চামড়ায় ভাঁজ পড়েছে। তার পরও মনে হয় সাল্টি কাঠের খাম। এমন শক্ত-পোক্ত শরীর মজুর। জোরে হাঁটলে মাটি কাঁপে। কিন্তু আগের মতো দপাদপ পা ফেলে জোরে হাঁটতে পারে না। বয়স তার সেই বাহাদুরি কেড়ে নিয়েছে। চলাচলের জন্য এখন তার হাতে লাঠি। লাঠির সাহায্য ছাড়া মজু এখন চলতে পারে না। মজু ডাকাত তার আসল নাম নয়। আসল নাম মজু মণ্ডল। কিন্তু সবাই ডাকে মজু ডাকাত। বয়সকালে দলবল নিয়ে দূরের গায়ে ডাকাতি করত মজু। বাধা দিলে খুন-খারাবিও করত। তবে তার বিশেষ বৈশিষ্ট্য ছিল নিজের এলাকায় কখনো সে ডাকাতি করত না। কাউকে করতেও দিত না। তার এলাকা ছিল পানির মতো ঠাণ্ডা। শান্তি আর শান্তি। কামারপাড়ার আশপাশে কয়েক গ্রামের মানুষ নিশ্চিন্তে ঘরের দরজা খুলে ঘুমাত। এলাকায় কোথাও চুরি-ডাকাতির কথা শোনা যেত না। যে কারণে এলাকার লোকজন মজু ডাকাতকে আশ্রয়-প্রশ্রয় দিত। পুলিশ কখনো মজু ডাকাতকে ধরতে পারত না। কামারপাড়া নিজ গাঁয়েই মজু ডাকাত লুকিয়ে থাকত। অথচ পুলিশ তাকে খুঁজে পেত না।
যৌবনে মজু একবার ভয়ংকর ঘটনা ঘটিয়ে ফেলে। ডাকাতি করতে গিয়ে শেলী নামের একটি যুবতী মেয়েকে তুলে নিয়ে আসে। তার পর মোল্লা ডেকে তাকে বিয়ে করে। যুবতী মেয়েটি দেখতে সুদর্শনা, শিক্ষিত। দেখেই বোঝা যায় কোনো খানদানি ঘরের মেয়ে। তার পরও স্বেচ্ছায় হাসিমুখে কবুল বলেছে। তাই দেখে গাঁয়ের লোকজন ভীষণ তাজ্জব।
অনেক পরে আসল কাহিনি জানা যায়। মেয়েটির মা মারা যাওয়ার পর ব্যবসায়ী বাবা আরেকটি বিয়ে করে। সেই নতুন মা মেয়েটিকে একদম সহ্য করতে পারত না। ঠিকমতো খেতে দিত না। কারণে-অকারণে গায়ে হাত তুলত। লেখাপড়া বন্ধ হয়ে যায় মেয়েটির। সবে কলেজে ভর্তি হয়েছিল। জোর করে একজন বয়স্ক ব্যক্তির সঙ্গে বিয়ে ঠিক করে সৎমা। শেলী রাজি ছিল না বলে তাকে মেরে ঘরে আটকিয়ে রাখে। তাকে খেতে দেওয়া হয় না। বাবা কখনো নতুন মায়ের ওপর দিয়ে কথা বলতে পারত না। বন্দি শেলী সারাক্ষণ কাঁদত। তার নীরব কান্নায় বালিশ ভিজে যেত। আত্মহত্যার কথাও ভাবত।
অনেকবার শেলী তার কষ্টের কথা বাবাকে জানিয়েছে। বাবা মেয়ের কোনো কথা কানে তোলেনি। মেয়েটি বাবার আগের ব্যবহারের সঙ্গে বর্তমান ব্যবহার মেলাতে পারে না। আগে তাকে কত আদর করত। শেলীর মনে আছে, একবার তার কঠিন জ্বর হয়েছিল। বাবা সারা রাত মেয়ের পাশে জেগে বসেছিল। নিজের হাতে মাথায় জলপট্টি করেছে। সেই বাবা কেন বদলে গেল?
শেলী যে রাতে গলায় ফাঁস নেওয়ার মনস্থির করল সেই রাতে আচমকা বাড়িতে ডাকাত হানা দেয়। বাবা বাড়ি ছিল না।
ব্যবসায়িক কাজে দেশের বাইরে ছিল। শেলীর ঘরে তালা ভেঙে ঢুকে তাকেও অন্য ভাইবোনদের সঙ্গে বন্দুকের ভয় দেখিয়ে জিম্মি করে ডাকাতরা। সৎমায়ের কাছে আলমারির চাবি চায়। চাবি দিতে গড়িমসি করলে ডাকাত সর্দার কষে চড় মারে সৎমার গালে। চড় খেয়ে সৎমা উল্টে পড়ে যায়। ছোট দুই ভাইবোন ভয়ে কান্নাকাটি শুরু করে। অন্য ডাকাতরা এসে দুই ভাইবোনের মুখ গামছা দিয়ে বাঁধে। চড় খেয়ে সৎমা উল্টে পড়ে গেলে শেলী দেখে মনে মনে ভীষণ খুশি। কেউ এই তেজী মহিলার ওপর কথা বলতে পারে না। সেই মহিলাকে উচিত শিক্ষা দিয়েছে এই ডাকাত। গাট্টাগোট্টা ডাকাত সর্দারকে শেলীর ভালো লেগে যায়। শ্যামলা গোলগাল মুখখানি বেশ মায়াভরা। মাথায় ঝাকরা চুল। টানা চোখজোড়ায় গভীর আকর্ষণ। শেলী বলে, ‘চাবি কোথায় আমি জানি।’ সে উঠে এসে শোকেসের ড্রয়ার থেকে আলমারির চাবি এনে দেয় ডাকাত সর্দারের হাতে। নিজেই দেখিয়ে দেয় কোথায় কোথায় টাকা আর গহনা আছে। নিজের গহনা দেখিয়ে বলে, ‘এগুলো আমার। এই গহনার সঙ্গে আমাকেও নিয়ে চলুন। এই দজ্জাল মহিলা আমাকে ঘরে বন্দি করে রেখেছিল। সে আমাকে ষাট বছরের এক বুড়োর সঙ্গে জোর করে বিয়ে দিচ্ছে। সে আমার আসল মা না, সৎমা।’
মজু ডাকাত অবাক হয়ে মেয়েটির দিকে তাকায়। ‘তুমি আমাদের সঙ্গে কেন যাবে?’
‘আমার ইচ্ছে। এই মহিলা আমাকে খেতে না দিয়ে বন্দি করে রাখে। আমি মুক্তি চাই।’
‘আমাদের সঙ্গে গেলে তুমি কীভাবে মুক্তি পাবে?’
‘পাব। এই গারোদ থেকে বেরোতে পারলেই আমার মুক্তি।’
মজুর বাড়িতে আপন বলতে তার নিঃসন্তান বিধবা বোন লাইলী আর আশ্রিত একজন দুস্থ মহিলা।
শেলী নামের নতুন মেয়েটিকে দেখে লাইলী রাগত মজুকে বলে, ‘তুই কি আজকাল সোনাদানার সঙ্গে সঙ্গে মেয়ে মানুষও ডাকাতি করা শুরু করছোস? দেখ মজু, নারীকে অসম্মান করবি তো তুই কইলাম ধ্বংস হয়া যাবি।’
মজু বড় বোনকে ভীষণ সমীহ করে। সে আমতা আমতা করে বলে, ‘বুবু, তুমি আমাকে খামখা দোষারূপ করতাছ। আসল কাহিনি তার মুখেই শোন।’
‘কী কাহিনি তুই বল?’
মজু এবার শেলীর কাছে যায়। বলে, ‘দেখ মেয়ে, তুমি মুক্তি চাইছিলা। তুমি মুক্তি পাইছ। এখন তুমি কোথায় যাইবা ঠিকানা কও- আমি তোমারে পৌঁছাইয়া দিই।’
শেলী জোর দিয়ে বলে, ‘আমি কোথাও যাব না। আমার যাওয়ার কোনো জায়গা নেই।’
মজুর বড় বোন লাইলী ক্ষুব্ধ কণ্ঠে বলে, ‘তুমি এখানে কীভাবে থাকবা? গ্রামে সমাজ বলে একটা কথা আছে। তোমার মতো একটা যুবতী মেয়েকে আশ্রয় দিলে গ্রামে নানাজন নানা কথা বলবে। এমনিতে মজুর ডাকাতি করা নিয়া মানুষ ওর ওপর ক্ষ্যাপা। তার ওপর তোমার মতো যুবতী মেয়েকে নিয়া নতুন কইরা ঝামেলায় জড়াইতে কও?’
শেলী দৃঢ় কণ্ঠে বলে, ‘ঝামেলার কিছু নেই। তার সঙ্গে আমার বিয়া দিয়া দেন।’
‘এই মেয়ে কী বলছ এসব? তুমি কি পাগল হয়া গেছ?’ লাইলী ধমকে ওঠে।
শেলী বলে, ‘আমি বুঝেশুনেই বলছি। আমার জীবনটা নরক হয়ে যাচ্ছিল। আমি ফাঁস দিয়া জীবন শেষ করে দিতে চেয়েছিলাম। উনি আমাকে নরক থেকে উদ্ধার করেছেন। আমি এখন বেহেশতে আছি। বুবু, আপনি দেরি না কইরা কাজি ডাকেন। আজই আমাদের বিয়ে হবে।’
‘তোমাকে দেখে মনে হচ্ছে তুমি শিক্ষিত। তুমি জেনেশুনে একজন ডাকাতকে বিয়া করবা?
‘আমাকে যে নরক থেকে উদ্ধার করেছে সে আমার কাছে ফেরেশতাতুল্য। আমি তো তাকেই বিয়ে করব।’
‘এ মেয়ে পাগল হয়া গেছে।’ লাইলী বলেই রান্নাঘরের দিকে চলে যায়। মজু এতক্ষণ চুপচাপ ছিল। সে বুঝে উঠতে পারছে না তার কী করণীয়। সে ঘরের বারান্দায় হেলান বেঞ্চে বসে শেলীকে ডেকে পাশে বসতে বলে। শেলী বসে। খুব ধীরস্থির শান্ত কণ্ঠে মজু বলে, ‘দেখ মেয়ে, তুমি ব্যাপারটা গভীরভাবে ভাবো। তোমার সামনে সুন্দর ভবিষ্যৎ। আমার মতো খুনি ডাকাতকে বিয়ে করলে তোমাকেও পদে পদে নাজেহাল হতে হবে। আমার জীবনের কোনো নিরাপত্তা নেই। যেকোনো মুহূর্তে আমার মৃত্যু হবে। কেন তুমি তোমার সুন্দর জীবনটা আমার সঙ্গে জড়ায়ে নষ্ট করতে চাইছ? কেন করতাছ এমন পাগলামী?’
শেলী জোর দিয়ে বলে, ‘আমি মোটেও পাগলামী করছি না। জীবনের ওপর আমার ঘেন্না ধরে গেছে। আমি জানি আমাকে পেলে বাবা-মা আমার জীবনটা ছিঁড়েখুঁড়ে ছিন্নভিন্ন করে দেবে। আমি তোমাকে নিয়ে নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন দেখতে চাই।’
মজু এবার চমকে ওঠে। তাকে সে তুমি করে বলছে। মজু মাথা নামিয়ে ঝিম মেরে থাকে। বলার মতো কথা খুঁজে পায় না।
খবর পেয়ে শেলীর বাবা ব্যবসার কাজ অসমাপ্ত রেখে দেশে ফিরে আসে। দ্বিতীয় স্ত্রীর মুখে বিস্তারিত শুনে সে থানায় গিয়ে ডায়েরি করে। নারী অপহরণ মামলা। খুব শক্ত মামলা। পুলিশ হন্যে হয়ে শেলীর অপহরণকারীকে খুঁজতে থাকে। পুলিশের প্রথম টার্গেট মজু ডাকাত। ডাকাতির ধরনে মজু ডাকাতের ডাকাতির নমুনা পাওয়া যায়। পলিশ তদন্তে নামে। তারা কামারপাড়া গ্রামে হানা দেয়। তার পরও সেই একই কেস। গ্রামবাসী পুলিশকে বলে মজু ডাকাত বহু আগেই গ্রাম ছেড়ে চলে গেছে। তার পরও পুলিশ মজুর বাড়িতে যায়। কিন্তু মজুকে বাড়িতে পায় না। গ্রামবাসী তাকে লুকিয়ে রেখেছে। পুলিশ ফিরে গেলে শেলীর কথাটা গ্রামে রটে যায়। আর তাতেই গ্রাম ভেঙে পড়ে মজুর বাড়িতে। গ্রামবাসী শেলীকে দেখে বিস্ময়ে হতবাক। এমন সুন্দর একটি যুবতী মেয়ে মজু ডাকাতকে বিয়ে করেছে। যার আগে একটি বউ ছিল। যাকে মজু নিজের হাতে খুন করেছে। মজুর মতো খুনি ডাকাতকে সেধে কেউ বিয়ে করবে এটা যেন তাদের কাছে অকল্পনীয়। অথচ মেয়েটি কাজি সাহেবের বিয়ে পড়ানোর সময় কোনো দ্বিধা না করে সহজভাবে কবুল বলে সবাইকে চমকে দেয়।
তার পর ধীরে ধীরে মজু ডাকাত বদলে যেতে থাকে। এ বদলের মূল কারিগর শেলী। শেলী মজুকে ডাকাতি করতে নিষেধ করে। বলে, ‘তুমি পুলিশের কাছে সারেন্ডার কর।’
মজু আপত্তি করে বলে, ‘থানায় আমার নামে হাজারটা মামলা। খুনের মামলাও আছে। বিচারে আমার ফাঁসি হবে। তখন তোমার কী হবে? তুমি কোথায় থাকবে?’
শেলী ভাবনায় পড়ে যায়। সে ভেবে চিন্তে বলে, ‘তাহলে তুমি এক কাজ কর। শুক্রবারে মসজিদে যাও। গ্রামবাসী যেহেতু তোমাকে সাহায্য করে সেই কারণে গ্রামবাসীর সামনে তওবা করে বলবে, ‘তুমি আর ডাকাতি করবে না। তুমি ভালো হয়ে গেছ। কী, পারবে না?’
মজু উচ্ছ্বাসে বলে, ‘খুব পারব।’
ঠিকই মজু শুক্রবারে মসজিদে যায়। তাকে মসজিদে দেখে মুসল্লিরা অবাক বিস্ময়ে তাকায়। নামাজ শেষে মজু বলে, ‘প্রিয় গ্রামবাসী, আমি এতদিন অনেক খারাপ কাজ করছি। তার পরও আপনারা আমাকে রক্ষা করছেন। এবার আমি তারই প্রতিদান দিতে আছি। আমি হুজুরের হাতে হাত রেখে তওবা করতে চাই, আমি আর ডাকাতি করব না। আমি ভালো হয়ে যাব।’
মজু সবার সামনে হুজুরের হাতে হাত রেখে তওবা পড়ে। তার পর হুজুর বলে, ‘আমরা মজুর কথা বিশ্বাস করেছি। কেন করেছি, মজু কথা দিয়ে কখনো কথার নড়চড় করেনি। আমরা তাকে নিবিড়ভাবে আগলে রাখব। কারণ যে ভালো হতে চায় তাকে ভালো হওয়ার সুযোগ দিতে হয়।’
আগে অনিয়মিত মসজিদে যেত মজু। এখন মসজিদই তার ঠিকানা। সন্তান হতে গিয়ে বউটা মারা গেছে। বোনটাও বেঁচে নেই। আশ্রিত যে মহিলা ছিল সেও মারা গেছে। মজু এখন একা। তাকে দেখার কেউ নেই। মন চাইলে নিজেই একবেলা রান্না করে। আরেক বেলা না খেয়ে থাকে। জীবন নিয়ে মজু ভীষণ উদাস। বেশির ভাগ সময় সে মসজিদে পড়ে থাকে।
শুক্রবারে জুমার নামাজে দাঁড়িয়েছে মজু। দুই রাকাত ফরজ নামাজ চলছে। নামাজ শেষ। মোনাজাতের প্রস্তুতি নিচ্ছে মাওলানা সাহেব। এসময় হ্যান্ডমাইকে ঘোষণা এল, ‘মজু, তুমি ধরা দাও। পুলিশ মসজিদের চারদিক ঘিরে ফেলেছে। তোমার পালাবার পথ নেই।’
সব মুসল্লি ঘাড় ঘুরিয়ে খোলা দরজা দিয়ে তাকিয়ে দেখে মসজিদের চারপাশে পুলিশ। অস্ত্র তাক করে আছে। আবার হ্যান্ডমাইকে ঘোষণা আসে, ‘মজু, আজ পালাবার চেষ্টা করলে গুলি চলবে। তাতে গ্রামবাসীও মারা যেতে পারে। অতএব...’
ঘোষণা শেষ হওয়ার আগেই মজু বাইরে আসে। পুলিশ তাকে হাত ওপরে তুলতে বলে। মজু পুলিশের নির্দেশ ফলো করে। মজুর গায়ে ছেঁড়া গেঞ্জি। মুখে দাড়ি। মাথায় টুপি। শরীরে বাঁক ধরেছে। পিঠ কুঁজো। তার পরও পুলিশ রাইফেল তাক করে আছে। মজু বলে, ‘বন্দুক নামান। আমি স্বেচ্ছায় ধরা দিতাছি।’
মসজিদের মুসল্লিরা সবাই বেরিয়ে এসেছে। মজু তাদের বলে, ‘আপনারা যান, নামাজ পড়েন। আমার পাপের শাস্তি আমাকে ভোগ করতে দেন। এ দুনিয়াটা এখন আমার কাছে বিশাল জেলখানা। আমার দম বন্ধ হয়ে আসে। সরকারের ছোট জেলখানা আমার জন্য ভালো। সেখানেই আমি ভালো থাকব।’
পুলিশের সঙ্গে মজু পৃথিবী নামক বিশাল জেলখানা থেকে ছোট জেলখানার দিকে নির্ভার রওনা হয়।