এলাকার বিশিষ্ট সমাজসেবক ও আসন্ন নির্বাচনের হেভিওয়েট প্রার্থী চৌধুরী আরমান শিকদার গত কয়েকদিনে মাটির মানুষে পরিণত হয়েছেন। তবে সমস্যা হলো, তিনি মাটির এতটাই কাছাকাছি চলে গেছেন যে, ভোটাররা এখন বিব্রত।
গতকাল সকালে চৌধুরী সাহেব মাছবাজারে ঢুকে পড়েছেন গণসংযোগ করতে করতে। এক প্রবীণ স্কুলশিক্ষক মাছের দরদাম করছিলেন। হঠাৎ চৌধুরী সাহেব সেখানে উপস্থিত হয়ে মাছ বিক্রেতার হাত থেকে বঁটিটা কেড়ে নিলেন।
ভরাট গলায় বললেন, আপনি কেন মাছ কাটবেন? আপনারা জাতির কারিগর, আপনাদের হাতে কি মাছের আঁশ মানায়? আজকের মাছ আমি কেটে দেব। জনসেবাই আমার ধর্ম।
শিক্ষক ভদ্রলোক বললেন, না না, চৌধুরী সাহেব, এ কী করছেন!
কিন্তু চৌধুরী সাহেব নাছোড়বান্দা। তিনি ধবধবে সাদা পাঞ্জাবিতে সামান্য ভাঁজ না ফেলে মাছ কাটতে বসে গেলেন। সমস্যা হলো, জীবনে তিনি কখনো শসা কেটেছেন কি না সন্দেহ। মাছের পেটে কোপ দিতে গিয়ে রক্ত মেখে, পিত্তি গলিয়ে একাকার করে ফেললেন।
চারপাশের উৎসুক জনতা মারহাবা, মারহাবা করলেও শিক্ষক বেচারা মনে মনে ভাবলেন, মাছের পিত্তি তো গলেই গেল, এরপর আমাদের পিত্তি না গললেই হয়।
এরপর এক পথসভায় চৌধুরী সাহেব মাইক্রোফোন হাতে নিলেন। আবেগী কণ্ঠে শুরু করলেন, প্রিয় এলাকাবাসী, আপনারা আমাকে নির্বাচিত করুন, আমি কথা দিচ্ছি—আগামী বর্ষায় এই রাস্তায় এক ফোঁটা পানিও জমবে না। ড্রেন পরিষ্কারের ঝামেলায় আমি বিশ্বাসী নই। আমি এলাকার আকাশে বিশাল শামিয়ানা টাঙিয়ে দেব। বৃষ্টি হবে, কিন্তু এক ফোঁটাও পড়বে না।
শ্রোতাদের গুঞ্জনের মধ্যেই তিনি আবার শুরু করলেন, রাস্তাগুলো হবে চলন্ত সিঁড়ির মতো। আপনারা কষ্ট করে হাঁটবেন কেন? শুধু এই মাথায় এসে দাঁড়াবেন, রাস্তা নিজেই আপনাদের গন্তব্যে পৌঁছে দেবে। আপনারা শুধু দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে উন্নয়ন দেখবেন।
তবে আসল ট্র্যাজেডিটা ঘটল দুপুরে। ডিজিটাল প্রচারের অংশ হিসেবে তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন, এক দিনমজুরের ঘরে দুপুরের খাবার খাবেন এবং সেটা ফেসবুকে লাইভ করা হবে। উদ্দেশ্য—তার সাদামাটা জীবনযাপন এবং গরিবের প্রতি ভালোবাসা প্রদর্শন।
সবকিছু রেডি। দিনমজুর কুদ্দুস মিয়ার টিনের ঘরে মেঝেতে বসেছেন চৌধুরী সাহেব। সামনে মাটির থালায় লাল চালের ভাত আর আলুভর্তা। চৌধুরী সাহেবের মিডিয়া কোঅর্ডিনেটর মোবাইল তাক করে আছে।
লাইভ শুরু হলো। চৌধুরী সাহেব ভাতের লোকমা মুখে দিয়ে ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে বললেন, আহা! এই যে মাটির সোঁদা গন্ধ, এই যে খেটে খাওয়া মানুষের ঘামের পবিত্রতা—এটাই তো আসল স্বাদ।
কমেন্ট বক্সে তখন আবেগের বন্যা। শেষ করার সময় হলো। তিনি ভাবগম্ভীর মুখে বিদায় নিলেন। কিন্তু লাইভ বাটনটা ঠিকমতো অফ করা হলো না– সেটা কেউই খেয়াল করেনি।
চৌধুরী সাহেব একটু সরে এসেই মুখ থেকে ভাতের লোকমাটা টিস্যু দিয়ে ফেলে দিলেন। মিনারেল ওয়াটার দিয়ে কুলকুচি করতে করতে বিরক্ত মুখে বললেন, আলুভর্তায় যা ঝাল দিয়েছে, মনে হচ্ছে জিভটা রিজাইন দিয়ে মুখ থেকে বেরিয়ে যাবে। আর শোনো, কুদ্দুস মিয়াকে ৫০০ টাকা দিয়ে দাও। আর বলে দিও ভোটের দিন যেন ফ্যামিলি নিয়ে যায়।
ফেসবুকের হাজার হাজার দর্শক তখন স্তব্ধ। হঠাৎ কমেন্ট বক্সে নীরবতা ভেঙে একজন লিখল, আপনার অভিনয় তো অস্কার পাওয়ার যোগ্য।
অবশেষে যখন লাইভটি বন্ধ হলো, ততক্ষণে চৌধুরী আরমান শিকদারের ‘আলুভর্তা প্রেম’ ভাইরাল।