শুরু হলো রুদ্ধশ্বাস নাটকীয়তা। বিএনপি যদি শপথ না নেয় তা হলে কি হবে? বিএনপির পক্ষ থেকে জানানো হলো, গণভোটের রায় অনুসারে জনগণের ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটাতে হলে আগে সংসদে যেতে হবে। সংসদে প্রয়োজনীয় আইন ও সংবিধান সংশোধন করতে হবে।...

উত্তেজনাপূর্ণ খবরে ঠাসা পত্রিকাগুলোর পাতা। কিন্তু খবরের কাগজেই কি সব খবর থাকে? খবরের ভিতরে খবর থাকে, খবর হয়ে উঠতে পারেনি এমন অনেক ঘটনা থাকে যা শুধু বর্তমানের মধ্যে যারা থাকে তারা কিছুটা জানে। ১১ ফেব্রুয়ারি বিকেল থেকে ১৭ ফেব্রুয়ারি বিকেল পর্যন্ত কত ঘটনা যে ঘটেছে তা কি সব পত্রিকায় ঠাঁই পেয়েছে? পত্রিকায় যখন কেউ পড়ছেন, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিপুল বিজয় পেয়েছে, সংসদ সদস্যরা শপথ নিয়েছেন, সরকার গঠন করেছেন, ৫০ সদস্যের মন্ত্রিসভা গঠন করেছে বিএনপি। এটুকু পড়লে মনে হবে কত না শান্তিপূর্ণ ছিল এই অন্তর্বর্তী সরকার থেকে নির্বাচিত সরকারে উত্তরণ। কিন্তু সত্য কল্পনার চেয়েও রোমাঞ্চকর এবারের নির্বাচনে সেটা আবার সত্য হলো। নানা সংশয়ের নির্বাচনে বিজয়ী বিএনপির নবগঠিত মন্ত্রিসভা ৫০ জনের। এদের মধ্যে ২৫ জন মন্ত্রী ও ২৪ জন প্রতিমন্ত্রী এবংটেকনোক্রেট মন্ত্রী তিনজন। এই মন্ত্রিসভার অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো এখানে নতুন মুখ আছে অনেক, যারা আগে কখনো মন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রী হননি। প্রথমবার নির্বাচিত হয়েই মন্ত্রিসভায় জায়গা করে নেওয়া নেতার সংখ্যাও কম নয়। মন্ত্রীদের ২৫ জনের মধ্যে ১৬ জনই নতুন মুখ। প্রতিমন্ত্রীর মধ্যে ২৪ জনই নতুন। এমনকি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও এবারই প্রথম মন্ত্রিসভার সদস্য হয়েছেন।
এবারের নির্বাচন ছিল বহুল আকাঙ্ক্ষিত আর ভীষণ অনিশ্চয়তায় ভরা। নির্বাচন হবে কিনা এই দোলাচলে ভুগেছে মানুষ শেষ পর্যন্ত। এ যেন বিশ্বকাপের টানটান উত্তেজনায় ভরা খেলা। যেখানে রেফারিকে নিয়ে সন্দেহ, আয়োজকদের নিয়ে সংশয় আর খেলোয়াড়দের মধ্যে মারমার কাটকাট অবস্থা। মানুষকে কতভাবে পক্ষে আনা যায় তার চেষ্টা নির্বাচনে সবসময়ই থাকে। কিন্তু টাকা আর ধর্মের ব্যবহার এবার হয়েছে অনেক বেশি। তাই শেষ বাঁশি বাজার পরও খেলার ফলাফল নিয়ে অনিশ্চয়তা যেমন স্নায়ুক্ষরা উত্তেজনা তৈরি করে এবারের সংসদ নির্বাচন তার চেয়ে কম কিছু নয়।
নির্বাচনে কয়েকটি বিষয় উল্লেখযোগ্য। নির্বাচন অতীতের নির্বাচনগুলোর চাইতে শান্তিপূর্ণ হয়েছে, কিছু আসনে ভোট গণনা এবং ফলাফল ঘোষণা নিয়ে উত্তেজনা সৃষ্টি হলেও নির্বাচনের ফলকে প্রত্যাখ্যান করার মতো ঘটনা ঘটেনি। ৩০টি আসনের ফল নিয়ে অভিযোগ করলেও নির্বাচনের ফলকে কার্যত মেনেই নিয়েছে বিরোধী দলগুলো। এর মধ্যেই নির্বাচিত দলের প্রধান বিরোধী দলগুলোর নেতাদের বাড়িতে সৌজন্য সাক্ষাৎ করতে গেলে তা রাজনৈতিক সৌজন্য বলে প্রশংসিত হয়েছে। রাজনৈতিক বিরোধিতা যেন প্রতিহিংসায় পরিণত না হয় এটা দেশের মানুষের অন্যতম চাওয়া। ফলে উত্তেজনার আগুনে ঘি ঢালার অনেকেই থাকলেও বিজয়ী দলের নেতৃত্বের ভূমিকা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রেখেছে।
সংকট দেখা দিল জুলাই সনদ বাস্তবায়ন নিয়ে। এমনিতেই হ্যাঁ না ভোটের প্রশ্ন নিয়ে বিতর্ক ছিল তারপর ঐকমত্য কমিশনের পক্ষ থেকে বলা হলো এই সংসদ একই সঙ্গে সংবিধান সংস্কার পরিষদ হিসেবে কাজ করবে। ফলে আবার জটিলতা দেখা দিল। প্রশ্ন এল নির্বাচন তো ছিল জাতীয় সংসদ নির্বাচন। সংবিধান মেনেই এটা গঠিত হবে, কাজ করবে। সংসদ সদস্যদের শপথ পাঠ করানোর আইনি বিধান আছে। কিন্তু সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ বাক্য কে পাঠ করাবেন? ফলে বিজয়ী দল যাদের এমন পরিমাণ সংসদ সদস্য আছে যে তারা সংবিধান সংশোধন করার ক্ষমতা রাখে তাদের পক্ষ থেকে প্রশ্ন তোলা হলো, তারা তো সংবিধান অনুযায়ী সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন কি? তাদের মুখপাত্র বললেন, আমরা কেউ সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হইনি এবং সংবিধানে এটা এখনো ধারণ করা হয়নি। গণভোটের রায় অনুযায়ী, সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠিত হলে সেটা সংবিধানে আগে ধারণ করতে হবে এবং সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্যকে কে শপথ নেওয়াবেন, সেটা বিধান করতে হবে।’ তারা আরও বললেন, সাংবিধানিকভাবে জাতীয় সংসদে গৃহীত হওয়ার পরে তখন জাতীয় সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্যদের শপথ নেওয়ার বিধান করা যাবে। আমরা এখন সাংবিধানিকভাবে এই পর্যন্ত আমরা এসেছি। আমরা সংবিধান মেনে এ পর্যন্ত চলছি এবং আশা করি সামনের দিনেও চলব।’ তারা জানিয়ে দিলেন, গণভোটের রায় অনুযায়ী সংবিধান সংস্কার হলে, সংবিধানের তৃতীয় তফসিলে সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্যদের শপথের ফরম যুক্ত হলে, কে এই শপথ পড়াবেন তা নির্ধারিত হলে, তখন সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেওয়া যাবে।
শুরু হলো রুদ্ধশ্বাস নাটকীয়তা। বিএনপি যদি শপথ না নেয় তা হলে কি হবে? বিএনপির পক্ষ থেকে জানানো হলো, গণভোটের রায় অনুসারে জনগণের ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটাতে হলে আগে সংসদে যেতে হবে। সংসদে প্রয়োজনীয় আইন ও সংবিধান সংশোধন করতে হবে। কারণ বিদ্যমান সংবিধান অনুযায়ী, সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ পড়ানোর এখতিয়ার সিইসির নেই। তারা আর একটি চমকপ্রদ তথ্য দিলেন, সিইসি তাদের সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ পাঠ করানোর জন্য ‘অ্যাপ্রোচ’ করেননি। ফলে এটা চূড়ান্ত হয়ে গেল যে বিএনপি সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নিচ্ছে না।
আমাদের রাজনীতি উত্তেজনা আর চমকে ভরা। প্রধান বিরোধী দলের পক্ষ থেকে বলা হলো, বিএনপির নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যরা সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ না নিলে জামায়াতে ইসলামীর জয়ী সংসদ সদস্যরা কোনো শপথই নেবেন না। দলটির নায়েবে আমির মঙ্গলবার সকালে পত্রিকায় এটা জানালেন। তিনি বললেন, দুপুর ১২টায় তাদের নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের শপথ অনুষ্ঠানের সময় নির্ধারিত রয়েছে। তারা সেখানে যাবেন। তবে বিএনপি যদি সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ না নেন, জামায়াতের নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যরা কোনো শপথই নেবেন না। কারণ তারা মনে করেন, সংস্কারবিহীন সংসদ অর্থহীন। সঙ্গে সঙ্গে এনসিপির নেতারাও জানালেন, তারাও শপথ নেবেন না। এই রাজনৈতিক উত্তেজনা সিনেমার থ্রিলারকেও যেন হার মানায়। সবার মনে প্রশ্ন কি হবে এখন?
এই টানটান উত্তেজনার মধ্যে মঙ্গলবার বেলা পৌনে ১১টার কিছু আগে জাতীয় সংসদ ভবনের শপথকক্ষে বিএনপির নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যরা শপথ গ্রহণ করেন। শপথ পড়ান প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি)। শপথের জন্য নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের দুটি ফরম দেওয়া হয়। এর একটি ছিল সাদা রঙের, যেটি সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নেওয়ার ফরম। অন্যটি ছিল নীল রঙের,যেটি সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেওয়ার ফরম। বিএনপির নির্বাচিত প্রার্থীরা সংসদ সদস্যের শপথপত্রে স্বাক্ষর করেন। আর তারপরপরই জামায়াতে ইসলামী সিদ্ধান্ত পাল্টে ফেলে। তারা জাতীয় সংসদের সংসদ সদস্য ও সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নিলেন। মঙ্গলবার দুপুর ১২টা ২৩ মিনিটে জামায়াতের নবনির্বাচিত প্রার্থীরা সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নেন। আর দুপুর ১২টা ২৭ মিনিটে তারা সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেন। ফলে এনসিপির কোনো উপায় থাকল না। জামায়াতে ইসলামীর পরপর তারাও শপথ নিলেন। নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের পৃথকভাবে এই দুই শপথ পড়ান প্রধান নির্বাচন কমিশনার। ফলে জট থেকেই গেল। বিএনপি সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নিলেন না আর বিরোধী দলের কাতারে যারা থাকবেন তারা শপথ নিলেন।
নাটক তো হলো। দর্শক যে জনগণ তাদের কি হবে? শপথ নেওয়ার সময় সংসদ সদস্যরা যেশপথবাক্য পড়েছেন তাতে তারা বলেন, ‘আমি (যার যার নাম) সংসদ-সদস্য নির্বাচিত হইয়া সশ্রদ্ধচিত্তে শপথ (বা দৃঢ়ভাবে ঘোষণা) করিতেছি যে, আমি যে কর্তব্যভার গ্রহণ করিতে যাইতেছি, তাহা আইন-অনুযায়ী ও বিশ্বস্ততার সহিত পালন করিব; আমি বাংলাদেশের প্রতি অকৃত্রিম বিশ্বাস ও আনুগত্য পোষণ করিব; এবং সংসদ-সদস্যরূপে আমার কর্তব্য পালনকে ব্যক্তিগত প্রভাবিত হইতে দিব না।’ শপথ কতটুকু পালিত হবে তাদের কর্মে আর সমাজ জীবনে সেটাই এখন দেখার বিষয়।
লেখক: সদস্য, কেন্দ্রীয় কমিটি
বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ)
