মুসলিম বিশ্বে বেগম খালেদা জিয়ার মতো উদার ও গণতন্ত্রমনা শাসক বা নেতা বিরল। বর্তমানে গণতন্ত্রের আড়ালে অনেক দেশেই উগ্রবাদের চর্চা চলছে। কিন্তু বেগম জিয়া কখনোই উগ্রবাদকে প্রশ্রয় দেননি। তিনি সারা জীবন উদার গণতন্ত্রের চর্চা করে গেছেন। তিনি ছিলেন সত্যিকারের একজন দেশপ্রেমিক জাতীয়তাবাদী নেতা।...

চব্বিশের ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের সময় মানুষ যেমন দলমত ভুলে গিয়ে একই প্ল্যাটফর্মে ঐক্যবদ্ধ হয়ে দাঁড়িয়েছিল, তারই পুনরাবৃত্তি ঘটে বেগম খালেদা জিয়ার জানাজায়। বেগম খালেদা জিয়া শুধু বাংলাদেশের রাজনীতিতে ঐক্যের প্রতীক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হননি; তিনি বিশ্বের নিপীড়িত মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতীকে পরিণত হয়েছিলেন। তার জীবন ও কর্ম আমাদের চিরদিন স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে গণমানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে অনুপ্রেরণা জোগাবে। অনমনীয় ব্যক্তিত্ব, মার্জিত ব্যবহার, প্রতিপক্ষের প্রতি উদারতা এবং সর্বোপরি সাধারণ মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠায় আপসহীন সংগ্রামের কারণে তিনি চিরদিন স্মরণীয় হয়ে থাকবেন। বেগম খালেদা জিয়া বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের আকাঙ্ক্ষার প্রতীক হয়ে উঠেছিলেন। সম্প্রতি দুষ্কৃতকারীর গুলিতে নিহত শরিফ ওসমান হাদি একবার বলেছিলেন, ‘আমি ছোটবেলা থেকেই বেগম খালেদা জিয়াকে অসম্ভব শ্রদ্ধা করি। আমি সব সময় স্বপ্ন দেখতাম বেগম খালেদা জিয়া আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছেন। বেগম খালেদা জিয়ার মাঝে আমি বাংলাদেশের প্রতিচ্ছবি দেখতে পাই। তিনি হাসলে আমি বুঝি বাংলাদেশ ভালো আছে। আবার তার মন খারাপ দেখলে বুঝতাম বাংলাদেশ ভালো নেই।’ সত্যি, বেগম খালেদা জিয়া বাংলাদেশের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতীক হয়ে উঠেছিলেন। এমন একজন জনপ্রিয় নেত্রীর অন্তিম যাত্রায় মানুষের ব্যাপক উপস্থিতি এবং আবেগ প্রমাণ করে তিনি মানুষের হৃদয়ের কতটা গভীরে স্থান করে নিয়েছিলেন। তিনি সাধারণ মানুষের কতটা আপন ছিলেন।
রাজধানীর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ে বেগম খালেদা জিয়ার জানাজায় সর্বস্তরের মানুষ যেভাবে অংশগ্রহণ করেন, তা বাংলাদেশ তো বটেই, পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল। একটি বিদেশি সংস্থার মতে, বেগম খালেদা জিয়ার জানাজায় ২৪ লাখ মানুষের সমাগম হয়েছিল। অনেকেই জানাজা স্থলে উপস্থিত হতে না পেরে দূরবর্তী স্থানে অবস্থান করেই জানাজায় শরিক হয়েছেন। অনেকেই ভবনের ছাদে উঠে জানাজায় অংশগ্রহণ করেছেন। সে এক নজিরবিহীন দৃশ্য। জানাজায় অংশ নিয়ে অনেকেই কান্নায় ভেঙে পড়েন। নির্দিষ্ট দিনে সকাল থেকেই মানুষ মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ অভিমুখে যাত্রা শুরু করেন। একজন মানুষের মৃত্যু কীভাবে পুরো জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করতে পারে, বেগম খালেদা জিয়ার জানাজা তা প্রমাণ করে দেখিয়েছে।
রাজনীতিতে আসার আগে বেগম খালেদা জিয়া ছিলেন নিতান্তই একজন গৃহবধূ। স্বামী রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রক্ষমতায় আসীন থাকাকালীন বেগম জিয়াকে সাধারণত মিডিয়ার সামনে দেখা যেত না। তিনি নিজেকে সব সময় আড়াল করে রাখতেই ভালোবাসতেন। বাংলাদেশের সৎ ও সফল রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে সেনাবাহিনীর একদল বিপথগামী সদস্যের হাতে নির্মমভাবে শাহাদতবরণ করলে উপরাষ্ট্রপতি অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি আবদুস সাত্তার রাষ্ট্রপতি হিসেবে নির্বাচিত হন। সেই সময় একটি মহল দেশের মধ্যে অস্থিতিশীলতা তৈরি করে। সেই অস্থিতিশীলতার অজুহাতে একপর্যায়ে সেনাপ্রধান এরশাদ সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করে নেন। এরপর তিনি বিএনপি এবং জিয়া পরিবারের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিলেন। ‘শত্রুর শত্রুই বন্ধু’-এই নীতিতে বিশ্বাসী আওয়ামী লীগও বিএনপির রাজনীতি ধ্বংস করার জন্য নানাভাবে চেষ্টা চালাতে থাকে। সেই সময় রাজনৈতিক অঙ্গনে বিএনপির অস্তিত্ব নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয়। নানা প্রলোভন দেখিয়ে এবং চাপ সৃষ্টির মাধ্যমে বিএনপির নেতাদের দলত্যাগে বাধ্য করা হয়। এমন এক জটিল অবস্থায় বিএনপির অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার স্বার্থে ঐক্যের প্রতীক হিসেবে বেগম খালেদা জিয়াকে রাজনীতিতে নিয়ে আসা হয়। তিনি বিএনপির রাজনীতিতে যুক্ত হয়ে দলের নেতৃত্ব গ্রহণ করার পর দলীয় সংহতি এবং শক্তি অনেকটাই বৃদ্ধি পায়। জেনারেল এরশাদ বেগম খালেদা জিয়াকেই সবচেয়ে বেশি ভয় পেতেন। কারণ চাপ সৃষ্টি অথবা প্রলোভন দেখিয়ে বেগম খালেদা জিয়াকে বশে আনা যাবে না, এটা এরশাদ খুব ভালোভাবেই জানতেন। ১৯৮৭ সালে এরশাদ পতনের আন্দোলন যখন তুঙ্গে, তখন পরবর্তী বছর (০৩-০৩-৮৮) মার্চ মাসের ৩ তারিখে চতুর্থ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের শিডিউল ঘোষণা করা হয়। বিএনপি নেতৃত্বাধীন রাজনৈতিক জোট, আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন জোট এবং জামায়াতে ইসলামী নির্বাচন অনুষ্ঠানের উদ্যোগকে প্রত্যাখ্যান করে এরশাদ পতনের সংগ্রাম জোরদার করতে থাকে। এ সময় আওয়ামী লীগ নেত্রী শেখ হাসিনা চট্টগ্রামে অনুষ্ঠিত এক সভায় ঘোষণা করেন, যারা এরশাদের অধীনে নির্বাচনে যাবে, তারা জাতীয় বেইমান। কিন্তু সবাইকে বিস্মিত করে কিছুদিন পর আওয়ামী লীগ নির্বাচনে অংশগ্রহণের ঘোষণা দেয়। জামায়াতে ইসলামীও নির্বাচন অংশগ্রহণ করে। নির্বাচন বয়কট করে বিএনপি রাজনৈতিক অঙ্গনে কার্যত একা হয়ে পড়ে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের অনেকেই ভেবেছিলেন, বিএনপির রাজনীতি হয়তো শেষ হতে যাচ্ছে। কিন্তু না, পরবর্তী সময়ে প্রমাণিত হয়েছে, বেগম খালেদা জিয়ার ‘নির্বাচন বয়কটের’ সিদ্ধান্ত ছিল অত্যন্ত যৌক্তিক ও সময়োপযোগী। সাধারণভাবে মনে করা হয়, সেদিন আওয়ামী লীগ এবং জামায়াতে ইসলামী যদি নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করে আন্দোলন অব্যাহত রাখত, তাহলে এরশাদের পতনের জন্য ১৯৯০ সাল পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হতো না। এরশাদবিরোধী দুর্বার গণ-আন্দোলনে বলিষ্ঠ নেতৃত্বদানের স্বীকৃতিস্বরূপ বেগম খালেদা জিয়াকে ‘আপসহীন নেত্রী’ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। রাজনীতির মাঠে বেগম জিয়ার গৃহীত প্রতিটি সিদ্ধান্তই সঠিক প্রমাণিত হয়েছে।
তিনিই প্রথম সরকারপ্রধান, যিনি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতাসীন হয়েছিলেন এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কাছে দায়িত্ব হস্তান্তর করেন। বেগম খালেদা জিয়া গণতন্ত্রের প্রতি ছিলেন অত্যন্ত শ্রদ্ধাশীল। তার শাসনামলে অন্তত তিনবার জরুরি অবস্থা জারির মতো পরিস্থিতির উদ্ভব হলেও তিনি তা করেননি। তিনি সব সময় চাইতেন রাজনৈতিক নেতারাই রাষ্ট্রপরিচালনা করুক।
মুসলিম বিশ্বে বেগম খালেদা জিয়ার মতো উদার ও গণতন্ত্রমনা শাসক বা নেতা বিরল। বর্তমানে গণতন্ত্রের আড়ালে অনেক দেশেই উগ্রবাদের চর্চা চলছে। কিন্তু বেগম জিয়া কখনোই উগ্রবাদকে প্রশ্রয় দেননি। তিনি সারা জীবন উদার গণতন্ত্রের চর্চা করে গেছেন। তিনি ছিলেন সত্যিকারের একজন দেশপ্রেমিক জাতীয়তাবাদী নেতা। তিনি যদি চাইতেন, তাহলে কারা নির্যাতনের পরিবর্তে বিদেশে গিয়ে সুখে দিন কাটাতে পারতেন। তাকে একাধিকবার দেশের বাইরে নির্বাসন দেওয়ার চেষ্টা করা হলেও তার চারিত্রিক দৃঢ়তার কারণে তা সম্ভব হয়নি। তিনি একবার বলেছিলেন, দেশের বাইরে আমার কোনো ঠিকানা নেই। কাজেই আমি দেশের বাইরে কোথাও যাব না। তিনি তার অঙ্গীকার রক্ষা করেছেন। সুখে-দুঃখে জাতির পাশে থেকে বেগম খালেদা জিয়া জাতির অভিভাবকে পরিণত হয়েছেন। তার প্রভাব উপেক্ষা করে ভবিষ্যতে বাংলাদেশে কারও পক্ষেই রাজনীতি করা সম্ভব হবে না।
বেগম খালেদা জিয়া কাউকে ব্যক্তিগতভাবে আঘাত দেননি। তিনি ছিলেন স্বল্পভাষী এবং কখনো কারও বিরুদ্ধে অশ্লীল বাক্য ব্যবহার করতেন না। কাউকে ব্যক্তিগতভাবে অপমানিত না করার এ শিক্ষা তিনি পরিবার থেকেই পেয়েছিলেন। জিয়া পরিবারের কেউই প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে কখনো অশ্লীল বাক্য প্রয়োগ করেন না। বিতাড়িত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বেগম খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে এমন সব অশ্লীল বাক্য প্রয়োগ করতেন, যা কোনো ভদ্রলোকের পক্ষে মুখে উচ্চারণ করা কঠিন। চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের পর তিনি প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে কোনো আক্রোশমূলক কথাবার্তা বলেননি। তিনি সামান্য উসকানি দিলে দেশের অভ্যন্তরে মারাত্মক বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হতে পারত। তিনি বরং দলীয় নেতাকর্মীদের এবং দেশবাসীকে শান্ত থাকার আহ্বান জানিয়েছেন।
আশির দশকের শেষের দিকে বেগম জিয়ার সঙ্গে আমার পরিচয় ঘটে। আমি তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির সভাপতি। বেগম খালেদা জিয়ার সঙ্গে আলোচনাকালে তার ব্যক্তিত্বে আমি মুগ্ধ হই। তিনি কথা বলতেন খুবই কম; কিন্তু অন্যের কথা অত্যন্ত ধৈর্যসহকারে শ্রবণ করতেন। কোনো কোনো সময় আমি বেগম খালেদা জিয়ার বক্তব্যের সঙ্গে দ্বিমত প্রকাশ করলে তিনি মোটেও ক্ষুব্ধ বা মনঃক্ষুণ্ন হতেন না। আমার প্রস্তাব গ্রহণযোগ্য বিবেচিত হলে তা মেনে নিতেন। আর গ্রহণযোগ্য মনে না হলে তিনি অত্যন্ত বিনয়ের সঙ্গে তা প্রত্যাখ্যান করতেন।
বেগম জিয়ার মৃত্যুর মধ্য দিয়ে দেশবাসী আবারও জাতীয়ভাবে ঐক্যবদ্ধ হয়েছে। তার আদর্শ অনুসরণ করে আমরা যদি আগামীতে বাংলাদেশকে উদার গণতান্ত্রিক এবং মানবকল্যাণমূলক রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তুলতে পারি, সেটাই হবে বেগম খালেদা জিয়ার প্রতি সর্বোত্তম সম্মান প্রদর্শন। আমি তার বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করছি।
লেখক: সাবেক উপাচার্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং বাহরাইনে নিযুক্ত বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত

