মিজান সাহেব একটা বেসরকারি সংস্থায় চাকরি করেন। দেখতে বেশ স্মার্ট, গায়ের রং ফর্সা, চোখে মোটা ফ্রেমের চশমা আর কথাবার্তায় ভদ্রতার ছাপ। অফিসে তার সুনাম আছে যথেষ্ট। সহকর্মীরা বলেন, মিজান ভাই খুব ভালো মানুষ। অফিসে এমন কোনো কাজ নেই, যা তিনি সামলাতে পারেন না। সৎ, সময়নিষ্ঠ, দায়িত্বশীল, সব গুণেই পরিপূর্ণ মানুষটি।
কিন্তু একটা বড় সমস্যা আছে তার। বসভীতি। অফিসের বস জনাব আব্দুল ওহাব মোল্যা। স্যুট-টাই পরা, কড়া মেজাজের লোক। তার সামনে দাঁড়ালে সাহসী বাঘও বিড়াল হয়ে যায়। আর মিজান সাহেব? বসকে দেখলেই তার হাত-পা কাঁপে, জিভ জড়িয়ে যায়, চোখে ঝাপসা দেখেন, মাথা ঘুরে যায়।
একদিনের ঘটনা, অফিসে বস হঠাৎ ঢুকছেন। মিজান সাহেব বসের ছায়া দেখেই তড়িঘড়ি উঠে দাঁড়াতে গেলেন। কিন্তু ভাগ্য বেচারার সঙ্গে ছিল না! টেবিলের ওপরের ফাইল উলটে মেঝেতে পড়ল। কাগজপত্র উড়তে লাগল যেন হেমন্তের শুকনো পাতা। তাতে যোগ হলো কলমদানি, সেটা গড়িয়ে গিয়ে সোজা পৌঁছালো বসের পায়ের কাছে।
বস তাকালেন কপাল কুঁচকে।
মিজান তোতলাতে তোতলাতে বললেন, স-স-সরি স্যার!
অফিস সহকারী রফিক মিয়া দৌড়ে এসে বলল, থাক স্যার, আমি উঠায়ে দিচ্ছি। আপনি টেবিলেই যান।
বস মুখে কিছু না বলে গম্ভীরভাবে নিজের রুমে ঢুকে গেলেন।
মিজান সাহেব ভাবলেন, হায় রে, আমি কেন এমন করি? বস দেখলেই হাত-পা কাঁপে কেন? এই জন্যই হয়তো প্রমোশনটা আটকে আছে।
তবে বস কিন্তু তাকে অপছন্দ করেন না। বরং, ভালোই বাসেন। কারণ, কাজের মানুষ তো তিনি। অন্য অফিসাররা যেখানে ফাইল একপাশে রেখে গল্পে মশগুল থাকে, মিজান সাহেব সেখানে বসে হিসাব মেলাচ্ছেন, রিপোর্ট লিখছেন, পরিকল্পনা সাজাচ্ছেন।
অফিসের গাম্ভীর্যের বাইরে, মিজান সাহেবের আরেক রূপ আছে। রোমান্টিক মিজান। তার প্রেমিকা মিরা, বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে, আধুনিক, সুন্দরী, হাসিখুশি এক তরুণী। দুজনের দেখা হয় নিয়মিত- অফিস শেষে ক্যাফেতে, কখনো পার্কে, কখনো-বা মার্কেটে। দুজনের সম্পর্ক এতটাই মধুর যে, মিরা তার বান্ধবীদের কাছে বলে বেড়ায়, আমার মিজান কিন্তু অল স্কয়ার প্রেমিক। ভদ্র, সুন্দর, দায়িত্ববান আবার রোমান্টিকও।
মিরার বাবার কথা উঠলে অবশ্য মিজান একটু ঘাবড়ে যান।
মিরা একদিন বললেন, শোনো মিজান, আমি কিন্তু বাবাকে তোমার কথা বলে ফেলেছি। তিনি তোমার সঙ্গে দেখা করতে চান।
মিজান হকচকিয়ে বললেন, সে কী! তোমার বাবা কি রাগী মানুষ?
মিরা হেসে বললেন, না রে বাবা! তিনি খুবই সিরিয়াস টাইপের মানুষ। তবে তুমি যদি একবার কথা বলো, তিনি তোমাকে পছন্দ না করে পারবেন না।
মিজান একটু ইতস্তত করে বললেন, আচ্ছা, দেখি আমার বসকে বলে ছুটি নিতে পারি কি না। তাকে দেখলেই আমার বুক কাঁপে!
মিরা হেসে বললেন, আহা! ভয় পেলে চলবে না। তুমি একবার ড্যাডকে জয় করো, তারপর দেখো, অফিসের ওই ভয়ংকর বসকে আর সহ্য করতে হবে না। আমার বাবার অফিসেই তুমি জেনারেল ম্যানেজার হবে।
এই আশ্বাসে মিজান সাহেবের বুক ভরে গেল। বললেন, তাই যেন হয়। বলেই মিরার নাকে মিষ্টি করে টোকা দিলেন।
এভাবেই দিন যাচ্ছিল প্রেম, হাসি আর আশা নিয়ে। একদিন সকালে অফিসে ঢুকেই মিজান সাহেব শুনলেন, বস তাকে খুঁজছেন।
বসের রুমে যেতেই বললেন, মিজান সাহেব, কাল দুপুরে আমার বাসায় আসবেন। লাঞ্চের দাওয়াত। বাসায় এক বিশেষ অতিথি আসবে, আপনাকে তার সঙ্গে আলাপ করিয়ে দেব। আপনার বুদ্ধি-বিবেচনা পরীক্ষা করারও সুযোগ হবে।
বুদ্ধি-বিবেচনা শুনেই মিজান সাহেবের গলা শুকিয়ে গেল। বললেন, জি...জি স্যার...ঠিক আছে।
বস হেসে বললেন, চিন্তা করবেন না, খুব সাধারণ লাঞ্চ।
একটু পরেই মিরা ফোন করল, মিজান, কাল আমাদের বাসায় আসবে। বাবা তোমাকে নিয়ে লাঞ্চ করবেন। আমাদের সম্পর্ক নিয়ে সিদ্ধান্ত নেবেন।
মিজানের মুখ হা হয়ে গেল। তিনি পড়লেন মহাবিপদে। একদিকে ভয়ংকর বসের দাওয়াত, অন্যদিকে প্রেয়সীর বাবার লাঞ্চ মিটিং। দুই জায়গায় একসঙ্গে যাওয়া সম্ভব নয়।
বিকেলে তিনি মরিয়া হয়ে মিরাকে ফোন করলেন কিন্তু পেলেন না। রিং বাজে, কেউ ধরে না। আবার চেষ্টা, তাও ব্যর্থ।
মিজান হতাশ মুখে বললেন, যেখানে বাঘের ভয়, সেখানে সন্ধ্যা হয়! বসের বাসায় না গেলে চাকরিই থাকবে না।
পরদিন মিজান ঝকঝকে শার্ট পরে, আতর মেখে, বসের বাসার পথে রওনা দিলেন। মনটা কেমন কেমন করছে। ভেতরে ভেতরে প্রার্থনা করছেন, হে প্রভু, বস যেন বেশি প্রশ্ন না করে।
দারোয়ান তাকে গেস্টরুমে বসাল। কিছুক্ষণ পর বস এলেন হাসিমুখে। বললেন, চলুন মিজান সাহেব। সামনের রুমে বসে আলাপ করি।
সেখানে বসে বস হাক দিলেন, এইরে মিরা মা! তোর মেহমান আসবে না নাকি? আমার মেহমান এসেছে। দেখা করে যা। মিজান এক ঝটকায় চেয়ারে সোজা হয়ে বসলেন।
পরের মুহূর্তেই রুমে প্রবেশ করল মিরা।
মিজানকে দেখে মিরা চমকে উঠে বলল, আরে! তুমি কখন এলে?
মিজান: আমি তো মাত্র এলাম। তুমি এখানে?
মিরা: আমার বাসায় এসে আমাকেই জিজ্ঞেস করছো নাকি?
মিজান বাকরুদ্ধ। মনে মনে বললেন, বসের বাসা মানেই মিরাদের বাসা? এ কী কপাল।
মিরা বাবার দিকে তাকিয়ে বলল, ড্যাড, তিনিই তো মিজান! যার কথা আমি তোমাকে বলেছি।
বস, অর্থাৎ আব্দুল ওহাব সাহেব চেয়ারে হেলান দিয়ে ধীরে বললেন, ওই যে মিজান সাহেব, যাকে আমি প্রতিদিন অফিসে দেখি! তো এই হলো তোমার প্রেমিক?
মিজান কাঁপতে কাঁপতে পানির গ্লাস নিতে গেলেন, আর তখনই ছপাৎ করে পানি গিয়ে পড়ল বসের গায়ে।
মিরা মুখ চেপে হাসছে। বস বললেন, গর্দভ।
ঘরজুড়ে নীরবতা। তারপর হালকা হাসি।
বস বললেন, তোমার মতো ভীতু ছেলেকে প্রেম করতে দেখেও আমি অবাক হই! অফিসে তুমি ভয় পাও, এখন আমার মেয়েকেও ভয় পাবে নাকি?
মিরা তাড়াতাড়ি বললেন, ড্যাড, ওকে ভয় দেখিও না! ও খুব ভালো মানুষ।
বস মুচকি হাসলেন, তা জানি। ওর কাজ আমি নিজে দেখি। তবে প্রেম করতে গিয়ে যদি ফাইল ফেলে দাও, তখন কিন্তু অফিসে নয়, ঘরেই শাসন করব।
সেদিন মিজান সাহেব বাড়ি ফিরলেন মনভরা আনন্দ নিয়ে। মনে মনে বললেন, বসভীতি গেল, প্রেমে জয় এল। সত্যিই, যেখানে বাঘের ভয়, সেখানেই সূর্যোদয়।