এপ্রিল ঢাকায় বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান নেপালের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বালা নন্দ শর্মার সঙ্গে এক বৈঠকে বলেন, বর্তমান সরকার প্রায়ত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করবে। তাই অনেকটা নিশ্চিত করেই বলা যায় যে, দুই দিন আগে হোক আর পরে হোক উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে বাংলাদেশের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হবে। শুরু হবে দুই দেশের মধ্য বাণিজ্যিক সম্পর্ক ও সাংস্কৃতিক বিনিময়। এটা আজকের সময়ে অত্যন্ত জরুরি ও আবশ্যক।...
ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার পর থেকে আন্তর্জাতিক দুনিয়ায় প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ও প্রেসিডেন্ট শিং জিংপিং-এর পরই উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উনের নাম উচ্চারিত হচ্ছে। কারণ এ যুদ্ধে যারা ইরানের পাশে শক্তভাবে দাঁড়িয়েছে তাদের মধ্যে কিম জং উন অন্যতম। তিনি খুবই স্পষ্ট বার্তা দিয়ে বলেছেন, তার দেশ কখনোই বন্ধুর বিপদে হাত গুটিয়ে বসে থাকবে না। আর তাই তো দেশটি সব নিষেধাজ্ঞাকে পদদলিত করে ইরানের পাশে দাঁড়িয়েছে। সাধ্যমতো অস্ত্র ও গোলাবারুদ সরবারাহ করছে। শুধু তাই নয়, কিম জং উন সুস্পষ্ট ঘোষণা দিয়ে বলেছেন, ইরানে পারমাণবিক হামলা হলে উত্তর কোরিয়া আমেরিকায় পারমাণবিক হামলা করবে। সেই সঙ্গে পারমাণবিক বোমা মেরে ইসরায়েলকে বিশ্বের মানচিত্র থেকে নিশ্চিন্ন করে দেবে।
উল্লেখ্য, উত্তর কোরিয়া পারমাণবিক শক্তিধর দেশ। তাদের রয়েছে দূরপাল্লার ব্যালাস্টিক মিসাইল। যা আমেরিকার যেকোনো স্থানে আঘাত হানতে পারে। এ বিষয়টি পুনঃপরীক্ষা করার জন্য ইরানে মার্কিন হামলার পর উত্তর কোরিয়া পর পর বেশ কয়েকটি ব্যালাস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের পরীক্ষা করে তাদের সক্ষমতার বার্তা দিয়েছে। দেশটির কাছে হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্রও আছে। যা শব্দের চেয়ে ১০ গুণ গতিসম্পন্ন। এখানে বলে রাখা ভালো যে, অনেক মুসলিম দেশ ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দিলেও উত্তর কোরিয়া দেয়নি। উত্তর কোরিয়া মনে করে ইসরায়েল কোনো পৃথক দেশ নয়, এটা যুক্তরাষ্ট্রের একটি সন্ত্রাসী ভূখণ্ড। সম্প্রতি কিম জং উন বিষয়টি আবারও জোর দিয়ে বলেছেন।
অনেকে বলতে পারেন- বন্ধুত্ব ও মৈত্রী এক জিনিস কিন্তু বন্ধুত্বের জন্য জীবনদান কি সম্ভব! হ্যাঁ, সম্ভব। উত্তর কোরিয়া এটাও প্রমাণ করেছে। ইউক্রেন যুদ্ধে উত্তর কোরিয়ার সৈনিকরা রুশ সৈনিকদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াই করছে। এই লড়াইয়ে, বিশেষ করে কুরস্ক অঞ্চলের যুদ্ধে দেশটির সহস্রাধিক সৈন্যের মৃত্যু হয়েছে। তার পরও কিম জং উন ইউক্রেন যুদ্ধে নিজ দেশের সেনাদের নিয়োজিত রেখেছেন। এটাই কোরিয়ার নীতি।
উত্তর কোরিয়া শুধু সামরিকভাবেই শক্তিশালী নয়, দেশটি অর্থনৈতিকভাবেও স্বনির্ভর। মার্কিন ও জাতিসংঘের দীর্ঘ নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও দেশটি শিক্ষা, স্বাস্থ্যসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি লাভ করেছে। দেশটি বিপুল খনিজ সম্পদে ভরপুর। এই খনিজ সম্পদগুলোর মধ্যে রয়েছে- ম্যাগনেসাইট, লৌহ আকরিক, কয়লা, টাংস্টোন, জিঙ্ক, সিসা, তামা, দস্তা, চুনাপাথর, গ্রাফাইট, ব্যারট, ইউরেনিয়াম, স্বর্ণখনি ও বিরল মৃত্তিকা। যা আজকের দুনিয়ার সভ্যতার জন্য বিশেষ প্রয়োজন।
উত্তর কোরিয়া ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে ঢাকায় তাদের দূতাবাসের কার্যক্রম বন্ধ করে ভারতের রাজধানী নতুন দিল্লিতে নিয়ে গেছে। এখন দিল্লিতে নিযুক্ত কোরিয়ার রাষ্ট্রদূত একই সঙ্গে বাংলাদেশের দায়িত্ব পালন করছেন। অথচ অতীতে এমন ছিল না। অতীতে এ সম্পর্ক খুব জোরদার না হলেও যথেষ্ট ভালো ছিল। তার জাজ্বল্যমান প্রমাণ ১৯৭৮ সালে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের তিন দিনব্যাপী (৮ সেপ্টেম্বের থেকে ১০ সেপ্টেম্বের) উত্তর কোরিয়া সফর। দেশটির ৩০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে তিনি প্রধান অতিথি হিসেবে অংশগ্রহণ করেন। এবং দুই দেশের সম্পর্ক উন্নয়নে বেশ কয়েটি চুক্তি স্বাক্ষর করেন। এর মধ্যে অন্যতম হলো- জরুরি ভিত্তিতে বাংলাদেশকে ২ লাখ টন সিমেন্ট সরবারাহ। এ সফরকালে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে দেশটির প্রতিষ্ঠাতা প্রেসিডেন্ট কিম ইল সুং স্বয়ং তাকে তাদের দেশের সর্বোচ্চ ‘হিরো অব দ্য রিপাবলিক’ পদকে ভূষিত করেন।
এ সফরকালে তিনি কিম ইল সুং স্কয়ারে অনুষ্ঠিত সামরিক বাহিনীর বর্ণাঢ্য কুচকাওজে সালাম গ্রহণ ও তার সম্মানে আয়োজিত এক বিশাল সামাবেশে বক্তৃতা করেন। এ ছাড়া তিনি কিম ইল সুং-এর জন্মস্থান মানজুদেতে গিয়ে তার পৈতৃক ভিটায় খড়ের ছাউনির মাটির ঘর পরির্দশন করেন। ঘুরে ঘুরে দেখেন রান্নাঘরসহ অন্যান্য ঘরে তার পিতা, পিতামহের আমলের ব্যবহৃত বিভিন্ন সামগ্রী। সেই সঙ্গে পরিদর্শন করেন জন্মস্থান-সংলগ্ন বিশাল একটি শিশুপার্ক। পরিদর্শন করেন পিয়ংইয়ং-এর গ্রান্ড চিলড্রেন প্যালেস। প্রত্যক্ষ করেন এবং খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখেন ওই দেশের খাল খননের সুফল।
জিয়াউর রহমান পিয়ংইয়ং থেকে দেশে ফিরে ঢাকায় শিশু উদ্যান ও শিশু একাডেমি নির্মাণের উদ্যোগ নেন। রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের পিয়ংইয়ং সফরের পর আর কোনো রাষ্ট্রপতি বা প্রধানমন্ত্রী দেশটি সফর করেননি। তবে দুই দেশের মধ্যে কিছু ব্যবসা-বাণিজ্য হয়েছে। ২০০২ সালে বাংলাদেশ উত্তর কোরিয়া থেকে ৩৪ দশমিক ৮ মিলিয়ন ডলারের স্বর্ণ আমদানি করে। এ সময় বাংলাদেশ ৫ দশমিক ৩১ মিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি করে। বেগম খালেদা জিয়ার প্রধানমন্ত্রিত্বের এ সময় দিই দেশের মধ্যে বাণিজ্য সম্পর্ক ছাড়াও সাংস্কৃতিক প্রতিনিধি দলের সফর বিনিময় হয়।
প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার প্রথম শাসন আমলেও দুই দেশের মধ্যে বেশ উষ্ণ সম্পর্ক ছিল। ১৯৯২ সালে বাংলাদেশ ও উত্তর কোরিয়ার মধ্যে অর্থনৈতিক, কারিগরি, বৈজ্ঞানিক ও বাণিজ্যিক বিষয়ে একটি দ্বিপক্ষীয় সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়। এ সমঝোতার ভিত্তিতে মধ্যপাড়া গ্রানাইট পাথর খনি প্রকল্প বাস্তবায়নে পেট্রোবাংলা উত্তর কোরিয়ার প্রতিষ্ঠান কোরীয় সাউথ সাউথ কো-অপারেশন করপোরেশনকে (নামনাম) দায়িত্ব প্রদান করে। নামনাম ১৯৯৪ সালে কঠিন শিলা প্রকল্পের কাজ শুরু করে। প্রতিদিন ৫,৫০০ মেট্রিক টন পাথর উত্তলন করে। চুক্তি অনুযায়ী ২০০৭ সালে নামনাম প্রেট্রোবাংলাকে খনিজ উত্তোলনের দায়িত্ব হস্তান্তর করে। ১৯৯০ সালে কিম ইল সুং-এর জন্মদিন উপলক্ষে আয়োজিত স্প্রিং আর্ট ফেস্টিভ্যালে জাতীয় পার্টির সাংস্কৃতি বিষয়ক সম্পাদক ও জাতীয় সাংস্কৃতিক পার্টির চেয়ারম্যান আজমল হুদা মিঠুর নেতৃত্বে তিন সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল অংশগ্রহণ করে। ওই প্রতিনিধি দলের অন্যতম ছিলেন পরর্বতীকালের বিখ্যাত অভিনেত্রী ও মডেল সাদিয়া ইসলাম মৌ। ওই ফেস্টিভ্যালে ৮৬টি দেশের সাংস্কৃতিক প্রতিনিধি দল ছাড়াও বিভিন্ন দেশের অনেক নেতা-কর্মী অংশগ্রহণ করেন। সৌভাগ্যক্রমে আমি ওই সময় পিয়ংইয়ং-এ ছিলাম।
দুর্ভাগ্যজনক, সেই সম্পর্ক শেখ হাসিনার শাসনামলে তলানিতে ঠেকেছে। যা এখনো অব্যাহত আছে। এ বিষয়ে বাংলাদেশ-কোরিয়া মৈত্রী সমিতির সভাপতি, সাবেক এমপি হারুন আর রশিদ বলেন, বাংলাদেশে ক্ষমতার পরিবর্তন হয়েছে। বিএনপির নেতৃত্বে সরকার হয়েছে। তাই স্বাভাবিকভাবেই উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে সম্পর্কের উন্নয়ন হবে বলে আশা করি। তাহলে দিল্লির পরিবর্তে আবারও ঢাকায় উত্তর কোরিয়া দূতাবাসের কার্যক্রম শুরু হবে। গত ২৮ এপ্রিল ঢাকায় বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান নেপালের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বালা নন্দ শর্মার সঙ্গে এক বৈঠকে বলেন, বর্তমান সরকার প্রায়ত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করবে। তাই অনেকটা নিশ্চিত করেই বলা যায় যে, দুই দিন আগে হোক আর পরে হোক উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে বাংলাদেশের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হবে। শুরু হবে দুই দেশের মধ্য বাণিজ্যিক সম্পর্ক ও সাংস্কৃতিক বিনিময়। এটা আজকের সময়ে অত্যন্ত জরুরি ও আবশ্যক।
আশা করি, খুব শিগগিরই উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে বাংলাদেশের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হবে।
লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট
