ঢাকা ২৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩, শনিবার, ০৬ জুন ২০২৬

সর্বশেষ
শাহজালালের কার্গো শেডে আগুন শূন্যরেখায় মানবেতর জীবন শিকলবাহায় হত‍্যাকারীদের ফাঁসির দাবিতে মরদেহ নিয়ে মহাসড়কে বিক্ষোভ অ্যালামনাই প্ল্যাটফর্ম ০২০৪ ব্যাচের বন্ধুদের ঈদ পরবর্তী পুনর্মিলনী মায়ানমারে পাচারকালে দেড় হাজার বস্তা সিমেন্ট আটক ৫২ মরুভূমিতে বিকল ট্রাক, পানির অভাবে ৪৯ জনের মৃত্যু মেধা ও ক্রীড়াবান্ধব জাতি গঠনে সরকার বহুমুখী কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে: ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী নোয়াখালীতে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের মিছিল আর্জেন্টিনা-ব্রাজিল ভক্তদের শোডাউন সরকারকে ৭ দিনের আলটিমেটাম ইনকিলাব মঞ্চের প্রথমবার এআই তৈরি করল ‘সুপার-ভ্যাকসিন’ হাদি হত্যা মামলার বাদীকে নিয়ে বোনের প্রশ্ন? জয়পুরহাট সীমান্তে পুশইনের চেষ্টা, বিজিবির টহল জোরদার রাজনীতি এক ভয়ংকর পরিস্থিতির দিকে ধাবিত হচ্ছে: মির্জা ফখরুল হজ শেষে দেশে ফিরলেন ২৯,৬৯৪ হাজি নারায়ণগঞ্জে ১৭ বন্যপাখি উদ্ধার ও অবমুক্ত হান্নানের বিরুদ্ধে চাঁদা দাবির তথ্য ফাঁস, ছাত্রদল নেতার বাড়িতে হামলার অভিযোগ নায়িকা মিমির বিরুদ্ধে আদালতে চার্জশিট, শেষ দেখে নেওয়ার হুমকি! দোয়া গুরুত্বপূর্ণ এক ইবাদত সংসদ ভবন এলাকায় আগ্নেয়াস্ত্র বহনসহ মিছিল-সমাবেশে নিষেধাজ্ঞা কটাক্ষের শিকার আনুশকা কলকাতার মেয়র পদ ছাড়লেন ফিরহাদ হাকিম চট্টগ্রামে কাফনের কাপড় পরে যুবলীগের বিক্ষোভ মিছিল হরোস্কোপের গোলকধাঁধায় ভবিষ্যৎ ভাবনা বিয়ে করলেন উপস্থাপিকা দীপ্তি চৌধুরী উখিয়ার রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শন করেছেন তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণের মানসিকতা সরকারের নেই: তথ্য প্রতিমন্ত্রী দিনে দিনেই ঘুরে আসুন মৈনট ঘাট থেকে পাবনায় ২০০ একর জমির ওপর বিসিক শিল্পনগরী গড়ে তোলা হবে: বাণিজ্যমন্ত্রী সবার সহযোগিতায় বাসডুবিতে কোনো প্রাণহানি ঘটেনি: নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী
Nagad desktop

সোনা রঙের কনকচূড়া

প্রকাশ: ১৯ মে ২০২৬, ০৮:১০ এএম
সোনা রঙের কনকচূড়া
ময়মনসিংহের জিমনেসিয়ামের বিপরীত দিকের কনকচূড়া গাছ। ছবি: লেখক

গ্রীষ্মের তীব্র দাবদাহে যখন প্রকৃতি ক্লান্ত হয়ে পড়ে, তখন চারপাশ আলো করে সোনারঙা হাসিতে ভরিয়ে তোলে যে বৃক্ষটি, তার নাম কনকচূড়া। দূর থেকে দেখলে মনে হয় যেন গাছের মগডালে কেউ তরল সোনা ঢেলে দিয়েছে। শহুরে কংক্রিটের রুক্ষতা দূর করতে এবং গ্রামীণ প্রকৃতির শোভা বর্ধনে এই বৃক্ষের জুড়ি মেলা ভার। 

কনকচূড়ার বৈজ্ঞানিক নাম Peltophorum pterocarpum,  এটি Fabaceae পরিবারের একটি উদ্ভিদ। বাংলাদেশে এটি মূলত কনকচূড়া নামে পরিচিত হলেও এর আরও কিছু চমৎকার নাম আছে, যেমন–হলুদ রাধাচূড়া, তাম্রচূড়া। ইংরেজিতে একে Yellwo Flametree, Copperpod, Golden Flamboyant বলা হয়। কনক শব্দের অর্থ সোনা, আর গাছের চূড়ায় সোনারঙা ফুলের থোকা ফোটে বলেই এর এমন  নামকরণ।

কনকচূড়া একটি মাঝারি থেকে বৃহৎ আকারের চিরসবুজ বা আধা-পত্রঝরা বৃক্ষ। এটি সাধারণত ১৫ থেকে ২৫ মিটার পর্যন্ত লম্বা হতে পারে। প্রধান কাণ্ড খাড়া, ধূসর বর্ণের ও মসৃণ। এর পাতাগুলো দ্বিপক্ষল (Bipinnate), যা দেখতে অনেকটা কৃষ্ণচূড়া বা তেঁতুল পাতার মতো। গাঢ় সবুজ রঙের এই পাতাগুলো গাছের ছায়াকে বেশ ঘন ও শীতল করে তোলে। বসন্তের শেষভাগে (মূলত এপ্রিল-মে মাসে) এই গাছে ফুল ফোটা শুরু হয় এবং তা বর্ষা অবধি স্থায়ী হয়। ফুলগুলো উজ্জ্বল হলুদ রঙের এবং ডালের ডগায় বড় বড় থোকায় থোকায় ফোটে। প্রতিটি ফুলের পাপড়ি কিছুটা কুঁচকানো এবং এর সুবাস মৃদু ও মিষ্টি।

ফুল ফোটা শেষ হলে গাছে চ্যাপ্টা, তামাটে বা খয়েরি রঙের পড বা শিম-জাতীয় ফল ধরে। এই তাম্রবর্ণের ফলের কারণেই এর ইংরেজি নাম হয়েছে ‘Copperpod’। ফলগুলো সহজে ঝরে পড়ে না, দীর্ঘ সময় গাছে ঝুলে থাকে।। Peltophorum অর্থ ঢালবাহী। ঢালের মতো ফলের আকৃতির জন্য এই নামকরণ। বিরাট দ্বিপক্ষল পাতা, শাখায়িত দীর্ঘ হলুদ পুষ্পমঞ্জরি এবং চ্যাপ্টা তামাটে ফলের প্রাচুর্যতা দিয়ে কনকচূড়া চেনা যায়।

কনকচূড়া প্রকৃতি ও পরিবেশের বন্ধু। কনকচূড়া শুধু সৌন্দর্যই বাড়ায় না, পরিবেশ রক্ষায় এর ভূমিকা অনন্য। এর ঘন পাতা চারপাশের বাতাসকে শীতল রাখতে সাহায্য করে। তীব্র গরমে পথিককে দেয় প্রশান্তির ছায়া। শিম-জাতীয় উদ্ভিদের মতো এর শিকড়ও মাটিতে নাইট্রোজেন সংবদ্ধকরণ করতে পারে, যা মাটির উর্বরতা বাড়ায়। এই গাছের কাণ্ড ও ডালপালা বেশ শক্ত হওয়ায় এটি তীব্র বাতাস বা ঝড় সহজে সহ্য করতে পারে। তাই উপকূলীয় অঞ্চলেও এর ব্যাপক ব্যবহার দেখা যায়।

সারা দেশেই কনকচূড়া চোখে পড়ে। ঢাকায় জাতীয় সংসদ ভবনের পূর্ব পাশের পথের ধারে সবচেয়ে বড় বীথিটি রয়েছে, এ ছাড়া রয়েছে মিন্টো রোডে ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মল চত্বরে। ময়মনসিংহে সরকারি বিদ্যাময়ী বালিকা বিদ্যালয়ের সামনে, জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে এবং সার্কিট হাউস মাঠসংলগ্ন জিমনেসিয়ামের বিপরীত পাশে কনকচূড়া গাছ রয়েছে।

ঐতিহ্যগত চিকিৎসা এবং বাণিজ্যিক ক্ষেত্রেও কনকচূড়ার ব্যবহার রয়েছে। এর বাকল বা ছাল থেকে এক ধরনের খাঁটি ট্যানিন ও রং পাওয়া যায়, যা চামড়া প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং কাপড় ডাইংয়ের কাজে ব্যবহৃত হয়। কিছু কিছু দেশের ঐতিহ্যবাহী চিকিৎসায় এর বাকলের রস দাঁতের মাড়ির সমস্যা দূর করতে এবং ক্ষত নিরাময়ে ব্যবহার করা হয়। এর কাঠ মাঝারি ধরনের শক্ত ও টেকসই হওয়ায় জ্বালানি এবং সাধারণ আসবাবপত্র তৈরির কাজে লাগে। এর আদি নিবাস আন্দামান দ্বীপপুঞ্জ, শ্রীলঙ্কা, মালয়েশিয়া ও অস্ট্রেলিয়ায়। এর কাঠ জ্বালানি ছাড়াও আসবাবপত্র তৈরিতে ব্যবহৃত হয়। বীজ থেকে সহজেই এর বংশবৃদ্ধি করা যায়।

কনকচূড়া আমাদের প্রকৃতির এক অনন্য আশীর্বাদ। যখন কৃষ্ণচূড়ার লাল, সোনালুর হলুদ আর জারুলের বেগুনি রঙের মেলা বসে, তখন কনকচূড়ার উজ্জ্বল উপস্থিতি সেই সৌন্দর্যকে পূর্ণতা দেয়। পার্ক, রাস্তার ধার কিংবা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রাঙ্গণে এই গাছ রোপণ করে আমরা যেমন পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করতে পারি, তেমনি আমাদের চারপাশকে করে তুলতে পারি আরও দৃষ্টিনন্দন। প্রকৃতির এই রূপালী-সোনারঙা উপহারকে টিকিয়ে রাখা আমাদের সবার দায়িত্ব।

লেখক: অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগ, মুমিনুন্নিসা সরকারি মহিলা কলেজ, ময়মনসিংহ

কৃষ্ণচূড়ার রাঙা মঞ্জরি

প্রকাশ: ০৫ জুন ২০২৬, ০৮:৪৮ এএম
আপডেট: ০৫ জুন ২০২৬, ০৯:১১ এএম
কৃষ্ণচূড়ার রাঙা মঞ্জরি
ঢাকার রমনা উদ্যানে ফোটা কৃষ্ণচূড়া ফুল। ছবি: লেখক

যুবক বয়সে শোনা লতা মঙ্গেশকরের একটি গানের পঙ্‌ক্তিগুলো এখনো কানে বাজে যখন চোখের সামনে পড়ে কৃষ্ণচূড়া ফুলেরা। গানটি হলো–‘কৃষ্ণচূড়া শোন শোন শোন।/ সারাবেলা দোলায় তোকে/ ক্ষ্যাপা হাওয়া যে!/ ক্ষ্যাপা হাওয়া যে!/ তার পায়ের শব্দ যায় না শোনা/ পাতার আওয়াজে,/ তোর পাতার আওয়াজে।’ কবি কাজী নজরুলের গানেও শুনি সে সুরের আভাস, কথার ইন্দ্রজাল–‘পিয়াল বনে উঠল বাজি তোমার বেণু ছড়ায় পথে কৃষ্ণচূড়া পরাগ-রেণু’ নজরুলের অন্তত ৯টি কবিতা ও গানে কৃষ্ণচূড়া ফুলের উল্লেখ পাওয়া যায়। 

কবি নজরুলের অন্য একটি গানে কৃষ্ণচূড়া ফুল যতটা খ্যাতি পেয়েছে, ততটা খ্যাতি মনে হয় আর কোনো গান বা কবিতায় পায়নি, গানের পঙ্‌ক্তিগুলো হলো–‘কৃষ্ণচূড়ার রাঙা মঞ্জরি-কর্ণে।/ আমি ভুবন ভুলাতে আসি গন্ধে ও বর্ণে / মোরে চেন কি?/ মোর আঁচলে চাঁপা, হেনা যুঁই অতসী।/ মোর বনের সাজিতে ভরা পলাশ বকুল/ নব আমের মুকুল,/ মম উত্তরী ঝলমল কিশলয় পর্ণে /’

কদম যেমন বর্ষার দূত, কৃষ্ণচূড়া তেমন গ্রীষ্মের। পঞ্জিকার পাতা না দেখে ফুল ফোটা কৃষ্ণচূড়া গাছ দেখে বোঝা যায় গ্রীষ্ম এসেছে। রৌদ্রদগ্ধ তপ্ত দিনের উত্তাপ যেন কৃষ্ণচূড়া ফুলেরা আরও বাড়িয়ে দেয়। লাল ও কমলা লাল ফুলগুলোকে দেখে মনে হয় কৃষ্ণচূড়া ফুল যেন কারও লজ্জা চুরি করে হয়েছে রক্তিম লাজবতী অথবা রোদ মেখে হয়েছে রৌদ্রবতী। কৃষ্ণচূড়া ফুল একদিকে যেমন প্রেমের, অন্যদিকে দ্রোহের প্রতীক। নজরুলের একটি অগ্রন্থিত ‘আবীর’ কবিতায় সে দ্রোহের ইশারা দেখি–
‘আবীর ছড়াও, আবীর ছড়াও, হে বীর তরুণদল,
নিরক্ত এই ধরা হোক পুন রক্তাক্তোজ্জ্বল।
পুষ্পাকীর্ণ পন্থা দেখাও কন্থা-জড়িত জীবে;
জ্বালাও অশোক কৃষ্ণচূড়ার শিখা, দীপ গেছে নিভে।’ 

ঢাকা শহরটি বড়ই অদ্ভুত ও আশ্চর্যময়। কৃষ্ণচূড়া ফুল ফোটার দিনে সড়ক-মহাসড়কগুলো যেন সেজে ওঠে সেসব রক্তিম ফুলে। নবীন সবুজ চিরল চিরল পাতার ফাঁকে ফাঁকে দলা দলা ফুল আর ফুল–আহা কি দাহ দিনের উষ্ণ আমন্ত্রণ! মুগ্ধ বিস্ময়ে শুধু তাকিয়ে থাকি সুবিশাল বৃক্ষের চূড়ায় পরা ফুলগুলোর দিকে। চন্দ্রিমা উদ্যান ও তার পাশের সড়ক, হাতিরঝিলের পাড় ধরে হাঁটতে থাকলে মনে হয় এ শহর বুঝি কৃষ্ণচূড়ার। আমাদের দেশের গাছ না সে, এসেছে সুদূর আফ্রিকার মাদাগাস্কার থেকে। ১৮২৪ সালে মাদাগাস্কার থেকে কৃষ্ণচূড়া যায় মরিশাসে, সেখান থেকে ইংল্যান্ড এবং আরও পরে বিস্তার ঘটে দক্ষিণ এশিয়ায়। অথচ বিদেশি গাছ হয়েও কীভাবে সে মানিয়ে গেছে এ দেশের প্রকৃতিতে, মনে হয় যেন সে আমাদেরই গৃহকন্যা।

কৃষ্ণচূড়া বিশাল বৃক্ষ, গোড়ায় ডানাওয়ালা অধিমূল, মাথায় ছাতার মতো ছড়ানো ডালপালা। তবে বছরের সব সময় গাছের চেহারা পত্রসুশোভিত ছত্রাকার থাকে না। শীতে সব পাতা ঝরে যায়। নিষ্পত্র সেসব গাছ দেখে মন খারাপ হয়ে যায়। শীতের শেষে বসন্তে আবার গাছ ভরে ওঠে কচি পত্রপল্লবে। বসন্তের পর গ্রীষ্মে ফুলগুলোর কাছ থেকে শোনা যায় গ্রীষ্মের আগমনী গান। চিরল চিরল সবুজ পাতা আর উজ্জ্বল লাল রঙের থোকা ধরা ফুল বড়ই মনোমুগ্ধকর। ফুলের পাঁচটি পাপড়ির মধ্যে চারটি পাপড়ি এক রকম, কিন্তু মাঝখানের একটি বড় ও অন্য রকম, হলদে-সাদা ছোপযুক্ত। শিগোত্রীয় গাছ, তাই বড় চ্যাপ্টা শিমের মতো ফল হয়, ফলের ভেতর বাদামি রঙের বীজ হয়। বীজ থেকে সহজে চারা হয়। বাগানের জন্য এ গাছ ভালো হলেও পথতরু হিসেবে ঝুঁকিপূর্ণ, কেননা এর ডালপালা খুব নরম। ঝড়-বাতাসে সহজে ভেঙে পড়ে। এতে পথচারীরা হতাহত হতে পারেন।

কৃষ্ণচূড়া গাছের ডালপালা চারদিকে ছড়ানো। গাছ ১০ থেকে ১৮ মিটার লম্বা হয়। থোকা ধরে টকটকে লাল রঙের ফুল ফোটা শুরু হয় এপ্রিলে, বর্ষাকালেও কিছু ফুল দেখা যায়। ফুল শেষে শিমের মতো চ্যাপ্টা বাদামি ও কাষ্ঠল বড় ফলের ভেতরে বীজ গঠিত হয়। বীজ থেকে গাছ হয়। পথতরু ও উদ্যানতরু হিসেবে লাগানো হয়। কৃষ্ণচূড়ার ইংরেজি নাম পিকক ফ্লাওয়ার, উদ্ভিদতাত্ত্বিক নাম Delonix regia ও গোত্র ফ্যাবেসি, উপগোত্র সিসালপিনিয়েসি। ডেলোনিক্স গ্রিক শব্দ, যার অর্থ থাবার মতো। ফুল দেখতে থাবার মতো। সম্ভবত সে জন্যই এর প্রজাতিগত নামের প্রথমাংশ রাখা হয়েছে ডেলোনিক্স রেজিয়া, যার অর্থ রাজকীয়। এটি যে রাজকীয় ফুল সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। তবে কাঠ যেন ততটাই মূল্যহীন, একমাত্র জ্বালানি কাঠ বা লাকড়ি ছাড়া এর আর তেমন উল্লেখযোগ্য কোনো ব্যবহার নেই। যে কোনো প্রান্তরে বা প্রশস্ত প্রাঙ্গণে রোপিত কৃষ্ণচূড়ার দীর্ঘ সারি খুবই মনোরম।

লেখক: কৃষিবিদ ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞ

বরিশালের পদ্মপুকুর: ‘প্রকৃতির রাজ্যে’ প্রবেশে বাধা

প্রকাশ: ০৪ জুন ২০২৬, ০৮:৫৪ এএম
আপডেট: ০৪ জুন ২০২৬, ০৯:০৭ এএম
বরিশালের পদ্মপুকুর: ‘প্রকৃতির রাজ্যে’ প্রবেশে বাধা
ছবি : খবেরর কাগজ

কয়েক একরের বিশাল দিঘিজুড়ে সবুজের মেলা, তার মাঝে মাথা উঁচিয়ে আছে হাজারও বিরল শ্বেতপদ্ম। অথচ ঈদের ছুটিতে পরিবার নিয়ে বরিশালের এই বিখ্যাত পদ্মপুকুরের সৌন্দর্য দেখতে এসে হতাশ হয়ে ফিরে গেছেন অসংখ্য দর্শনার্থী। বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) হঠাৎ করেই বন্ধ করে দিয়েছে ঐতিহ্যবাহী এই স্থাপনায় প্রবেশ। প্রায় এক মাস ধরে কার্যকর থাকা এই সিদ্ধান্তের কারণে স্থানীয় বাসিন্দা ও প্রকৃতিপ্রেমীদের মাঝে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।

বরিশাল শহরের রাজাবাহাদুর সড়কে বিআইডব্লিউটিএর বিশ্রামাগার ‘হিমনীড়’-সংলগ্ন পুকুরটিতে প্রতিবছর এই সময়ে শ্বেতপদ্মে ছেয়ে যায়। ঈদের ছুটিতে দূর-দূরান্ত থেকে আসা অনেক দর্শনার্থীকে দেখা গেছে, সীমানাপ্রাচীরের বাইরে দাঁড়িয়ে শ্বেতপদ্মের সৌন্দর্য দেখছেন। কয়েকজন কিশোরও ভেতরে যাওয়ার অপেক্ষায় থাকলেও সুযোগ পায়নি। অনেকে আক্ষেপ করছেন, বছরের এই একটি সময়ে ফোটা বিরল শ্বেতপদ্মগুলো কাছ থেকে দেখার সুযোগ থেকে তাদের বঞ্চিত করা হচ্ছে।

পরিবার-পরিজন নিয়ে পদ্মপুকুর দেখতে আসা মাহবুব মাসুম নামে এক প্রবাসী বলেন, ‘শনিবার অনেক আশা নিয়ে সন্তানদের এই ঐতিহাসিক পুকুরটি দেখাতে এনেছিলাম। কিন্তু গেটে থাকা আনসার সদস্যরা আমাদের ভেতরে ঢুকতে দেননি। বাধ্য হয়ে প্রাচীরের বাইরে দাঁড়িয়েই বাচ্চাদের ফুল দেখালাম।’

ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি আরও বলেন, ‘এত সুন্দর ও দর্শনীয় একটি জায়গা সাধারণ মানুষের জন্য এভাবে পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া কোনোভাবেই ঠিক হয়নি। বরিশালের এই অনন্য প্রাকৃতিক সৌন্দর্যকে সবার জন্য উন্মুক্ত রাখা উচিত।’

পুকুরটির পাহারায় নিয়োজিত আনসার সদস্যরা জানান, কর্তৃপক্ষের কঠোর নির্দেশেই তারা কাউকে ভেতরে প্রবেশ করতে দিচ্ছেন না। তাদের দাবি, কিছু দর্শনার্থী ভেতরে ঢুকে পদ্মফুল টেনে ছেঁড়েন এবং আশপাশের বাগানের ক্ষতি করেন। এ ছাড়া কিছু অপ্রাপ্তবয়স্ক ও তরুণ-তরুণী দীর্ঘসময় ধরে ভেতরে বসে আপত্তিকর আচরণ করেন। মূলত এই সামাজিক পরিবেশ রক্ষা ও ফুল বাঁচানোর তাগিদেই বিআইডব্লিউটিএর প্রকৌশল শাখার নির্বাহী প্রকৌশলী আমজাদ হোসাইনের নির্দেশে এই সিদ্ধান্ত কার্যকর করা হয়েছে।

তবে বিআইডব্লিউটিএর এই যুক্তিকে ‘অজুহাত’ বলে উড়িয়ে দিয়েছেন স্থানীয় সাংস্কৃতিক ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা। বরিশাল সাংস্কৃতিক সংগঠন সমন্বয় পরিষদের সাধারণ সম্পাদক শহীদুল ইসলাম শিশির এই সিদ্ধান্তের তীব্র বিরোধিতা করে বলেন, ‘এই পদ্মপুকুর বরিশালের একটি অন্যতম ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা। এখানকার শ্বেতপদ্ম অত্যন্ত বিরল প্রজাতির। ফলে এই সৌন্দর্য উপভোগ করা ও দেখার নাগরিক অধিকার সবার আছে।’

তিনি আরও যুক্তি দেন, ‘পুকুরটির ঠিক পাশেই বিআইডব্লিউটিএর প্রকৌশল কার্যালয় এবং তাদের ঐতিহাসিক বাংলো ‘হিমনীড়’ অবস্থিত। সেখানে সার্বক্ষণিক আনসার ও নিরাপত্তাকর্মীরা ডিউটি করেন। এত নজরদারির মধ্যে কিশোর-কিশোরী বা যুবকদের পক্ষে কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত কর্মকাণ্ড করা প্রায় অসম্ভব। আর যদি এমন কিছু ঘটেও থাকে, তবে তা শক্ত হাতে দমন করার দায়িত্ব তো নিরাপত্তাকর্মীদেরই।’

শহীদুল ইসলাম শিশির পরামর্শ দেন, প্রয়োজনে সিটি করপোরেশনের কাছ থেকে অতিরিক্ত নিরাপত্তারক্ষী চাওয়া যেতে পারে কিংবা আরও আনসার সদস্য নিয়োগ করা যেতে পারে। কিন্তু সমস্যা সমাধানের নামে দর্শনার্থীদের ভেতরে ঢুকতে না দেওয়া কোনো বুদ্ধিমানের কাজ নয়। এর ফলে নতুন প্রজন্ম নিজেদের ইতিহাস ও প্রকৃতির সুন্দর একটা অংশ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।

তবে বরিশাল নদীবন্দর কর্মকর্তা মো. আসাদুজ্জামান ইমন অবশ্য বিষয়টিকে দেখছেন ঐতিহ্য সংরক্ষণের অংশ হিসেবে। তিনি বলেন, ‘পদ্মপুকুরের ঐতিহ্য ও সৌন্দর্য সংরক্ষণের স্বার্থেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এটি বিআইডব্লিউটিএর ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা। দর্শনার্থীরা সীমানাপ্রাচীরের বাইরে থেকে পুকুরের সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারবেন।’

ইতিহাসের পাতা ওল্টালে জানা যায়, ব্রিটিশ আমলে নগরের বান্দ রোড এলাকায় প্রায় সাড়ে পাঁচ একর জায়গাজুড়ে স্টিমার কোম্পানির কার্যালয় স্থাপন করা হয়। ১৯৬৫ সালে মেরিন ওয়ার্কশপের তৎকালীন ব্যবস্থাপক জার্মান নাগরিক মি. ইলিনগর বিশেষভাবে শ্বেতপদ্মের চারা সংগ্রহ করে পুকুরে রোপণ করেন। এর পর থেকেই পুকুরটি ‘পদ্মপুকুর’ নামে পরিচিতি পায়। প্রতিবছর এপ্রিল থেকে জুলাই পর্যন্ত পুকুরজুড়ে শ্বেতপদ্মের সমারোহ দেখতে ভিড় করেন প্রকৃতিপ্রেমী ও দর্শনার্থীরা।

মঈনুল ইসলাম সবুজ/ খাদিজা রুমি/

দেখা পেলাম দুর্লভ কাঠ বগের

প্রকাশ: ০৪ জুন ২০২৬, ০৮:৩১ এএম
আপডেট: ০৪ জুন ২০২৬, ০১:০৮ পিএম
দেখা পেলাম দুর্লভ কাঠ বগের
চট্টগ্রাম শহরের এভারকেয়ার হাসপাতালের পাশে অনন্যা আবাসন প্রকল্প এলাকার ঝোপে কাঠ বগ। ছবি: লেখক

২০১২ সালের ২২ সেপ্টেম্বরের ঘটনা। প্রয়াত ফরেস্ট রেঞ্জার মুনির ভাই ও তার স্ত্রী পক্ষী আলোকচিত্রী তানিয়া খানকে নিয়ে ছুটে চলেছি মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলের বাইক্কা বিল জলাভূমি অভয়ারণ্যের দিকে। রাস্তার জায়গায় জায়গায় কাদা।

কাজেই অটোরিকশা থেকে নেমে প্রায় দেড় কিলোমিটার পথ পায়ে হেঁটে বালিহাঁসের বাক্সগুলোর দিকে যাচ্ছি। পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া খালটি ঢোল কলমি ও কচুরিপানায় পূর্ণ। হঠাৎই তানিয়া আপার চিৎকার ‘পাওয়া গেছে, পাওয়া গেছে!’ ‘কই? কই? দেখছি নাতো।’ আমি বললাম।

উত্তর এল ‘ওই তো উড়ে যাচ্ছে।’ ‘হ্যাঁ, দেখতে পেয়েছি।’ ক্যামেরায় ক্লিকের বন্যা বয়ে গেল। কাঠের মতো হলদেটে রঙের লম্বা ঠোঁটের পাখিটি খানিকটা উড়ে গিয়ে ঢোল কলমিগাছের নিচে বসল। পটাপট কয়েকটা ছবি তুললাম। মনটা ভরে গেল দুর্লভ পাখিটিকে দেখে।

এরপর ওকে বহুবার দেখেছি ঢাকার কেরানীগঞ্জ ও পূর্বাচল, গাজীপুরের পুবাইল, রাজশাহীর মোহনপুর, চাঁপাইনবাবগঞ্জের চরইল বিল, চুয়াডাঙ্গার বেলগাছিসহ দেশের বহু স্থানে।

গত ১৭ এপ্রিল চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি অ্যান্ড এনিম্যাল সায়েন্স বিশ্ববিদ্যালয়ে ছয় দিনের জন্য গেলাম বন্যপ্রাণী চিকিৎসা বিষয়ে ব্যবহারিক পরীক্ষা গ্রহণের জন্য। পরীক্ষা দুপুর থেকে বিকেল পর্যন্ত। কাজেই সকালে কোনো কাজ নেই। কাজেই ২১ এপ্রিল ভোরে এভারকেয়ার হাসপাতালের পাশে অবস্থিত অনন্যা আবাসিক প্রকল্প এলাকায় চলে গেলাম।

একসময় এখানে গ্রাম, বিল ও জলাশয় ছিল। এখনো খানিকটা রয়েছে। পুরো প্রকল্পটি প্লটে ভাগ করা থাকলেও কোনো প্লটেই ঘরবাড়ি ওঠেনি। তাই পুরো এলাকাটি ঘাসবন, হোগলাবন ও গাছপালায় ছেয়ে গেছে। আর আবাস গেড়েছে লালটুপি ছাতারে, হলদে-পেট টুনি, লালবুক ঘুরঘুরিসহ বেশ কিছু বিরল ও দুর্লভ পাখি।

সকাল ৭টা নাগাদ সিএনজিচালিত অটোরিকশা থেকে নেমে প্রায় ৫০ মিনিটে পুরো প্রকল্প এলাকা হেঁটে ১২ প্রজাতির পাখির দেখা পেলাম। এরপর এক ঝাঁক কালোমাথা মুনিয়া দেখে হোগলাবনের সামনে এলাম। কিন্তু মুনিয়ার ছবি তোলার আগেই পাখিগুলোর ঠিক সামনে একটি ঝোঁপে হঠাৎই ১৪ বছর আগে শ্রীমঙ্গলে

দেখা লম্বা ঠোঁটের ছোট্ট হলদে পাখিটির মতো একটি পাখি এসে নামল। আর যায় কোথায়? ক্যামেরার শাটারে ক্লিক ক্লিক ধ্বনি শুরু হলো। তবে মাত্র ৩৯ সেকেন্ডে ১৯টি ছবি দিয়ে পাখিটি দ্রুত সামনের দিকে উড়ে গেল।

চট্টগ্রামের অনন্যার হোগলা বনে ও বাইক্কা বিলে দেখা পাখি আর কেউ নয় এ দেশের এক দুর্লভ আবাসিক পাখি কাঠ বগ। হলদে বগ বা হলুদ বগলা নামেও পরিচিত। ইংরেজি নাম Yellwo Bittern। আরডেইডি (Ardeidae) গোত্রের বকটির বৈজ্ঞানিক নাম Ixobrychus sinensis (ইক্সোব্রাইকাস সাইনেনসিস)। বাংলাদেশ ছাড়াও সাইবেরিয়াসহ পুরো এশিয়াজুড়ে পাখিটিকে দেখা যায়।

কাঠ বগ ছোট আকারের বগলা। প্রাপ্তবয়স্ক পাখির দেহের দৈর্ঘ্য ৩৬-৩৮ সেন্টিমিটার ও ওজন ৮১-১০৪ গ্রাম। গলা ছোট ও ঠোঁট লম্বা। পুরুষের দেহের ওপরটা হলদে-বাদামি ও নিচটা হালকা হলদে। ডানা হালকা হলুদ। ডানার মাঝের ও প্রান্তের পালকগুলো কালো ওড়ার সময় যা স্পষ্ট দেখা যায়।

কোমর ও লেজের পালক কালচে। মাথা ও গলা খয়েরি; মাথার টুপি কালো। চোখ কমলা-হলুদ। চঞ্চু হলদে। পা, পায়ের পাতা ও আঙুল হলদে-সবুজ। স্ত্রীর মাথার টুপি, গলা ও বুক বাদামি রেখাযুক্ত। অপ্রাপ্তবয়স্কগুলো দেখতে মায়ের মতো হলেও দেহের নিচের দিকে বাদামি রেখার পরিমাণ বেশি। তা ছাড়া পিঠের ওপরটা হলদে ফোঁটাযুক্ত।

এ দেশের সব বিল ও বাদায় বাস করতে সক্ষম হলেও এদের সিলেট বিভাগের জলাধারগুলোতেই বেশি দেখা যায়। এরা নলবন, ঢোল কলমি, কচুরিপানা ও জলজ উদ্ভিদপূর্ণ জলাধার, বিল, বাদা, খাল, পুকুর ও ধানখেতে বিচরণ করতে পছন্দ করে। একাকী চরে বেড়ায়।

অত্যন্ত সাবধানি ও লাজুক পাখিগুলো সচরাচর কোনো পাতা বা উদ্ভিদের নিচে লুকিয়ে থেকে ছোট ছোট মাছ, ব্যাঙ, কীটপতঙ্গ ইত্যাদি শিকার করে খায়। এদের গায়ের রং পরিবেশের সঙ্গে মিলেমিশে একাকার হয়ে যায় বলে সহজে নজরে আসে না। কেবল ওড়ার সময়ই চোখে পড়ে। সকাল ও পড়ন্ত বিকেলে বেশি তৎপর থাকে। সচরাচর উচ্চস্বরে ‘কেকের-কেকের---’ বা ‘কাকাক-কাকাক---’ শব্দে ডাকে।

জুন থেকে সেপ্টেম্বর প্রজননকাল। এ সময় পুরুষ পাখি স্ত্রী পাখিকে আকৃষ্ট করার জন্য ‘ক্রিউ-ক্রিউ---’ একটিমাত্র শব্দে ডাকে ও প্রজনন নৃত্য করে। জলার পাশের ঘন ঝোপ, কচুরিপানা, পানিতে ঝুলে পড়া উদ্ভিদ, প্লাবিত ধানগাছ ইত্যাদিতে অতি গোপনে বাসা বানায়।

ডিম পাড়ে ৪-৬টি, রং ফ্যাকাশে নীলচে-সবুজ। মা-বাবা দুজনেই তা দিয়ে ১৬-২১ দিনে ডিম থেকে ছানা ফোটায়। ছানাদের বয়স ১৪-১৬ দিন হলেই ওরা বাসা ছাড়ে। আয়ুষ্কাল চার বছরের বেশি।

লেখক: পাখি ও বন্যপ্রাণী প্রজনন ও চিকিৎসা বিশেষজ্ঞ, গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়।

স্নিগ্ধ রং ও সুবাসের বেলি ফুল

প্রকাশ: ০৩ জুন ২০২৬, ০৮:০৭ এএম
স্নিগ্ধ রং ও সুবাসের বেলি ফুল
ময়মনসিংহের কাচারিঘাটের নার্সারিতে ফোটা বেলি ফুল। ছবিটি সম্প্রতি তোলা। ছবি: লেখক

স্নিগ্ধ সাদা রং, মন-মাতানো সুবাস আর অতুলনীয় কোমলতার এক অপরূপ প্রতীক হলো বেলি ফুল। এর মোহনীয় সুবাস আর ধবধবে সাদা পাপড়ি বাঙালির হৃদয়ে এক বিশেষ জায়গা করে নিয়েছে। বেলির বৈজ্ঞানিক নাম Jasminum sambac,  এটি  Oleaceae  পরিবারের একটি  জনপ্রিয় সপুষ্পক উদ্ভিদ। এই ফুলের আদি নিবাস  দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া। বাঙালির উৎসব, সংস্কৃতি আর দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে এই ফুল জড়িয়ে আছে ওতপ্রোতভাবে। 

বেলি মূলত একটি মাঝারি আকৃতির গুল্মজাতীয় বা লতানো গাছ। এর পাতাগুলো গাঢ় সবুজ, চকচকে এবং ডিম্বাকৃতির হয়ে থাকে। বেলি ফুল সাধারণত গুচ্ছাকারে ফোটে।  পাপড়ির বিন্যাসের ওপর ভিত্তি করে বেলি ফুল কয়েক জাতের হয়। এক পাপড়ির বেলি আকারে কিছুটা ছোট  এবং এর সুবাস অত্যন্ত তীব্র হয়। মাঝারি বেলিতে  পাপড়ির স্তর কিছুটা বেশি থাকে। থোকা বেলি গোলাপের মতো ঘন পাপড়িযুক্ত এবং আকারে বেশ বড় হয়।
গ্রীষ্মের প্রচণ্ড দাবদাহে যখন প্রকৃতি ক্লান্ত হয়ে পড়ে, ঠিক তখনই বেলি ফুল ফোটার ধুম পড়ে। মূলত গ্রীষ্ম ও বর্ষাকাল বেলি ফুল ফোটার প্রধান সময়। বিকেলের ম্লান আলোয় এই ফুল ফুটতে শুরু করে এবং সন্ধ্যার পর এর সুবাস চারপাশ মুখরিত করে তোলে। বেলি ফুল চাষের জন্য উষ্ণ ও আর্দ্র আবহাওয়া সবচেয়ে উপযোগী। রোদেলা জায়গায় এই গাছ দ্রুত বৃদ্ধি পায়। সাধারণত দোআঁশ মাটিতে বেলি ভালো হয়। বছরের চৈত্র মাস থেকে শুরু করে বর্ষাকাল পর্যন্ত বেলিফুল ফোটার প্রধান সময়। কাটিং বা কলমের মাধ্যমে খুব সহজেই এই ফুলের বংশবিস্তার করা যায়। বিশেষ করে বর্ষাকালে ডাল কেটে মাটিতে পুঁতে দিলেই নতুন চারা গজিয়ে ওঠে।

শীতকালে বেলি গাছ একপ্রকার সুপ্তাবস্থায় থাকে। তাই শীতের শেষে (ফেব্রুয়ারি-মার্চ মাসে) গাছের ডালপালা হালকা ছাঁটাই করে দিলে বসন্ত ও গ্রীষ্মে প্রচুর নতুন কুঁড়ি আসে।

বেলি শুধু বাগানের সৌন্দর্যই বাড়ায় না, এর অর্থনৈতিক গুরুত্বও অপরিসীম। বাণিজ্যিক ভিত্তিতে বেলি ফুলের চাষ করে অনেকেই স্বাবলম্বী হচ্ছেন। বাঙালির যেকোনো উৎসব, বিয়ে বা ধর্মীয় অনুষ্ঠানে বেলি ফুলের মালা এক অপরিহার্য অনুষঙ্গ। নারীদের খোঁপার শোভা বর্ধনে কিংবা ঘরের সৌন্দর্য বাড়াতে এর জুড়ি মেলা ভার। এর তীব্র ও মনমাতানো ঘ্রাণের জন্য পারফিউম, কসমেটিকস এবং ধূপকাঠিতে বেলিফুলের নির্যাস ব্যবহার করা হয়। বিভিন্ন ধর্মীয় উপাসনায় বেলিফুল পবিত্রতার প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হয়। বেলি ফুলের সুগন্ধি তেল (Jasmine Essential Oil) অত্যন্ত মূল্যবান। এটি নামি-দামি পারফিউম, সাবান, সুগন্ধি তেল এবং বিভিন্ন প্রসাধন সামগ্রী তৈরিতে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়। আয়ুর্বেদ ও লোকজ চিকিৎসায় বেলির পাতা ও ফুলের ব্যবহার রয়েছে। এর সুবাস মানসিক চাপ ও ক্লান্তি দূর করতে সাহায্য করে। অনেক দেশে বেলির শুকনা পাপড়ি দিয়ে সুগন্ধি ‘জেসমিন টি’ বা চা তৈরি করা হয়, যা স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী, হজমে সাহায্য করে। এ ছাড়া এর পাতা ও শিকড় নানা চর্মরোগ সারাতে আয়ুর্বেদিক চিকিৎসায় ব্যবহৃত হয়।

আমাদের সাহিত্যে ও গানে বেলিফুলের উপস্থিতি বিশাল। বেলিফুল নিয়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বাল্মিকী প্রতিভা গীতিনাট্যে  লিখেছেন, 

‘বেলি ফুল, বেলিফুল,
কার খোঁপায় হবি ব্যাকুল
কার গলায় মালিকা হয়ে
সুবাস দিবি আকুল করে।’ 
বেলিফুল কিন্তু ফিলিপিন্সের জাতীয় ফুল। সেখানে একে বলা হয় ‘সাম্পাগুইতা’ (Sampaguita)। এটি সেখানে বিশুদ্ধতা ও বিশ্বস্ততার প্রতীক হিসেবে গণ্য হয়।

শহুরে ব্যালকনি বা ছাদবাগান থেকে শুরু করে গ্রামীণ উঠোন—সবখানেই বেলি ফুল তার আপন মহিমায় উজ্জ্বল। এর সরল সৌন্দর্য এবং তীব্র ও স্নিগ্ধ সুবাস আমাদের মনকে সতেজ করে তোলে। যান্ত্রিক জীবনের ক্লান্তি ভুলে ঘরের কোণে এক গোছা বেলি ফুল এনে দিতে পারে এক টুকরো অনাবিল শান্তি ও সতেজতা।

লেখক : অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগ, মুমিনুন্নিসা সরকারি মহিলা কলেজ, ময়মনসিংহ

আবাস হারিয়ে মানুষের দোরগোড়ায় বনের নিঃশব্দ আর্তনাদ

প্রকাশ: ০২ জুন ২০২৬, ০৩:২১ পিএম
আপডেট: ০২ জুন ২০২৬, ০৩:৪৪ পিএম
আবাস হারিয়ে মানুষের দোরগোড়ায় বনের নিঃশব্দ আর্তনাদ
মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল থেকে গত এক মাসে লোকালয় থেকে ১৪টি বন্যপ্রাণী উদ্ধার করা হয়। খবরের কাগজ

নিজ আবাস হারিয়ে বনের প্রাণীরা এখন শহরের দরজায় এসে দাঁড়াচ্ছে, নিঃশব্দ আর্তনাদ নিয়ে। ক্রমাগত বনভূমি ধ্বংস, খাদ্য ও নিরাপত্তার সংকট তাদের ঠেলে দিচ্ছে মানুষের বসতির দিকে। মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল উপজেলায় গত এক মাসে লোকালয় থেকে ১৪টি বন্যপ্রাণী উদ্ধার করেছে বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশন। এই সংখ্যা নিছক পরিসংখ্যান নয়; এ যেন ধীরে ধীরে নিঃশেষ হয়ে যাওয়া এক জীববৈচিত্র্যের মর্মান্তিক গল্প।

বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশনের পরিচালক স্বপন দেব সজল জানান, চলতি বছরের ৩ মে থেকে ৩১ মে পর্যন্ত এই এক মাসে শ্রীমঙ্গলের বিভিন্ন এলাকা থেকে উদ্ধার করা হয়েছে ১৪টি বন্যপ্রাণী। এদের মধ্যে রয়েছে অজগর, পদ্ম গোখরা, তক্ষক, বন বিড়াল, চিতা বিড়াল, জঙ্গল প্যাঁচা, সবুজ ফনিমনসা এবং বিপন্ন লজ্জাবতী বানরের মতো সংবেদনশীল প্রজাতি যারা একসময় গভীর বনে নির্ভয়ে বিচরণ করতো।

তিনি আরও জানান, তিনি নিজে ও পরিবেশকর্মী রাজদীপ দেব অনেক সময় মানুষের ঘরবাড়ি কিংবা দোকানপাট থেকে এসব প্রাণীকে উদ্ধার করেন। অনেক ক্ষেত্রে প্রাণীগুলো থাকে আহত, ক্লান্ত কিংবা অসুস্থ। তাদের সযত্নে চিকিৎসা ও পরিচর্যা করে সুস্থ করে তোলার পর বন বিভাগের সহায়তায় আবার ফিরিয়ে দেওয়া হয় তাদের নিজস্ব আবাসে, বনের নীরব সবুজে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, একসময় শ্রীমঙ্গলের লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানসহ আশপাশের বনাঞ্চল ছিল বন্যপ্রাণীর স্বর্গরাজ্য। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই বন আজ সংকুচিত। মানুষের বসতি, রিসোর্ট, কৃষিজমি আর অবাধ প্রবেশে কমে গেছে খাদ্যের উৎস। ফলে বনের প্রাণীরা বাধ্য হয়ে লোকালয়ে চলে আসছে, কখনও খাদ্যের খোঁজে, কখনো নিরাপদ আশ্রয়ের আশায়। আর সেই পথেই অনেক প্রাণ ঝরে যাচ্ছে দ্রুতগামী যানবাহনের চাকায়।

পরিবেশবিদরা সতর্ক করে বলছেন, এভাবে বন ধ্বংস অব্যাহত থাকলে শুধু প্রাণীকুলই নয়, পুরো বাস্তুতন্ত্রই একদিন হুমকির মুখে পড়বে। খাদ্যশৃঙ্খল ভেঙে গেলে এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়বে কৃষি, পরিবেশ এবং মানুষের জীবনযাত্রায়।

বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুযায়ী, গত বছর শ্রীমঙ্গল ও আশেপাশের এলাকা থেকে ৬৭টি বন্যপ্রাণী উদ্ধার করা হয়েছে, এই পরিসংখ্যান স্পষ্ট করে দেয়- বনের প্রাণীরা আর বনে নিরাপদ নেই।

স্বপন দেব সজল বলেন, নির্বিচারে গাছপালা কাটা, ঝোপঝাড় উজাড়, বনভূমিতে মানুষের অবাধ প্রবেশ, ফসল চাষ ও অপরিকল্পিত রিসোর্ট নির্মাণ সব মিলিয়ে বন্যপ্রাণীদের জীবন হয়ে উঠেছে দুর্বিষহ। খাদ্যের সংকটে তারা বাধ্য হয়ে মানুষের কাছাকাছি চলে আসছে।

তিনি সবাইকে অনুরোধ করে বলেন, বন্যপ্রাণী লোকালয়ে এলে আতঙ্কিত হয়ে তাদের আঘাত করবেন না। আমাদের খবর দিন, আমরা নিরাপদে উদ্ধার করে তাদের আবার বনে ফিরিয়ে দেব।

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) জাতীয় পরিষদ সদস্য আ স ম সালেহ সোহেল খবরের কাগজকে বলেন, প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষায় প্রতিটি প্রাণীরই নিজস্ব ভূমিকা রয়েছে। কিন্তু আমরা যদি বন ও পরিবেশ রক্ষা না করি, একদিন এই প্রাণীরাও হারিয়ে যাবে আমাদের পৃথিবী থেকে। এই উদ্ধার কার্যক্রম শুধু প্রাণ বাঁচানো নয়, মানুষের মধ্যে সচেতনতার আলো ছড়িয়ে দেওয়ার এক গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ।

মানুষের দখল ও অযত্নে প্রাকৃতিক আবাসস্থল ধ্বংস হয়ে যাওয়ার কারণে বন্যপ্রাণীরা বাধ্য হয়ে লোকালয়ে চলে আসছে। বন্যপ্রাণী উদ্ধার ও সংরক্ষণে এমন উদ্যোগ প্রকৃতিকে সুস্থ রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে বলে মনে করছেন পরিবেশবাদীরা।

থিও/