যার অর্থ থাবার মতো। ফুল দেখতে থাবার মতো। সম্ভবত সে জন্যই এর প্রজাতিগত নামের প্রথমাংশ রাখা হয়েছে ডেলোনিক্স রেজিয়া, যার অর্থ রাজকীয়। এটি যে রাজকীয় ফুল সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। তবে কাঠ যেন ততটাই মূল্যহীন, একমাত্র জ্বালানি কাঠ বা লাকড়ি ছাড়া এর আর তেমন উল্লেখযোগ্য কোনো ব্যবহার নেই। যে কোনো প্রান্তরে বা প্রশস্ত প্রাঙ্গণে রোপিত কৃষ্ণচূড়ার দীর্ঘ সারি খুবই মনোরম।

লেখক: কৃষিবিদ ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞ

বরিশালের পদ্মপুকুর: ‘প্রকৃতির রাজ্যে’ প্রবেশে বাধা

প্রকাশ: ০৪ জুন ২০২৬, ০৮:৫৪ এএম
আপডেট: ০৪ জুন ২০২৬, ০৯:০৭ এএম
বরিশালের পদ্মপুকুর: ‘প্রকৃতির রাজ্যে’ প্রবেশে বাধা
ছবি : খবেরর কাগজ

কয়েক একরের বিশাল দিঘিজুড়ে সবুজের মেলা, তার মাঝে মাথা উঁচিয়ে আছে হাজারও বিরল শ্বেতপদ্ম। অথচ ঈদের ছুটিতে পরিবার নিয়ে বরিশালের এই বিখ্যাত পদ্মপুকুরের সৌন্দর্য দেখতে এসে হতাশ হয়ে ফিরে গেছেন অসংখ্য দর্শনার্থী। বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) হঠাৎ করেই বন্ধ করে দিয়েছে ঐতিহ্যবাহী এই স্থাপনায় প্রবেশ। প্রায় এক মাস ধরে কার্যকর থাকা এই সিদ্ধান্তের কারণে স্থানীয় বাসিন্দা ও প্রকৃতিপ্রেমীদের মাঝে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।

বরিশাল শহরের রাজাবাহাদুর সড়কে বিআইডব্লিউটিএর বিশ্রামাগার ‘হিমনীড়’-সংলগ্ন পুকুরটিতে প্রতিবছর এই সময়ে শ্বেতপদ্মে ছেয়ে যায়। ঈদের ছুটিতে দূর-দূরান্ত থেকে আসা অনেক দর্শনার্থীকে দেখা গেছে, সীমানাপ্রাচীরের বাইরে দাঁড়িয়ে শ্বেতপদ্মের সৌন্দর্য দেখছেন। কয়েকজন কিশোরও ভেতরে যাওয়ার অপেক্ষায় থাকলেও সুযোগ পায়নি। অনেকে আক্ষেপ করছেন, বছরের এই একটি সময়ে ফোটা বিরল শ্বেতপদ্মগুলো কাছ থেকে দেখার সুযোগ থেকে তাদের বঞ্চিত করা হচ্ছে।

পরিবার-পরিজন নিয়ে পদ্মপুকুর দেখতে আসা মাহবুব মাসুম নামে এক প্রবাসী বলেন, ‘শনিবার অনেক আশা নিয়ে সন্তানদের এই ঐতিহাসিক পুকুরটি দেখাতে এনেছিলাম। কিন্তু গেটে থাকা আনসার সদস্যরা আমাদের ভেতরে ঢুকতে দেননি। বাধ্য হয়ে প্রাচীরের বাইরে দাঁড়িয়েই বাচ্চাদের ফুল দেখালাম।’

ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি আরও বলেন, ‘এত সুন্দর ও দর্শনীয় একটি জায়গা সাধারণ মানুষের জন্য এভাবে পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া কোনোভাবেই ঠিক হয়নি। বরিশালের এই অনন্য প্রাকৃতিক সৌন্দর্যকে সবার জন্য উন্মুক্ত রাখা উচিত।’

পুকুরটির পাহারায় নিয়োজিত আনসার সদস্যরা জানান, কর্তৃপক্ষের কঠোর নির্দেশেই তারা কাউকে ভেতরে প্রবেশ করতে দিচ্ছেন না। তাদের দাবি, কিছু দর্শনার্থী ভেতরে ঢুকে পদ্মফুল টেনে ছেঁড়েন এবং আশপাশের বাগানের ক্ষতি করেন। এ ছাড়া কিছু অপ্রাপ্তবয়স্ক ও তরুণ-তরুণী দীর্ঘসময় ধরে ভেতরে বসে আপত্তিকর আচরণ করেন। মূলত এই সামাজিক পরিবেশ রক্ষা ও ফুল বাঁচানোর তাগিদেই বিআইডব্লিউটিএর প্রকৌশল শাখার নির্বাহী প্রকৌশলী আমজাদ হোসাইনের নির্দেশে এই সিদ্ধান্ত কার্যকর করা হয়েছে।

তবে বিআইডব্লিউটিএর এই যুক্তিকে ‘অজুহাত’ বলে উড়িয়ে দিয়েছেন স্থানীয় সাংস্কৃতিক ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা। বরিশাল সাংস্কৃতিক সংগঠন সমন্বয় পরিষদের সাধারণ সম্পাদক শহীদুল ইসলাম শিশির এই সিদ্ধান্তের তীব্র বিরোধিতা করে বলেন, ‘এই পদ্মপুকুর বরিশালের একটি অন্যতম ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা। এখানকার শ্বেতপদ্ম অত্যন্ত বিরল প্রজাতির। ফলে এই সৌন্দর্য উপভোগ করা ও দেখার নাগরিক অধিকার সবার আছে।’

তিনি আরও যুক্তি দেন, ‘পুকুরটির ঠিক পাশেই বিআইডব্লিউটিএর প্রকৌশল কার্যালয় এবং তাদের ঐতিহাসিক বাংলো ‘হিমনীড়’ অবস্থিত। সেখানে সার্বক্ষণিক আনসার ও নিরাপত্তাকর্মীরা ডিউটি করেন। এত নজরদারির মধ্যে কিশোর-কিশোরী বা যুবকদের পক্ষে কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত কর্মকাণ্ড করা প্রায় অসম্ভব। আর যদি এমন কিছু ঘটেও থাকে, তবে তা শক্ত হাতে দমন করার দায়িত্ব তো নিরাপত্তাকর্মীদেরই।’

শহীদুল ইসলাম শিশির পরামর্শ দেন, প্রয়োজনে সিটি করপোরেশনের কাছ থেকে অতিরিক্ত নিরাপত্তারক্ষী চাওয়া যেতে পারে কিংবা আরও আনসার সদস্য নিয়োগ করা যেতে পারে। কিন্তু সমস্যা সমাধানের নামে দর্শনার্থীদের ভেতরে ঢুকতে না দেওয়া কোনো বুদ্ধিমানের কাজ নয়। এর ফলে নতুন প্রজন্ম নিজেদের ইতিহাস ও প্রকৃতির সুন্দর একটা অংশ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।

তবে বরিশাল নদীবন্দর কর্মকর্তা মো. আসাদুজ্জামান ইমন অবশ্য বিষয়টিকে দেখছেন ঐতিহ্য সংরক্ষণের অংশ হিসেবে। তিনি বলেন, ‘পদ্মপুকুরের ঐতিহ্য ও সৌন্দর্য সংরক্ষণের স্বার্থেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এটি বিআইডব্লিউটিএর ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা। দর্শনার্থীরা সীমানাপ্রাচীরের বাইরে থেকে পুকুরের সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারবেন।’

ইতিহাসের পাতা ওল্টালে জানা যায়, ব্রিটিশ আমলে নগরের বান্দ রোড এলাকায় প্রায় সাড়ে পাঁচ একর জায়গাজুড়ে স্টিমার কোম্পানির কার্যালয় স্থাপন করা হয়। ১৯৬৫ সালে মেরিন ওয়ার্কশপের তৎকালীন ব্যবস্থাপক জার্মান নাগরিক মি. ইলিনগর বিশেষভাবে শ্বেতপদ্মের চারা সংগ্রহ করে পুকুরে রোপণ করেন। এর পর থেকেই পুকুরটি ‘পদ্মপুকুর’ নামে পরিচিতি পায়। প্রতিবছর এপ্রিল থেকে জুলাই পর্যন্ত পুকুরজুড়ে শ্বেতপদ্মের সমারোহ দেখতে ভিড় করেন প্রকৃতিপ্রেমী ও দর্শনার্থীরা।

মঈনুল ইসলাম সবুজ/ খাদিজা রুমি/

দেখা পেলাম দুর্লভ কাঠ বগের

প্রকাশ: ০৪ জুন ২০২৬, ০৮:৩১ এএম
আপডেট: ০৪ জুন ২০২৬, ০১:০৮ পিএম
দেখা পেলাম দুর্লভ কাঠ বগের
চট্টগ্রাম শহরের এভারকেয়ার হাসপাতালের পাশে অনন্যা আবাসন প্রকল্প এলাকার ঝোপে কাঠ বগ। ছবি: লেখক

২০১২ সালের ২২ সেপ্টেম্বরের ঘটনা। প্রয়াত ফরেস্ট রেঞ্জার মুনির ভাই ও তার স্ত্রী পক্ষী আলোকচিত্রী তানিয়া খানকে নিয়ে ছুটে চলেছি মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলের বাইক্কা বিল জলাভূমি অভয়ারণ্যের দিকে। রাস্তার জায়গায় জায়গায় কাদা।

কাজেই অটোরিকশা থেকে নেমে প্রায় দেড় কিলোমিটার পথ পায়ে হেঁটে বালিহাঁসের বাক্সগুলোর দিকে যাচ্ছি। পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া খালটি ঢোল কলমি ও কচুরিপানায় পূর্ণ। হঠাৎই তানিয়া আপার চিৎকার ‘পাওয়া গেছে, পাওয়া গেছে!’ ‘কই? কই? দেখছি নাতো।’ আমি বললাম।

উত্তর এল ‘ওই তো উড়ে যাচ্ছে।’ ‘হ্যাঁ, দেখতে পেয়েছি।’ ক্যামেরায় ক্লিকের বন্যা বয়ে গেল। কাঠের মতো হলদেটে রঙের লম্বা ঠোঁটের পাখিটি খানিকটা উড়ে গিয়ে ঢোল কলমিগাছের নিচে বসল। পটাপট কয়েকটা ছবি তুললাম। মনটা ভরে গেল দুর্লভ পাখিটিকে দেখে।

এরপর ওকে বহুবার দেখেছি ঢাকার কেরানীগঞ্জ ও পূর্বাচল, গাজীপুরের পুবাইল, রাজশাহীর মোহনপুর, চাঁপাইনবাবগঞ্জের চরইল বিল, চুয়াডাঙ্গার বেলগাছিসহ দেশের বহু স্থানে।

গত ১৭ এপ্রিল চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি অ্যান্ড এনিম্যাল সায়েন্স বিশ্ববিদ্যালয়ে ছয় দিনের জন্য গেলাম বন্যপ্রাণী চিকিৎসা বিষয়ে ব্যবহারিক পরীক্ষা গ্রহণের জন্য। পরীক্ষা দুপুর থেকে বিকেল পর্যন্ত। কাজেই সকালে কোনো কাজ নেই। কাজেই ২১ এপ্রিল ভোরে এভারকেয়ার হাসপাতালের পাশে অবস্থিত অনন্যা আবাসিক প্রকল্প এলাকায় চলে গেলাম।

একসময় এখানে গ্রাম, বিল ও জলাশয় ছিল। এখনো খানিকটা রয়েছে। পুরো প্রকল্পটি প্লটে ভাগ করা থাকলেও কোনো প্লটেই ঘরবাড়ি ওঠেনি। তাই পুরো এলাকাটি ঘাসবন, হোগলাবন ও গাছপালায় ছেয়ে গেছে। আর আবাস গেড়েছে লালটুপি ছাতারে, হলদে-পেট টুনি, লালবুক ঘুরঘুরিসহ বেশ কিছু বিরল ও দুর্লভ পাখি।

সকাল ৭টা নাগাদ সিএনজিচালিত অটোরিকশা থেকে নেমে প্রায় ৫০ মিনিটে পুরো প্রকল্প এলাকা হেঁটে ১২ প্রজাতির পাখির দেখা পেলাম। এরপর এক ঝাঁক কালোমাথা মুনিয়া দেখে হোগলাবনের সামনে এলাম। কিন্তু মুনিয়ার ছবি তোলার আগেই পাখিগুলোর ঠিক সামনে একটি ঝোঁপে হঠাৎই ১৪ বছর আগে শ্রীমঙ্গলে

দেখা লম্বা ঠোঁটের ছোট্ট হলদে পাখিটির মতো একটি পাখি এসে নামল। আর যায় কোথায়? ক্যামেরার শাটারে ক্লিক ক্লিক ধ্বনি শুরু হলো। তবে মাত্র ৩৯ সেকেন্ডে ১৯টি ছবি দিয়ে পাখিটি দ্রুত সামনের দিকে উড়ে গেল।

চট্টগ্রামের অনন্যার হোগলা বনে ও বাইক্কা বিলে দেখা পাখি আর কেউ নয় এ দেশের এক দুর্লভ আবাসিক পাখি কাঠ বগ। হলদে বগ বা হলুদ বগলা নামেও পরিচিত। ইংরেজি নাম Yellwo Bittern। আরডেইডি (Ardeidae) গোত্রের বকটির বৈজ্ঞানিক নাম Ixobrychus sinensis (ইক্সোব্রাইকাস সাইনেনসিস)। বাংলাদেশ ছাড়াও সাইবেরিয়াসহ পুরো এশিয়াজুড়ে পাখিটিকে দেখা যায়।

কাঠ বগ ছোট আকারের বগলা। প্রাপ্তবয়স্ক পাখির দেহের দৈর্ঘ্য ৩৬-৩৮ সেন্টিমিটার ও ওজন ৮১-১০৪ গ্রাম। গলা ছোট ও ঠোঁট লম্বা। পুরুষের দেহের ওপরটা হলদে-বাদামি ও নিচটা হালকা হলদে। ডানা হালকা হলুদ। ডানার মাঝের ও প্রান্তের পালকগুলো কালো ওড়ার সময় যা স্পষ্ট দেখা যায়।

কোমর ও লেজের পালক কালচে। মাথা ও গলা খয়েরি; মাথার টুপি কালো। চোখ কমলা-হলুদ। চঞ্চু হলদে। পা, পায়ের পাতা ও আঙুল হলদে-সবুজ। স্ত্রীর মাথার টুপি, গলা ও বুক বাদামি রেখাযুক্ত। অপ্রাপ্তবয়স্কগুলো দেখতে মায়ের মতো হলেও দেহের নিচের দিকে বাদামি রেখার পরিমাণ বেশি। তা ছাড়া পিঠের ওপরটা হলদে ফোঁটাযুক্ত।

এ দেশের সব বিল ও বাদায় বাস করতে সক্ষম হলেও এদের সিলেট বিভাগের জলাধারগুলোতেই বেশি দেখা যায়। এরা নলবন, ঢোল কলমি, কচুরিপানা ও জলজ উদ্ভিদপূর্ণ জলাধার, বিল, বাদা, খাল, পুকুর ও ধানখেতে বিচরণ করতে পছন্দ করে। একাকী চরে বেড়ায়।

অত্যন্ত সাবধানি ও লাজুক পাখিগুলো সচরাচর কোনো পাতা বা উদ্ভিদের নিচে লুকিয়ে থেকে ছোট ছোট মাছ, ব্যাঙ, কীটপতঙ্গ ইত্যাদি শিকার করে খায়। এদের গায়ের রং পরিবেশের সঙ্গে মিলেমিশে একাকার হয়ে যায় বলে সহজে নজরে আসে না। কেবল ওড়ার সময়ই চোখে পড়ে। সকাল ও পড়ন্ত বিকেলে বেশি তৎপর থাকে। সচরাচর উচ্চস্বরে ‘কেকের-কেকের---’ বা ‘কাকাক-কাকাক---’ শব্দে ডাকে।

জুন থেকে সেপ্টেম্বর প্রজননকাল। এ সময় পুরুষ পাখি স্ত্রী পাখিকে আকৃষ্ট করার জন্য ‘ক্রিউ-ক্রিউ---’ একটিমাত্র শব্দে ডাকে ও প্রজনন নৃত্য করে। জলার পাশের ঘন ঝোপ, কচুরিপানা, পানিতে ঝুলে পড়া উদ্ভিদ, প্লাবিত ধানগাছ ইত্যাদিতে অতি গোপনে বাসা বানায়।

ডিম পাড়ে ৪-৬টি, রং ফ্যাকাশে নীলচে-সবুজ। মা-বাবা দুজনেই তা দিয়ে ১৬-২১ দিনে ডিম থেকে ছানা ফোটায়। ছানাদের বয়স ১৪-১৬ দিন হলেই ওরা বাসা ছাড়ে। আয়ুষ্কাল চার বছরের বেশি।

লেখক: পাখি ও বন্যপ্রাণী প্রজনন ও চিকিৎসা বিশেষজ্ঞ, গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়।