আমতলী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান পদপ্রার্থী মোকসেদ আলী। মানুষ হিসেবে সজ্জন, তবে রাজনীতিতে নতুন। সারা জীবন সরকারি চাকরি করে রিটায়ারমেন্টের পর তার মনে হয়েছে, এবার জনগণের সেবা করা দরকার। তার নির্বাচনি প্রতীক পড়েছে ‘ঢেঁকি’। এই স্মার্টফোনের যুগে ঢেঁকি প্রতীক পেয়ে তিনি এমনিতেই মনমরা, তার ওপর প্রচারের আধুনিক কলাকৌশল কিছুই বোঝেন না।
এই সময় দেবদূতের মতো আগমন ঘটল মোকসেদ সাহেবের ভাগনে ডিজিটাল পারভেজের। ঢাকা থেকে বিবিএ শেষ করে পারভেজ এখন নিজেকে ডিজিটাল মাইন্ড হ্যাকার বলে পরিচয় দেন।
মোকসেদ সাহেবকে তিনি বোঝালেন, মামা, পোস্টার-লিফলেট এখন অচল। যুগ এখন ভাইরাল কনটেন্টের। আমরা চালাব স্মার্ট ক্যাম্পেইন।
মোকসেদ সাহেব হাই তুলে বললেন, এসব খটমট কথা বুঝি না। সহজ করে বল, কী করতে হবে?
পারভেজ ল্যাপটপ খুলে বললেন, চিন্তা করবেন না মামা। আমি একটা এআই সফটওয়্যারকে আপনার সব তথ্য দিয়ে দিয়েছি। সে-ই আপনার জন্য ইউনিক সব স্লোগান আর প্রচারের আইডিয়া তৈরি করে দেবে। এক্কেবারে হিট হয়ে যাবে।
দুদিন পর পারভেজ কিছু কাগজ প্রিন্ট করে নিয়ে এলেন। বললেন, মামা, এআই আপনার জন্য ফাটাফাটি স্লোগান বানিয়েছে। এগুলো দিয়েই আমরা প্রচার চালাব।
মোকসেদ সাহেব কাগজ হাতে নিয়ে পড়তে শুরু করলেন-
১. যুবসমাজের জাতীয় ক্রাশ, ঢেঁকি মার্কা ১২ মাস
২. গ্লোবাল ভিলেজ স্বপ্ন দেখি, তাই তো মোদের মার্কা ঢেঁকি
স্লোগানগুলো দেখে মোকসেদ সাহেবের মাথা ঘুরে গেল। তিনি বললেন, এসব কী লিখেছিস? ক্রাশ মানে কী? আর ঢেঁকির সঙ্গে গ্লোবাল ভিলেজের সম্পর্ক কী?
পারভেজ বোঝালেন, মামা, এটাই তো আধুনিকতা। মানুষ নতুন কিছু চায়। চলুন, আজ হাটের দিনে এই স্লোগানগুলো দিয়েই প্রচার শুরু করি।
অনিচ্ছা সত্ত্বেও মোকসেদ সাহেব রাজি হলেন। আমতলী বাজারের সাপ্তাহিক হাটে গিয়ে তিনি প্রচার শুরু করলেন। সামনে চায়ের দোকানে বসে থাকা কয়েকজন তরুণকে দেখে তিনি প্রথম স্লোগানটা ছাড়লেন, কী খবর যুবসমাজ। আমি মোকসেদ আলী। মনে রেখো, যুবসমাজের জাতীয় ক্রাশ, ঢেঁকি মার্কা ১২ মাস।
তরুণরা একে অপরের দিকে তাকিয়ে হেসে ফেললেন। একজন বলেই বসলেস, চাচা, শেষমেশ আপনার ওপর ক্রাশ...!
এটুকু বলতেই পাশের জন খোঁচা দিয়ে তাকে থামিয়ে দিলেন।
উপস্থিত সবাই হো হো করে হেসে উঠলেন। মোকসেদ সাহেব রাগে-লজ্জায় ঘেমেনেয়ে অস্থির। তবুও পারভেজের কান মলে দেওয়ার ইচ্ছাটা বহু কষ্টে দমন করলেন।
কিন্তু ডিজিটাল পারভেজের কেরামতি তখনো বাকি। তিনি বুদ্ধি দিলেন, মামা, স্লোগানে কাজ হচ্ছে না। একটা লাইভ করতে হবে। আপনি নিজের হাতে ঢেঁকিতে পাড় দিয়ে দেখাবেন। মানুষ বুঝবে, আপনি কতটা মাটির কাছাকাছি।
পরিকল্পনামাফিক ক্যামেরা চালু হলো। মোকসেদ সাহেব জীবনেও ঢেঁকি দেখেননি, চালানো তো দূরের কথা। তিনি শার্টের হাতা গুটিয়ে যেই না ঢেঁকিতে পা দিয়েছেন, অমনি বিপরীত দিক থেকে ঢেঁকির মাথাটা ছিটকে এসে লাগল তার ঠিক কপালে। ‘ওরে বাবারে’ বলে তিনি চিতপটাং, আর সেই দৃশ্য ফেসবুকে লাইভ।
পরের এক ঘণ্টায় যা হলো, তা ইতিহাস। ভিডিওটি শুধু আমতলী ইউনিয়নে নয়, সারা দেশে ভাইরাল হয়ে গেল। তবে হাসির খোরাক হিসেবে। নানা মিউজিক লাগিয়ে, স্লো-মোশন দিয়ে মানুষ ভিডিওটা শেয়ার করতে লাগল।
পরদিন সকালে মন খারাপ করে মোকসেদ সাহেব চায়ের দোকানে বসে আছেন। সবাই তাকে দেখে মুচকি হাসছেন। এমন সময় তার প্রতিদ্বন্দ্বী হেলাল ব্যাপারী এসে তার কাঁধে হাত রেখে বললেন, মোকসেদ ভাই, আপনার প্রচারের স্টাইলটা দারুণ। আমার কর্মীরা তো সারা দিন আপনার ভিডিও দেখেই হাসতে হাসতে শেষ। তারা আমার পোস্টার লাগানোর সময়ই পাচ্ছে না।
মোকসেদ সাহেব বুঝলেন, ডিজিটাল হতে গিয়ে তিনি নিজেই ডিজিটাল কনটেন্ট হয়ে গেছেন। তিনি ঠিক করলেন, ভোটে জেতা হোক বা না হোক, ভাগনে পারভেজকে দিয়ে আগে বাড়ির সব ধান ভাঙাবেন। ঢেঁকির আসল ব্যবহারটা তো জানা দরকার।