দুটি জিনিস আমার আব্বার চোখের বিষ ছিল। এক হচ্ছে অনেক বেলা পর্যন্ত ঘুমানো আর দুই হচ্ছে অনেকক্ষণ ধরে ফোনে কথা বলা। আমাদের ল্যান্ডফোনের দিনগুলোতে আমরা খুব ঝামেলায় থাকতাম। ফোনটা ছিল আব্বার বেডরুমে। আমাদের ফোন আসলে আব্বার রুমে গিয়ে কথা বলতে হতো। যে-ই ফোন করুক না কেন আব্বাই আগে রিসিভ করত। আমার যে বন্ধু বা বড় আপুর যে বান্ধবী ফোন করত, তাদের আগে একটা কঠিন জেরার মধ্যদিয়ে যেতে হতো। আব্বার প্রশ্ন শুরু হতো, তোমার বাবা কী করে দিয়ে। এভাবে আমার বন্ধুবান্ধব ফোন করা কমিয়ে দিত।
মোবাইল আসার পর বড় আপু প্রথম মোবাইল পেল। আব্বার চক্ষুশূলে তৃতীয় জিনিসটা যোগ হলো। কিন্তু সারা দিন আপুকে চেক দিতে পারত না। আপু ছাদে, কখনো গভীর রাতে ফিসফিস করে কথা বলত।
আব্বা যেখানে চাকরি করত সেখানে সবাই মোবাইল নিয়ে নিল। সবাই আব্বাকেও একটা মোবাইল নিয়ে নিতে বলল। আব্বা অনড়, মুঠোফোন তার অপছন্দ। কিন্তু একদিন প্রচণ্ড বৃষ্টিতে আব্বা এলাকার মোড়ে আটকা পড়ল। টানা ২০ মিনিট বৃষ্টি পড়লেই আমাদের এলাকার রোডে পানি উঠে যায়। আর এর বেশি বৃষ্টি হলে আমরা নৌকা নামিয়ে দিই। বৃষ্টির অবস্থা দেখে আব্বা অস্থির হয়ে গেল। এদিকে আশপাশের সবাই বাসায় কল দিচ্ছে আর তাদের বাসা থেকে কেউ না কেউ এসে নিয়ে যাচ্ছে। আব্বার মুঠোফোন অপছন্দ তাই কোমর পানিতে হেঁটে এসে, বাম পায়ের স্যান্ডেল হারিয়ে, ঠাণ্ডা বাঁধিয়ে বাসায় এসে প্রথম কথা বলল, ‘একটা নরমাল মোবাইল কত টাকা নেবে?’
আম্মা আব্বার জন্য চা আনছিল, আব্বার কথা শুনে স্বাভাবিকভাবেই কাপ মেঝেতে ফেলে দিল। আব্বা মোবাইল নিল। নকিয়ার একটা সিম্পল ফোন। সেই ফোনের খুঁটিনাটি শেখানোর দায়িত্ব পড়ল ছোট ভাইয়ের ওপর।
‘আমি আজ ছোট বলে সবাই খালি আমার ওপর অত্যাচার করিও’ এইরকম কী একটা গজগজ করতে করতে সে আব্বার রুমের দিকে গেল।
আব্বা প্রথম প্রশ্ন করল, ‘চার্জ কীভাবে দিতে হয়, কখন দিতে হয়? মনে রাখবি সব জীবের জন্য চার্জ অপরিহার্য।’
আমি আর বড় আপু রুমের বাইরে আড়ালেই ছিলাম। হাসি সামলাতে গিয়ে আমি হাঁচি দিয়ে দিলাম। এরপর আমাদের জীবনে বিশাল ঝামেলা শুরু হলো। ভোরে, বিষণ্ন দুপুরে, গভীর রাতে আব্বা আমাদের ডেকে নিত চার্জ দেওয়ার জন্যে। যদিও তাকে অনেকবার শেখানো হয়েছে চার্জ দেওয়ার নিয়মকানুন। একদিন আপু বলেই ফেলল, ‘এমন কোনো মোবাইল নাই যেটা একবার চার্জ দিলে আর দিতে হবে না।’ আব্বা শুনে বলল, ‘বেয়াদবের মতো কথা বলোস ক্যান?’
এভাবেই সব চলছিল। এর মধ্যেই এল স্মার্টফোন। আমরা খুব আনস্মার্ট হয়ে গেলাম। বাসা থেকে বের টের হই না, কিছু করি না। সারা দিন স্মার্টফোনে ডুবে থাকি। সবাই একটু বড় হয়েছি। কলেজ ভার্সিটিতে পড়ি। আব্বাও আগের মতো বকাঝকা করে না বা করলেও আমরা গায়ে মাখি না বা গায়ে মাখলেও একটা স্ট্যাটাস দিয়ে গা থেকে সেটা ঝেড়ে ফেলি। আব্বার চক্ষুশূলের চতুর্থ জিনিসটা পাওয়া গেল।
এরপর বড় আপার বিয়ে হয়ে গেল। দুলাভাই আমেরিকা থাকে, আপাকেও নিয়ে গেল। আপা মাঝে মাঝে আমাদের মোবাইলে ভিডিও কল দিত। আব্বা সেভাবেই কথা বলত। একবার কথা শুরু হলে আর ছাড়ত না বলে আমরা খুব বিরক্ত হতাম। মাঝে মাঝে কল দিলেও আমরা রিসিভ করতাম না। তখনো বুঝি নাই কী বিপদ ডেকে আনছি। একদিন সুন্দর এক রোদেলা সকালে আব্বা ঘোষণা দিল, সে একটা স্মার্টফোন নেবে। আমার আর ছোট ভাইয়ের মেরুদণ্ড বেয়ে শীতল স্রোত বয়ে গেল। স্মার্টফোন কিনুক তাতে সমস্যা নাই কিন্তু এই স্মার্টফোন আব্বার গলায় বাঁধবে কে? আমরা নানাভাবে আব্বাকে নিরুৎসাহিত করার চেষ্টা করলাম।
আব্বা নাছোড়বান্দা কিনবেই। এরপর আর কথা থাকে না। একদিন সকালে আব্বা একটা স্মার্টফোন কিনে আনল। আর কীভাবে জানি আমার ছোট ভাই এর পরের দিন স্টাডি ট্যুরের নাম করে বান্দরের মতো বান্দরবান চলে গেল। আমি অভাগার কাঁধে এসে পড়ল এই মহান দায়িত্ব। প্রথমেই আব্বার সেই তারকাখচিত প্রশ্ন, ‘চার্জ কেমনে দিব?’
স্মার্টফোন অপারেট করা কত কষ্টের হতে পারে আমি হাড়ে হাড়ে বুঝলাম। সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো আব্বা টাচ করতেই কোনো অ্যাপস না খুলে ওটা সরে যাচ্ছিল। যেহেতু আব্বা টাচটা খুব জোরে করছিল। আমি বারবার বোঝাচ্ছিলাম আস্তে আস্তে হাত নরম করে। এর মধ্যে আম্মা এসে মুখ ঝামটা দিয়ে বলল, ‘হাত নরম ক্যামনে হবে? সারা জীবন আমার সঙ্গে ঝগড়া করে গেছে!’
আমি মনে মনে প্রমাদ গুনলাম। টানা তিন ঘণ্টার চেষ্টায় আব্বা শিখল কীভাবে ফোন করবে আর কীভাবে ফোন রিসিভ করবে। এতসব শেষ করার সঙ্গে সঙ্গেই আব্বা বলল, ‘চার্জ মনে হয় শেষ। দেখি চার্জ দে।’
আমার ইচ্ছা করল দোতলার বারান্দা থেকে লাফ মারি। ঠিক সাতদিন পর চোর জানালা দিয়ে আব্বার সেট নিয়ে গেল। সকালে আব্বা সেটা আমাদের বলতেই ছোট ভাই হেসে দিয়ে বলল, ‘আয় হায়! বলেন কী?’
ভাইয়ের উদ্বেগ গলায় ফুটল না। যেভাবে মাঝে মাঝে সাবটাইটেল মিলে না মুভির সঙ্গে। আব্বা মন খারাপ করে ফেলল। আমরা সান্ত্বনা দিলাম, বাদ দেন পুরাতন আমলের মোবাইলই ভালো।
ঠিক সাতদিন পর সকালে আব্বা আমাদের ঘুম থেকে জাগিয়ে ড্রয়িং রুমে নিয়ে এল। ড্রয়িং রুমে এসেই আমার আর ছোট ভাইয়ের চোখ থেকে ঘুম সঙ্গে সঙ্গে উধাও হয়ে গেল। আব্বার মোবাইল চুরির খবর শুনে বড় আপু আব্বার জন্য একটা আইফোন পাঠিয়েছে। আব্বা সারা গালে হেসে সেই আইফোন দেখিয়ে আমাদের জিজ্ঞাসা করল, ‘এটার চার্জ ক্যামনে দেয় রে?’