১০ বছর আগে ডাইনোসর অনুসন্ধানকারীদের একটি দল থাইল্যান্ডের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের একটি পুকুরের ধারে বিশালাকৃতির হাড়ের স্তূপ আবিষ্কার করে। পরে এসব হাড় নিয়ে ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডন, মাহাসারাখাম ইউনিভার্সিটি, সুরানারি ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজি এবং থাইল্যান্ডের সিরিনধর্ন মিউজিয়ামের গবেষকরা যৌথভাবে গবেষণা চালান। গবেষণায় এগুলোকে সৌরোপড প্রজাতির নতুন এক ডাইনোসরের জীবাশ্ম হিসেবে শনাক্ত করা হয়।
বিজ্ঞানীরা ডাইনোসরটির নাম দিয়েছেন নাগাটাইটান চাইয়াফুমেনসিস । চাইয়াফুম প্রদেশের নাম অনুসারে, যেখানে প্রায় এক দশক আগে এর জীবাশ্ম পাওয়া গিয়েছিল। থাইল্যান্ডের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের এই দুর্গম এলাকা ডাইনোসরের জীবাশ্ম আবিষ্কারের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। ১৯৮৬ সালে প্রথম ডাইনোসর প্রজাতি সিয়ামোসরাস সুতিথর্নি আবিষ্কারের পর থেকে এখানে আরও ১৩টি ভিন্ন প্রজাতির জীবাশ্ম পাওয়া গেছে।
বিশালাকার এই ডাইনোসরটির ওজন ছিল প্রায় নয়টি প্রাপ্তবয়স্ক হাতির সমান বলে গবেষকরা ধারণা করছেন। এটিই এখন পর্যন্ত এশিয়ায় পাওয়া সবচেয়ে বড় ডাইনোসর।
সায়েন্টিফিক রিপোর্টস জার্নালে গত বৃহস্পতিবার প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে জানানো হয়, নাগাটাইটান হলো ‘সৌরোপড’ বংশের সদস্য। লম্বা ঘাড় ও লেজ, ছোট মাথা এবং স্তম্ভের মতো চারটি পায়ের জন্য এই ডাইনোসরগুলো পরিচিত। গবেষণার তথ্য অনুযায়ী এই তৃণভোজী প্রাণীটি দৈর্ঘ্যে ২৭ মিটার (৮৯ ফুট) ও ওজনে প্রায় ২৭ টন ছিল।
গবেষকরা জানান, প্রায় ১০ থেকে ১২ কোটি বছর আগে এই ডাইনোসরটি বর্তমানের থাইল্যান্ডে বিচরণ করত। এটি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় এ পর্যন্ত পাওয়া ডাইনোসরগুলোর মধ্যে বৃহত্তম। প্রাণীটির মাথা ও দাঁতের কোনো জীবাশ্ম পাওয়া যায়নি। তবে অন্যান্য সৌরোপডদের খাদ্যাভ্যাসের ওপর ভিত্তি করে গবেষকরা এর খাবারের ধরন সম্পর্কে ধারণা পেয়েছেন।
লন্ডন ইউনিভার্সিটি কলেজের প্যালিওন্টোলজির পিএইচডি শিক্ষার্থী এবং এই গবেষণার প্রধান লেখক থিটিওয়াত সেথাপানিচসাকুল বলেন, ‘নাগাটাইটান সম্ভবত একবারে প্রচুর পরিমাণে খাবার গ্রহণ করত। এরা মূলত কনিফার বা বীজ ফার্নের মতো এমন সব উদ্ভিদ খেত, যা খুব একটা চিবানোর প্রয়োজন হতো না।’
পৃথিবীর ইতিহাসে সৌরোপডরা ছিল অন্যতম বৃহত্তম স্থলচর প্রাণী। লন্ডনের ন্যাচারাল হিস্ট্রি মিউজিয়ামের বিখ্যাত ‘ডিপি দ্য ডিপ্লোডোকাস’-এর তুলনায় নাগাটাইটানের ওজন অন্তত ১০ টন বেশি ছিল বলে জানান সেথাপানিচসাকুল।
থাই এই গবেষক নব-আবিষ্কৃত ডাইনোসরটিকে ‘শেষ টাইটান’ বলে অভিহিত করেছেন। কারণ, থাইল্যান্ডের যে কনিষ্ঠ শিলা স্তরে ডাইনোসরের অস্তিত্ব পাওয়া গেছে, এটি সেখান থেকেই আবিষ্কৃত হয়েছে। তিনি আরও বলেন, ‘ক্রেটাসিয়াস যুগে এই অঞ্চলটি অগভীর সমুদ্রে পরিণত হয়। ফলে এখানে আর কোনো সৌরোপডের বসবাস সম্ভব ছিল না। তাই এটিকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার শেষ টাইটান বলাই যুক্তিযুক্ত।’
নাগাটাইটান সৌরোপডদের এমন একটি উপদলের অন্তর্ভুক্ত ছিল, প্রায় ১৪ কোটি বছর আগে যাদের আবির্ভাব ঘটে। আজ থেকে প্রায় ৯ কোটি বছর আগে এরাই ছিল বিশ্বের একমাত্র টিকে থাকা সৌরোপড প্রজাতি। আর ৬ কোটি ৬ লাখ বছর আগে গ্রহাণুর আঘাতে ডাইনোসর যুগ শেষ হওয়ার আগ পর্যন্ত পৃথিবীতে এরাই টিকে ছিল।
দশ বছর আগে উত্তর-পূর্ব থাইল্যান্ডের স্থানীয় বাসিন্দারা প্রথম এই বিশাল প্রাণীর দেহাবশেষ খুঁজে পান। তবে ২০২৪ সালের আগে এর খননকাজ সম্পূর্ণ করা সম্ভব হয়নি। এর অবশেষগুলোর আগে আবিষ্কৃত সৌরোপডদের সঙ্গে আংশিক মিল আছে। তবে একে নতুন প্রজাতি হিসেবে গণ্য করার মতো যথেষ্ট স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য রয়েছে।
ডাইনোসরটির নাম থাই মন্দিরে প্রদর্শিত সর্প-সদৃশ ধর্মীয় সত্তা ‘নাগা’র নামানুসারে রাখা হয়েছে। সব মিলিয়ে থাইল্যান্ডে এখন পর্যন্ত ১৪টি নামধারী ডাইনোসরের সন্ধান পাওয়া গেল। বর্তমানে ব্যাংককের থাইনোসর মিউজিয়ামে নাগাটাইটান চাইয়াফুমেনসিসের একটি পূর্ণাঙ্গ রেপ্লিকা প্রদর্শনের জন্য রাখা হয়েছে। সূত্র: আল-জাজিরা