কালবৈশাখীর পর রমনা উদ্যানের কিছু গাছের ডালপালা ভেঙে পড়ে আছে। সেগুলোর মধ্যে ফুল ফোটা পাদাউকের ডালও আছে। পাদাউক ফুলকে কখনো এত কাছ থেকে দেখিনি। সে ফুলের ছবি তুলতে গিয়েই পাশে পেলাম হেলে পড়া কাজুবাদামগাছকে। ফুল ফুটেছে, ফল ধরা শুরু হয়েছে। কাজুবাদাম ফলটা বড্ড অদ্ভুত। আগে হয় বিচি বা বাদাম, পরে হয় ফল, বিচিটা ফলের বাইরেই ঝুলতে থাকে। কাজুবাদাম ফুলের ছবি তুলতে গিয়েই সে গাছের ডালে বসা একটা সবুজ গাছফড়িংয়ের দেখা পেলাম। ফড়িং আর পাতাশোষক পোকাদের নিয়ে মাঝে মাঝে গোলমাল বাধে। এরপর আছে ঘাসফড়িংদের ঝামেলা। হেমিপ্টেরা বর্গের লিফ হপার ও প্ল্যান্ট হপার– এ দুটোই শোষক পোকা। এক প্রকার পোকা খায় পাতার রস, সে জন্য তার নাম লিফ হপার, বাংলায় বলা হয় পাতাফড়িং।
বাংলাদেশে সবচেয়ে মারাত্মক পাতাফড়িং হলো ধানের সবুজ পাতাফড়িং, এরা টুংরো ভাইরাস রোগ ছড়ায়। আর এক রকমের শোষক পোকা আছে যারা খায় গাছের কাণ্ড ও ডালপালা এবং ডগার রস। সে জন্য ওদের বলে গাছফড়িং। বাংলাদেশে সবচেয়ে মারাত্মক গাছফড়িং হলো ধানের বাদামি গাছফড়িং। কাজুবাদামগাছের একটা সরু ডালে ফুল-পাতার আড়ালে চুপচাপ বসে আছে বেচারা। ওদের স্বভাবটাই এমন, যেখানে বসে সেখান থেকে রস চুষে খেতেই থাকে, সহজে জায়গা ছেড়ে উঠতে চায় না। তাতে অবশ্য আমার ছবি তুলতে সুবিধা হলো। চেহারাটা অন্য গাছফড়িংদের মতো না, পাশ থেকে ওকে মোটেই বাদামি গাছফড়িংয়ের মতো দেখায় না। বরং ট্রি হপারদের চেহারার মতো খানিকটা দেখায়।
এ পোকার বৈজ্ঞানিক নাম Siphanta acuta ও গোত্র ফ্ল্যাটিডি। এশিয়াটিক সোসাইটির বাংলাদেশ উদ্ভিদ ও প্রাণী জ্ঞানকোষ বইয়ের বিশতম খণ্ডে হেমিপ্টেরা বর্গের পোকাগুলোর বর্ণনার মধ্যেও এ পোকাটির কোনো উল্লেখ পেলাম না। এমনকি বাংলাদেশে মোহাম্মদ আতিকুর রহমান ও সাথি গবেষকদের দ্বারা ১৭৫৮ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত পাওয়া হেমিপ্টেরা বর্গের পাতাফড়িং ও গাছফড়িংদের ৭৪টি নামের যে প্রাথমিক তালিকা বা চেকলিস্ট রয়েছে তাতেও এর নাম পেলাম না। তাতে সন্দেহ হলো, পোকাটি কি এ দেশে নতুন? ইন্টারনেট ঘেঁটে জানা গেল, এ প্রজাতিটি অস্ট্রেলিয়ার একটি স্থানীয় পোকা। তবে তাকে বিশ্বের অনেক দেশেই এখন পাওয়া যায়। পোকাটি বেশ ছোট, মাত্র ১০ মিলিমিটার লম্বা, ডানা ভাঁজ করে বসে থাকলে পাতার মতো দেখায়, রংটাও সবুজ। সাধারণত গাছেই এদের দেখা যায়। এ জন্য এ পোকার সাধারণ নাম সবুজ গাছফড়িং বা গ্রিন প্ল্যান্ট হপার। অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডে পোকাটি এ নামেই পরিচিত। আবার হাওয়াইতে এ পোকাটির নাম টর্পেডো বাগ।
প্রাপ্তবয়স্ক পোকার ডানা অনেকটা ত্রিভুজাকার, ডানার অগ্রভাগ তীক্ষ্ণভাবে সুচালো ও একটি খাড়া চালের মতো থাকে। দেহের চেয়ে ডানা লম্বা হওয়ায় এদের দেহ দেখা যায় না, মাথা ও ডানার রং মিলেমিশে একাকার হওয়ায় মাথাকে আলাদাভাবে বোঝা যায় না, শুধু কালো আলপিনের মাথার মতো বিন্দুবৎ চোখ দুটো দেখা যায়। এ পোকার এক জোড়া শুঁড় বা অ্যান্টেনা, দুই জোড়া ডানা ও তিন জোড়া পা রয়েছে। মুখে রস চোষনের জন্য আছে চোষক অঙ্গ, স্ত্রী পোকার পেটের শেষপ্রান্তে থাকে একটি ডিমপাড়া নল বা অঙ্গ। এদের সাধারণত গ্রীষ্মকালে দেখা যায়। এ সময় স্ত্রী পোকারা ডিম পাড়ে, শরৎকালেও পাড়ে। একটি স্ত্রী পোকা পাতার উপরে গুচ্ছাকারে ৯০ থেকে ১১০টি ডিম পাড়ে। ডিমগাদাকে বলে ডিম-কুশন বা ডিমের গদি যা প্রথমে সাদা থাকে, পরে কালো হয়ে যায়। ডিম ফুটে ছানারা বের হওয়ার পর ডিমের কাছেই ঘুরঘুর করে। এরপর পাঁচবার খোলস বদলানোর পর ছানারা সাবালক হয়।
বাচ্চা ও প্রাপ্তবয়স্ক উভয় পোকাই রস ভক্ষণকারী পতঙ্গ। এরা লেবুসহ বিভিন্ন ফলের গাছ থেকে রস চুষে খেয়ে সেসব ডালপালাকে দুর্বল করে ফেলে। তাই এটি উদ্ভিদের জন্য একটি ক্ষতিকর পোকা। তবে ওদের শত্রুও আছে। Aphanomerus pusillus প্রজাতির বোলতা ওদের পেড়ে রাখা ডিমের ওপর ডিম পাড়ে। এ যেন কাকের বাসায় কোকিলের ডিম পাড়া। গাছফড়িংয়ের ডিম ফুটে ছানারা বের হওয়ার আগেই ওই বোলতার বাচ্চারা বেরিয়ে আসে। তখন গাছফড়িংয়ের ছানারা আর পৃথিবীর আলো দেখতে পায় না, বোলতার ছানারা ওদের খেয়ে ফেলে। বড়রা একটু আড়াল আবডালে থাকা পছন্দ করে, কেননা পাখি ও মাকড়সারা দেখলে ওদের শিকার করে খেয়ে ফেলে। সত্যিই বড্ড বিচিত্র এই পোকাদের জগত!
লেখক: কৃষিবিদ ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞ