অবশেষে বৈশাখের এক সকালে পুন্নাগচাঁপা ফুলের দেখা পেলাম। রাজধানীর রমনা উদ্যানের নার্সারির ভেতরে একটি বড় সুউচ্চ গাছের ডালপালাজুড়ে শোভা পাচ্ছে অজস্র কুঁড়ি আর ফুল। হালকা মেঘলেপা আকাশের পটভূমিতে সুউচ্চ বৃক্ষের সঘন গাঢ় সবুজ পত্রপল্লবের ঝোপে ছোট ছোট সাদা ফুল আর কুঁড়িগুলো যেন মুক্তার মতো জ্বলছে। ফুলগুলো দেখে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের একটি কবিতায় লেখা পুন্নাগের কথা মনে পড়ল–
‘শুষ্ক খড়কুটো ধূলি শীত-শীর্ণ বিদায়-পাতায়
ফাল্গুনী-পরশে তার।–আমার ধমকে নুয়ে যায়
বনস্পতি মহা মহীরুহ, শাল্মলি, পুন্নাগ দেওদার,
ধরি যবে তার’
এ চারটি চরণ কাজী নজরুল ইসলাম বিষের বাঁশী কাব্যের ‘ঝড়’ নামের দীর্ঘ কবিতার। ফণীমনসা, বনস্পতি (বট), শাল্মলি (শাল), দেওদার (দেবদারু), পদ্ম, কেতকী (কেয়া), কদম্ব (কদম), তমাল, তাল, পিয়াল ও দূর্বার সঙ্গে পুন্নাগ বা সুলতানচাঁপাগাছেরও উল্লেখ করেছেন। সুলতানচাঁপা নাম নিয়ে কোনো সংশয় নেই, কিন্তু পুন্নাগ নিয়ে দ্বন্দ্ব বাধল। এর কারণ হলো, কালিদাসের রঘুবংশ গ্রন্থের চতুর্থ সর্গে পাগলা হাতির বর্ণনা করতে গিয়ে পুন্নাগ ফুলের গন্ধকে তিনি টেনে এনেছেন– ‘সেই সুগন্ধে আকুল হইয়া ব্যাকুল ভ্রমরদল/ পুন্নাগ ত্যাজি বসিছে আসিয়া তাদের কপোলপরি।’
পুন্নাগের অর্থ খুঁজতে গিয়ে সাহিত্যলোক প্রকাশিত অমূল্যচরণ বিদ্যাভূষণের উদ্ভিদ অভিধানটি খুলে দেখলাম, তাতে পুন্নাগের অর্থ লেখা রয়েছে– নাগকেশরাদিবর্গের তরুবিশেষ, যার হিন্দি নাম পুলাক ও সুলতানচম্পক। সহজে ধারণা করা যায় যে সুলতানচম্পকই কালক্রমে সুলতানচাঁপা হয়েছে। তামিল ভাষায় পিন্নগ। পুন্নাগ ও পুনাং নামটা ওড়িয়া ভাষার। সে অভিধানে এ গাছের উদ্ভিদতাত্ত্বিক নামসহ সংক্ষিপ্ত পরিচয়ও তুলে ধরা হয়েছে–বহুশাখবিশিষ্ট ছায়াতরু। কাণ্ড প্রায় সরল হয় না। পাতা ডিম্বাকার ও শিরাবহুল, মসৃণ। ফুল বড়, সাদা ও সুগন্ধি। ফল পাকলে হয় হরিদ্রাভ পীত। বীজ থেকে তেল হয়। তেলকে বলে পুনাং তেল। পাতা ও ফুল ওষুধ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। কুঁড়ি থেকে হরিদ্রা রং তৈরি হয়।
নামের ঠিকুজি বের করতে গিয়ে আরও একটা দ্বন্দ্ব মনে এল। পুন্নাগকে বলা হচ্ছে নাগকেশর। তা হলে কি নাগেশ্বর আর নাগকেশর এক না?
১২২৪ বঙ্গাব্দে প্রকাশিত বাঙ্গালা ভাষার অভিধানের দ্বিতীয় সংস্করণে সে ফয়সালা পেলাম। সেখানে পুন্নাগের অর্থ বলা হয়েছে ‘পুষ্প। নাগের (হস্তীর) মদ গন্ধযুক্ত পুষ্প যার, নাগকেশর বৃক্ষ।’ তবে বাংলা একাডেমির আধুনিক বাংলা অভিধানে কেন পুন্নাগের অর্থ শ্বেতপদ্ম, শ্বেতহস্তী, নরশ্রেষ্ঠ বলা হয়েছে, তা বোধগম্য হলো না। কালিদাসের কাব্যে শ্বেতপদ্মের সংস্কৃত নাম বলা হয়েছে কহ্নার, পুন্নাগ না। তার কাব্যেও পুন্নাগকে পরিচয় করানো হয়েছে নাগকেশর রূপে। কেননা এ ফুলের কেন্দ্রস্থলে থাকা হলুদ কেশরগুচ্ছ দেখতে অনেকটা নাগফণার মতো। নাগলিঙ্গম ফুলেরও তাই। ‘নাগ’যুক্ত নামের ফুল যথা নাগকেশর, নাগেশ্বর ও নাগলিঙ্গম–এ তিনটি উদ্যানফুলই এ দেশে আছে। আরও আছে বুনোফুল নাগবল্লী ও নাগদামিনী।
এই পুন্নাগই আবার উচ্চারণগুণে উপকূলীয় খুলনা-বরিশাল অঞ্চলে হয়ে গেছে পুইন্যাল বা পুইন্নাল। পিরোজপুর, ঝালকাঠি, পটুয়াখালীর বেশ কিছু সুপারিবাগানে বিলাতি গাব আর এ গাছ বেশ দেখেছি। এ গাছের পাতা দেখতে অনেকটা সুন্দরীগাছের মতো, তবে সুন্দরী পাতার চেয়ে বড়। এ জন্য কেউ কেউ একে সুন্দরীও বলে, কেউ কেউ বলে গোটা গাছ। কেননা ফলগুলো গোটার মতো, ফলের খোসা ছাড়িয়ে তেল বের করা হয়। পুন্নাগের ইংরেজি নাম Alexandrian laurel, Oil-nut, Mastwood, Beach calophyllum বা Beautyleaf, উদ্ভিদতাত্ত্বিক নাম Calophyllum inophyllum, গোত্র ক্যালোফাইলেসি।
পুন্নাগ একটি চিরসবুজ বহুবর্ষজীবী বৃহৎ বৃক্ষ। এটি এশিয়ার একটি উত্তম কাঠ উৎপাদনকারী গাছ। বিশেষ করে জাহাজের মাস্তুল ও জাহাজ নির্মাণের জন্য এই কাঠ মূল্যবান। এই গাছে শাখা-প্রশাখা হয় কম, বৃদ্ধিও ধীর। গাছ ৮ থেকে ৩০ মিটার লম্বা হয়। বাকল ফাটা ফাটা ও কৃষ্ণবর্ণ। বছরে গাছে দুবার ফুল ফোটে, এপ্রিল থেকে জুন ও অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর। একটি রেসিম ধরনের পুষ্পমঞ্জরিতে কয়েকটা ফুল ফোটে। ফুলের পাপড়ির বিস্তার ২৫ থেকে ৩০ মিলিমিটার, রং সাদা, সুমিষ্ট ঘ্রাণবিশিষ্ট। ফল গোলাকার, ব্যাস ২ থেকে ৪ সেন্টিমিটার, সবুজ। পাকা ফলের রং হলুদ থেকে বাদামি-লাল, তখন খোসা কুঁচকে যায়। শাঁস স্পঞ্জের মতো এবং খেতে অনেকটা আপেলের মতো। আদিনিবাস আফ্রিকা। বাহারি গাছ হিসেবে পার্কে ও বাগানে লাগানো হয়। বীজ থেকে চারা হয়। বর্তমানে অনেক উদ্যান ও রাজপথের ধারে সুদর্শন ছায়াতরু হিসেবে সুগন্ধি ফুল ও সুদৃশ্য পাতার জন্য লাগানো হচ্ছে। পুন্নাগ এ দেশে দুর্লভ নয়।
লেখক: কৃষিবিদ ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞ