ঢাকা ২৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩, শনিবার, ০৬ জুন ২০২৬

সর্বশেষ
হলিউড অভিনেতা খুন, প্রেমিকার ছেলে গ্রেপ্তার শ্রীমঙ্গলে বাস-পিকআপভ্যান সংঘর্ষ, নিহত ১ স্বর্ণ ভরিতে কমল ৫৪৮২ টাকা এআই এজেন্টের নতুন প্ল্যাটফর্ম প্রজেক্ট সোলারা মুকুসদপুরে মেসির ১৬ ফুট উচ্চতার ভাস্কর্য ও নেইমারের প্রতিকৃতি জামালপুরে ডেঙ্গু প্রতিরোধে সচেতনামূলক শোভাযাত্রা অনুষ্ঠিত সাঘাটায় কিশোরীকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ, আটক ৩ চ্যাটজিপিটির মেমোরি ফিচারে বড় পরিবর্তন বিমানবাহিনী জাদুঘরে রেনেসন্স হোটেলের বাহার রেস্টুরেন্টে শুরু হচ্ছে ‘ম্যাজিক্যাল ফ্রাইডে ব্রাঞ্চ’ বিদ্যুতের খুঁটি থেকে ঘুঘুর বাচ্চা নামাতে গিয়ে প্রাণ গেল কিশোরের চাঁদপুরে ‘টেইল অব হিলসা অ্যান্ড আ বয়’ এর মোড়ক উন্মোচন ১০ জনকে পুশইনের ৩০ ঘণ্টা পরও সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি বিজিবি-বিএসএফ পথচারীকে ধাক্কা দিয়ে তরুণীর হুমকি, ‘আমার স্বামী পুলিশ’ দেওয়ানগঞ্জে চলন্ত ট্রেনে উঠতে গিয়ে যুবক নিহত সেলফ কেয়ার রুটিন যখন থেরাপি জাতিসংঘের সর্বোচ্চ সম্মাননা পেলেন বাংলাদেশের ৬ শান্তিরক্ষী এখনই সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নিন সন্ধ্যার মধ্যে ১৪ অঞ্চলে হতে পারে ঝড় ও বজ্রবৃষ্টি সোনারগাঁয় কাভার্ডভ্যান উল্টে চালক নিহত ফেসবুক পোস্টের জেরে মামলা, সাংবাদিক পরিচয়ে মানববন্ধন লক্ষ্মীপুরে ২ মাদককারবারিকে পুলিশে দিলো জনতা ফেনীতে ডেঙ্গু রোধে সচেতনতামূলক র‍্যালি কুড়িগ্রামে সড়ক দুর্ঘটনায় বাবা-ছেলে নিহত মুন্সীগঞ্জে ডেঙ্গু প্রতিরোধে র‍্যালি ও পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম মঞ্চের জন্য অনেক গবেষণামূলক কাজ করতে চাই: জুয়েনা শবনম টেকনাফে ৯৯৯-এ গোলাগুলির দাবি, অভিযোগের সত্যতা মেলেনি! গাংনী সীমান্ত দিয়ে ৬ জনকে পুশইনের চেষ্টা ‘রকস্টার’ যেন মাদকের বিজ্ঞাপন নন্দনকাননে মন্দির জবরদখলের চেষ্টার অভিযোগ, দফায় দফায় সংঘর্ষ
Nagad desktop

উত্তেজনার শেষ নাকি শুরু?

প্রকাশ: ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৪:৩১ পিএম
উত্তেজনার শেষ নাকি শুরু?
রাজেকুজ্জামান রতন

শুরু হলো রুদ্ধশ্বাস নাটকীয়তা। বিএনপি যদি শপথ না নেয় তা হলে কি হবে? বিএনপির পক্ষ থেকে জানানো হলো, গণভোটের রায় অনুসারে জনগণের ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটাতে হলে আগে সংসদে যেতে হবে। সংসদে প্রয়োজনীয় আইন ও সংবিধান সংশোধন করতে হবে।...

উত্তেজনাপূর্ণ খবরে ঠাসা পত্রিকাগুলোর পাতা। কিন্তু খবরের কাগজেই কি সব খবর থাকে? খবরের ভিতরে খবর থাকে, খবর হয়ে উঠতে পারেনি এমন অনেক ঘটনা থাকে যা শুধু বর্তমানের মধ্যে যারা থাকে তারা কিছুটা জানে। ১১ ফেব্রুয়ারি বিকেল থেকে ১৭ ফেব্রুয়ারি বিকেল পর্যন্ত কত ঘটনা যে ঘটেছে তা কি সব পত্রিকায় ঠাঁই পেয়েছে? পত্রিকায় যখন কেউ পড়ছেন, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিপুল বিজয় পেয়েছে, সংসদ সদস্যরা শপথ নিয়েছেন, সরকার গঠন করেছেন, ৫০ সদস্যের মন্ত্রিসভা গঠন করেছে বিএনপি। এটুকু পড়লে মনে হবে কত না শান্তিপূর্ণ ছিল এই অন্তর্বর্তী সরকার থেকে নির্বাচিত সরকারে উত্তরণ। কিন্তু সত্য কল্পনার চেয়েও রোমাঞ্চকর এবারের নির্বাচনে সেটা আবার সত্য হলো। নানা সংশয়ের নির্বাচনে বিজয়ী বিএনপির নবগঠিত মন্ত্রিসভা ৫০ জনের। এদের মধ্যে ২৫ জন মন্ত্রী ও ২৪ জন প্রতিমন্ত্রী এবংটেকনোক্রেট মন্ত্রী তিনজন। এই মন্ত্রিসভার অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো এখানে নতুন মুখ আছে অনেক, যারা আগে কখনো মন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রী হননি। প্রথমবার নির্বাচিত হয়েই মন্ত্রিসভায় জায়গা করে নেওয়া নেতার সংখ্যাও কম নয়। মন্ত্রীদের ২৫ জনের মধ্যে ১৬ জনই নতুন মুখ। প্রতিমন্ত্রীর মধ্যে ২৪ জনই নতুন। এমনকি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানও এবারই প্রথম মন্ত্রিসভার সদস্য হয়েছেন।

এবারের নির্বাচন ছিল বহুল আকাঙ্ক্ষিত আর ভীষণ অনিশ্চয়তায় ভরা। নির্বাচন হবে কিনা এই দোলাচলে ভুগেছে মানুষ শেষ পর্যন্ত। এ যেন বিশ্বকাপের টানটান উত্তেজনায় ভরা খেলা। যেখানে রেফারিকে নিয়ে সন্দেহ, আয়োজকদের নিয়ে সংশয় আর খেলোয়াড়দের মধ্যে মারমার কাটকাট অবস্থা। মানুষকে কতভাবে পক্ষে আনা যায় তার চেষ্টা নির্বাচনে সবসময়ই থাকে। কিন্তু টাকা আর ধর্মের ব্যবহার এবার হয়েছে অনেক বেশি। তাই শেষ বাঁশি বাজার পরও খেলার ফলাফল নিয়ে অনিশ্চয়তা যেমন স্নায়ুক্ষরা উত্তেজনা তৈরি করে এবারের সংসদ নির্বাচন তার চেয়ে কম কিছু নয়।

নির্বাচনে কয়েকটি বিষয় উল্লেখযোগ্য। নির্বাচন অতীতের নির্বাচনগুলোর চাইতে শান্তিপূর্ণ হয়েছে, কিছু আসনে ভোট গণনা এবং ফলাফল ঘোষণা নিয়ে উত্তেজনা সৃষ্টি হলেও নির্বাচনের ফলকে প্রত্যাখ্যান করার মতো ঘটনা ঘটেনি। ৩০টি আসনের ফল নিয়ে অভিযোগ করলেও নির্বাচনের ফলকে কার্যত মেনেই নিয়েছে বিরোধী দলগুলো। এর মধ্যেই নির্বাচিত দলের প্রধান বিরোধী দলগুলোর নেতাদের বাড়িতে সৌজন্য সাক্ষাৎ করতে গেলে তা রাজনৈতিক সৌজন্য বলে প্রশংসিত হয়েছে। রাজনৈতিক বিরোধিতা যেন প্রতিহিংসায় পরিণত না হয় এটা দেশের মানুষের অন্যতম চাওয়া। ফলে উত্তেজনার আগুনে ঘি ঢালার অনেকেই থাকলেও বিজয়ী দলের নেতৃত্বের ভূমিকা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রেখেছে।

সংকট দেখা দিল জুলাই সনদ বাস্তবায়ন নিয়ে। এমনিতেই হ্যাঁ না ভোটের প্রশ্ন নিয়ে বিতর্ক ছিল তারপর ঐকমত্য কমিশনের পক্ষ থেকে বলা হলো এই সংসদ একই সঙ্গে সংবিধান সংস্কার পরিষদ হিসেবে কাজ করবে। ফলে আবার জটিলতা দেখা দিল। প্রশ্ন এল নির্বাচন তো ছিল জাতীয় সংসদ নির্বাচন। সংবিধান মেনেই এটা গঠিত হবে, কাজ করবে। সংসদ সদস্যদের শপথ পাঠ করানোর আইনি বিধান আছে। কিন্তু সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ বাক্য কে পাঠ করাবেন? ফলে বিজয়ী দল যাদের এমন পরিমাণ সংসদ সদস্য আছে যে তারা সংবিধান সংশোধন করার ক্ষমতা রাখে তাদের পক্ষ থেকে প্রশ্ন তোলা হলো, তারা তো সংবিধান অনুযায়ী সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন কি? তাদের মুখপাত্র বললেন, আমরা কেউ সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হইনি এবং সংবিধানে এটা এখনো ধারণ করা হয়নি। গণভোটের রায় অনুযায়ী, সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠিত হলে সেটা সংবিধানে আগে ধারণ করতে হবে এবং সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্যকে কে শপথ নেওয়াবেন, সেটা বিধান করতে হবে।’ তারা আরও বললেন, সাংবিধানিকভাবে জাতীয় সংসদে গৃহীত হওয়ার পরে তখন জাতীয় সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্যদের শপথ নেওয়ার বিধান করা যাবে। আমরা এখন সাংবিধানিকভাবে এই পর্যন্ত আমরা এসেছি। আমরা সংবিধান মেনে এ পর্যন্ত চলছি এবং আশা করি সামনের দিনেও চলব।’ তারা জানিয়ে দিলেন, গণভোটের রায় অনুযায়ী সংবিধান সংস্কার হলে, সংবিধানের তৃতীয় তফসিলে সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্যদের শপথের ফরম যুক্ত হলে, কে এই শপথ পড়াবেন তা নির্ধারিত হলে, তখন সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেওয়া যাবে।

শুরু হলো রুদ্ধশ্বাস নাটকীয়তা। বিএনপি যদি শপথ না নেয় তা হলে কি হবে? বিএনপির পক্ষ থেকে জানানো হলো, গণভোটের রায় অনুসারে জনগণের ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটাতে হলে আগে সংসদে যেতে হবে। সংসদে প্রয়োজনীয় আইন ও সংবিধান সংশোধন করতে হবে। কারণ বিদ্যমান সংবিধান অনুযায়ী, সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ পড়ানোর এখতিয়ার সিইসির নেই। তারা আর একটি চমকপ্রদ তথ্য দিলেন, সিইসি তাদের সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ পাঠ করানোর জন্য ‘অ্যাপ্রোচ’ করেননি। ফলে এটা চূড়ান্ত হয়ে গেল যে বিএনপি সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নিচ্ছে না।

আমাদের রাজনীতি উত্তেজনা আর চমকে ভরা। প্রধান বিরোধী দলের পক্ষ থেকে বলা হলো, বিএনপির নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যরা সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ না নিলে জামায়াতে ইসলামীর জয়ী সংসদ সদস্যরা কোনো শপথই নেবেন না। দলটির নায়েবে আমির মঙ্গলবার সকালে পত্রিকায় এটা জানালেন। তিনি বললেন, দুপুর ১২টায় তাদের নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের শপথ অনুষ্ঠানের সময় নির্ধারিত রয়েছে। তারা সেখানে যাবেন। তবে বিএনপি যদি সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ না নেন, জামায়াতের নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যরা কোনো শপথই নেবেন না। কারণ তারা মনে করেন, সংস্কারবিহীন সংসদ অর্থহীন। সঙ্গে সঙ্গে এনসিপির নেতারাও জানালেন, তারাও শপথ নেবেন না। এই রাজনৈতিক উত্তেজনা সিনেমার থ্রিলারকেও যেন হার মানায়। সবার মনে প্রশ্ন কি হবে এখন?

এই টানটান উত্তেজনার মধ্যে মঙ্গলবার বেলা পৌনে ১১টার কিছু আগে জাতীয় সংসদ ভবনের শপথকক্ষে বিএনপির নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যরা শপথ গ্রহণ করেন। শপথ পড়ান প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি)। শপথের জন্য নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের দুটি ফরম দেওয়া হয়। এর একটি ছিল সাদা রঙের, যেটি সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নেওয়ার ফরম। অন্যটি ছিল নীল রঙের,যেটি সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেওয়ার ফরম। বিএনপির নির্বাচিত প্রার্থীরা সংসদ সদস্যের শপথপত্রে স্বাক্ষর করেন। আর তারপরপরই জামায়াতে ইসলামী সিদ্ধান্ত পাল্টে ফেলে। তারা জাতীয় সংসদের সংসদ সদস্য ও সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নিলেন। মঙ্গলবার দুপুর ১২টা ২৩ মিনিটে জামায়াতের নবনির্বাচিত প্রার্থীরা সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নেন। আর দুপুর ১২টা ২৭ মিনিটে তারা সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেন। ফলে এনসিপির কোনো উপায় থাকল না। জামায়াতে ইসলামীর পরপর তারাও শপথ নিলেন। নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের পৃথকভাবে এই দুই শপথ পড়ান প্রধান নির্বাচন কমিশনার। ফলে জট থেকেই গেল। বিএনপি সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নিলেন না আর বিরোধী দলের কাতারে যারা থাকবেন তারা শপথ নিলেন।

নাটক তো হলো। দর্শক যে জনগণ তাদের কি হবে? শপথ নেওয়ার সময় সংসদ সদস্যরা যেশপথবাক্য পড়েছেন তাতে তারা বলেন, ‘আমি (যার যার নাম) সংসদ-সদস্য নির্বাচিত হইয়া সশ্রদ্ধচিত্তে শপথ (বা দৃঢ়ভাবে ঘোষণা) করিতেছি যে, আমি যে কর্তব্যভার গ্রহণ করিতে যাইতেছি, তাহা আইন-অনুযায়ী ও বিশ্বস্ততার সহিত পালন করিব; আমি বাংলাদেশের প্রতি অকৃত্রিম বিশ্বাস ও আনুগত্য পোষণ করিব; এবং সংসদ-সদস্যরূপে আমার কর্তব্য পালনকে ব্যক্তিগত প্রভাবিত হইতে দিব না।’ শপথ কতটুকু পালিত হবে তাদের কর্মে আর সমাজ জীবনে সেটাই এখন দেখার বিষয়।

লেখক: সদস্য, কেন্দ্রীয় কমিটি
বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ)

পাসপোর্ট ও বিদেশযাত্রার প্রক্রিয়া সহজ করতে হবে

প্রকাশ: ০৫ জুন ২০২৬, ০৩:২১ পিএম
পাসপোর্ট ও বিদেশযাত্রার প্রক্রিয়া সহজ করতে হবে
ড. খলিলুর রহমান

যখন নাগরিকরা নিজেদের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকেই ভয় করতে শুরু করে, তখন কোনো জাতি এগোতে পারে না। সরকার জনগণের সেবা করার জন্য–ভয় দেখানোর জন্য নয়। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর কাজ মানুষের মধ্যে আস্থা, ন্যায়বিচার ও বিশ্বাস সৃষ্টি করা; আতঙ্ক ও সন্দেহ নয়।...
পাসপোর্ট পাওয়ার অধিকার কোনো রাজনৈতিক অনুগ্রহ নয়; এটি নাগরিকত্বের একটি মৌলিক অধিকার। পাসপোর্ট শুধু বিদেশ ভ্রমণের নথি নয়–এটি একজন নাগরিকের পরিচয়, জাতীয়তা এবং নিজের রাষ্ট্রের প্রতি তার বৈধ সম্পর্কের স্বীকৃতি। যখন কোনো সরকার রাজনৈতিক পরিচয়, সন্দেহ বা প্রশাসনিক পক্ষপাতের ভিত্তিতে এই অধিকার প্রয়োগ করে, তখন তা ন্যায়বিচার, সমতা ও গণতান্ত্রিক শাসনের মূল ভিত্তিকেই দুর্বল করে দেয়।

গত রাতে আমার এক ঘনিষ্ঠ ব্যক্তির ফোন পেলাম, যাকে আমি কয়েক দশক ধরে চিনি। তিনি সততা, নিষ্ঠা ও আন্তরিকতার সঙ্গে চার দশক ধরে দেশসেবা করে আসছেন। তিনি তার কূটনৈতিক পাসপোর্ট জমা দিয়ে নতুন বাংলাদেশি পাসপোর্ট পাওয়ার জটিলতা নিয়ে আমার সহায়তা চাচ্ছিলেন। তার অভিজ্ঞতা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং এটি এমন একটি উদ্বেগজনক প্রবণতার প্রতিফলন, যা ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অনির্বাচিত প্রশাসনের সময়ে ব্যাপকভাবে দেখা গিয়েছিল।

বিষয়টির বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে যাওয়ার আগে একটি বাস্তবতা স্বীকার করা জরুরি। দীর্ঘদিন ধরে ধারাবাহিক সরকারগুলো কূটনৈতিক পাসপোর্টের মর্যাদা ও গুরুত্বকে ক্ষুণ্ন করেছে। অনেকে পেশাগতভাবে কূটনৈতিক পাসপোর্ট পাওয়ার যোগ্য ছিলেন না কিংবা পেশাদার কূটনীতিক ছিলেন না, তাদেরও এই সুবিধা দেওয়া হয়েছে। এর ফলে ঐতিহ্যগতভাবে রাষ্ট্রের প্রতিনিধিত্বকারী কূটনীতিকদের জন্য সংরক্ষিত এই নথির গুরুত্ব ও মর্যাদা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। গত রাতে যিনি আমার সহায়তা চেয়েছিলেন, তিনিও কূটনৈতিক সেবার বাইরে থেকেও কূটনৈতিক পাসপোর্ট পেয়েছিলেন তার রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালনের জন্য।

তবে কূটনৈতিক পাসপোর্টের অপব্যবহার সংশোধনের নামে কোনো নাগরিককে সাধারণ পাসপোর্ট থেকে বঞ্চিত করা কখনোই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। যেকোনো বাংলাদেশি নাগরিক, যার বিরুদ্ধে কোনো ফৌজদারি দণ্ড বা আইনি নিষেধাজ্ঞা নেই, তার সমানভাবে পাসপোর্ট পাওয়ার অধিকার রয়েছে। এটি শুধু প্রশাসনিক বিষয় নয়; এটি সাংবিধানিক ও মানবাধিকারসংক্রান্ত প্রশ্ন।

দুঃখজনকভাবে, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় এমন কিছু চর্চা গড়ে ওঠে, যা দেখে মনে হয়েছে পূর্ববর্তী সরকারে কাজ করেছেন বা একসময় কূটনৈতিক পাসপোর্ট ধারণ করেছেন এমন ব্যক্তিদের শাস্তি দেওয়ার মানসিকতা কাজ করেছে। বহু সম্মানিত সরকারি কর্মকর্তা, পেশাজীবী, শিক্ষাবিদ ও অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে এক ধরনের অলিখিত সন্দেহ ও বঞ্চনার শিকার হতে হয়েছে। আইন ও বিধিমালার ভিত্তিতে আবেদন মূল্যায়নের পরিবর্তে রাজনৈতিক পরিচিতি ও ইচ্ছাকৃত প্রশাসনিক জটিলতা সৃষ্টি করা হয়েছে।

আরও দুঃখজনক হলো, ড. ইউনূস ও তার অনির্বাচিত প্রশাসন সমাজে বিভাজন সৃষ্টির রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েছিল। মানুষকে পাশাপাশি দাঁড়াতে উৎসাহিত করার পরিবর্তে একে অপরের বিরুদ্ধে দাঁড় করানোর প্রবণতা তারা উৎসাহিত করেছে।

আমি নিজেও ব্যক্তিগতভাবে এসব চর্চার প্রভাব প্রত্যক্ষ করেছি এবং একজন ভুক্তভোগী। শত শত মানুষ পাসপোর্ট পেতে অপ্রয়োজনীয় বিলম্ব, জটিলতা ও অপমানজনক আচরণের শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক হয়ে ওঠে, যখন সাবেক কূটনৈতিক পাসপোর্টধারীদের সাধারণ পাসপোর্ট প্রক্রিয়ায়ও জাতীয় নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর অস্বাভাবিক সম্পৃক্ততা যোগ করা হয়। এতে বৈধ নিরাপত্তা উদ্বেগ ও রাজনৈতিক নজরদারির সীমারেখা অস্পষ্ট হয়ে পড়ে।

অন্যদিকে, ড. ইউনূস ও তার ঘনিষ্ঠদের আমলে পাসপোর্ট দেওয়ার ক্ষেত্রে প্রচলিত পুলিশ ভেরিফিকেশন ব্যবস্থা বাতিল করা হয়, যা একটি বিতর্কিত সিদ্ধান্ত হিসেবে সমালোচিত হয়েছিল। যদিও অনেক নাগরিক আমলাতান্ত্রিক হয়রানি কমার কারণে এটিকে স্বাগত জানিয়েছিলেন। তবু ক্রমে অভিযোগ ওঠে যে, অতিরিক্ত শিথিলতা অপব্যবহারের সুযোগ তৈরি করেছে। এমনো অভিযোগ সামনে আসে যে, পর্যাপ্ত যাচাই ছাড়াই বাংলাদেশে অবস্থানরত অনাগরিক বা বাস্তুচ্যুত ব্যক্তিদের পাসপোর্ট দেওয়া হয়েছে।

কানাডায় বাংলাদেশের হাইকমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতা থেকে আমি বলতে পারি দক্ষতা ও জাতীয় নিরাপত্তার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা কতটা গুরুত্বপূর্ণ। একটি পাসপোর্ট আন্তর্জাতিকভাবে রাষ্ট্রের সার্বভৌম নিশ্চয়তার প্রতীক। এর বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষুণ্ন হলে তার প্রভাব শুধু অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও দেশের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আজ বিভিন্ন দেশের বাংলাদেশি পাসপোর্টধারীদের ভিসা নাকচ হওয়ার ঘটনা এর একটি অন্যতম নিদর্শন। শুধু ভিসা প্রাপ্তিতে প্রতিবন্ধকতা নয়, দুর্বল যাচাই ব্যবস্থা প্রকৃত বাংলাদেশি নাগরিকদের বিদেশযাত্রা কঠিন করে তুলতে পারে এবং রাষ্ট্রকে কূটনৈতিক ও নিরাপত্তাজনিত ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে।

ড. ইউনূসের অপশাসনের সময় আরেকটি উদ্বেগজনক বিষয় ছিল বিমানবন্দরে যাত্রীদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার ও অন্যায় আচরণ। অভিযোগ রয়েছে, বিশেষ করে যারা আগে কূটনৈতিক পাসপোর্ট ধারণ করেছেন বা সরকারি দায়িত্বে ছিলেন, তাদের অনেককে বিভিন্ন সংস্থার কর্মকর্তারা অপ্রয়োজনীয় জিজ্ঞাসাবাদ, বিলম্ব এবং ভীতিকর পরিস্থিতির মুখোমুখি করেছেন। অনেক ক্ষেত্রে বৈধ নিরাপত্তা উদ্বেগ ছাড়াই যাত্রীদের যাত্রা বিলম্বিত বা আটকে দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে।

এর চেয়েও উদ্বেগজনক ছিল গণমাধ্যমের কিছু অংশের ভূমিকা। বিমানবন্দরের এসব ঘটনার পর কিছু যাত্রীকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও চাঞ্চল্যকর সংবাদ পরিবেশনের মাধ্যমে জনসমক্ষে সন্দেহভাজন হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। অনেক শিরোনাম ও প্রতিবেদন এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে, যাতে নিরপেক্ষ তথা উপস্থাপনের চেয়ে ব্যক্তি বিশেষকে হেয় প্রতিপন্ন করার প্রবণতা বেশি ছিল। এটি শুধু পেশাগত নীতির পরিপন্থী নয়; বরং সমাজে ভয় ও বিভাজনের সংস্কৃতি তৈরি করে।

যখন নাগরিকরা নিজেদের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকেই ভয় করতে শুরু করে, তখন কোনো জাতি এগোতে পারে না। সরকার জনগণের সেবা করার জন্য–ভয় দেখানোর জন্য নয়। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর কাজ মানুষের মধ্যে আস্থা, ন্যায়বিচার ও বিশ্বাস সৃষ্টি করা; আতঙ্ক ও সন্দেহ নয়। এই প্রেক্ষাপটে ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারির সংসদ নির্বাচন বহু নাগরিকের মধ্যে স্বস্তি ও নতুন আশার সঞ্চার করেছে। নির্বাচিত রাজনৈতিক সরকারের প্রত্যাবর্তনকে অনেকে ড. ইউনূসের অনির্বাচিত প্রশাসনের বিতর্কিত চর্চাগুলো থেকে বেরিয়ে আসার সুযোগ হিসেবে দেখেছেন। এটি উৎসাহব্যঞ্জক যে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার এসব বিষয়ে কিছু ইতিবাচক পদক্ষেপ নিয়েছে বলে জানা যাচ্ছে। সাবেক কূটনৈতিক পাসপোর্টধারীদের প্রতি তুলনামূলক মানবিক ও বাস্তবসম্মত দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ এবং বিমানবন্দরে অপ্রয়োজনীয় হয়রানি কমানোর উদ্যোগ প্রশংসার দাবিদার।

বিশেষ করে ব্যক্তিগতভাবে আমি সন্তুষ্ট যে, এই উন্নয়নগুলো বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নেতৃত্বে হচ্ছে, যিনি ঘটনাচক্রে আমারই সিভিল সার্ভিস ব্যাচের কর্মকর্তা ছিলেন এবং প্রশাসনিক বাস্তবতা ও নাগরিক মর্যাদার গুরুত্ব সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা রাখেন। কার্যকর শাসনের জন্য শুধু ক্ষমতা নয়; প্রয়োজন প্রজ্ঞা, সংযম ও মানবিকতা।

তবে সংস্কার অর্ধেক পথে থেমে থাকলে চলবে না। বাংলাদেশ এখন এমন একটি আধুনিক, জবাবদিহিমূলক ও অধিকারভিত্তিক পাসপোর্ট ও অভিবাসন ব্যবস্থা গড়ে তোলার সুযোগ পেয়েছে, যা জাতীয় নিরাপত্তা ও গণতান্ত্রিক স্বাধীনতার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করবে। এ ধরনের ব্যবস্থার জন্য কয়েকটি মৌলিক নীতি জরুরি।

প্রথমত, রাজনৈতিক পরিচয়, পেশাগত পটভূমি বা অতীত সরকারি সম্পৃক্ততা নির্বিশেষে সব নাগরিককে সমানভাবে বিবেচনা করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, নিরাপত্তা যাচাইয়ের প্রক্রিয়াকে অনানুষ্ঠানিক রাজনৈতিক বিবেচনার পরিবর্তে সুস্পষ্ট আইনি কাঠামোর মধ্যে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে হবে।
তৃতীয়ত, বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকে পেশাদারত্ব ও সংযমের সঙ্গে কাজ করতে হবে, যাতে বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ ছাড়া কোনো যাত্রী হয়রানির শিকার না হন।

চতুর্থত, বাংলাদেশি পাসপোর্টের মর্যাদা ও বিশ্বাসযোগ্যতা রক্ষায় পূর্বের যথাযথ যাচাই ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে, যাতে অ-নাগরিকরা পাসপোর্ট না পায় বা পাসপোর্ট দেওয়ার ক্ষেত্রে অপব্যবহার রোধ করা যায়, আবার প্রকৃত নাগরিকরাও হয়রানির শিকার না হন।
সবশেষে, গণমাধ্যমকে আরও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে এবং রাজনৈতিক প্রতিহিংসা বা চরিত্র হননের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে।

সম্ভবত ড. ইউনূসের অনির্বাচিত প্রশাসনের সবচেয়ে ক্ষতিকর উত্তরাধিকার ছিল নাগরিকদের মধ্যে বিভাজন সৃষ্টি। তাদের সবচেয়ে বড় মেটিকুলাস ডিজাইন ছিল সমাজে মানুষকে সহনাগরিক নয়, প্রতিপক্ষ হিসেবে দেখতে শেখানো। তবে এটি স্বস্তিদায়ক যে, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সরকারের সময় সেই বিভাজনের রাজনীতি ধীরে ধীরে অবসানের দিকে যাচ্ছে। গণতন্ত্রে রাজনৈতিক মতপার্থক্য স্বাভাবিক; কিন্তু সন্দেহ, প্রতিশোধ ও সংঘাতনির্ভর শাসনব্যবস্থা জাতীয় ঐক্যকে দুর্বল করে।

বাংলাদেশ ইতোমধ্যে দীর্ঘ রাজনৈতিক মেরূকরণের জন্য বড় মূল্য দিয়েছে। এখন দেশের প্রয়োজন পুনর্মিলন, প্রাতিষ্ঠানিক ন্যায়বিচার এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের পুনঃপ্রতিষ্ঠা। নাগরিকদের উচিত জাতি গঠনের কাজে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দাঁড়ানো, মুখোমুখি সংঘাতে নয়।

যেকোনো সরকারের দায়িত্ব শুধু আইন পরিচালনা নয়; সামাজিক আস্থা ও জাতীয় সংহতি রক্ষা করাও। যখন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে রাজনৈতিক প্রতিশোধের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়, তখন ক্ষতিগ্রস্ত হয় গণতন্ত্র ও রাষ্ট্রের বিশ্বাসযোগ্যতা উভয়ই।

এখন জাতির প্রত্যাশা বাংলাদেশ আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক, মানবিক ও গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক সংস্কৃতির দিকে এগিয়ে যাবে; যেখানে নাগরিক অধিকার সম্মানিত হবে, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান নিরপেক্ষ থাকবে এবং প্রশাসন দলীয় স্বার্থের পরিবর্তে জাতীয় স্বার্থে কাজ করবে।

পরিশেষে, পাসপোর্ট কখনোই রাজনৈতিক অস্ত্র হওয়া উচিত নয়। এটি হওয়া উচিত সেই প্রতীক, যা প্রতিটি বাংলাদেশির নাগরিকত্ব, মর্যাদা ও সমঅধিকারের প্রতিনিধিত্ব করে।

লেখক: সাবেক রাষ্ট্রদূত ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব

মেধাবীদের বিদেশে উচ্চশিক্ষার প্রবণতা কী বার্তা দিচ্ছে

প্রকাশ: ০৫ জুন ২০২৬, ১২:৫৬ পিএম
মেধাবীদের বিদেশে উচ্চশিক্ষার প্রবণতা কী বার্তা দিচ্ছে

যোগ্যতার মূল্য আছে, গবেষণার সম্মান আছে, চাকরির নিরাপত্তা আছে এবং স্বপ্ন বাস্তবায়নের সুযোগ আছে। যে রাষ্ট্র তার মেধাবীদের ধরে রাখতে পারে, সে রাষ্ট্র ভবিষ্যৎকে ধরে রাখতে পারে। আর যে রাষ্ট্র তার সেরা মেধাগুলোকে হারায়, সে রাষ্ট্র একসময় বুঝতে পারে, সবচেয়ে বড় ক্ষতি অর্থনীতির নয়, সম্ভাবনার।...

বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে আজকাল একটি নতুন দৃশ্য খুবই পরিচিত। একসময় যেখানে শিক্ষার্থীদের স্বপ্ন ছিল বিসিএস ক্যাডার হওয়া, ব্যাংকার হওয়া কিংবা দেশের কোনো বড় প্রতিষ্ঠানে চাকরি পাওয়া, সেখানে এখন অনেকের প্রধান লক্ষ্য বিদেশে উচ্চশিক্ষা। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে প্রায় প্রতিদিনই আমি রিকমেন্ডেশন লেটার লিখি। কেউ যুক্তরাষ্ট্রে আবেদন করছে, কেউ কানাডায়, কেউ অস্ট্রেলিয়া, জার্মানি, জাপান বা ইউরোপের বিভিন্ন দেশে। শিক্ষার্থীদের আলোচনায় এখন গবেষণা প্রস্তাবনা, স্কলারশিপ, আইইএলটিএস, জিআরই, পাবলিকেশন এবং অধ্যাপকদের ই-মেইল যোগাযোগের বিষয়গুলোই বেশি স্থান পায়।

এটি একদিকে আশাব্যঞ্জক। কারণ বাংলাদেশের তরুণরা এখন বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার মতো সক্ষমতা অর্জন করছে। একই সঙ্গে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নও সামনে নিয়ে আসে– এই মেধাবী তরুণদের বড় অংশ যদি স্থায়ীভাবে বিদেশে থেকে যায়, তাহলে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ কী হবে?

একটি রাষ্ট্রের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ হলো ওই রাষ্ট্রের দক্ষ ও সৃজনশীল মানবসম্পদ। সেই মানবসম্পদের সবচেয়ে যোগ্য অংশ যখন দেশ ছাড়ার পরিকল্পনা করে, তখন বিষয়টি কেবল ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; এটি জাতীয় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়।অনেকে মনে করেন বিদেশে যাওয়ার মূল কারণ উন্নত শিক্ষা। বাস্তবে বিষয়টি আরও জটিল। বাংলাদেশের অসংখ্য মেধাবী শিক্ষার্থী মনে করে যে তাদের ভবিষ্যৎ এখানে যথেষ্ট নিরাপদ নয়। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ভালো ফলাফল করেও চাকরি পাওয়ার নিশ্চয়তা নেই। অনেক ক্ষেত্রে নিয়োগপ্রক্রিয়া দীর্ঘ, অনিশ্চিত এবং প্রতিযোগিতামূলক। দক্ষতা ও যোগ্যতার পাশাপাশি নানা অদৃশ্য বাস্তবতাও কাজ করে বলে সাধারণ মানুষের মধ্যে একটি ধারণা তৈরি হয়েছে।

সরকারি চাকরির ক্ষেত্রে রাজনৈতিক পরিবর্তনের সঙ্গে প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস, ওএসডি সংস্কৃতি কিংবা পদোন্নতির অনিশ্চয়তা অনেকের মধ্যে উদ্বেগ সৃষ্টি করে। বেসরকারি খাতেও উচ্চশিক্ষিত গবেষক বা বিশেষজ্ঞদের জন্য পর্যাপ্ত সুযোগ এখনো সীমিত। ফলে একজন শিক্ষার্থী যখন দেখে যে, বিদেশে তার দক্ষতার মূল্য অনেক বেশি, তখন সে স্বাভাবিকভাবেই সেই পথ বেছে নিতে চায়।

আরও একটি বড় কারণ হলো গবেষণার পরিবেশ। বাংলাদেশের অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতিভাবান শিক্ষক ও শিক্ষার্থী থাকলেও গবেষণা তহবিল, আধুনিক ল্যাবরেটরি, আন্তর্জাতিক জার্নালে প্রকাশনার সহায়তা এবং গবেষণাভিত্তিক ক্যারিয়ার কাঠামো এখনো পর্যাপ্ত নয়। অন্যদিকে, বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো পূর্ণ স্কলারশিপ, গবেষণা অনুদান, স্বাস্থ্যসেবা এবং উচ্চমানের গবেষণা সুবিধা প্রদান করছে। ফলে সিদ্ধান্তটি অনেক সময় আবেগের নয়, বাস্তবতার হয়ে ওঠে।

আজকের উন্নত দেশগুলোও একসময় মেধা পাচারের সমস্যার মুখোমুখি হয়েছিল। ১৯৭০ ও ’৮০-এর দশকে ভারত থেকে বিপুলসংখ্যক প্রকৌশলী, বিজ্ঞানী ও চিকিৎসক যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপে চলে যান। একসময় একে ভারতের জন্য বড় ক্ষতি মনে করা হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তীতে ভারত তথ্যপ্রযুক্তি খাত, গবেষণা অবকাঠামো এবং উদ্যোক্তা পরিবেশ উন্নত করে। ফলে বিদেশে থাকা ভারতীয় মেধাবীদের একটি অংশ দেশে বিনিয়োগ শুরু করে, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলে এবং জ্ঞান স্থানান্তরে ভূমিকা রাখে।

চীন আরও দূরদর্শী নীতি গ্রহণ করে। বিদেশে পিএইচডি সম্পন্ন করা গবেষকদের দেশে ফিরিয়ে আনতে তারা বিশেষ গবেষণা অনুদান, উচ্চ বেতন, আবাসন সুবিধা এবং স্বাধীন গবেষণার সুযোগ দেয়। এর ফলে হাজার হাজার বিজ্ঞানী দেশে ফিরেন আসেন এবং চীনের প্রযুক্তিগত উত্থানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। দক্ষিণ কোরিয়া ও সিঙ্গাপুরও একই ধরনের নীতি অনুসরণ করেছে। তারা বুঝেছিল, মেধাবীদের বিদেশযাত্রা থামানো সম্ভব নয়; কিন্তু দেশে ফিরে আসার জন্য আকর্ষণীয় পরিবেশ তৈরি করা সম্ভব।

এখন প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় ঝুঁকি কী? বাংলাদেশের সামনে সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো ‘সিলেকটিভ ব্রেইন ড্রেইন’। অর্থাৎ সবার আগে দেশ ছাড়ছে সবচেয়ে মেধাবী, গবেষণামুখী এবং আন্তর্জাতিক মানের দক্ষতাসম্পন্ন তরুণরা। যখন একজন অসাধারণ গবেষক, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বিশেষজ্ঞ, প্রকৌশলী, চিকিৎসক বা নীতিনির্ধারণী দক্ষতাসম্পন্ন ব্যক্তি বিদেশে স্থায়ীভাবে থেকে যান, তখন দেশ কেবল একজন নাগরিককে হারায় না; বরং ভবিষ্যতের একটি সম্ভাবনাকেও হারায়।

একজন বিজ্ঞানী হয়তো একটি নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবন করতে পারতেন। একজন অর্থনীতিবিদ হয়তো নতুন নীতি প্রণয়নে ভূমিকা রাখতে পারতেন। একজন শিক্ষক হয়তো শত শত শিক্ষার্থীকে অনুপ্রাণিত করতে পারতেন। তাদের অনুপস্থিতি সরাসরি দৃশ্যমান না হলেও দীর্ঘমেয়াদে এর প্রভাব গভীর।
তাহলে এই মুহূর্তে বাংলাদেশের সরকারের কী করা উচিত? এর উত্তর যদি সাজাতে চাই তাহলে এভাবে দেখা যেতে পারে– প্রথমত, মেধাভিত্তিক রাষ্ট্র গঠন করতে হবে। এমন একটি পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে যেখানে একজন তরুণ বিশ্বাস করবে যে তার পরিশ্রম ও যোগ্যতার যথাযথ মূল্যায়ন হবে। দ্বিতীয়ত, গবেষণা ও উন্নয়ন খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। বাংলাদেশের জিডিপির তুলনায় গবেষণায় ব্যয় এখনো অত্যন্ত কম। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে গবেষণা অনুদান, আধুনিক গবেষণাগার এবং আন্তর্জাতিক অংশীদারত্বের সুযোগ দিতে হবে। তৃতীয়ত, বিদেশফেরত মেধাবীদের জন্য বিশেষ কর্মসূচি চালু করা যেতে পারে। দেশে ফিরে আসা গবেষক ও বিশেষজ্ঞদের জন্য দ্রুত নিয়োগ, গবেষণা তহবিল এবং কর সুবিধা দেওয়া যেতে পারে। চতুর্থত, বিশ্ববিদ্যালয় ও শিল্প খাতের মধ্যে শক্তিশালী সংযোগ তৈরি করতে হবে। যাতে একজন শিক্ষার্থী বুঝতে পারে যে গবেষণা ও উদ্ভাবনের মাধ্যমে দেশেও সফল ক্যারিয়ার গড়া সম্ভব। পঞ্চমত, রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে হবে। চাকরির নিরাপত্তা এবং পেশাগত স্বাধীনতা মানুষের সিদ্ধান্তে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

বিদেশে যাওয়া কোনো অপরাধ নয়। বরং অনেক ক্ষেত্রে এটি প্রয়োজনীয়। জ্ঞান অর্জনের জন্য পৃথিবীকে জানার বিকল্প নেই। তবে প্রশ্ন হলো, বিদেশে অর্জিত জ্ঞান ও দক্ষতা কি দেশের কল্যাণে ব্যবহার করা হচ্ছে? সবাই দেশে ফিরে আসবে– এমন প্রত্যাশা বাস্তবসম্মত নয়। কিন্তু বিদেশে থেকেও দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে গবেষণা করা, শিক্ষার্থীদের পরামর্শ দেওয়া, প্রযুক্তি বিনিয়োগ করা কিংবা নতুন উদ্যোক্তা তৈরিতে সহায়তা করা সম্ভব।
বাংলাদেশ আজ একটি সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। আমাদের তরুণরা আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি মেধাবী, বেশি আত্মবিশ্বাসী এবং বেশি বৈশ্বিক। এটি আমাদের শক্তি। কিন্তু সেই শক্তি যদি ক্রমাগত দেশের বাইরে স্থায়ীভাবে চলে যায়, তাহলে উন্নয়নের গতি একসময় বাধাগ্রস্ত হবে।
মেধা পাচার রোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায় সীমান্ত বন্ধ করা নয়, বরং সুযোগ সৃষ্টি করা। তরুণদের এমন একটি বাংলাদেশ উপহার দিতে হবে যেখানে তারা অনুভব করবে– যোগ্যতার মূল্য আছে, গবেষণার সম্মান আছে, চাকরির নিরাপত্তা আছে এবং স্বপ্ন বাস্তবায়নের সুযোগ আছে। যে রাষ্ট্র তার মেধাবীদের ধরে রাখতে পারে, সে রাষ্ট্র ভবিষ্যৎকে ধরে রাখতে পারে। আর যে রাষ্ট্র তার সেরা মেধাগুলোকে হারায়, সে রাষ্ট্র একসময় বুঝতে পারে, সবচেয়ে বড় ক্ষতি অর্থনীতির নয়, সম্ভাবনার।

লেখক: অধ্যাপক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
[email protected]

স্বাধীনতার অবিনাশী ছাত্র ও যুব নেতৃত্ব

প্রকাশ: ০৫ জুন ২০২৬, ১২:২৪ পিএম
স্বাধীনতার অবিনাশী ছাত্র ও যুব নেতৃত্ব

একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ হঠাৎ ঘটে যাওয়া কোনো বিস্ফোরণ নয়, এর পেছনে আছে তিল তিল করে গড়ে তোলা জনসমর্থণ, যার পেছনে আছেন মুখ্য নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব এবং তার আদর্শে দীক্ষিত মুক্তিযুদ্ধ পূর্ব ত্যাগী ছাত্র ও যুবনেতারা। সদ্য প্রয়াত তোফায়েল আহমেদসহ মুক্তিযুদ্ধ-পূর্ব ছাত্র ও যুব নেতৃত্ব সে কারণেই বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসের অবিচ্ছেদ অংশ...

বাংলাদেশের বয়স যখন ৫৪ বছর অতিক্রম করেছে, মুক্তিযুদ্ধের রাজনৈতিক নেতৃত্বের সবাই তখন মৃত্যুবরণ করেছেন, সামরিক নেতৃত্বের প্রায় সকলে গত হয়েছেন, শীর্ষ যুব ও ছাত্র নেতৃত্বের অধিকাংশ এরই মধ্যে পৃথিবী ছেড়েছেন এবং জাতীয় রণাঙ্গনে জীবন বাজি রাখা মুক্তিবাহিনীর বীর যোদ্ধারা একে একে পৃথিবী ছেড়ে যাচ্ছেন। জাতীয় গণমাধ্যমে তাদের মৃত্যুর খবর খুব একটা আসে না, কিছু মিলে ফেসবুকসহ সমাজ মাধ্যমে। ভাবছিলাম মুক্তিযুদ্ধের যে রণাঙ্গন বন্ধুরা বিদায় নিচ্ছেন তাদের নিয়ে কিছু লিখি। কিন্তু হয়ে ওঠেনি। ঠিক সে সময় ১ জুন ২০২৬ মৃত্যুবরণ করলেন তোফায়েল আহমেদ। এই মৃত্যুর মধ্য দিয়ে সমাপ্তি ঘটল ইতিহাস সৃষ্টিকারী সেই ছাত্র ও যুব নেতৃত্বের যারা পাকিস্তানের প্রবল প্রতাবশালী সামরিক শাসক ফিল্ড মার্শাল আইয়ুব খানের পরাজয় ঘটিয়ে বাঙালি নবজাগরণে সুবিশাল ভূমিকা রাখার কৃতিত্ব অর্জন করেছিলেন।
উনিশ শ ষাটের দশক, একদিকে সামরিক শাসন, চলছে ধর্মের নামে শাসন ও শোষণ, অন্যদিকে পাকিস্তানের দুই অংশের মধ্যে বাড়ছে বৈষম্যের দেয়াল! এককথায় বাঙালিকে পাকিস্তানের দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক বানানো হয়েছে: কোথাও মর্যাদা নেই; সংস্কৃতিতে আধিপত্ত!, চাকরি, অর্থনীতি, সেনাবাহিনী সব ক্ষেত্রে পিছিয়ে পড়ছে বাঙালি। ভয়ংকর সেই আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছেন শেখ মুজিব ও তার সহযোগীরা। সঙ্গত কারণে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ সব বিদ্যাপীঠ উত্তপ্ত, সে আগুনে ঘি ঢালার কাজ করে চলেছেন যুব ও ছাত্রনেতারা। বলতেই হবে ছাত্রলীগ বা ছাত্র ইউনিয়নের সেদিনের রাজনীতি তখন শুধু মিছিল-মিটিং ছিল না, ছিল জাতিকে মুক্ত করার, সামনে এগিয়ে নেওয়ার প্রজ্ঞাবান প্রতিশ্রুতি। 
১৯৬৬ থেকে ধারাবাহিক আন্দোলন পরিক্রমায় পূর্ব পাকিস্তান উত্তপ্ত, বাঙালি জনগোষ্ঠী অধিকার-সচেতন হয়ে উঠতে থাকে। বাঙালি গণমানুষের এই মানোজাগতিক উত্তরণ ঘটে মূলত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৬-দফা উপস্থাপনের পর থেকে। এখনকার রাজনীতিতে শ্রমিক সমাজের ভূমিকা নেই বললেই চলে। কিন্তু ১৯৬০-এর দশকে শ্রমজীবী মানুষ ছিল রাজপথের অন্যতম প্রধান শক্তি। আর ছিল দেশ জাগানিয়া অপ্রতিরুদ্ধ ছাত্র সমাজ–যারা গণমানুষকে সামনে এগিয়ে নিয়েছে, প্রগতিশীলতার পথ দেখিয়েছে। 
ষাটের দশকের গণ-আন্দোলনের উত্তাল সময়ে যে কয়েকজন বলিষ্ঠ ছাত্রনেতা আবির্ভূত হয়েছেন তোফায়েল আহমেদ তাদের অন্যতম শীর্ষ– ঊনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থানের অন্যতম প্রধান নায়ক তিনি। আমরা যারা সে সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ি, তারা তাকে দেখার সুযোগ পেয়েছি। সেই বিস্ময়কর গণ-অভ্যুত্থানে পাকিস্তানি শাসনের ভিত কাঁপিয়ে দেওয়া তেজস্বী কণ্ঠ তিনি। 
অনলবর্ষি এই ছাত্র নেতা দ্বীপাঞ্চল ভোলা থেকে উঠে এসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শীর্ষ ছাত্র নেতৃত্বের অধিকারী হয়েছিলেন, ডাকসুর ভিপি হয়ে আইয়ুব খানের মসনদ গুঁড়ো করার নেতৃত্ব দিয়েছিলেন, ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের মূল নেতা হিসেবে রাজপথ কাঁপিয়েছিলেন। এরপর মুক্তিযুদ্ধের সশস্ত্র পর্বে অন্যতম প্রধান সংগঠক হন তিনি, স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধুর একান্ত আস্থাভাজন থেকে রাজনৈতিক সচিবের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭৫-এ বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ড পরবর্তী-সময়ে অনেক বিপন্নতা গেছে তার, এরপর বঙ্গবন্ধুকন্যার নেতৃত্বের সরকারে মন্ত্রীর দায়িত্ব লাভ করেন। রাজনৈতিক জীবনের একপর্যায়ে এসে দলীয় রাজনীতিতে তিনি কোণঠাসা হয়ে পড়েছিলেন শোনা যায়। কিন্তু আদর্শচ্যুত হয়েছিলেন এ কথা কেউই বলবেন না। ১৯৭০ থেকে শুরু করে প্রায় সকল জাতীয় নির্বাচনে দলীয় মনোনয়নে ৯ বার জাতীয় সংসদে নির্বাচিত হয়েছেন তোফায়েল, জীবনের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত মুক্তিযুদ্ধ, বঙ্গবন্ধুর আদর্শ ধারণ করে গেছেন তিনি। 
১৯৭০-এ অনুষ্ঠিত হলো যৌথ পাকিস্তানের প্রথম ও শেষ সাধারণ নির্বাচন, বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের ব্যাপক বিজয় ঘটল, কিন্তু ইয়াহিয়া বা সেনাবাহিনী কোনো বাঙালির হাতে পাকিস্তানের ক্ষমতা ছাড়বে না, তারা ষড়যন্ত্র আঁটতে থাকল। এল ৭ মার্চের রমনার রেসকোর্স ময়দান, বঙ্গবন্ধু ডাক দিলেন, তোমরা ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোলো; বললেন, এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, স্বাধীনতার সংগ্রাম। সারা বাংলা জেগে উঠল। এবং দুর্গ গড়ার কাজটা সারলেন সে সময়ের দলীয় নেতৃত্ব ও যুব ও ছাত্র নেতারা। তারা সারা দেশ চষে বেড়ালেন, প্রতিটি জেলায়, প্রতিটি থানায়, প্রতিটি কলেজে গিয়ে ছাত্র-যুবকদের প্রস্তুত হতে বললেন, প্রয়োজনে অস্ত্র ধরতে বললেন। 
সে কারণে বলি, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ হঠাৎ ঘটে যাওয়া কোনো বিস্ফোরণ নয়, এর পেছনে আছে তিল তিল করে গড়ে তোলা জনসমর্থণ, যার পেছনে আছেন মুখ্য নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব এবং তার আদর্শে দীক্ষিত মুক্তিযুদ্ধ পূর্ব ত্যাগী ছাত্র ও যুবনেতারা। 
২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি বাহিনী যখন অতর্কিতে ঝাঁপিয়ে পড়ল নিরস্ত্র বাঙালির ওপর, বঙ্গবন্ধু যখন বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করলেন এবং তাকে বাড়ি থেকে উঠিয়ে নিয়ে সেদিনের পশ্চিম পাকিস্তানে নেওয়া হলো, বেঙ্গল রেজিমেন্ট, ইপিআর, পুলিশ বহু জায়গায় বিদ্রোহ করল শুরু হলো ছাত্রজনতার স্বতঃস্ফূর্ত গণপ্রতিরোধ; এই গণবিদ্রোহের মানসিক প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছিল সেদিনের যুব ও ছাত্র নেতাদের হাতে। শুধু তাই নয়, তারা ব্যাপক ভূমিকা রাখলেন স্বশস্ত্র মুক্তিযুদ্ধ সংগঠনের নানা স্তরে। কারণ মুক্তিযুদ্ধ শুধু মারণাস্ত্রে হয়নি, হয়েছে মানুষের মনের অস্ত্রে, যে মনকে তৈরি করেছেন মূলত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের আপসহীন নেতৃত্ব, আর তার বিষ্ফোরণ ঘটেছে যুব ও ছাত্র নেতাদের অবিনাশী ত্যাগে। 
রাজনীতির উত্থান-পতন বা নানা পথ-পরিক্রমায় অনেক নাম আসে, হারিয়েও যায়। কিন্তু ইতিহাসের কিছু নাম থাকে অবিনশ্বর, যা সময়ের ধুলোয় হারায় না, প্রবল চেষ্টাতেও সে নাম মুছে দিতে পারে না কেউ। বাংলাদেশের স্বাধীনতার প্রশ্নে সে নাম বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতি পর্বে আরও কিছু নাম ছিল যুব ও ছাত্র নেতৃত্বের–সিরাজুল আলম খান, শেখ ফজলুল হক মনি, আবদুর রাজ্জাক এবং সদ্য প্রয়াত তোফায়েল আহমদ–ইতিহাসে তারা চিরস্মরণীয়। এই নায়করা ছিলেন স্বাধীনতাপূর্ব ছাত্র-যুবসমাজের হৃদয়ের স্পন্দন, বঙ্গবন্ধুর ডাকে যে জনজোয়ার তৈরি হয়েছিল, সেই জোয়ারে বৈঠা হাতে জাতিকে তারা এগিয়ে নিয়েছিলেন।


ঊনসত্তর-সত্তররের ছাত্র আন্দোলন থেকে শুরু করে মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত আরও কয়েকজন শীর্ষ ছাত্র নেতাকে দেখার সুযোগ হয়েছিল আমাদের। আ স ম আবদুর রব ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ ডাকসুর ভিপি, শাজাহান সিরাজ ছিলেন ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক, নূরে আলম সিদ্দিকী ছিলেন ডাকসুর জিএস, আবদুল কুদ্দুস মাখন ছিলেন ছাত্রলীগের অন্যতম প্রভাবশালী নেতা, যাদের সমন্বয়ে তৈরি হয়েছিল ছাত্রসমাজের যৌথ কমান্ড– ‘স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ’। এদের মধ্যে একমাত্র আ স ম আবদুর রব আজো আছেন, বাকি তিনজন গত হয়েছেন। বাস্তবতা হচ্ছে, তারা সবাই শেষ পর্যন্ত একপথে হাঁটেননি, পথ ভিন্ন ও মত ভিন্ন হয়েছিল, সঙ্গত অসঙ্গত নানা কারণে, কেউ কেউ আবার অভিযুক্তও হয়েছিলেন নানা পর্বে। কিন্তু ইতিহাসের মুক্তিযুদ্ধ পূর্ব যে মাঠে তারা বিচরণ করেছেন, সে ইতিহাস মিথ্যা হয়ে যায় না।
মুক্তিযুদ্ধের সময়কালে বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানের কারাগারে, সৈয়দ নজরুল ইসলাম, তাজউদ্দীন আহমদ, এম মনসুর আহমেদ, কামরুজ্জামান– এদের একনিষ্ঠ নেতৃত্বে এবং মুক্তিযুদ্ধের প্রধান সহায়ক দেশ ভারতের সমর্থনে মুজিবনগর সরকার তখন যুদ্ধ পরিচালনায় সক্রিয়; হাজারও তরুণ প্রশিক্ষিত হচ্ছে, যুদ্ধ সেক্টরগুলো সবল হচ্ছে, মুক্তিবাহিনী সুসংগঠিত হচ্ছে; সে সময়ে এই যুব ও ছাত্রনেতারা যুব তারুণ্যকে এক সুতোয় গেঁথেছেন। যে কারণে মুষ্টিমেয় কিছু বিপথগামী ছাড়া গোটা তারুণ্য সেদিন এক হয়েছিল স্বাধীনতার প্রশ্নে। 
সদ্য প্রয়াত তোফায়েল আহমেদসহ মুক্তিযুদ্ধ-পূর্ব ছাত্র ও যুব নেতৃত্ব সে কারণেই বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসের অবিচ্ছেদ অংশ, তারা সবাই পরবর্তী সময় এক পথে থাকেননি ঠিক, কারও কারও পদক্ষেপ বিতর্কেরও ঊর্ধ্বে ছিল না, কিন্তু স্বাধীনতা ও বঙ্গবন্ধুর প্রশ্নে তাদের ভূমিকা ছিল অবিচল।

লেখক: মুক্তিযোদ্ধা, প্রাবন্ধিক ও কথাসাহিত্যিক

আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় এবং ‘কোচিং সেন্টার’ বিতর্ক

প্রকাশ: ০৪ জুন ২০২৬, ০৫:১৭ পিএম
আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় এবং ‘কোচিং সেন্টার’ বিতর্ক
শাহ নিসতার জাহান

আমাদের ছেলেমেয়েরা যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ পায়; মানে, ভর্তি পরীক্ষার দৌড়ে যখন টিকে যায়, তখন কিন্তু আমরা সেটি নিয়ে খুশি থাকি এবং আনন্দের সঙ্গে অন্যকে জানাতেও পছন্দ করি। সে তুলনায়, কেউ নর্থসাউথ, ব্র্যাক বা এরকম কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছে, এমন সংবাদে খুব উৎসাহিত হতে দেখি না...

বাংলাদেশের একজন মাননীয় মন্ত্রী (জনাব ববি হাজ্জাজ) বলেছেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় একটি কোচিং সেন্টার। অবশ্য তিনি পরে তার বক্তব্য থেকে সরে গেছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা ডেটাসহ বলছেন, তাদের এবং অন্যদের কী অবস্থা। তাদের তথ্য বলছে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অনেক এগিয়ে। বিষয়টি বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। একটি বিশ্ববিদ্যালয়কে হেয় করা হয়েছে, কেউ কেউ বলছেন। আমার মনে হয়, মাননীয় মন্ত্রীর আশা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে অনেক বেশি ছিল বা আছে। সেই আকাঙ্ক্ষা পূরণ হয়নি বলে আফসোস থেকে তিনি ওই মন্তব্য করেছেন। কারণ, বাংলাদেশের মানুষ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছ থেকে অনেক আশা করে এবং সেই আশা ভঙ্গ হলে তারা আশাহত হয়। স্বাভাবিক। আবার, এই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নিয়েই তারা গর্ব করে। উদাহরণ হিসেবে বলব, আমাদের ছেলেমেয়েরা যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ পায়; মানে, ভর্তি পরীক্ষার দৌড়ে যখন টিকে যায়, তখন কিন্তু আমরা সেটি নিয়ে খুশি থাকি এবং আনন্দের সঙ্গে অন্যকে জানাতেও পছন্দ করি। সে তুলনায়, কেউ নর্থসাউথ, ব্র্যাক বা এরকম কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছে, এমন সংবাদে খুব উৎসাহিত হতে দেখি না এবং বহু ক্ষেত্রেই এটি কোনো সংবাদ নয়। এর মানে এই নয় যে, এসব বিশ্ববিদ্যালয়ের খুব গুরুত্ব নেই। নিশ্চয় আছে। তবে সেটি সাধারণ্যে অত গুরুত্ব দিয়ে কেউ বলে, অন্তত আমার জানা নেই।

দীর্ঘ সময় ধরে পাবলিক এবং প্রাইভেট, এই দ্বিবিধ লেবেল বা তকমা আমরা শুনে আসছি। সেই লেবেলের মধ্যে একটা বিশাল দেয়াল আছে, এ কথা আশা করি কেউ অস্বীকার করবেন না। আসলে, যে যার মতো কাজ করে যেতে পারলেই হলো। একটি ভালো কাজে কে এগিয়ে থাকে সেটি বিবেচ্য। সেক্ষেত্রে, যদি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের প্রকাশিত ডেটা (আমি নিজে সেই ডেটার সত্যাসত্য বলতে পারব না। কারণ, আমি সেটি দেখেছি ফেসবুকে) সঠিক হয়, তাহলে বলতে হবে, মাননীয় মন্ত্রী কিছুটা আবেগ কিংবা আশাবঞ্চিত হয়ে সেই কথা বলেছেন। তার এই আবেগকে আমি সম্মান করি। কিন্তু সমস্যা অন্য জায়গায়। যদি ধরেও নিই, মাননীয় মন্ত্রীর ডেটা সঠিক এবং ফেসবুকে যেসব কথা, দাবি উঠেছে, সেগুলো ভুল, সেক্ষেত্রে কিন্তু এ দেশের রাজনীতিকরা দায় এড়াতে পারেন না। আমরা দেখেছি, বাংলাদেশের ভিসি নিয়োগের ক্ষেত্রে কী হয়। শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে কী ঘটে। আমার অভিজ্ঞতা বলে, একজন ভিসি কেবল টেলিভিশনে যাবেন, ‘টক শো’ করবেন, সেই লোভে একটি বিভাগকেই জলাঞ্জলি দিয়েছিলেন। মোটামুটি যাকে-তাকে ধরে এনে শিক্ষক বানানো হয়েছিল। যারা শিক্ষক হয়ে এসেছেন, তারা জানেন না, একজন শিক্ষকের কাজ কী এবং এটি কেবল একটি বিভাগ কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে নয়। উদাহরণ অনেক। ভিসিদের ইচ্ছের মাত্রা বিবিধ। তাহলে, এবংবিধ যখন অবস্থা, শিক্ষকরা পড়াশোনা করবেন কেন? একজন প্রজ্ঞাবান ভিসি আমরা আশা করতে পারি কীভাবে? আমি তো দেখি, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় তাদের ‘ব্যবসা’ই জমজমাট কিংবা রমরমা, যাদের ওই অর্থে কোনো একাডেমিক কাজ বা ইচ্ছে নেই। সেই ১৯৯৬ সালে, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপক ইউসুফ আলীকে সরিয়ে দিয়েছিল তৎকালীন সরকার। কারণ, তিনি বিএনপির ভিসি। রাজনৈতিক বিবেচনায় এর আগেও হয়তো হয়েছিল নিয়োগ, কিন্তু এত উন্মুক্ত অবস্থায় নয়। তারপর থেকে শিক্ষকরা মোটামুটি ‘কুত্তা-দৌড়’ (মাফ করবেন, এই শব্দটি ব্যবহারের জন্য। তবে, আমার কাছে এর চেয়ে ভালো কোনো শব্দ আপাতত নেই) শুরু করলেন রাজনীতি মাথায় নিয়ে, শুধু পদ-পদবির (ভিসি ইত্যাদি) লোভে। সেটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরে এবং বাইরে। এটি যদি তার একাডেমিক কাজ বিবেচনায় হতো তাহলে কিন্তু কোনো কথা থাকত না, শিক্ষকরা অযথা রাজনীতি নিয়ে পড়েও থাকতেন না। এই রাজনৈতিক বিবেচনাতেই শিক্ষক নিয়োগ হয়। আমি তো দেখি বেশ কিছু শিক্ষার্থী এক্ষুনি রাজনৈতিক দৌড়ঝাঁপ করছে, কেবল শিক্ষক হওয়ার আশায়। অথচ তার কাজ ছিল, নিজেকে শিক্ষক হওয়ার জন্য উপযুক্ত করা। সেটি করছে না। কারণ, সে বুঝে গেছে কাকে দিয়ে কাজ হবে এবং এ কাজে বহু ক্ষেত্রেই ইন্ধন দিচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন, মানে সেখানে বিভিন্ন পদে বসা মানুষ। কারণ, তারাও হয়তো একই ধারায় নিয়োগপ্রাপ্ত। বিষয়টি কষ্টের।

কিছু কিছু ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা আনার জন্য, লিখিত পরীক্ষার ব্যবস্থা আছে। সেটি প্রশ্নাতীত নয়। ভাইবার কথা বাদ দিলাম। আমি বলব, শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার ক্ষেত্রে, একেবারে লেকচারার পদেই, একটি কাজ করুন না, বিজ্ঞাপনের সঙ্গে বলে দেবেন, একাডেমিক লাইন থাকা জরুরি। মানে, আবেদনের সঙ্গে অন্তত একটি প্রকাশিত আর্টিকেল থাকতে হবে। মানে, তিনি যে শিক্ষক হবেন, তার শুরু তিনি দেখিয়ে দেবেন। তাহলে, আমাদের ওই শিক্ষার্থী আর রাজনীতি নিয়ে থাকবেন না। ভিসি যতই মাথা নষ্ট করুক, এই শর্তের বাইরে যেতে পারবেন না। ফলে, লিখিত পরীক্ষা নেওয়ার দরকারও হবে না। এখন, দেখতে হবে লেখাটি কোন জার্নালে ছাপা হয়েছে। একই কথা বলব শিক্ষকদের প্রমোশনের ক্ষেত্রেও। তাদের প্রমোশন ওই জার্নালের মানের ওপর হবে। প্রয়োজনে একজন শিক্ষক কখনোই ‘অধ্যাপক’ পদের যোগ্য হবেন না। বিদেশে বহু উদাহরণ আছে, সিনিয়র লেকচারার থেকেই অবসরে। আমরা কেন পারব না? সেজন্য একটি মানদণ্ড থাকতে হবে। তখন বহু শিক্ষকের হম্বিতম্বি বন্ধ হয়ে যাবে। তারা গবেষণায় মন দেবেন নয়তো ছিটকে পড়বেন। কিন্তু মাননীয় মন্ত্রী, সেটি কি করতে পারবেন? চেষ্টা করলে পারতেন; কিন্তু করবেন কি না জানি না। কাজটি ঘটাতে পারলে, ঢাকা কেন, বাংলাদেশের কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাপারেই আপনার হতাশা থাকত না। কিছুদিন আগে আমি একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘প্রমোশনাল নিয়োগ বোর্ডে’ গিয়েছিলাম। তাদের আকাঙ্ক্ষা আমার কাছে ভালো লাগল। অন্তত দুটি লেখা Scopus Indexed জার্নালে প্রকাশিত না হলে তারা পদোন্নতি আটকে দিচ্ছেন। শর্ত দিচ্ছেন, পদোন্নতি পেতে হলে, প্রার্থীকে ওই জাতীয় জার্নালে লেখা প্রকাশ করতে হবে এবং ক্ষেত্রবিশেষ একক লেখা। করুন না ওই নিয়ম ঢাকা, জগন্নাথ, জাহাঙ্গীরনগর কিংবা অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে। দেখবেন, আপনি আর কাউকে ‘কোচিং সেন্টার’ বলতে পারবেন না। শিক্ষকরা আত্মমর্যাদাবোধ করবেন। কিন্তু সে ব্যাপারে রাষ্ট্রেরও কিছু দায়িত্ব নিতে হবে আপাতত। পরে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো নিজেই ঠিক হয়ে যাবে। আমাদের প্রধানমন্ত্রী এই কিছুদিন আগেই অনেকটা হতাশার কথা বলেছিলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকদের নিয়োগ নিয়ে। আমি আশা করি, এ ব্যাপারে তাহলে তার আগ্রহের কমতি নেই। দেশকে ফেরানোর একটি বড় ইচ্ছা আমরা তার মধ্যে দেখছি। সেটি তার চলাফেরা এবং কথাবার্তায় অপ্রকাশ্য থাকে না। বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের সঙ্গে মিশে গেছেন তিনি। আপনাদের পক্ষে তাই বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে নতুন নীতিমালা তৈরি করে ফেলা অসম্ভব নয়। শুধু একবার এই কাজটি করে ফেলতে পারলে, কিছু শিক্ষক অবশ্য অসন্তুষ্ট হবেন। কিন্তু বহু শিক্ষক খুশি হবেন (আমি আশা করি এই শ্রেণিটিই আপনাকে হতাশামুক্ত করবে এবং করে যাচ্ছে)। আপনি তখন কাউকে ‘কোচিং সেন্টার’ বলতে পারবেন না; কিংবা বললেও তারা গায়ে মাখবেন না। কারণ, আপনার কথা তখন হাস্যকর মনে হবে সবার কাছে। সেখানেই আপনার তৃপ্তি আসবে। বাংলাদেশ নামের রাষ্ট্র আমার এই কথাগুলো সত্যি ভাববে কি? 

লেখক: অধ্যাপক, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ; চেয়ারপারসন, ফিল্ম অ্যান্ড টেলিভিশন বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা

পাসপোর্ট ও বিদেশযাত্রার প্রক্রিয়া সহজ করতে হবে

প্রকাশ: ০৪ জুন ২০২৬, ০৫:০৬ পিএম
পাসপোর্ট ও বিদেশযাত্রার প্রক্রিয়া সহজ করতে হবে
ড. খলিলুর রহমান

যখন নাগরিকরা নিজেদের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকেই ভয় করতে শুরু করে, তখন কোনো জাতি এগোতে পারে না। সরকার জনগণের সেবা করার জন্য–ভয় দেখানোর জন্য নয়। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর কাজ মানুষের মধ্যে আস্থা, ন্যায়বিচার ও বিশ্বাস সৃষ্টি করা; আতঙ্ক ও সন্দেহ নয়।...

পাসপোর্ট পাওয়ার অধিকার কোনো রাজনৈতিক অনুগ্রহ নয়; এটি নাগরিকত্বের একটি মৌলিক অধিকার। পাসপোর্ট শুধু বিদেশ ভ্রমণের নথি নয়–এটি একজন নাগরিকের পরিচয়, জাতীয়তা এবং নিজের রাষ্ট্রের প্রতি তার বৈধ সম্পর্কের স্বীকৃতি। যখন কোনো সরকার রাজনৈতিক পরিচয়, সন্দেহ বা প্রশাসনিক পক্ষপাতের ভিত্তিতে এই অধিকার প্রয়োগ করে, তখন তা ন্যায়বিচার, সমতা ও গণতান্ত্রিক শাসনের মূল ভিত্তিকেই দুর্বল করে দেয়।

গত রাতে আমার এক ঘনিষ্ঠ ব্যক্তির ফোন পেলাম, যাকে আমি কয়েক দশক ধরে চিনি। তিনি সততা, নিষ্ঠা ও আন্তরিকতার সঙ্গে চার দশক ধরে দেশসেবা করে আসছেন। তিনি তার কূটনৈতিক পাসপোর্ট জমা দিয়ে নতুন বাংলাদেশি পাসপোর্ট পাওয়ার জটিলতা নিয়ে আমার সহায়তা চাচ্ছিলেন। তার অভিজ্ঞতা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং এটি এমন একটি উদ্বেগজনক প্রবণতার প্রতিফলন, যা ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অনির্বাচিত প্রশাসনের সময়ে ব্যাপকভাবে দেখা গিয়েছিল।

বিষয়টির বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে যাওয়ার আগে একটি বাস্তবতা স্বীকার করা জরুরি। দীর্ঘদিন ধরে ধারাবাহিক সরকারগুলো কূটনৈতিক পাসপোর্টের মর্যাদা ও গুরুত্বকে ক্ষুণ্ন করেছে। অনেকে পেশাগতভাবে কূটনৈতিক পাসপোর্ট পাওয়ার যোগ্য ছিলেন না কিংবা পেশাদার কূটনীতিক ছিলেন না, তাদেরও এই সুবিধা দেওয়া হয়েছে। এর ফলে ঐতিহ্যগতভাবে রাষ্ট্রের প্রতিনিধিত্বকারী কূটনীতিকদের জন্য সংরক্ষিত এই নথির গুরুত্ব ও মর্যাদা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। গত রাতে যিনি আমার সহায়তা চেয়েছিলেন, তিনিও কূটনৈতিক সেবার বাইরে থেকেও কূটনৈতিক পাসপোর্ট পেয়েছিলেন তার রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালনের জন্য।

তবে কূটনৈতিক পাসপোর্টের অপব্যবহার সংশোধনের নামে কোনো নাগরিককে সাধারণ পাসপোর্ট থেকে বঞ্চিত করা কখনোই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। যেকোনো বাংলাদেশি নাগরিক, যার বিরুদ্ধে কোনো ফৌজদারি দণ্ড বা আইনি নিষেধাজ্ঞা নেই, তার সমানভাবে পাসপোর্ট পাওয়ার অধিকার রয়েছে। এটি শুধু প্রশাসনিক বিষয় নয়; এটি সাংবিধানিক ও মানবাধিকারসংক্রান্ত প্রশ্ন।

দুঃখজনকভাবে, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় এমন কিছু চর্চা গড়ে ওঠে, যা দেখে মনে হয়েছে পূর্ববর্তী সরকারে কাজ করেছেন বা একসময় কূটনৈতিক পাসপোর্ট ধারণ করেছেন এমন ব্যক্তিদের শাস্তি দেওয়ার মানসিকতা কাজ করেছে। বহু সম্মানিত সরকারি কর্মকর্তা, পেশাজীবী, শিক্ষাবিদ ও অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে এক ধরনের অলিখিত সন্দেহ ও বঞ্চনার শিকার হতে হয়েছে। আইন ও বিধিমালার ভিত্তিতে আবেদন মূল্যায়নের পরিবর্তে রাজনৈতিক পরিচিতি ও ইচ্ছাকৃত প্রশাসনিক জটিলতা সৃষ্টি করা হয়েছে।

আরও দুঃখজনক হলো, ড. ইউনূস ও তার অনির্বাচিত প্রশাসন সমাজে বিভাজন সৃষ্টির রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েছিল। মানুষকে পাশাপাশি দাঁড়াতে উৎসাহিত করার পরিবর্তে একে অপরের বিরুদ্ধে দাঁড় করানোর প্রবণতা তারা উৎসাহিত করেছে।

আমি নিজেও ব্যক্তিগতভাবে এসব চর্চার প্রভাব প্রত্যক্ষ করেছি এবং একজন ভুক্তভোগী। শত শত মানুষ পাসপোর্ট পেতে অপ্রয়োজনীয় বিলম্ব, জটিলতা ও অপমানজনক আচরণের শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক হয়ে ওঠে, যখন সাবেক কূটনৈতিক পাসপোর্টধারীদের সাধারণ পাসপোর্ট প্রক্রিয়ায়ও জাতীয় নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর অস্বাভাবিক সম্পৃক্ততা যোগ করা হয়। এতে বৈধ নিরাপত্তা উদ্বেগ ও রাজনৈতিক নজরদারির সীমারেখা অস্পষ্ট হয়ে পড়ে।

অন্যদিকে, ড. ইউনূস ও তার ঘনিষ্ঠদের আমলে পাসপোর্ট দেওয়ার ক্ষেত্রে প্রচলিত পুলিশ ভেরিফিকেশন ব্যবস্থা বাতিল করা হয়, যা একটি বিতর্কিত সিদ্ধান্ত হিসেবে সমালোচিত হয়েছিল। যদিও অনেক নাগরিক আমলাতান্ত্রিক হয়রানি কমার কারণে এটিকে স্বাগত জানিয়েছিলেন। তবু ক্রমে অভিযোগ ওঠে যে, অতিরিক্ত শিথিলতা অপব্যবহারের সুযোগ তৈরি করেছে। এমনো অভিযোগ সামনে আসে যে, পর্যাপ্ত যাচাই ছাড়াই বাংলাদেশে অবস্থানরত অনাগরিক বা বাস্তুচ্যুত ব্যক্তিদের পাসপোর্ট দেওয়া হয়েছে।

কানাডায় বাংলাদেশের হাইকমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতা থেকে আমি বলতে পারি দক্ষতা ও জাতীয় নিরাপত্তার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা কতটা গুরুত্বপূর্ণ। একটি পাসপোর্ট আন্তর্জাতিকভাবে রাষ্ট্রের সার্বভৌম নিশ্চয়তার প্রতীক। এর বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষুণ্ন হলে তার প্রভাব শুধু অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও দেশের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আজ বিভিন্ন দেশের বাংলাদেশি পাসপোর্টধারীদের ভিসা নাকচ হওয়ার ঘটনা এর একটি অন্যতম নিদর্শন। শুধু ভিসা প্রাপ্তিতে প্রতিবন্ধকতা নয়, দুর্বল যাচাই ব্যবস্থা প্রকৃত বাংলাদেশি নাগরিকদের বিদেশযাত্রা কঠিন করে তুলতে পারে এবং রাষ্ট্রকে কূটনৈতিক ও নিরাপত্তাজনিত ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে।

ড. ইউনূসের অপশাসনের সময় আরেকটি উদ্বেগজনক বিষয় ছিল বিমানবন্দরে যাত্রীদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার ও অন্যায় আচরণ। অভিযোগ রয়েছে, বিশেষ করে যারা আগে কূটনৈতিক পাসপোর্ট ধারণ করেছেন বা সরকারি দায়িত্বে ছিলেন, তাদের অনেককে বিভিন্ন সংস্থার কর্মকর্তারা অপ্রয়োজনীয় জিজ্ঞাসাবাদ, বিলম্ব এবং ভীতিকর পরিস্থিতির মুখোমুখি করেছেন। অনেক ক্ষেত্রে বৈধ নিরাপত্তা উদ্বেগ ছাড়াই যাত্রীদের যাত্রা বিলম্বিত বা আটকে দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে।

এর চেয়েও উদ্বেগজনক ছিল গণমাধ্যমের কিছু অংশের ভূমিকা। বিমানবন্দরের এসব ঘটনার পর কিছু যাত্রীকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও চাঞ্চল্যকর সংবাদ পরিবেশনের মাধ্যমে জনসমক্ষে সন্দেহভাজন হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। অনেক শিরোনাম ও প্রতিবেদন এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে, যাতে নিরপেক্ষ তথা উপস্থাপনের চেয়ে ব্যক্তি বিশেষকে হেয় প্রতিপন্ন করার প্রবণতা বেশি ছিল। এটি শুধু পেশাগত নীতির পরিপন্থী নয়; বরং সমাজে ভয় ও বিভাজনের সংস্কৃতি তৈরি করে।

যখন নাগরিকরা নিজেদের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকেই ভয় করতে শুরু করে, তখন কোনো জাতি এগোতে পারে না। সরকার জনগণের সেবা করার জন্য–ভয় দেখানোর জন্য নয়। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর কাজ মানুষের মধ্যে আস্থা, ন্যায়বিচার ও বিশ্বাস সৃষ্টি করা; আতঙ্ক ও সন্দেহ নয়। এই প্রেক্ষাপটে ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারির সংসদ নির্বাচন বহু নাগরিকের মধ্যে স্বস্তি ও নতুন আশার সঞ্চার করেছে। নির্বাচিত রাজনৈতিক সরকারের প্রত্যাবর্তনকে অনেকে ড. ইউনূসের অনির্বাচিত প্রশাসনের বিতর্কিত চর্চাগুলো থেকে বেরিয়ে আসার সুযোগ হিসেবে দেখেছেন। এটি উৎসাহব্যঞ্জক যে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার এসব বিষয়ে কিছু ইতিবাচক পদক্ষেপ নিয়েছে বলে জানা যাচ্ছে। সাবেক কূটনৈতিক পাসপোর্টধারীদের প্রতি তুলনামূলক মানবিক ও বাস্তবসম্মত দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ এবং বিমানবন্দরে অপ্রয়োজনীয় হয়রানি কমানোর উদ্যোগ প্রশংসার দাবিদার।

বিশেষ করে ব্যক্তিগতভাবে আমি সন্তুষ্ট যে, এই উন্নয়নগুলো বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নেতৃত্বে হচ্ছে, যিনি ঘটনাচক্রে আমারই সিভিল সার্ভিস ব্যাচের কর্মকর্তা ছিলেন এবং প্রশাসনিক বাস্তবতা ও নাগরিক মর্যাদার গুরুত্ব সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা রাখেন। কার্যকর শাসনের জন্য শুধু ক্ষমতা নয়; প্রয়োজন প্রজ্ঞা, সংযম ও মানবিকতা।

তবে সংস্কার অর্ধেক পথে থেমে থাকলে চলবে না। বাংলাদেশ এখন এমন একটি আধুনিক, জবাবদিহিমূলক ও অধিকারভিত্তিক পাসপোর্ট ও অভিবাসন ব্যবস্থা গড়ে তোলার সুযোগ পেয়েছে, যা জাতীয় নিরাপত্তা ও গণতান্ত্রিক স্বাধীনতার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করবে। এ ধরনের ব্যবস্থার জন্য কয়েকটি মৌলিক নীতি জরুরি।

প্রথমত, রাজনৈতিক পরিচয়, পেশাগত পটভূমি বা অতীত সরকারি সম্পৃক্ততা নির্বিশেষে সব নাগরিককে সমানভাবে বিবেচনা করতে হবে।

দ্বিতীয়ত, নিরাপত্তা যাচাইয়ের প্রক্রিয়াকে অনানুষ্ঠানিক রাজনৈতিক বিবেচনার পরিবর্তে সুস্পষ্ট আইনি কাঠামোর মধ্যে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে হবে।

তৃতীয়ত, বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকে পেশাদারত্ব ও সংযমের সঙ্গে কাজ করতে হবে, যাতে বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ ছাড়া কোনো যাত্রী হয়রানির শিকার না হন।

চতুর্থত, বাংলাদেশি পাসপোর্টের মর্যাদা ও বিশ্বাসযোগ্যতা রক্ষায় পূর্বের যথাযথ যাচাই ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে, যাতে অ-নাগরিকরা পাসপোর্ট না পায় বা পাসপোর্ট দেওয়ার ক্ষেত্রে অপব্যবহার রোধ করা যায়, আবার প্রকৃত নাগরিকরাও হয়রানির শিকার না হন।

সবশেষে, গণমাধ্যমকে আরও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে এবং রাজনৈতিক প্রতিহিংসা বা চরিত্র হননের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে।

সম্ভবত ড. ইউনূসের অনির্বাচিত প্রশাসনের সবচেয়ে ক্ষতিকর উত্তরাধিকার ছিল নাগরিকদের মধ্যে বিভাজন সৃষ্টি। তাদের সবচেয়ে বড় মেটিকুলাস ডিজাইন ছিল সমাজে মানুষকে সহনাগরিক নয়, প্রতিপক্ষ হিসেবে দেখতে শেখানো। তবে এটি স্বস্তিদায়ক যে, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সরকারের সময় সেই বিভাজনের রাজনীতি ধীরে ধীরে অবসানের দিকে যাচ্ছে। গণতন্ত্রে রাজনৈতিক মতপার্থক্য স্বাভাবিক; কিন্তু সন্দেহ, প্রতিশোধ ও সংঘাতনির্ভর শাসনব্যবস্থা জাতীয় ঐক্যকে দুর্বল করে।

বাংলাদেশ ইতোমধ্যে দীর্ঘ রাজনৈতিক মেরূকরণের জন্য বড় মূল্য দিয়েছে। এখন দেশের প্রয়োজন পুনর্মিলন, প্রাতিষ্ঠানিক ন্যায়বিচার এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের পুনঃপ্রতিষ্ঠা। নাগরিকদের উচিত জাতি গঠনের কাজে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দাঁড়ানো, মুখোমুখি সংঘাতে নয়।

যেকোনো সরকারের দায়িত্ব শুধু আইন পরিচালনা নয়; সামাজিক আস্থা ও জাতীয় সংহতি রক্ষা করাও। যখন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে রাজনৈতিক প্রতিশোধের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়, তখন ক্ষতিগ্রস্ত হয় গণতন্ত্র ও রাষ্ট্রের বিশ্বাসযোগ্যতা উভয়ই।

এখন জাতির প্রত্যাশা বাংলাদেশ আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক, মানবিক ও গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক সংস্কৃতির দিকে এগিয়ে যাবে; যেখানে নাগরিক অধিকার সম্মানিত হবে, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান নিরপেক্ষ থাকবে এবং প্রশাসন দলীয় স্বার্থের পরিবর্তে জাতীয় স্বার্থে কাজ করবে।

পরিশেষে, পাসপোর্ট কখনোই রাজনৈতিক অস্ত্র হওয়া উচিত নয়। এটি হওয়া উচিত সেই প্রতীক, যা প্রতিটি বাংলাদেশির নাগরিকত্ব, মর্যাদা ও সমঅধিকারের প্রতিনিধিত্ব করে।

লেখক: সাবেক রাষ্ট্রদূত ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব