শতবছরের সিংহ পরিবারের একনায়কতন্ত্র শেষ হয়েছে। বনের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো গণতান্ত্রিক নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে, যেখানে বনের সব পশুপাখি মিলে তাদের পরবর্তী ‘বনপতি’ বেছে নেবে। এই খবরে বনের প্রতিটি কোণে ভোটের হাওয়া বইছে আর বটতলায় চলছে তুমুল রাজনৈতিক বিশ্লেষণ।
এবারের নির্বাচনে একাধিক প্রার্থী থাকলেও, মূল প্রতিদ্বন্দ্বী দুজন। একজন হলেন মহাগর্জনশীল বাঘ ডোরাকাটা খান, যার দলের নাম ‘শক্তিমান ঐক্যজোট’। তার নির্বাচনি প্রতীক ধারালো দাঁত।
দ্বিতীয় প্রার্থী হলেন শেয়াল পণ্ডিত, যিনি ‘পরিবর্তনশীল পরিষদ’ নামের দলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। তার প্রতীক পাকা কাঁঠাল, যা দিয়ে তিনি নিজেকে প্রকৃতিপ্রেমী হিসেবে তুলে ধরছেন।
নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পরপরই শুরু হলো প্রচারণার ডামাডোল। ডোরাকাটা খানের সমর্থক হায়না আর হিংস্র পশুর দল শালপাতায় ‘ধারালো দাঁত’ মার্কার পোস্টার দিয়ে পুরো বন ছেয়ে ফেলল। পোস্টারগুলোর নিচে লেখা- ‘দুর্নীতিবাজ শেয়ালের কালো থাবা, ভেঙে দাও, গুঁড়িয়ে দাও।’
জবাবে শেয়াল পণ্ডিতের সমর্থক বানর আর পাখিরা কলার পাতায় নিজেদের পোস্টার বানিয়ে বাঘের পোস্টারের ওপর সেঁটে দিল। তাদের স্লোগান- ‘গর্জনে আর ভয় নাই, কাঁঠাল মার্কায় ভোট চাই।’
পরদিন সকালে দেখা গেল, ডোরাকাটা খানের সব পোস্টারের ‘ধারালো দাঁত’ ছবির ওপর কে বা কারা গোবর লেপে দিয়েছে!
ডোরাকাটা খান এক বিশাল জনসভায় গর্জন করে বললেন, আমি নির্বাচিত হলে এই বনে কোনো হানাহানি থাকবে না। হরিণ ও খরগোশসহ সব নিরীহ প্রাণী নিরাপদে থাকবে। কোনো শিকারি বনে ঢুকতে পারবে না।
তার কথা শুনে এক খরগোশ আরেক খরগোশের কানে ফিসফিস করে বলল, শিকারি না হয় ঢুকল না, কিন্তু তিনি নির্বাচিত হলে তো আমাদের আর বনে থাকা লাগবে না।
এদিকে শেয়াল পণ্ডিত তার মিষ্টি কথায় সবার মন ভোলানোর চেষ্টা করছেন। এক সভায় তিনি ঘোষণা দিলেন, আমি জিতলে মৌমাছিদের সঙ্গে চুক্তি করে বনের মাঝখান দিয়ে ‘মধুর নদী’ বইয়ে দেব। তখন আর খাবারের কোনো চিন্তা থাকবে না।
তার কথা শুনে ছোট ছোট পশুপাখি আনন্দে ডিগবাজি খেতে শুরু করল।
নির্বাচনের আগের রাত। শেয়াল পণ্ডিত তার কর্মীদের নিয়ে ভোটারদের বাড়ি বাড়ি গেলেন। হরিণদের এক বস্তা কচি ঘাস দিয়ে বললেন, ভোটটা কিন্তু কাঁঠালেই চাই।
কুমিরকে একটা মরা হাঁস উপহার দিয়ে বললেন, সকাল সকাল কেন্দ্রে চলে যাবেন কিন্তু।
অন্যদিকে ডোরাকাটা খান নিলেন ভিন্ন কৌশল। তিনি গভীর রাতে বনের এমাথা-ওমাথা কেবল একটা গর্জন দিয়ে বললেন, কাল সকালে ভোটকেন্দ্রে যেন সবাইকে দেখি।
ব্যস, এর চেয়ে বড় হুমকির আর দরকার হলো না।
ভোটের দিন সকালে ভোটকেন্দ্র হলো এক বিশাল বটগাছের কোটর। প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন এক অতি প্রবীণ কচ্ছপ। তিনি ধীরে-সুস্থে সবকিছু পর্যবেক্ষণ করছেন। ইসি সচিবালয়ের কর্মকর্তারা অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশে ভোটগ্রহণের চেষ্টা করছেন।
ভোট দিতে এসে পশুদের মধ্যে তুমুল ঝগড়া লেগে গেল। এক বানর নাকি পাঁচবার ভোট দেওয়ার চেষ্টা করেছে! একবার লেজ লম্বা করে, একবার ছোট করে, আবার মাথায় পাতা বেঁধে— মোট পাঁচ ধরনের চেহারায় ভোট দিতে এসে সে ধরা পড়েছে। অন্য পশুপাখিরা তাকে ধিক্কার দিয়ে বলল, এখনকার যুগে কি আর এসব চলে? ফিঙ্গারপ্রিন্ট দিলেই সব বেরিয়ে আসবে।
বিকেলের পর ভোটগণনা শুরু হলো। কচ্ছপ মহাশয় একটি একটি করে পাতা গুনছেন। বোঝা গেল, ধারালো দাঁত আর পাকা কাঁঠালের মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই চলছে।
অবশেষে সিইসি ঘোষণা দিলেন, বিপুল ভোটে জয়ী হয়েছেন এক নতুন প্রার্থী! তার নাম ছাগলু খান। তার কোনো দল নেই, তিনি স্বতন্ত্র প্রার্থী। প্রতীক ছিল এক আঁটি ঘাস।
সবাই তো অবাক! ডোরাকাটা খান আর শেয়াল পণ্ডিত দুজনেই ‘কীভাবে সম্ভব!’ বলে চিৎকার করে উঠলেন। তারা এই নির্বাচন প্রত্যাখ্যান করবেন বলে জানালেন।
তখন নির্বাচন কমিশনার কচ্ছপ মহাশয় বললেন, বনের বেশির ভাগ সাধারণ ভোটার, যেমন হরিণ, খরগোশ, ছাগল আর পাখিরা ভেবে দেখেছে— বাঘ জিতলে তাদের খাবে আর শেয়াল জিতলে তাদের ঠকাবে। তাই তারা সবাই মিলে বুদ্ধি করে ছাগলকেই ভোট দিয়েছে। কারণ, ছাগল বড়জোড় তাদের ভাগের ঘাসটুকু খাবে, জীবনটা তো অন্তত বাঁচবে।
শেয়াল আর বাঘ রাগে গজগজ করতে করতে বলতে লাগলো, ঠিক আছে। ঘোড়া ডিঙিয়ে ঘাস খাওয়া... আমরাও দেখে নেব।
সেই নির্বাচনের পর থেকেই ‘ঘোড়া ডিঙিয়ে ঘাস খাওয়া’ প্রবাদটি প্রচলিত হয়ে গেল।