ভবিষ্যৎ সরকারকে যুবসম্প্রদায়ের চিত্রকে সামনে রেখেই অগ্রসর হতে হবে। সমগ্র জাতির আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নের মূল লক্ষ্য হলো যুবসমাজ এবং গুণগত শিক্ষাব্যবস্থা। তাপ-গতিবিদ্যার দ্বিতীয় সূত্রের সমান্তরালে বাংলাদেশের পর্যাপ্ত যুবশক্তিকে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার সুযোগ সৃষ্টির মাধ্যমে কাজে রূপান্তরিত না করতে পারলে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ Entropy-এর মধ্যে আবদ্ধ থাকবে।...

মানুষ হলো রাজনৈতিক প্রাণী। প্রতিটি মানুষের মধ্যে রাজনৈতিক চেতনা সহজাত প্রবৃত্তি হিসেবে স্বয়ংক্রিয়ভাবে কাজ করে। বিখ্যাত গ্রিক দার্শনিক অ্যারিস্টোটল এ ধ্রুব সত্যটি অত্যন্ত সুন্দরভাবে তার লেখার মধ্যদিয়ে ব্যাখ্যা করেছেন। এর মূলত দুটি কারণ রয়েছে। প্রথমত, মানুষ সামাজিক জীব। সমাজ ব্যতীত তার বেঁচে থাকাটা অসম্ভব। দ্বিতীয়ত, সমাজের ছবিকে সুন্দরভাবে সাজানোর জন্য প্রয়োজন হয় একটি নিয়মতান্ত্রিক সাংগঠনিক কাঠামো। সমাজের সর্বোচ্চ স্তরকে আমরা রাষ্ট্র হিসেবে চিহ্নিত করে থাকি। রাষ্ট্রের মূল দায়িত্ব হলো তার নাগরিকের কল্যাণ সাধন করা।
রাষ্ট্র কেবল বিমূর্ত বস্তু নয়। রাষ্ট্রের একটি জীবন আছে। মানুষের জীবনের মতো তার আয়ুষ্কাল ক্ষীণ নয়। তার দীর্ঘ জীবনের সময়কে সর্বদা সচল রাখাই হলো সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জের কাজ। কেবলমাত্র ভৌগোলিক সীমারেখা দ্বারা আবদ্ধ থাকাটাই রাষ্ট্রের একমাত্র পরিচয় নয়। পৃথিবীতে যে এত রাষ্ট্র রয়েছে, তাদের সত্যিকার অর্থে রাষ্ট্র বলা যায় কি না, সে ব্যাপারে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা রাষ্ট্রের একটি শ্রেণিবিভাজন করে থাকেন। এ বিভাজনের আবার বিভিন্ন নামকরণ রয়েছে; যেমন পতিত রাষ্ট্র (Failed State), ভঙ্গুর রাষ্ট্র (Fragile State), উন্নত রাষ্ট্র এবং উন্নয়নশীল রাষ্ট্র। একটু সূক্ষ্মভাবে পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে যে, এসব নামকরণের পেছনে যে সূচকটি রয়েছে সেটি হলো মানবউন্নয়ন (Human Development Index-HDI)। নাগরিকের জীবনমানের উন্নতি না ঘটলে সেই রাষ্ট্রের বেঁচে থাকার কোনো মূল্য নেই। এ কাজটি সম্পাদনের পেছনে মানুষের অর্থনৈতিক স্বাবলম্বীতার যে প্রয়োজনীয়তা রয়েছে তার চেয়েও অধিক গুরুত্বপূর্ণ হলো জাতীয় রাজনীতিতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা।
পৃথিবীতে অনেক ছোট রাষ্ট্র রয়েছে, যেমন নরওয়ে, সুইডেন, ডেনমার্ক, সিঙ্গাপুর, হংকং, তাইওয়ান যাদের মানবউন্নয়নের অবস্থান সূচকে সবচেয়ে ওপরে। অথচ আফগানিস্তান এবং কঙ্গোর মতো আফ্রিকার অধিকাংশ রাষ্ট্রের অবস্থান ভঙ্গুর কিংবা পতিত রাষ্ট্রের পর্যায়ে রয়েছে। যদিও পতিত রাষ্ট্রের সংজ্ঞাটি এখন আর বিশেষ ব্যবহার করা হয় না, তথাপি মধ্যপ্রাচ্যের ইরাক, লিবিয়া, সিরিয়ার মতো দেশগুলোকে পতিত রাষ্ট্রের তালিকায় চিহ্নিত করলে খুব একটা ভুল হবে বলে মনে করার কারণ নেই। এসব রাষ্ট্রের এক অদ্ভুত অনভিপ্রেত অবয়ব রয়েছে। এ রাষ্ট্রগুলোর সমাজের একটি অত্যন্ত ক্ষুদ্র গোষ্ঠী রয়েছে, যারা মারাত্মকভাবে ধনী এবং তাদের আর্থ-সাংস্কৃতিক সম্পর্ক পশ্চিমের উন্নত দেশগুলোর সঙ্গে। নব্য উপনিবেশবাদের যুগে এ রাষ্ট্রগুলো প্রাক-আধুনিক যুগের উপজাতীয় রাষ্ট্রের (Tribal State) কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। এর ফলে যে ক্ষতিটা হয় তা হলো, রাষ্ট্র তার সমন্বয়বাদী জৈবিক সমাজ গঠনে বিফল হয়। এ ঘটনাটি অনেকটা তাপ-গতিবিদ্যার দ্বিতীয় সূত্রের মতো, যাকে সহজ ভাষায় পদার্থবিদরা Entropy বলে থাকেন।
এনট্রপি মানে বিশৃঙ্খলা। পদার্থবিদরা বলে থাকেন, যেকোনো ভৌত ব্যবস্থায় পর্যাপ্ত শক্তি (Energy) থাকতে পারে কিন্তু তাকে কাজে (Work) রূপান্তরিত করার ক্ষমতা (Power) না থাকলে, সেই ভৌত ব্যবস্থায় বিশৃঙ্খলা (Disorder) সৃষ্টি হওয়া স্বাভাবিক। ভৌত ব্যবস্থার এ পর্যবেক্ষণ যোগ্য বিষয়টিকে রাষ্ট্রের জৈবিক অস্তিত্বের সঙ্গে তুলনা করা যেতে পারে।
বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক পরিবেশের অবস্থাটাও সেরকম। এখানে প্রচুর সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও এখন পর্যন্ত আমরা রাষ্ট্রের জন্য এক টেকসই সার্বিক কাঠামো গড়ে তুলতে পারিনি। এর মূল কারণ পরিকল্পনার জন্য যে মেধা এবং সংহত দক্ষতার প্রয়োজন হয় সেটার অত্যন্ত অভাব রয়েছে সরকার পরিচালনার কর্মপদ্ধতিতে। উন্নয়নের মূল টার্গেটটি চিহ্নিত করে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণে আমরা অসফল হয়েছি, যার প্রথমে রয়েছে দুর্নীতি। এ কারণেই গত সরকারের সময় উন্নয়নের ডামাডোল বাজানো সত্ত্বেও বাংলাদেশের অবস্থান ভঙ্গুর রাষ্ট্র হিসেবে অত্যন্ত হতাশাজনক। এখন কিছুটা সন্তোষজনক বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ থাকলেও বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অবস্থাকে মোটেই সুস্থ বলা যাবে না।
অর্থনৈতিক সুস্থতা নির্ভর করে রাষ্ট্রের সাধারণ মানুষের আর্থ-সামাজিক অবস্থানের ওপর। প্রায় দেড় বছরের ওপর হতে চলল বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার প্রশাসন পরিচালনা করে আসছেন। এই অল্প সময়ের মধ্যে সরকারের কাছে অতিরিক্ত কিছু আশা করা বাঞ্ছনীয় ছিল না। এ কাজটি পরবর্তী নির্বাচিত সরকারের জন্য চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দেবে। তবে সে চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার জন্য সবচেয়ে প্রয়োজনীয় কাজ হলো বাস্তবভিত্তিক (Reality Based) অর্থনৈতিক কৌশলপত্র প্রণোয়ন। জনকল্যাণমূলক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার মূলে রয়েছে মাইক্রো অর্থনীতির প্রতি মনোযোগ দেওয়া।
বাংলাদেশের বেকারত্বের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। ২০২৫ সালে প্রায় ২০ লাখ যুবক বেকার ছিল এবং এ সংখ্যা ভবিষ্যতে আরও বাড়বে বলে অর্থনীতিবিদরা পূর্বাভাস দিচ্ছেন। অর্থনীতিবিদরা বেকারত্বের যে কারণগুলো দেখিয়েছেন তার অন্যতম হলো রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা এবং সৃজনশীল কর্মসৃষ্টিতে মেধার অভাব। দেখা যায় যে, শিক্ষা এবং শিল্প খাতের চাহিদার মধ্যে এত পার্থক্য যে, গ্র্যাজুয়েশন করার পরও একজন যুবকের চাকরির বাজারে কোনো প্রয়োজনীয়তা দেখা যায় না। দুঃখজনক হলো যে, বর্তমানে প্রায় ৪০ শতাংশ যুবক আংশিক বেকারত্বের (Under-Employed) কাজে নিয়োজিত রয়েছে। যোগ্যতার চেয়ে কম কাজে নিয়োজিত থাকায় মেধার ক্ষতি হয়, তা রাষ্ট্রের সামগ্রিক দক্ষতাকে (Aggregate Competence) মারাত্মকভাবে ক্ষতি করে।
বাংলাদেশের জনসংখ্যা প্রায় ১৭ কোটি। অথচ মোট ডাক্তারের সংখ্যা ১ লাখ ৩৪ হাজার; প্রায় ১ হাজার মানুষের জন্য রয়েছে মাত্র শূন্য দশমিক ৬ থেকে শূন্য দশমিক ৭ জন ডাক্তার। তূলনামূলকভাবে কিউবার জনসংখ্যা প্রায় ২ কোটি। সেখানে ডাক্তারের সংখ্যা ১ লাখ; প্রতি ১ হাজার মানুষের জন্য রয়েছে ৯ থেকে ১০ জন ডাক্তার। কিউবার প্রায় ২৪ হাজার ডাক্তার বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মিশনে বিদেশে স্বাস্থ্যসেবায় মানবজাতির কল্যাণে নিয়োজিত রয়েছেন। সবচেয়ে লক্ষ্যণীয় তথ্য হলো, ১৯৫৯ সালে কিউবায় ডাক্তারের সংখ্যা ছিল মাত্র ৩ হাজার। স্বাস্থ্য যে একটি জাতীর সবচেয়ে বড় সম্পদ এ বিশ্বাস কিউবার রাজনৈতিক নেতাদের চেতনায় জনকল্যাণমূলক অর্থনীতির পুরোধা হিসেবে প্রতিভাত হয়েছিল সেটা থেকে বাংলাদেশের রাজনীতিবিদদের শিক্ষণীয় অনেক কিছু আছে।
কর্মসংস্থান এবং শিক্ষার মধ্যে এক অর্থনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে। যে শিক্ষা কর্মসংস্থানের সুযোগকে প্রসারিত করতে ব্যর্থ হয়, সেই শিক্ষা হতাশা সৃষ্টি করতে বাধ্য। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে অনেক বিষয় নিয়ে পড়াশোনা করানো হয়, যার আদৌ কোনো প্রায়োগিক প্রভাব বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে রয়েছে কি না, সেদিকে মনোযোগী হওয়া প্রয়োজন। বিখ্যাত অর্থনীতিবিদ জন মেইনর্ড কেইনসের এক বিখ্যাত উক্তি রয়েছে যে, কোনো রাষ্ট্র যদি তার অর্থনীতিকে ‘পূর্ণ কর্মসংস্থান’ (Full Employment) পর্যায়ে উন্নীত করতে চায়, তাহলে সে রাষ্ট্রকে বাজারে তার সামগ্রিক চাহিদা (Aggregate Demand) বৃদ্ধি করতে হবে। চাহিদা মানুষের আকাঙ্ক্ষা দ্বারা তাড়িত হয়ে থাকে। এ কারণেই বাংলাদেশের সামাজিক প্রেক্ষাপট বিবেচনা করলে দেখা যাবে যে, বহু দেশের মতো, যেমন চীন ও ভারত, যেখানে জনসংখ্যার আধিক্য রয়েছে, তাদের মতো বাংলাদেশে প্রযুক্তিগত শিক্ষার ওপর বিশেষভাবে জোর দেওয়া উচিত।
বাংলাদেশেও উপযুক্ত শিক্ষার প্রয়োগ জাতীয় উন্নয়নের ক্ষেত্রে অবদান রেখেছে, যেমন আমাদের কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো। অনুরূপ, স্বাস্থ্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর সরকার মনোযোগ দিলে জাতীয় স্বাস্থ্যনীতি প্রণোয়নে উন্নত চিকিৎসার্থে বিদেশে গমনের কোনো প্রয়োজন পড়বে না। শিক্ষাই জাতির মেরুদণ্ড- এ প্রবাদবাক্যটি এখন পর্যন্ত বাংলাদেশের ক্ষেত্রে পুরোপুরি প্রতিফলিত হয়নি।
যেকোনো সরকারের জন্য ভবিষ্যতে রাষ্ট্র পরিচালনা অত্যন্ত বিরাট চ্যালেঞ্জের বিষয় হবে। যারা ‘বাংলাদেশ একটি দরিদ্র রাষ্ট্র’ এ ধারণা পোষণ করেন, তারা একটা ভ্রান্ত মানসিক মনোবৃত্তি দ্বারা প্রভাবিত হয়ে থাকেন। প্রায় ১৭ কোটি মানুষের এ দেশ, বাংলাদেশ। পরিসংখ্যান বলে ২৮ শতাংশ মানুষের বয়স শূন্য থেকে ১৪ বছর এবং ৬৬ শতাংশ মানুষের বয়স ১৫ থেকে ৬৪ বছরে মধ্যে। সবচেয়ে প্রণিধানযোগ্য তথ্য হলো যে, বাংলাদেশের জনসংখ্যার মধ্যম বয়স (Median Age) হলো মাত্র ২৬ বছর। রাজনৈতিক সংগঠনগুলো, যুব সম্প্রদায়কে আত্মঘাতী কর্মকাণ্ডে জড়িত না করে সামগ্রিকভাবে শিক্ষার প্রতি মনোযোগী করলে, বাজার অর্থনীতির চাহিদা পূরণে কৌশল প্রণয়নের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থা গ্রহণের ফলে আগামী পৃথিবীর উন্নত দেশগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশ পাল্লা দিয়ে উঠতে পারবে। যে রাষ্ট্রের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ লোক (১৫-৬৪ বছর) কর্মক্ষম, সেই রাষ্ট্রের সম্ভাব্য অর্থনৈতিক সুযোগ (Economic Advantage) বলার অপেক্ষা রাখে না।
কিন্তু অদ্যবধি রাষ্ট্র এ কাজটি নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করতে বহুলাংশে ব্যর্থ হয়েছে। আমরা লক্ষ্য করেছি কেবলমাত্র স্বাস্থ্য এবং কৃষি ক্ষেত্রে বিপ্লব ঘটিয়ে কীভাবে আশাব্যঞ্জক কর্মসংস্থানের সৃষ্টি করা যায়। পরিশেষে বলতে হবে যে, ভবিষ্যৎ সরকারকে যুবসম্প্রদায়ের চিত্রকে সামনে রেখেই অগ্রসর হতে হবে। সমগ্র জাতির আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নের মূল লক্ষ্য হলো যুবসমাজ এবং গুণগত শিক্ষাব্যবস্থা। তাপ-গতিবিদ্যার দ্বিতীয় সূত্রের সমান্তরালে বাংলাদেশের পর্যাপ্ত যুবশক্তিকে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার সুযোগ সৃষ্টির মাধ্যমে কাজে রূপান্তরিত না করতে পারলে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ Entropy-এর মধ্যে আবদ্ধ থাকবে।
লেখক: ডিস্টিংগুইস্ড এক্সপার্ট, অ্যাভিয়েশেন অ্যান্ড অ্যারোস্পেস বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ এবং সাবেক রাষ্ট্রদূত
