গ্রীষ্মের তীব্র দাবদাহে যখন প্রকৃতি ক্লান্ত হয়ে পড়ে, তখন চারপাশ আলো করে সোনারঙা হাসিতে ভরিয়ে তোলে যে বৃক্ষটি, তার নাম কনকচূড়া। দূর থেকে দেখলে মনে হয় যেন গাছের মগডালে কেউ তরল সোনা ঢেলে দিয়েছে। শহুরে কংক্রিটের রুক্ষতা দূর করতে এবং গ্রামীণ প্রকৃতির শোভা বর্ধনে এই বৃক্ষের জুড়ি মেলা ভার।
কনকচূড়ার বৈজ্ঞানিক নাম Peltophorum pterocarpum, এটি Fabaceae পরিবারের একটি উদ্ভিদ। বাংলাদেশে এটি মূলত কনকচূড়া নামে পরিচিত হলেও এর আরও কিছু চমৎকার নাম আছে, যেমন–হলুদ রাধাচূড়া, তাম্রচূড়া। ইংরেজিতে একে Yellwo Flametree, Copperpod, Golden Flamboyant বলা হয়। কনক শব্দের অর্থ সোনা, আর গাছের চূড়ায় সোনারঙা ফুলের থোকা ফোটে বলেই এর এমন নামকরণ।
কনকচূড়া একটি মাঝারি থেকে বৃহৎ আকারের চিরসবুজ বা আধা-পত্রঝরা বৃক্ষ। এটি সাধারণত ১৫ থেকে ২৫ মিটার পর্যন্ত লম্বা হতে পারে। প্রধান কাণ্ড খাড়া, ধূসর বর্ণের ও মসৃণ। এর পাতাগুলো দ্বিপক্ষল (Bipinnate), যা দেখতে অনেকটা কৃষ্ণচূড়া বা তেঁতুল পাতার মতো। গাঢ় সবুজ রঙের এই পাতাগুলো গাছের ছায়াকে বেশ ঘন ও শীতল করে তোলে। বসন্তের শেষভাগে (মূলত এপ্রিল-মে মাসে) এই গাছে ফুল ফোটা শুরু হয় এবং তা বর্ষা অবধি স্থায়ী হয়। ফুলগুলো উজ্জ্বল হলুদ রঙের এবং ডালের ডগায় বড় বড় থোকায় থোকায় ফোটে। প্রতিটি ফুলের পাপড়ি কিছুটা কুঁচকানো এবং এর সুবাস মৃদু ও মিষ্টি।
ফুল ফোটা শেষ হলে গাছে চ্যাপ্টা, তামাটে বা খয়েরি রঙের পড বা শিম-জাতীয় ফল ধরে। এই তাম্রবর্ণের ফলের কারণেই এর ইংরেজি নাম হয়েছে ‘Copperpod’। ফলগুলো সহজে ঝরে পড়ে না, দীর্ঘ সময় গাছে ঝুলে থাকে।। Peltophorum অর্থ ঢালবাহী। ঢালের মতো ফলের আকৃতির জন্য এই নামকরণ। বিরাট দ্বিপক্ষল পাতা, শাখায়িত দীর্ঘ হলুদ পুষ্পমঞ্জরি এবং চ্যাপ্টা তামাটে ফলের প্রাচুর্যতা দিয়ে কনকচূড়া চেনা যায়।
কনকচূড়া প্রকৃতি ও পরিবেশের বন্ধু। কনকচূড়া শুধু সৌন্দর্যই বাড়ায় না, পরিবেশ রক্ষায় এর ভূমিকা অনন্য। এর ঘন পাতা চারপাশের বাতাসকে শীতল রাখতে সাহায্য করে। তীব্র গরমে পথিককে দেয় প্রশান্তির ছায়া। শিম-জাতীয় উদ্ভিদের মতো এর শিকড়ও মাটিতে নাইট্রোজেন সংবদ্ধকরণ করতে পারে, যা মাটির উর্বরতা বাড়ায়। এই গাছের কাণ্ড ও ডালপালা বেশ শক্ত হওয়ায় এটি তীব্র বাতাস বা ঝড় সহজে সহ্য করতে পারে। তাই উপকূলীয় অঞ্চলেও এর ব্যাপক ব্যবহার দেখা যায়।
সারা দেশেই কনকচূড়া চোখে পড়ে। ঢাকায় জাতীয় সংসদ ভবনের পূর্ব পাশের পথের ধারে সবচেয়ে বড় বীথিটি রয়েছে, এ ছাড়া রয়েছে মিন্টো রোডে ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মল চত্বরে। ময়মনসিংহে সরকারি বিদ্যাময়ী বালিকা বিদ্যালয়ের সামনে, জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে এবং সার্কিট হাউস মাঠসংলগ্ন জিমনেসিয়ামের বিপরীত পাশে কনকচূড়া গাছ রয়েছে।
ঐতিহ্যগত চিকিৎসা এবং বাণিজ্যিক ক্ষেত্রেও কনকচূড়ার ব্যবহার রয়েছে। এর বাকল বা ছাল থেকে এক ধরনের খাঁটি ট্যানিন ও রং পাওয়া যায়, যা চামড়া প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং কাপড় ডাইংয়ের কাজে ব্যবহৃত হয়। কিছু কিছু দেশের ঐতিহ্যবাহী চিকিৎসায় এর বাকলের রস দাঁতের মাড়ির সমস্যা দূর করতে এবং ক্ষত নিরাময়ে ব্যবহার করা হয়। এর কাঠ মাঝারি ধরনের শক্ত ও টেকসই হওয়ায় জ্বালানি এবং সাধারণ আসবাবপত্র তৈরির কাজে লাগে। এর আদি নিবাস আন্দামান দ্বীপপুঞ্জ, শ্রীলঙ্কা, মালয়েশিয়া ও অস্ট্রেলিয়ায়। এর কাঠ জ্বালানি ছাড়াও আসবাবপত্র তৈরিতে ব্যবহৃত হয়। বীজ থেকে সহজেই এর বংশবৃদ্ধি করা যায়।
কনকচূড়া আমাদের প্রকৃতির এক অনন্য আশীর্বাদ। যখন কৃষ্ণচূড়ার লাল, সোনালুর হলুদ আর জারুলের বেগুনি রঙের মেলা বসে, তখন কনকচূড়ার উজ্জ্বল উপস্থিতি সেই সৌন্দর্যকে পূর্ণতা দেয়। পার্ক, রাস্তার ধার কিংবা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রাঙ্গণে এই গাছ রোপণ করে আমরা যেমন পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করতে পারি, তেমনি আমাদের চারপাশকে করে তুলতে পারি আরও দৃষ্টিনন্দন। প্রকৃতির এই রূপালী-সোনারঙা উপহারকে টিকিয়ে রাখা আমাদের সবার দায়িত্ব।
লেখক: অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগ, মুমিনুন্নিসা সরকারি মহিলা কলেজ, ময়মনসিংহ