পশ্চিমবঙ্গের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী তথা প্রবীণ বাম নেতা প্রয়াত জ্যোতি বসুর নব্বইয়ের দশকের গোড়ার দিকের একটি মন্তব্য সে সময় পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক মহলে সাড়া ফেলে দিয়েছিল। তিনি মন্তব্য করেছিলেন- পশ্চিমবঙ্গে বিজেপিকে টেনে নিয়ে এসে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যে রাজ্যের কত বড় সর্বনাশ করল, তা রাজ্যের মানুষ একদিন হাড়ে হাড়ে টের পাবে। তা বিশদে না বললে জ্যোতি বসুর ওই মন্তব্যের মর্ম উদ্ধার করা কঠিন হবে।
পশ্চিমবঙ্গে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তখন কংগ্রেস ভেঙে বেরিয়ে এসে নিজের দল (তৃণমূল কংগ্রেস) গঠন করেছেন। শুধু তাই নয়, এর কিছুকালের মধ্যেই দিল্লিতে বিজেপি সরকারের শরিক পর্যন্ত হয়ে কেন্দ্রীয় সরকারের মন্ত্রীও হয়ে বসেছেন। ঠিক সে সময় থেকেই তিনি পশ্চিমবঙ্গে বিজেপিকে নানা সুযোগ করে দেওয়ার কাজ শুরু করেন। এরপর রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীর আসনে বসার পর বিজেপি এবং আরএসএস-কে পশ্চিমবঙ্গের মাটিতে জায়গা করে দেওয়ার জন্য ‘সিস্টেমেটিক্যালি’ কাজ করে গেছে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে তৃণমূল কংগ্রেস। যে পশ্চিমবঙ্গে হাতে গোনা কয়েকটি মাত্র আরএসএস-এর শাখা, স্কুল ইত্যাদি ছিল, এখন তা পশ্চিম বাংলার গ্রামে গ্রামে ছড়িয়ে গেছে। অর্থাৎ প্রবীণ বাম নেতা সেদিন যা বলতে চেয়েছিলেন, তা হলো ষোলোআনা ধর্মনিরপেক্ষ রাজ্য বলে পরিচিত পশ্চিমবঙ্গে কট্টর হিন্দুত্বের যে চারা গাছ মমতা রোপণ করলেন, তা বিষবৃক্ষে পরিণত হতে বেশি দেরি হবে না। প্রাজ্ঞ রাজনীতিকের সেদিনের সেই খেদোক্তি আজ পশ্চিমবঙ্গের মানুষ হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছেন।
চলতি মাসের শেষ সপ্তাহে পশ্চিমবাংলায় ভোট গ্রহণ পর্ব শুরু হবে। প্রচার, মনোনয়ন পেশ ইত্যাদিসহ তার প্রস্তুতি নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর উত্তাপ স্বাভাবিকভাবেই বাড়তে শুরু করেছে। এই মুহূর্তে পশ্চিমবাংলায় সবচেয়ে বেশি ‘টেনশন’ যা নিয়ে, তা হলো এসআইআর। অর্থাৎ ভোটার তালিকার নিবিড় সংশোধন। আর তা করতে গিয়ে দেখা যাচ্ছে প্রায় ১ কোটি মানুষকে বাদ দিয়েই এবার ভোটপর্ব চলবে। বিষয়টি এখন রয়েছে ভারতের সুপ্রিম কোর্টের হাতে।
সম্প্রতি বাংলার সীমান্তবর্তী জেলা মালদহ এ নিয়ে উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। প্রতিবাদের উত্তাপ ছড়ায় পার্শ্ববর্তী জেলা মুর্শিদাবাদেও। মানুষের উত্তেজনা মাত্রা ছাড়িয়ে যাওয়ায় সেই বিষয়টিও চলে যায় সুপ্রিম কোর্টে। ভারতের শীর্ষ আদালত জানিয়েছেন, তদন্তের রিপোর্ট দেখে আমরা বুঝতে পারছি, মালদহ এবং মুর্শিদাবাদে গোলমাল ‘পূর্বপরিকল্পিত’। অর্থাৎ অনেক আগে থেকেই এ ধরনের বড় গোলমালের পরিকল্পনা করা হচ্ছিল। সুপ্রিম কোর্টের পর্যবেক্ষণের নিশানা যে রাজ্যের শাসক দল, তৃণমূল কংগ্রেস, তা অনেকটাই স্পষ্ট। এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন, এ দুটি জেলাই সংখ্যালঘুপ্রধান। স্বাভাবিকভাবেই তাদের নামই বেশি বাদ গেছে।
মালদহে এসআইআর-এর কাজে নিযুক্ত বিচারবিভাগীয় আধিকারিকদের নিগ্রহের ঘটনায় ২৫ পাতার একটি প্রাথমিক রিপোর্ট সুপ্রিম কোর্টে জমা করেছে জাতীয় তদন্তকারী সংস্থা (এনআইএ)। সেখানে দেখানো হয়েছে মহিলা বিচারকের আর্তনাদের ভিডিও। এর পরেই মোথাবাড়িতে বিচারকদের ওপর হামলা নিয়ে সোমবার কড়া ভাষায় হুঁশিয়ারি দিয়েছেন ভারতের সুপ্রিম কোর্ট। অন্যদিকে, এ ঘটনা ঘিরে রাজনৈতিক চাপানউতোরও তুঙ্গে। উল্লেখ্য, ভারতের সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে এসআইআর সংক্রান্ত নাম বাদ দেওয়ার জটিলতার বিষয়টি সমাধা করার চেষ্টা করছে বিচারবিভাগ। অর্থাৎ ম্যাজিস্ট্রেট এবং অন্যান্য বিচারপতি এখন এসআইআর নিয়ে সুষ্ঠু সমাধানে পৌঁছনোর চেষ্টা করছেন।
তদন্তের স্বার্থে ইতোমধ্যেই মোথাবাড়ি অঞ্চলের ২২ জন বুথ লেভেল অফিসারকে ম্যারাথন জিজ্ঞাসাবাদ করেছেন এনআইএ আধিকারিকরা। তাদের কাছ থেকে বেশ কিছু চাঞ্চল্যকর ও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য মিলেছে বলে অনুমান করা হচ্ছে। উল্লেখ্য, বুধবার সকাল থেকেই কালিয়াচক ২ নম্বর বিডিও অফিসে বিক্ষোভকারীদের জমায়েত শুরু হয়েছিল, যার সামনের সারিতে ছিলেন মহিলারা। এক সময় বিক্ষোভকারীরা বিডিও অফিসের ভেতরে ঢুকে পড়লে কেন্দ্রীয় বাহিনী তাদের বের করে দিলেও, তারা এলাকা ছাড়েননি। বুধবার রাতে পুলিশ ও কেন্দ্রীয় বাহিনীর কড়া ঘেরাটোপে বিচারবিভাগীয় আধিকারিকরা বেরোনোর সময় আচমকাই তাদের কনভয়ে হামলা চালানো হয়। ইটের আঘাতে ভেঙে যায় একটি গাড়ির কাচ এবং সেই গাড়ির চালক গুরুতর আহত অবস্থায় বর্তমানে মালদহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।
ঘটনার গুরুত্ব বিচার করে কলকাতার বালিগঞ্জে এক মহিলা বিচারকের বাসভবনে গিয়ে তার সঙ্গে দীর্ঘক্ষণ কথা বলেন তদন্তকারী অফিসাররা। সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে ‘এসআইআর’-এর কাজ করতে যাওয়া বিচারকদের নিরাপত্তা কেন বিঘ্নিত হলো এবং সে সময় স্থানীয় পুলিশ প্রশাসনের ভূমিকা কী ছিল, সে প্রশ্নগুলোই এখন বড় হয়ে দেখা দিয়েছে। একাধিক ভিডিও ফুটেজে দেখা গেছে, রাতে বিচারকদের বেরোনোর সময়ও সেখানে প্রচুর বিক্ষোভকারী জমায়েত হয়েছিল। সোমবার সুপ্রিম কোর্ট এনআইএ-এর এ রিপোর্ট খতিয়ে দেখার পর পরবর্তী কী পদক্ষেপ গ্রহণ করে, এখন সেদিকেই তাকিয়ে গোটা রাজ্য।
সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি সূর্যকান্ত স্পষ্ট জানিয়েছেন, এ ঘটনায় স্থানীয় পুলিশের তদন্তের কোনো প্রশ্নই ওঠে না। তদন্তভার নিতে হবে এনআইএ-কে। সে ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে আরও একবার সুপ্রিম কোর্টে প্রশ্নের মুখে পড়লেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যসচিব সুমন্ত নারিওয়ালা। ঘটনার দিন কেন তিনি কলকাতা হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি সুজয় পালের ফোন ধরেননি, সে প্রশ্ন তুলে ভর্ৎসনাও করেন শীর্ষ আদালত। ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ পড়ার প্রতিবাদে গত সপ্তাহের বুধবার দফায় দফায় উত্তপ্ত হয়ে উঠেছিল মালদহের মোথাবাড়ি, সুজাপুরসহ বিভিন্ন এলাকা।
এসআইআরের কাজে নিযুক্ত সাতজন বিচারককে কালিয়াচক-২ ব্লক অফিসের ভেতরে রাত পর্যন্ত আটকে রাখে উত্তেজিত জনতা। সে বিষয় গড়ায় সুপ্রিম কোর্ট পর্যন্ত। গত শুনানিতেই রাজ্য পুলিশ-প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছিল শীর্ষ আদালত।
এ ঘটনায় কারণ দর্শনো হয়েছিল রাজ্যের মুখ্যসচিব, রাজ্যপুলিশের ডিজি, মালদহের জেলাশাসক এবং এসপিকে। সর্বশেষ শুনানিতে তাদের ভার্চুয়ালি উপস্থিত থাকার নির্দেশ দিয়েছিলেন আদালত। আদালতের নির্দেশে সোমবারের শুনানিতে উপস্থিত ছিলেন রাজ্যের মুখ্যসচিব। তার উদ্দেশে সুপ্রিম কোর্টের প্রশ্ন, ‘আপনার সমস্যা কী। আপনি কি প্রধান বিচারপতির ফোনও রিসিভ করেন না?’ জবাবে দুষ্মন্ত জানান, সেদিন সকালে কলকাতায় ছিলেন না। কলকাতা থেকে কোনো ফোনও পাননি। তার কথায়, ‘আমি কলকাতা থেকে কোনো কল পাইনি। আমি একটি বৈঠক করতে দিল্লিতে গিয়েছিলাম। দুপুর ২টা থেকে ৪টা পর্যন্ত বিমানে ছিলাম।’ পাল্টা বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী মুখ্যসচিবকে বলেন, ‘সম্ভবত সন্ধ্যার দিকে ফোন করা হয়েছিল। আপনি যদি দয়া করে একটি মোবাইল নম্বর এবং অন্যান্য যোগাযোগের তথ্য শেয়ার করতেন ভালো হতো।’
মুখ্যসচিবকে বিচারপতি বাগচী আরও বলেন, ‘আপনি বলছেন মোবাইলে নিরাপত্তার জন্য এমন হয়েছে। নিরাপত্তা এতটাই বেশি যে প্রধান বিচারপতিও যোগাযোগ করতে পারেন না? অনুগ্রহ করে নিজেকে একটু নিচে নামিয়ে আনুন, যাতে হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতির মতো সাধারণ মানুষও আপনার সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেন।’ বিচারপতি বাগচীর বলেন, ‘আমাদের কাছে ক্ষমা না চেয়ে হাই কোর্টের প্রধান বিচারপতির কাছে গিয়ে ক্ষমা চান।’
প্রধান বিচারপতিরও ভর্ৎসনার মুখে পড়েন মুখ্যসচিব। তিনি স্পষ্ট জানান, সে দিনের ঘটনা প্রশাসনের ব্যর্থতা। তার কথায়, ‘আপনারা যথাযথ ব্যবস্থা না নেওয়ায় কমিশন কিছুই করতে পারেনি। কমিশনের সঙ্গে কোনো যোগাযোগই রাখছেন না। এখন এ সংস্থাটি যেকোনো ধরনের জরুরি পরিস্থিতিতে আপনাদের নির্দেশ দেওয়ার জন্য দায়িত্বে রয়েছে। এ যোগাযোগের ঘাটতির কারণেই রাজ্যে এত সমস্যা এবং অশান্তি সৃষ্টি হয়েছে। কী ধরনের দায়বদ্ধতা রয়েছে আপনার?’ শুধু পশ্চিমবঙ্গে নয়, অন্য রাজ্যেও আমলাতন্ত্রের অনড় মনোভাব নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন প্রধান বিচারপতি।
আদালতে কমিশনের পক্ষ থেকে বলা হয়, একটি বক্তৃতায় কেন্দ্রীয় বাহিনী সিআরপিএফ নিয়ে এমন মন্তব্য করা হয়েছে, যা সাধারণ মানুষের মধ্যে আশঙ্কা বাড়াতে পারে। অভিযোগ, ওই বক্তব্যে বলা হয়েছে যে উত্তরপ্রদেশ থেকে আসা কেন্দ্রীয় বাহিনীর জওয়ানরা হামলা করতে পারে, এমন ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে। কমিশনের মতে, এ ধরনের মন্তব্য ভোটের আবহে উত্তেজনা বাড়াতে পারে। এ-সংক্রান্ত বক্তব্যের নথিও আদালতে জমা দেওয়া হয়েছে। সলিসিটর জেনারেল তুষার মেহতা শুনানিতে জানান, একটি ভিডিওতে এক বিচারিক আধিকারিককে প্রকাশ্যে ভীত ও আবেগপ্রবণ অবস্থায় দেখা গেছে।
লেখক: ভারতের সিনিয়র সাংবাদিক
