আওয়ামী লীগের পনেরো বছরের অপশাসন ও ড. মুহাম্মদ ইউনূসর অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছরের অগোছালো রাষ্ট্র পরিচালনা বাংলাদেশকে সামাজিক-অর্থনৈতিক দিক থেকে অত্যন্ত ভঙ্গুর অবস্থানে নিয়ে গেছে। এ দুর্বলতা কাটিয়ে বাংলাদেশকে পুনরায় সবলতার ধারায় ফিরিয়ে আনার দুরূহ কাজটি সম্পন্ন করার গুরুদায়িত্ব অর্পিত হয়েছে তারেক রহমানের ওপর। তিনি যদি তা সুচারু রূপে সম্পন্ন করতে পারেন, তাহলে বাবা জিয়াউর রহমান ও মা খালেদা জিয়ার মতো সফল সরকারপ্রধানের অভিধায় অভিষিক্ত হবেন।...
জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের রাষ্ট্রক্ষমতার পাদপ্রদীপের আলোয় এসেছিলেন এক জটিল সময়ে। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকাণ্ড, ৩ নভেম্বর ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফের ব্যর্থ সামরিক অভ্যুত্থান এবং তার বিপরীতে ৭ নভেম্বরে পাল্টা অভ্যুত্থানে সিপাহি-জনতার বিপ্লব, সব মিলিয়ে দেশে বিরাজ করছিল এক অরাজক পরিস্থিতি। সে পরিস্থিতিতে ৭ নভেম্বরের অভ্যুত্থানের মধ্যদিয়েই বাংলাদেশের রাষ্ট্রক্ষমতার দৃশ্যপটে জিয়াউর রহমানের অভিষেক। সে সময়ে তার সামনে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল সেই অরাজক পরিস্থিতির অবসান ঘটিয়ে দেশে শান্তি প্রতিষ্ঠা এবং উদ্ভূত পরিস্থিতিতে জনমনে যে ভীতির জন্ম হয়েছিল তা দূর করা। সেই কঠিন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় জিয়াউর রহমান সফল হয়েছিলেন। সে সময় সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল বিশৃঙ্খল সেনাবাহিনীকে ঐক্যবদ্ধ ও সুশৃঙ্খল করা। জিয়াউর রহমান তার ধীরস্থির চিন্তাভাবনা ও কঠোরতার মাধ্যমে অল্পদিনেই সেনাবাহিনীতে চেইন অব কমান্ড ফিরিয়ে আনতে পেরেছিলেন। একই সঙ্গে তিনি দেশে বিরাজমান অরাজক পরিস্থিতিকেও কঠোর হাতে নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হয়েছিলেন। আর এ নিয়ন্ত্রণ তাকে পরবর্তী সময়ে রাষ্ট্র পরিচালনায় সামনে এগিয়ে যাওয়ার পথ করে দিয়েছিল।
আজ তারই ছেলে তারেক রহমান যখন দেশের দায়িত্বভার গ্রহণ করছেন তখন পরিস্থিতি ১৯৭৫ সালের অনুরূপ না হলেও বিশৃঙ্খলা সর্বত্র বিরাজমান। তারেক রহমানের একটি সুবিধা হচ্ছে, তিনি একটি সুসংগঠিত ও সুশৃঙ্খল সেনাবাহিনী পাচ্ছেন। ফলে রাষ্ট্রের এই গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গটির ব্যাপারে তার বাড়তি সময় ব্যয় করার প্রয়োজন পড়বে না। তবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী পুলিশ যেরকম এলোমেলো অবস্থায় রয়েছে, তাকে সুশৃঙ্খল ও গতিশীল করতে কিছুটা বেগ পেতে হতে পারে। এজন্য তারেক রহমানের সরকারের প্রধান কাজ হবে জনগণের মনে আস্থা সৃষ্টি করা। সেজন্য পুলিশ বাহিনীকে নৈতিক শক্তিতে বলীয়ান করার পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর দেশের অনেক থানায় কোনো পুলিশ ছিল না। কোনো কোনো থানায় থাকলেও তারা ছিল নিষ্ক্রিয়। এ সুযোগে উচ্ছৃঙ্খল জনতা ও দুষ্কৃতকারীরা তাদের অপকর্ম নির্বিঘ্নে করতে পেরেছে। সে অবস্থার পরিবর্তন ঘটাতে একজন প্রজ্ঞাবান ও দৃঢ়তাসম্পন্ন ব্যক্তির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পদে আসা প্রয়োজন।
জিয়াউর রহমান তার নেতৃত্বাধীন সেনাবাহিনীতে সর্বপ্রথম চেইন অব কামান্ড প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তার পর একে একে হাত দিয়েছিলেন রাষ্ট্রের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গে। তারেক রহমানের নেতৃত্বে সেনাবাহিনী না থাকলেও আছে তার দলের সুবিশাল কর্মিবাহিনী। এ কর্মিবাহিনীকে নিয়ন্ত্রণে রাখাই হবে তার জন্য সবচেয়ে কঠিন কাজ। কেননা, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর বিএনপির কর্মিবাহিনী, বিশেষ করে ছাত্রদল, যুবদল ও স্বেচ্ছাসেবক দলের কতিপয় নেতাকর্মী চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, দখল, থানা থেকে আসামি ছিনতাই ইত্যাদি অপরাধমূক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েছিল। এসব অপকর্মের অভিযোগ দলীয় প্রধান তারেক রহমানও অস্বীকার করেননি। বরং এক বক্তৃতায় তিনি অভিযোগ স্বীকার করে নিয়ে দল থেকে ওইসব অপরাধী কর্মীদের বহিষ্কারের কথা উল্লেখ করেছিলেন। সংখ্যাটি ছিল প্রায় ৮ হাজার। জিয়াউর রহমান সেনাবাহিনীতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে এনেছিলেন কঠোর নিয়মানুবর্তিতা অনুশীলনের মাধ্যমে। অনিয়ম-বিশৃঙ্খলাকে কখনোই প্রশ্রয় দেননি, মার্জনাও করেননি। আইন ও নিয়মশৃঙ্খলার বিষয়ে তার কঠোর অবস্থানের কথা সংশ্লিষ্টরা ছিলেন সম্যক অবগত। তারা জানতেন নিয়মের ব্যত্যয় ঘটলে জিয়াউর রহমান কাউকে ক্ষমা করবেন না। তাই সবাই তটস্থ থাকত শাস্তির ভয়ে।
রাজনীতিতে এসেও জিয়াউর রহমান সততার প্রতি তার বিশ্বস্ততা অব্যাহত রেখেছিলেন। তিনি নিজে যেমন সৎ ছিলেন, তার দলের নেতা-কর্মী এবং কেবিনেট সদস্যদের মধ্যে কেউ দুর্নীতি করলে তাদের ছাড় দেননি। দুর্নীতি-অনিয়মের জন্য একাধিক মন্ত্রীকে বরখাস্ত করেছিলেন তিনি। দলীয় নেতা-কর্মীদের বেলায়ও তাই করেছেন। একটি ঘটনা এখানে প্রাসঙ্গিক হিসেবেই উল্লেখ করছি। ১৯৮০ সালে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের একটি দেশে সফরসঙ্গী হিসেবে গিয়েছিলেন জাতীয়তাবাদী যুবদলের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য খোরশেদ আলম। আসার সময় তিনি সে সময়ে বাংলাদেশে অপরিচিত পণ্য একটি ভিসিআর এনেছিলেন; যার শুল্ক ছিল প্রায় পঁচাত্তর হাজার টাকা। খোরশেদ আলম রাষ্ট্রপতির সফরসঙ্গী হওয়ার প্রভাব খাটিয়ে বিনাশুল্কে তা নিয়ে এসেছিলেন। এ ঘটনাটি পত্রিকায় প্রকাশিত হলে প্রেসিডেন্ট জিয়ার গোচরে আসে। সেদিন তিনি ছিলেন যাশোরে রাষ্ট্রীয় কর্মসূচিতে। সেখান থেকেই নির্দেশ দিয়ে খোরশেদ আলমকে দল থেকে চিরতরে বহিষ্কার করেছিলেন। বলা নিষ্প্রয়োজন, খোরশেদ আলম আর কখনোই বিএনপিতে তার সদস্যপদ ফিরে পাননি। ঘটনাটি উল্লেখ করলাম এজন্য যে, কমান্ডারকে হতে হয় কঠোর মনোভাবের। অপরাধী সৈনিককে আজ লঘু শাস্তি দিয়ে কাল ক্ষমা করলে সে বাহিনীতে চেইন অব কমান্ড কখনোই প্রতিষ্ঠিত হয় না।
নির্বাচনে বিজয়ী হওয়ার পর গত ১৪ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর একটি পাঁচ তারকা হোটেলে জনাকীর্ণ এক সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য রেখেছেন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান। সেখানে প্রারম্ভিক বক্তব্য ও প্রশ্নোত্তর পর্বে তিনি যেসব কথা বলেছেন, তা দেশবাসীকে আশান্বিত করেছে নিঃসন্দেহে। তিনি বলেছেন, ‘ধর্ম বর্ণ, কিংবা ভিন্নমত যা-ই হোক, কোনো অজুহাতেই দুর্বলের ওপর সবলের আক্রমণ মেনে নেওয়া হবে না।’ তিনি বলেছেন, ‘আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় সরকারি দল কিংবা বিরোধী দল, অন্যমত কিংবা ভিন্নমত, প্রতিটি নাগরিকের জন্যই আইন সমান। আইনের প্রয়োগ হবে বিধিবদ্ধ নিয়মে।’ (খবরের কাগজ, ১৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬)। তারেক রহমানের এ বক্তব্য অবশ্যই সাধুবাদযোগ্য। দুর্বলের ওপর সবলের আক্রমণ বা অত্যাচর আমাদের সমাজে প্রতিনিয়তই ঘটে থাকে। সবচেয়ে মর্মান্তিক বিষয় হলো, দুর্বল কোথাও ন্যায়বিচার পায় না। থানায় গেলে সবলরা তাদের প্রভাব প্রতিপত্তি দিয়ে দুর্বলের প্রতিকার পাওয়ার পথে আটকে দেয়। আর অর্থনৈতিক কারণে দুর্বলরা আদালতের শরণাপন্ন হতে পারে না, হলেও বিচারের দীর্ঘ সূত্রতায় তারা একসময় হতোদ্যম হয়ে সে পথ ত্যাগ করে। তারেক রহমান কোনো রকমের অন্যায় কিংবা বেআইনি কর্মকাণ্ড বরদাশত করা হবে না বলেও উল্লেখ করেছেন। এটা তার বা তার সরকারের জন্য এক বিরাট চ্যালেঞ্জ। চব্বিশের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে মহামারির মতো যে ‘মব সন্ত্রাসের’ প্রাদুর্ভাব ঘটেছে, তা থেকে জাতিকে মুক্তি দেওয়া হবে নতুন সরকারের অন্যতম একটি কাজ। কেবলমাত্র আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমেই এ নব্য সন্ত্রাস থেকে মুক্তিলাভ সম্ভব।
আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর জুলাই আন্দোলনে সম্পৃক্ত একটি বিশেষ গোষ্ঠী আমাদের স্বাধীনতার ইতিহাসকে বিকৃত করতে উদ্ধত হয়েছিল। স্বাধীনতাযুদ্ধের ঘোষক জিয়াউর রহমানের উত্তরসূরি তারেক রহমানকে অবশ্যই সে অপচেষ্টা নস্যাৎ করে দিতে হবে। কেননা, একাত্তরে আমাদের জাতীয় অস্তিত্বের শিকড় প্রোথিত। তাকে উপড়ে ফেললে আমরা হয়ে পড়ব অস্তিত্বহীন। শহীদ জিয়াউর রহমান জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করার লক্ষ্যে একাত্তরের স্বাধীনতাবিরোধীদের দেশে রাজনীতি করার সুযোগ দিয়েছিলেন। তার মানে এই নয় যে, আজ স্বাধীনতার ৫৫ বছর পরে তাদের উত্তরসূরিরা আমাদের স্বাধীনতাকেই অস্বীকার করবে। এ দেশের মানুষ রাজনৈতিক প্রশ্নে শতধাবিভক্ত থাকলেও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ও স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে তারা সবসময় ঐক্যবদ্ধ থেকেছে এবং ভবিষ্যতেও থাকবে। আগামী দিনে সে ঐক্যে নেতৃত্ব দিতে হবে তারেক রহমানকেই।
এ নিবন্ধটি প্রকাশিত হওয়ার আগেই হয়তো তারেক রহমানের নেতৃত্বে নতুন মন্ত্রিপরিষদ গঠিত হয়ে যাবে। গত ১৫ ফেব্রুয়ারি দৈনিক খবরের কাগজ সম্ভাব্য মন্ত্রীদের একটি তালিকা প্রকাশ করেছে। তাতে নতুন ও পুরোনো অনেকের নামই রয়েছে। সচেতন ব্যক্তিরা মনে করেন, যে সমস্যা-সংকুল পরিস্থিতিতে তারেক রহমান সরকারের দায়িত্ব নিতে যাচ্ছেন, তাতে তার কেবিনেটে সৎ ও অবিতর্কিত ব্যক্তিদের ঠাঁই পাওয়া বাঞ্ছনীয়। কেননা, আওয়ামী লীগের পনেরো বছরের অপশাসন ও ড. মুহাম্মদ ইউনূসর অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছরের অগোছালো রাষ্ট্র পরিচালনা বাংলাদেশকে সামাজিক-অর্থনৈতিক দিক থেকে অত্যন্ত ভঙ্গুর অবস্থানে নিয়ে গেছে। এ দুর্বলতা কাটিয়ে বাংলাদেশকে পুনরায় সবলতার ধারায় ফিরিয়ে আনার দুরূহ কাজটি সম্পন্ন করার গুরুদায়িত্ব অর্পিত হয়েছে তারেক রহমানের ওপর। তিনি যদি তা সুচারু রূপে সম্পন্ন করতে পারেন, তাহলে বাবা জিয়াউর রহমান ও মা খালেদা জিয়ার মতো সফল সরকারপ্রধানের অভিধায় অভিষিক্ত হবেন।
লেখক: সাংবাদিক ও কলামিষ্ট

