ঢাকা ২২ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩, শুক্রবার, ০৫ জুন ২০২৬

সর্বশেষ
লেবাননে ইসরায়েলি হামলায় আহত ২ বাংলাদেশি শহরেই বেশি হামের প্রকোপ মিরসরাইয়ে ১৫ দিনের ব্যবধানে হামের উপসর্গে যমজ শিশুর মৃত্যু প্রধানমন্ত্রীর লাল টেলিফোনের তার চুরি করে ভাঙারিতে বিক্রি, গ্রেপ্তার ২ ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় মাদক কারবারের অভিযোগে হাত-চোখ বেঁধে যুবককে নির্যাতন ঝিনাইদহে শিশুকে ধর্ষণচেষ্টা, গণপিটুনিতে যুবকের মৃত্যু বিশ্ব পরিবেশ দিবস: গ্রিন কনসার্ন’স ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে বৃক্ষরোপণ দিল্লিতে দগ্ধ ৮ বাংলাদেশির ৩ জনের অবস্থা গুরুতর রংপুরে স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতাকে মারধরের অভিযোগে ওসি ক্লোজড চুয়াডাঙ্গায় বজ্রপাতে যুবকের মৃত্যু জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় প্রধানমন্ত্রীর ভাবনা দুপক্ষের সংঘর্ষে রণক্ষেত্র নান্দাইল, ১৪৪ ধারা জারি খলিলুর রহমান কীভাবে সামলাবেন দুই দায়িত্ব গাছ থেকে পড়ে প্রাণ গেল গৃহবধূর ছাত্রলীগের ঝটিকা মিছিলের ঘটনায় সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা ৬ নবজাতকের মৃত্যু: আদ্‌-দ্বীন হাসপাতালকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের শোকজ ঘুরতে গিয়ে ট্রাকের ধাক্কায় প্রাণ গেল দুই বন্ধুর চট্টগ্রামে ৬০ কোটি টাকার স্ক্র্যাপ জাহাজে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, ফেরত পাঠানোর উদ্যোগ তেল, গ্যাস ও বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির গণবিরোধী সিদ্ধান্ত অবিলম্বে বাতিল করতে হবে: নজরুল ইসলাম প্রতিবন্ধী শিশুদের সম্পদে রূপান্তরের আহ্বান চাঁপাইনবাবগঞ্জে পৃথক স্থানে বজ্রপাতে ৫ জনের মৃত্যু বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে দেশ গৃহযুদ্ধের দিকে ধাবিত হচ্ছে: জি এম কাদের যে বিশ্বাস মানুষের জীবনে এনে দেয় অভাবনীয় ৬টি পরিবর্তন? জনমুখী শাসনব্যবস্থা নিশ্চিত করতে চায় জাতীয় সংসদ: স্পিকার চামড়া নৈরাজ্য অর্থনীতির জন্য অশনিসংকেত ৫ জুন পপ গুরু আজম খানের মৃত্যুবার্ষিকী গাজীপুরে বাসচাপায় অটোচালকসহ নিহত ২ আছিয়া থেকে রামিসা: বিচার কোথায়? প্রোগ্রামিং ভাষা অধ্যায়ের ১৪টি বহুনির্বাচনি প্রশ্ন ও উত্তর, ৪র্থ পর্ব, এইচএসসির তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি ঈশ্বরগঞ্জে সংঘর্ষের ঘটনায় তরুণের মৃত্যু, চেয়ারম্যানসহ ৩১ জনের নামে মামলা
Nagad desktop

উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখুন এবং দীর্ঘজীবী হোন

প্রকাশ: ১৭ মে ২০২৬, ০৫:০২ পিএম
আপডেট: ১৭ মে ২০২৬, ০৫:০৪ পিএম
উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখুন এবং দীর্ঘজীবী হোন
ডা. এ বি এম আবদুল্লাহ

উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত জানার পরেও ওষুধ খেতে অনীহা প্রকাশ করেন বা খেতে চান না। কারও কারও ধারণা, একবার ওষুধ খেলে তা আর বন্ধ করা যাবে না। তাদের ধারণা- ভালোই তো আছি, ওষুধের কী দরকার? এ ধারণাগুলো সম্পূর্ণ ভুল। এ ধরনের রোগীরাই হঠাৎ করে হৃদরোগ বা স্ট্রোকে আক্রান্ত হন, এমনকি মৃত্যুও হয়ে থাকে। মনে রাখতে হবে যারা উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত তাদের অবশ্যই ডাক্তারের পরামর্শ নিতে হবে, নিয়মিত সারা জীবন ওষুধ সেবন করতে হবে এবং নিয়মিত চেক করাতে হবে।...

১৭ মে বিশ্ব উচ্চ রক্তচাপ দিবস। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তত্ত্বাবধানে ওয়ার্ল্ড হাইপারটেনশন লিগ ও ইন্টারন্যাশনাল হাইপারটেনশন সোসাইটি এবারের প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করেছে ‘একসাথে উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ করি, নিয়মিত রক্তচাপ পরীক্ষা করুন, নীরব ঘাতককে পরাজিত করুন’।

অসংক্রামক ব্যাধির মধ্যে অন্যতম হলো উচ্চ রক্তচাপ, যা প্রায়ই একটি স্থায়ী রোগ হিসেবে বিবেচিত। এর জন্য চিকিৎসা ও প্রতিরোধ খুবই জরুরি। তা না হলে বিভিন্ন জটিলতা, এমনকি হঠাৎ করে মৃত্যুরও ঝুঁকি থাকে।

উচ্চ রক্তচাপ বা হাইপারটেনশন কী?
স্বাভাবিক রক্তচাপ হলো সেই বল, যার সাহায্যে রক্ত শরীরের এক স্থান থেকে অন্য স্থানে পৌঁছায়। হৃদপিণ্ডের পাম্পিং ক্রিয়ার মাধ্যমে রক্তচাপ তৈরি হয়। রক্তচাপের কোনো একক নির্দিষ্ট মাত্রা নেই। বিভিন্ন বয়সের সঙ্গে সঙ্গে একেকজনের রক্তচাপের মাত্রা ভিন্ন এবং একই মানুষের বেলায় বিভিন্ন সময়ে রক্তচাপও কমবেশি হতে পারে। উত্তেজনা, দুশ্চিন্তা, অধিক পরিশ্রম, কম ঘুম ও অতিরিক্ত ব্যায়ামের ফলে রক্তচাপ বাড়তে পারে। ঘুম ভালো হলে এবং বিশ্রাম নিলে রক্তচাপ কমে যায়। রক্তচাপের এ পরিবর্তন স্বাভাবিক। সাধারণত বয়স যত কম, রক্তচাপও তত কম হয়। যদি কারও রক্তচাপ নরমাল মাত্রার চাইতে বেশি হয় এবং অধিকাংশ সময় এমনকি বিশ্রামকালীনও বেশি থাকে, তবে ধরে নিতে হবে তিনি উচ্চ রক্তচাপের রোগী।

রক্তচাপ কত প্রকার:
রক্তচাপ দুই ধরনের: সিস্টোলিক ও ডায়াস্টলিক। নরমাল সিস্টোলিক ১০০ থেকে ১৪০ এবং ডায়াস্টলিক ৬০ থেকে ৯০ মিমি. মার্কারি। কারও ব্লাড প্রেশার যদি ১৪০/৯০ বা এর চেয়েও বেশি হয়, তখন বুঝতে হবে তার উচ্চ রক্তচাপের সমস্যা আছে। তবে বয়স ভেদে তারতম্য হতে পারে।

উচ্চ রক্তচাপ কি জটিল ব্যাধি?
উচ্চ রক্তচাপ ভয়ংকর পরিণতি ডেকে আনতে পারে। অনেক সময় উচ্চ রক্তচাপের কোনো প্রাথমিক লক্ষণ দেখা যায় না। এটাই উচ্চ রক্তচাপের সবচেয়ে খারাপ দিক। যদিও অনেক সময় উচ্চ রক্তচাপের রোগীর বেলায় কোনো লক্ষণ থাকে না, তবুও নীরবে উচ্চ রক্তচাপ শরীরের বিভিন্ন অংশকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। এজন্য উচ্চ রক্তচাপকে বলা হয় ‘নীরব ঘাতক’। অনিয়ন্ত্রিত এবং চিকিৎসাবিহীন উচ্চ রক্তচাপ থেকে মারাত্মক শারীরিক জটিলতা দেখা দিতে পারে।

উচ্চ রক্তচাপে কী কী জটিলতা হতে পারে?
রক্তচাপ নিয়ন্ত্রিত না থাকলে শরীরের গুরুত্বপূর্ণ চারটি অঙ্গে মারাত্মক জটিলতা হতে পারে। যেমন- হৃদপিণ্ড, কিডনি, মস্তিষ্ক ও চোখ। অনিয়ন্ত্রিত উচ্চ রক্তচাপ থেকে হৃদযন্ত্রের মাংসপেশি দুর্বল হয়ে হৃদযন্ত্র রক্ত পাম্প করতে পারে না এবং এ অবস্থাকে বলা হয় হার্ট ফেইলিওর। রক্তনালি সংকুচিত হয়ে হার্ট অ্যাটাক বা মায়োকার্ডিয়াল ইনফার্কশন হতে পারে। উচ্চ রক্তচাপের কারণে কিডনি বিকল হয়ে কার্যকারিতা হারাতে পারে, যার অন্যতম কারণ অনিয়ন্ত্রিত উচ্চ রক্তচাপ। এ ছাড়া মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ বা স্ট্রোক হয়ে রোগীর মৃত্যুও হতে পারে এবং চোখের রেটিনায় রক্তক্ষরণ হয়ে অন্ধত্ব বরণ করতে পারে।

কী কী কারণে উচ্চ রক্তচাপ হয়?
শতকরা ৯০ ভাগ রোগীর উচ্চ রক্তচাপের কোনো নির্দিষ্ট কারণ জানা যায় না, একে প্রাইমারি বা অ্যাসেনশিয়াল রক্তচাপ বলে। সাধারণত, বয়স্ক মানুষের উচ্চ রক্তচাপ বেশি হয়ে থাকে। কিছু কিছু বিষয় উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি বাড়ায়, যেমন:

১. বংশানুক্রমিক: উচ্চ রক্তচাপের বংশগত ধারাবাহিকতা আছে, যদি বাবা-মায়ের উচ্চ রক্তচাপ থাকে তবে সন্তানেরও উচ্চ রক্তচাপ হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। এমনকি নিকটাত্মীয়ের উচ্চ রক্তচাপ থাকলেও অন্যদের রক্তচাপের ঝুঁকি থাকে। ২. ধূমপান: ধূমপায়ীদের শরীরে তামাকের নানা রকম বিষাক্ত পদার্থের প্রতিক্রিয়ায় উচ্চ রক্তচাপসহ ধমনী, শিরার নানা রকম রোগ ও হৃদরোগ দেখা দিতে পারে। তামাক, জর্দা, গুল ব্যবহারে একই সমস্যা হতে পারে। ৩. অতিরিক্ত লবণ গ্রহণ: খাবার লবণে সোডিয়াম থাকে, যা রক্তের জলীয় অংশ বাড়িয়ে দেয়। ফলে রক্তের আয়তন বেড়ে যায় এবং রক্ত চাপও বেড়ে যায়। ৪. অধিক ওজন এবং অলস জীবনযাত্রা: যথেষ্ট পরিমাণে ব্যায়াম ও শারীরিক পরিশ্রম না করলে শরীরে ওজন বেড়ে যেতে পারে। এতে হৃদযন্ত্রকে অতিরিক্ত পরিশ্রম করতে হয় এবং এর ফলে অধিক ওজনসম্পন্ন লোকদের উচ্চ রক্তচাপ হয়ে থাকে। ৫. অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস: অতিরিক্ত চর্বিজাতীয় খাবার, যেমন মাংস, মাখন এবং ডুবা তেলে ভাজা খাবার খেলে ওজন বাড়বে। কলিজা, গুর্দা, মগজ এসব খেলে রক্তে কোলেস্টরল বেড়ে যায়। রক্তে অতিরিক্ত কোলেস্টেরল হলে রক্তনালির দেয়াল মোটা ও শক্ত হয়ে যায়। এর ফলে রক্তচাপ বেড়ে যেতে পারে। ৬. অতিরিক্ত মদ পান: যারা নিয়মিত অত্যধিক মদ পান করে, তাদের উচ্চ রক্তচাপ বেশি হয়। অ্যালকোহলে অতিরিক্ত ক্যালরি থাকে, এর ফলে ওজন বেড়ে যায় এবং এতে রক্তচাপ বেড়ে যায়। ৭. ডায়াবেটিস: ডায়াবেটিস রোগীদের অথারোসক্লেরোসিস বেশি হয়। ফলে বয়সের সঙ্গে সঙ্গে ডায়াবেটিস রোগীদের উচ্চ রক্তচাপ দেখা দেয়। এ ছাড়া তাদের অন্ধত্ব ও কিডনির নানা রকম রোগ হতে পারে। ৮. অতিরিক্ত উৎকণ্ঠা: অতিরিক্ত রাগ, উত্তেজনা, ভীতি এবং মানসিক চাপের কারণেও রক্তচাপ সাময়িকভাবে বেড়ে যেতে পারে। যদি এ মানসিক চাপ অব্যাহত থাকে এবং রোগী ক্রমবর্ধমান মানসিক চাপের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে না পারে, তবে এই উচ্চ রক্তচাপ স্থায়ী রূপ নিতে পারে।

অন্যান্য কারণ: কিছু কিছু অঙ্গ আক্রান্ত হলে রোগের কারণে উচ্চ রক্তচাপ হতে পারে। নির্দিষ্ট কারণ খুঁজে পাওয়া গেলে একে বলা হয় সেকেন্ডারি হাইপারটেনশন। এ কারণগুলোর মধ্যে কয়েকটি হলো:
১. কিডনির রোগ। ২. অ্যাড্রেনাল গ্রন্থি ও পিটুইটারি গ্রন্থির টিউমার। ৩ ধমনীর বংশগত রোগ। ৪. গর্ভধারণ অবস্থায় অ্যাকলাম্পসিয়া ও প্রি-অ্যাকলাম্পসিয়া হলে। ৫. অনেক দিন ধরে জন্মনিয়ন্ত্রণ বড়ির ব্যবহার, স্টেরয়েড গ্রহণ এবং ব্যথানিরামক কিছু কিছু ওষুধ সেবন করলে।

উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি কমাতে কী করা উচিত?
জীবনযাত্রার পরিবর্তন এনে উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি কমানো সম্ভব। বংশগতভাবে উচ্চ রক্তচাপ থাকলে তা কমানো সম্ভব নয়। এরকম ক্ষেত্রে যেসব উপাদান নিয়ন্ত্রণ করা যায়, সেগুলোর ব্যাপারে বেশি মনোযোগী হওয়া উচিত।

১. যাদের অতিরিক্ত ওজন, তাদের অবশ্যই ওজন কমাতে হবে। ২. খাওয়াদাওয়া নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। ৩. নিয়মিত ব্যায়াম: সকাল-সন্ধ্যা হাঁটাচলা, সম্ভব হলে দৌড়ানো, হালকা ব্যায়াম, লিফটে না চড়ে সিঁড়ি ব্যবহার ইত্যাদি। ৪. খাদ্য গ্রহণের ক্ষেত্রে সতর্কতা: কম চর্বি ও কম কোলেস্টেরলযুক্ত খাবার গ্রহণ করতে হবে। যেমন- খাশি বা গরুর গোশত, কলিজা, মগজ, গিলা, গুর্দা, কম খেতে হবে। কম তেলে রান্না করা খাবার এবং ননী তোলা দুধ, অসম্পৃক্ত চর্বি, যেমন- সয়াবিন, ক্যানোলা, ভুট্টার তেল অথবা সূর্যমুখীর তেল খাওয়া যাবে। বেশি আশযুক্ত খাবার গ্রহণ করা ভালো। আটার রুটি এবং সুজিজাতীয় খাবার পরিমাণ মতো খাওয়া ভালো। ৫. লবণ নিয়ন্ত্রণ: তরকারিতে প্রয়োজনীয় লবণের বাইরে অতিরিক্ত লবণ পরিহার করতে হবে। ৬. মদপান: অতিরিক্ত মদপান পরিহার করতে হবে। ৭. ধূমপান বর্জন: ধূমপান অবশ্যই বর্জনীয়। ধূমপায়ীর সংস্পর্শ থেকে দূরে থাকুন। তামাক পাতা, জর্দা, গুল লাগানো ইত্যাদিও পরিহার করতে হবে। ৮. ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ: যাদের ডায়াবেটিস আছে, তা অবশ্যই নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। ৯. মানসিক ও শারীরিক চাপ সামলাতে হবে: নিয়মিত বিশ্রাম, সময়মতো ঘুমানো, শরীরকে অতিরিক্ত ক্লান্তি থেকে বিশ্রাম দিতে হবে। নিজের শখের কাজ করা, নিজ ধর্মের চর্চা করা ইত্যাদির মাধ্যমে মানসিক শান্তি বেশি হবে। ১০. রক্তচাপ নিয়মিত পরীক্ষা: নিয়মিত চিকিৎসকের কাছে গিয়ে রক্তচাপ পরীক্ষা করানো উচিত। যত আগে উচ্চ রক্তচাপ ধরা পড়ে, তত আগে নিয়ন্ত্রণ করা যায় এবং জটিলতা থেকে রক্ষা পাওয়া যায়।

উচ্চ রক্তচাপ হলে কি চিকিৎসা করাতেই হবে?
উচ্চ রক্তচাপ সারে না, একে নিয়ন্ত্রণ করা যায়। এর জন্য নিয়মিত ওষুধ সেবন করতে হবে। অনেক রোগী কিছুদিন ওষুধ খাবার পর রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে এলে ওষুধ বন্ধ করে দেন, মনে করেন রক্তচাপ ভালো হয়ে গেছে, কাজেই ওষুধ খাওয়ার দরকার কী? এ ধারণা সম্পূর্ণ ভুল। কোনোক্রমেই ডাক্তারের নির্দেশ ছাড়া ওষুধ সেবন বন্ধ করা যাবে না। অনেকেই আবার উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত জানার পরেও ওষুধ খেতে অনীহা প্রকাশ করেন বা খেতে চান না। কারও কারও ধারণা, একবার ওষুধ খেলে তা আর বন্ধ করা যাবে না। আবার কেউ কেউ এমনও ভাবেন যে, উচ্চ রক্তচাপ তার দৈনন্দিন জীবনপ্রবাহে কোনো সমস্যা করছে না বা রোগের কোনো লক্ষণ নেই, তাই উচ্চ রক্তচাপের ওষুধ খেতে চান না বা প্রয়োজন মনে করেন না। তাদের ধারণা- ভালোই তো আছি, ওষুধের কী দরকার? এ ধারণাগুলো সম্পূর্ণ ভুল। এ ধরনের রোগীরাই হঠাৎ করে হৃদরোগ বা স্ট্রোকে আক্রান্ত হন, এমনকি মৃত্যুও হয়ে থাকে। মনে রাখতে হবে যারা উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত তাদের অবশ্যই ডাক্তারের পরামর্শ নিতে হবে, নিয়মিত সারা জীবন ওষুধ সেবন করতে হবে এবং নিয়মিত চেক করাতে হবে।

লেখক: ইমেরিটাস অধ্যাপক

আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় এবং ‘কোচিং সেন্টার’ বিতর্ক

প্রকাশ: ০৪ জুন ২০২৬, ০৫:১৭ পিএম
আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় এবং ‘কোচিং সেন্টার’ বিতর্ক
শাহ নিসতার জাহান

আমাদের ছেলেমেয়েরা যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ পায়; মানে, ভর্তি পরীক্ষার দৌড়ে যখন টিকে যায়, তখন কিন্তু আমরা সেটি নিয়ে খুশি থাকি এবং আনন্দের সঙ্গে অন্যকে জানাতেও পছন্দ করি। সে তুলনায়, কেউ নর্থসাউথ, ব্র্যাক বা এরকম কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছে, এমন সংবাদে খুব উৎসাহিত হতে দেখি না...

বাংলাদেশের একজন মাননীয় মন্ত্রী (জনাব ববি হাজ্জাজ) বলেছেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় একটি কোচিং সেন্টার। অবশ্য তিনি পরে তার বক্তব্য থেকে সরে গেছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা ডেটাসহ বলছেন, তাদের এবং অন্যদের কী অবস্থা। তাদের তথ্য বলছে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অনেক এগিয়ে। বিষয়টি বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। একটি বিশ্ববিদ্যালয়কে হেয় করা হয়েছে, কেউ কেউ বলছেন। আমার মনে হয়, মাননীয় মন্ত্রীর আশা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে অনেক বেশি ছিল বা আছে। সেই আকাঙ্ক্ষা পূরণ হয়নি বলে আফসোস থেকে তিনি ওই মন্তব্য করেছেন। কারণ, বাংলাদেশের মানুষ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছ থেকে অনেক আশা করে এবং সেই আশা ভঙ্গ হলে তারা আশাহত হয়। স্বাভাবিক। আবার, এই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নিয়েই তারা গর্ব করে। উদাহরণ হিসেবে বলব, আমাদের ছেলেমেয়েরা যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ পায়; মানে, ভর্তি পরীক্ষার দৌড়ে যখন টিকে যায়, তখন কিন্তু আমরা সেটি নিয়ে খুশি থাকি এবং আনন্দের সঙ্গে অন্যকে জানাতেও পছন্দ করি। সে তুলনায়, কেউ নর্থসাউথ, ব্র্যাক বা এরকম কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছে, এমন সংবাদে খুব উৎসাহিত হতে দেখি না এবং বহু ক্ষেত্রেই এটি কোনো সংবাদ নয়। এর মানে এই নয় যে, এসব বিশ্ববিদ্যালয়ের খুব গুরুত্ব নেই। নিশ্চয় আছে। তবে সেটি সাধারণ্যে অত গুরুত্ব দিয়ে কেউ বলে, অন্তত আমার জানা নেই।

দীর্ঘ সময় ধরে পাবলিক এবং প্রাইভেট, এই দ্বিবিধ লেবেল বা তকমা আমরা শুনে আসছি। সেই লেবেলের মধ্যে একটা বিশাল দেয়াল আছে, এ কথা আশা করি কেউ অস্বীকার করবেন না। আসলে, যে যার মতো কাজ করে যেতে পারলেই হলো। একটি ভালো কাজে কে এগিয়ে থাকে সেটি বিবেচ্য। সেক্ষেত্রে, যদি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের প্রকাশিত ডেটা (আমি নিজে সেই ডেটার সত্যাসত্য বলতে পারব না। কারণ, আমি সেটি দেখেছি ফেসবুকে) সঠিক হয়, তাহলে বলতে হবে, মাননীয় মন্ত্রী কিছুটা আবেগ কিংবা আশাবঞ্চিত হয়ে সেই কথা বলেছেন। তার এই আবেগকে আমি সম্মান করি। কিন্তু সমস্যা অন্য জায়গায়। যদি ধরেও নিই, মাননীয় মন্ত্রীর ডেটা সঠিক এবং ফেসবুকে যেসব কথা, দাবি উঠেছে, সেগুলো ভুল, সেক্ষেত্রে কিন্তু এ দেশের রাজনীতিকরা দায় এড়াতে পারেন না। আমরা দেখেছি, বাংলাদেশের ভিসি নিয়োগের ক্ষেত্রে কী হয়। শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে কী ঘটে। আমার অভিজ্ঞতা বলে, একজন ভিসি কেবল টেলিভিশনে যাবেন, ‘টক শো’ করবেন, সেই লোভে একটি বিভাগকেই জলাঞ্জলি দিয়েছিলেন। মোটামুটি যাকে-তাকে ধরে এনে শিক্ষক বানানো হয়েছিল। যারা শিক্ষক হয়ে এসেছেন, তারা জানেন না, একজন শিক্ষকের কাজ কী এবং এটি কেবল একটি বিভাগ কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে নয়। উদাহরণ অনেক। ভিসিদের ইচ্ছের মাত্রা বিবিধ। তাহলে, এবংবিধ যখন অবস্থা, শিক্ষকরা পড়াশোনা করবেন কেন? একজন প্রজ্ঞাবান ভিসি আমরা আশা করতে পারি কীভাবে? আমি তো দেখি, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় তাদের ‘ব্যবসা’ই জমজমাট কিংবা রমরমা, যাদের ওই অর্থে কোনো একাডেমিক কাজ বা ইচ্ছে নেই। সেই ১৯৯৬ সালে, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপক ইউসুফ আলীকে সরিয়ে দিয়েছিল তৎকালীন সরকার। কারণ, তিনি বিএনপির ভিসি। রাজনৈতিক বিবেচনায় এর আগেও হয়তো হয়েছিল নিয়োগ, কিন্তু এত উন্মুক্ত অবস্থায় নয়। তারপর থেকে শিক্ষকরা মোটামুটি ‘কুত্তা-দৌড়’ (মাফ করবেন, এই শব্দটি ব্যবহারের জন্য। তবে, আমার কাছে এর চেয়ে ভালো কোনো শব্দ আপাতত নেই) শুরু করলেন রাজনীতি মাথায় নিয়ে, শুধু পদ-পদবির (ভিসি ইত্যাদি) লোভে। সেটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরে এবং বাইরে। এটি যদি তার একাডেমিক কাজ বিবেচনায় হতো তাহলে কিন্তু কোনো কথা থাকত না, শিক্ষকরা অযথা রাজনীতি নিয়ে পড়েও থাকতেন না। এই রাজনৈতিক বিবেচনাতেই শিক্ষক নিয়োগ হয়। আমি তো দেখি বেশ কিছু শিক্ষার্থী এক্ষুনি রাজনৈতিক দৌড়ঝাঁপ করছে, কেবল শিক্ষক হওয়ার আশায়। অথচ তার কাজ ছিল, নিজেকে শিক্ষক হওয়ার জন্য উপযুক্ত করা। সেটি করছে না। কারণ, সে বুঝে গেছে কাকে দিয়ে কাজ হবে এবং এ কাজে বহু ক্ষেত্রেই ইন্ধন দিচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন, মানে সেখানে বিভিন্ন পদে বসা মানুষ। কারণ, তারাও হয়তো একই ধারায় নিয়োগপ্রাপ্ত। বিষয়টি কষ্টের।

কিছু কিছু ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা আনার জন্য, লিখিত পরীক্ষার ব্যবস্থা আছে। সেটি প্রশ্নাতীত নয়। ভাইবার কথা বাদ দিলাম। আমি বলব, শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার ক্ষেত্রে, একেবারে লেকচারার পদেই, একটি কাজ করুন না, বিজ্ঞাপনের সঙ্গে বলে দেবেন, একাডেমিক লাইন থাকা জরুরি। মানে, আবেদনের সঙ্গে অন্তত একটি প্রকাশিত আর্টিকেল থাকতে হবে। মানে, তিনি যে শিক্ষক হবেন, তার শুরু তিনি দেখিয়ে দেবেন। তাহলে, আমাদের ওই শিক্ষার্থী আর রাজনীতি নিয়ে থাকবেন না। ভিসি যতই মাথা নষ্ট করুক, এই শর্তের বাইরে যেতে পারবেন না। ফলে, লিখিত পরীক্ষা নেওয়ার দরকারও হবে না। এখন, দেখতে হবে লেখাটি কোন জার্নালে ছাপা হয়েছে। একই কথা বলব শিক্ষকদের প্রমোশনের ক্ষেত্রেও। তাদের প্রমোশন ওই জার্নালের মানের ওপর হবে। প্রয়োজনে একজন শিক্ষক কখনোই ‘অধ্যাপক’ পদের যোগ্য হবেন না। বিদেশে বহু উদাহরণ আছে, সিনিয়র লেকচারার থেকেই অবসরে। আমরা কেন পারব না? সেজন্য একটি মানদণ্ড থাকতে হবে। তখন বহু শিক্ষকের হম্বিতম্বি বন্ধ হয়ে যাবে। তারা গবেষণায় মন দেবেন নয়তো ছিটকে পড়বেন। কিন্তু মাননীয় মন্ত্রী, সেটি কি করতে পারবেন? চেষ্টা করলে পারতেন; কিন্তু করবেন কি না জানি না। কাজটি ঘটাতে পারলে, ঢাকা কেন, বাংলাদেশের কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাপারেই আপনার হতাশা থাকত না। কিছুদিন আগে আমি একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘প্রমোশনাল নিয়োগ বোর্ডে’ গিয়েছিলাম। তাদের আকাঙ্ক্ষা আমার কাছে ভালো লাগল। অন্তত দুটি লেখা Scopus Indexed জার্নালে প্রকাশিত না হলে তারা পদোন্নতি আটকে দিচ্ছেন। শর্ত দিচ্ছেন, পদোন্নতি পেতে হলে, প্রার্থীকে ওই জাতীয় জার্নালে লেখা প্রকাশ করতে হবে এবং ক্ষেত্রবিশেষ একক লেখা। করুন না ওই নিয়ম ঢাকা, জগন্নাথ, জাহাঙ্গীরনগর কিংবা অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে। দেখবেন, আপনি আর কাউকে ‘কোচিং সেন্টার’ বলতে পারবেন না। শিক্ষকরা আত্মমর্যাদাবোধ করবেন। কিন্তু সে ব্যাপারে রাষ্ট্রেরও কিছু দায়িত্ব নিতে হবে আপাতত। পরে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো নিজেই ঠিক হয়ে যাবে। আমাদের প্রধানমন্ত্রী এই কিছুদিন আগেই অনেকটা হতাশার কথা বলেছিলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকদের নিয়োগ নিয়ে। আমি আশা করি, এ ব্যাপারে তাহলে তার আগ্রহের কমতি নেই। দেশকে ফেরানোর একটি বড় ইচ্ছা আমরা তার মধ্যে দেখছি। সেটি তার চলাফেরা এবং কথাবার্তায় অপ্রকাশ্য থাকে না। বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের সঙ্গে মিশে গেছেন তিনি। আপনাদের পক্ষে তাই বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে নতুন নীতিমালা তৈরি করে ফেলা অসম্ভব নয়। শুধু একবার এই কাজটি করে ফেলতে পারলে, কিছু শিক্ষক অবশ্য অসন্তুষ্ট হবেন। কিন্তু বহু শিক্ষক খুশি হবেন (আমি আশা করি এই শ্রেণিটিই আপনাকে হতাশামুক্ত করবে এবং করে যাচ্ছে)। আপনি তখন কাউকে ‘কোচিং সেন্টার’ বলতে পারবেন না; কিংবা বললেও তারা গায়ে মাখবেন না। কারণ, আপনার কথা তখন হাস্যকর মনে হবে সবার কাছে। সেখানেই আপনার তৃপ্তি আসবে। বাংলাদেশ নামের রাষ্ট্র আমার এই কথাগুলো সত্যি ভাববে কি? 

লেখক: অধ্যাপক, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ; চেয়ারপারসন, ফিল্ম অ্যান্ড টেলিভিশন বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা

পাসপোর্ট ও বিদেশযাত্রার প্রক্রিয়া সহজ করতে হবে

প্রকাশ: ০৪ জুন ২০২৬, ০৫:০৬ পিএম
পাসপোর্ট ও বিদেশযাত্রার প্রক্রিয়া সহজ করতে হবে
ড. খলিলুর রহমান

যখন নাগরিকরা নিজেদের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকেই ভয় করতে শুরু করে, তখন কোনো জাতি এগোতে পারে না। সরকার জনগণের সেবা করার জন্য–ভয় দেখানোর জন্য নয়। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর কাজ মানুষের মধ্যে আস্থা, ন্যায়বিচার ও বিশ্বাস সৃষ্টি করা; আতঙ্ক ও সন্দেহ নয়।...

পাসপোর্ট পাওয়ার অধিকার কোনো রাজনৈতিক অনুগ্রহ নয়; এটি নাগরিকত্বের একটি মৌলিক অধিকার। পাসপোর্ট শুধু বিদেশ ভ্রমণের নথি নয়–এটি একজন নাগরিকের পরিচয়, জাতীয়তা এবং নিজের রাষ্ট্রের প্রতি তার বৈধ সম্পর্কের স্বীকৃতি। যখন কোনো সরকার রাজনৈতিক পরিচয়, সন্দেহ বা প্রশাসনিক পক্ষপাতের ভিত্তিতে এই অধিকার প্রয়োগ করে, তখন তা ন্যায়বিচার, সমতা ও গণতান্ত্রিক শাসনের মূল ভিত্তিকেই দুর্বল করে দেয়।

গত রাতে আমার এক ঘনিষ্ঠ ব্যক্তির ফোন পেলাম, যাকে আমি কয়েক দশক ধরে চিনি। তিনি সততা, নিষ্ঠা ও আন্তরিকতার সঙ্গে চার দশক ধরে দেশসেবা করে আসছেন। তিনি তার কূটনৈতিক পাসপোর্ট জমা দিয়ে নতুন বাংলাদেশি পাসপোর্ট পাওয়ার জটিলতা নিয়ে আমার সহায়তা চাচ্ছিলেন। তার অভিজ্ঞতা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং এটি এমন একটি উদ্বেগজনক প্রবণতার প্রতিফলন, যা ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অনির্বাচিত প্রশাসনের সময়ে ব্যাপকভাবে দেখা গিয়েছিল।

বিষয়টির বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে যাওয়ার আগে একটি বাস্তবতা স্বীকার করা জরুরি। দীর্ঘদিন ধরে ধারাবাহিক সরকারগুলো কূটনৈতিক পাসপোর্টের মর্যাদা ও গুরুত্বকে ক্ষুণ্ন করেছে। অনেকে পেশাগতভাবে কূটনৈতিক পাসপোর্ট পাওয়ার যোগ্য ছিলেন না কিংবা পেশাদার কূটনীতিক ছিলেন না, তাদেরও এই সুবিধা দেওয়া হয়েছে। এর ফলে ঐতিহ্যগতভাবে রাষ্ট্রের প্রতিনিধিত্বকারী কূটনীতিকদের জন্য সংরক্ষিত এই নথির গুরুত্ব ও মর্যাদা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। গত রাতে যিনি আমার সহায়তা চেয়েছিলেন, তিনিও কূটনৈতিক সেবার বাইরে থেকেও কূটনৈতিক পাসপোর্ট পেয়েছিলেন তার রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালনের জন্য।

তবে কূটনৈতিক পাসপোর্টের অপব্যবহার সংশোধনের নামে কোনো নাগরিককে সাধারণ পাসপোর্ট থেকে বঞ্চিত করা কখনোই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। যেকোনো বাংলাদেশি নাগরিক, যার বিরুদ্ধে কোনো ফৌজদারি দণ্ড বা আইনি নিষেধাজ্ঞা নেই, তার সমানভাবে পাসপোর্ট পাওয়ার অধিকার রয়েছে। এটি শুধু প্রশাসনিক বিষয় নয়; এটি সাংবিধানিক ও মানবাধিকারসংক্রান্ত প্রশ্ন।

দুঃখজনকভাবে, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় এমন কিছু চর্চা গড়ে ওঠে, যা দেখে মনে হয়েছে পূর্ববর্তী সরকারে কাজ করেছেন বা একসময় কূটনৈতিক পাসপোর্ট ধারণ করেছেন এমন ব্যক্তিদের শাস্তি দেওয়ার মানসিকতা কাজ করেছে। বহু সম্মানিত সরকারি কর্মকর্তা, পেশাজীবী, শিক্ষাবিদ ও অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে এক ধরনের অলিখিত সন্দেহ ও বঞ্চনার শিকার হতে হয়েছে। আইন ও বিধিমালার ভিত্তিতে আবেদন মূল্যায়নের পরিবর্তে রাজনৈতিক পরিচিতি ও ইচ্ছাকৃত প্রশাসনিক জটিলতা সৃষ্টি করা হয়েছে।

আরও দুঃখজনক হলো, ড. ইউনূস ও তার অনির্বাচিত প্রশাসন সমাজে বিভাজন সৃষ্টির রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েছিল। মানুষকে পাশাপাশি দাঁড়াতে উৎসাহিত করার পরিবর্তে একে অপরের বিরুদ্ধে দাঁড় করানোর প্রবণতা তারা উৎসাহিত করেছে।

আমি নিজেও ব্যক্তিগতভাবে এসব চর্চার প্রভাব প্রত্যক্ষ করেছি এবং একজন ভুক্তভোগী। শত শত মানুষ পাসপোর্ট পেতে অপ্রয়োজনীয় বিলম্ব, জটিলতা ও অপমানজনক আচরণের শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক হয়ে ওঠে, যখন সাবেক কূটনৈতিক পাসপোর্টধারীদের সাধারণ পাসপোর্ট প্রক্রিয়ায়ও জাতীয় নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর অস্বাভাবিক সম্পৃক্ততা যোগ করা হয়। এতে বৈধ নিরাপত্তা উদ্বেগ ও রাজনৈতিক নজরদারির সীমারেখা অস্পষ্ট হয়ে পড়ে।

অন্যদিকে, ড. ইউনূস ও তার ঘনিষ্ঠদের আমলে পাসপোর্ট দেওয়ার ক্ষেত্রে প্রচলিত পুলিশ ভেরিফিকেশন ব্যবস্থা বাতিল করা হয়, যা একটি বিতর্কিত সিদ্ধান্ত হিসেবে সমালোচিত হয়েছিল। যদিও অনেক নাগরিক আমলাতান্ত্রিক হয়রানি কমার কারণে এটিকে স্বাগত জানিয়েছিলেন। তবু ক্রমে অভিযোগ ওঠে যে, অতিরিক্ত শিথিলতা অপব্যবহারের সুযোগ তৈরি করেছে। এমনো অভিযোগ সামনে আসে যে, পর্যাপ্ত যাচাই ছাড়াই বাংলাদেশে অবস্থানরত অনাগরিক বা বাস্তুচ্যুত ব্যক্তিদের পাসপোর্ট দেওয়া হয়েছে।

কানাডায় বাংলাদেশের হাইকমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতা থেকে আমি বলতে পারি দক্ষতা ও জাতীয় নিরাপত্তার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা কতটা গুরুত্বপূর্ণ। একটি পাসপোর্ট আন্তর্জাতিকভাবে রাষ্ট্রের সার্বভৌম নিশ্চয়তার প্রতীক। এর বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষুণ্ন হলে তার প্রভাব শুধু অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও দেশের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আজ বিভিন্ন দেশের বাংলাদেশি পাসপোর্টধারীদের ভিসা নাকচ হওয়ার ঘটনা এর একটি অন্যতম নিদর্শন। শুধু ভিসা প্রাপ্তিতে প্রতিবন্ধকতা নয়, দুর্বল যাচাই ব্যবস্থা প্রকৃত বাংলাদেশি নাগরিকদের বিদেশযাত্রা কঠিন করে তুলতে পারে এবং রাষ্ট্রকে কূটনৈতিক ও নিরাপত্তাজনিত ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে।

ড. ইউনূসের অপশাসনের সময় আরেকটি উদ্বেগজনক বিষয় ছিল বিমানবন্দরে যাত্রীদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার ও অন্যায় আচরণ। অভিযোগ রয়েছে, বিশেষ করে যারা আগে কূটনৈতিক পাসপোর্ট ধারণ করেছেন বা সরকারি দায়িত্বে ছিলেন, তাদের অনেককে বিভিন্ন সংস্থার কর্মকর্তারা অপ্রয়োজনীয় জিজ্ঞাসাবাদ, বিলম্ব এবং ভীতিকর পরিস্থিতির মুখোমুখি করেছেন। অনেক ক্ষেত্রে বৈধ নিরাপত্তা উদ্বেগ ছাড়াই যাত্রীদের যাত্রা বিলম্বিত বা আটকে দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে।

এর চেয়েও উদ্বেগজনক ছিল গণমাধ্যমের কিছু অংশের ভূমিকা। বিমানবন্দরের এসব ঘটনার পর কিছু যাত্রীকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও চাঞ্চল্যকর সংবাদ পরিবেশনের মাধ্যমে জনসমক্ষে সন্দেহভাজন হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। অনেক শিরোনাম ও প্রতিবেদন এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে, যাতে নিরপেক্ষ তথা উপস্থাপনের চেয়ে ব্যক্তি বিশেষকে হেয় প্রতিপন্ন করার প্রবণতা বেশি ছিল। এটি শুধু পেশাগত নীতির পরিপন্থী নয়; বরং সমাজে ভয় ও বিভাজনের সংস্কৃতি তৈরি করে।

যখন নাগরিকরা নিজেদের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকেই ভয় করতে শুরু করে, তখন কোনো জাতি এগোতে পারে না। সরকার জনগণের সেবা করার জন্য–ভয় দেখানোর জন্য নয়। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর কাজ মানুষের মধ্যে আস্থা, ন্যায়বিচার ও বিশ্বাস সৃষ্টি করা; আতঙ্ক ও সন্দেহ নয়। এই প্রেক্ষাপটে ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারির সংসদ নির্বাচন বহু নাগরিকের মধ্যে স্বস্তি ও নতুন আশার সঞ্চার করেছে। নির্বাচিত রাজনৈতিক সরকারের প্রত্যাবর্তনকে অনেকে ড. ইউনূসের অনির্বাচিত প্রশাসনের বিতর্কিত চর্চাগুলো থেকে বেরিয়ে আসার সুযোগ হিসেবে দেখেছেন। এটি উৎসাহব্যঞ্জক যে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার এসব বিষয়ে কিছু ইতিবাচক পদক্ষেপ নিয়েছে বলে জানা যাচ্ছে। সাবেক কূটনৈতিক পাসপোর্টধারীদের প্রতি তুলনামূলক মানবিক ও বাস্তবসম্মত দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ এবং বিমানবন্দরে অপ্রয়োজনীয় হয়রানি কমানোর উদ্যোগ প্রশংসার দাবিদার।

বিশেষ করে ব্যক্তিগতভাবে আমি সন্তুষ্ট যে, এই উন্নয়নগুলো বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নেতৃত্বে হচ্ছে, যিনি ঘটনাচক্রে আমারই সিভিল সার্ভিস ব্যাচের কর্মকর্তা ছিলেন এবং প্রশাসনিক বাস্তবতা ও নাগরিক মর্যাদার গুরুত্ব সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা রাখেন। কার্যকর শাসনের জন্য শুধু ক্ষমতা নয়; প্রয়োজন প্রজ্ঞা, সংযম ও মানবিকতা।

তবে সংস্কার অর্ধেক পথে থেমে থাকলে চলবে না। বাংলাদেশ এখন এমন একটি আধুনিক, জবাবদিহিমূলক ও অধিকারভিত্তিক পাসপোর্ট ও অভিবাসন ব্যবস্থা গড়ে তোলার সুযোগ পেয়েছে, যা জাতীয় নিরাপত্তা ও গণতান্ত্রিক স্বাধীনতার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করবে। এ ধরনের ব্যবস্থার জন্য কয়েকটি মৌলিক নীতি জরুরি।

প্রথমত, রাজনৈতিক পরিচয়, পেশাগত পটভূমি বা অতীত সরকারি সম্পৃক্ততা নির্বিশেষে সব নাগরিককে সমানভাবে বিবেচনা করতে হবে।

দ্বিতীয়ত, নিরাপত্তা যাচাইয়ের প্রক্রিয়াকে অনানুষ্ঠানিক রাজনৈতিক বিবেচনার পরিবর্তে সুস্পষ্ট আইনি কাঠামোর মধ্যে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে হবে।

তৃতীয়ত, বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকে পেশাদারত্ব ও সংযমের সঙ্গে কাজ করতে হবে, যাতে বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ ছাড়া কোনো যাত্রী হয়রানির শিকার না হন।

চতুর্থত, বাংলাদেশি পাসপোর্টের মর্যাদা ও বিশ্বাসযোগ্যতা রক্ষায় পূর্বের যথাযথ যাচাই ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে, যাতে অ-নাগরিকরা পাসপোর্ট না পায় বা পাসপোর্ট দেওয়ার ক্ষেত্রে অপব্যবহার রোধ করা যায়, আবার প্রকৃত নাগরিকরাও হয়রানির শিকার না হন।

সবশেষে, গণমাধ্যমকে আরও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে এবং রাজনৈতিক প্রতিহিংসা বা চরিত্র হননের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে।

সম্ভবত ড. ইউনূসের অনির্বাচিত প্রশাসনের সবচেয়ে ক্ষতিকর উত্তরাধিকার ছিল নাগরিকদের মধ্যে বিভাজন সৃষ্টি। তাদের সবচেয়ে বড় মেটিকুলাস ডিজাইন ছিল সমাজে মানুষকে সহনাগরিক নয়, প্রতিপক্ষ হিসেবে দেখতে শেখানো। তবে এটি স্বস্তিদায়ক যে, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সরকারের সময় সেই বিভাজনের রাজনীতি ধীরে ধীরে অবসানের দিকে যাচ্ছে। গণতন্ত্রে রাজনৈতিক মতপার্থক্য স্বাভাবিক; কিন্তু সন্দেহ, প্রতিশোধ ও সংঘাতনির্ভর শাসনব্যবস্থা জাতীয় ঐক্যকে দুর্বল করে।

বাংলাদেশ ইতোমধ্যে দীর্ঘ রাজনৈতিক মেরূকরণের জন্য বড় মূল্য দিয়েছে। এখন দেশের প্রয়োজন পুনর্মিলন, প্রাতিষ্ঠানিক ন্যায়বিচার এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের পুনঃপ্রতিষ্ঠা। নাগরিকদের উচিত জাতি গঠনের কাজে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দাঁড়ানো, মুখোমুখি সংঘাতে নয়।

যেকোনো সরকারের দায়িত্ব শুধু আইন পরিচালনা নয়; সামাজিক আস্থা ও জাতীয় সংহতি রক্ষা করাও। যখন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে রাজনৈতিক প্রতিশোধের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়, তখন ক্ষতিগ্রস্ত হয় গণতন্ত্র ও রাষ্ট্রের বিশ্বাসযোগ্যতা উভয়ই।

এখন জাতির প্রত্যাশা বাংলাদেশ আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক, মানবিক ও গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক সংস্কৃতির দিকে এগিয়ে যাবে; যেখানে নাগরিক অধিকার সম্মানিত হবে, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান নিরপেক্ষ থাকবে এবং প্রশাসন দলীয় স্বার্থের পরিবর্তে জাতীয় স্বার্থে কাজ করবে।

পরিশেষে, পাসপোর্ট কখনোই রাজনৈতিক অস্ত্র হওয়া উচিত নয়। এটি হওয়া উচিত সেই প্রতীক, যা প্রতিটি বাংলাদেশির নাগরিকত্ব, মর্যাদা ও সমঅধিকারের প্রতিনিধিত্ব করে।

লেখক: সাবেক রাষ্ট্রদূত ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব

বৃদ্ধার করুণ মৃত্যু মানবিক ও মানসিক স্বাস্থ্য ভয়াবহ সংকটে

প্রকাশ: ০৩ জুন ২০২৬, ১১:২৮ এএম
মানবিক ও মানসিক স্বাস্থ্য ভয়াবহ সংকটে
মনিরা রহমান

এই ঘটনা আমাদের সমাজের মানবিক মূল্যবোধের গভীর অবক্ষয়কে সামনে নিয়ে এসেছে। এখানে অর্থনৈতিক সংকট, শিক্ষার অভাব বা সামাজিক অক্ষমতার কোনো অজুহাত নেই। সন্তানরা শিক্ষিত ও প্রতিষ্ঠিত হওয়া সত্ত্বেও যদি একজন অসুস্থ, বয়স্ক মায়ের খোঁজ না নেন, তাহলে প্রশ্ন ওঠে মানবিকতা ও পারিবারিক দায়বদ্ধতার জায়গায় এসব কী ঘটছে!

শিশু অবস্থায় যেমন মা-বাবা সন্তানের যত্ন নেন, তেমনি বার্ধক্যে মা-বাবার দেখাশোনা করা সন্তানের নৈতিক দায়িত্ব। সাত দিন ধরে একজন মা মৃত অবস্থায় পড়ে থাকলেন, কেউ ফোনও করল না, এটি এক ধরনের চরম অবহেলা, যা সামাজিক অপরাধের পর্যায়ে পড়ে। এ ধরনের সামাজিক অপরাধ দমনে আইনের যথাযথ প্রয়োগ এবং রাষ্ট্রীয় পদক্ষেপ জরুরি।

বর্তমানে সমাজে সহমর্মিতা ও পারিবারিক বন্ধন দুর্বল হয়ে পড়ছে। আমরা একের পর এক সহিংসতা, নির্মমতা ও ট্রমার মধ্যে বসবাস করছি, যার প্রভাব মানুষের মানসিকতা ও আচরণে পড়ছে। ফলে অনেকেই আত্মকেন্দ্রিক হয়ে উঠছেন এবং অন্যের কষ্টের প্রতি সংবেদনশীলতা হারাচ্ছেন।

এই ঘটনার সঙ্গে জড়িত সন্তানরা মানসিক ও সামাজিক বিকাশের প্রক্রিয়াগত গবেষণার বিষয় হয়ে গেছেন। কারণ, মানুষ কীভাবে এমন পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে যেখানে নিজের মায়ের প্রতিও ন্যূনতম সহমর্মিতা থাকে না, বোঝা জরুরি। এ ছাড়া পরিবার, শিক্ষা ও সমাজে নৈতিকতা, সহমর্মিতা ও দায়িত্ববোধের চর্চা বাড়ানো এবং প্রবীণদের সুরক্ষায় রাষ্ট্রীয়ভাবে জবাবদিহি ও কার্যকর সেবাব্যবস্থা গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি।

- মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ এবং নির্বাহী প্রধান, ওয়েলবিং ফাউন্ডেশন

বৃদ্ধার করুণ মৃত্যু এ ঘটনা গভীর মূল্যবোধ সংকটের বহিঃপ্রকাশ

প্রকাশ: ০৩ জুন ২০২৬, ১১:১৭ এএম
এ ঘটনা গভীর মূল্যবোধ সংকটের বহিঃপ্রকাশ
অধ্যাপক সালমা আক্তার

একা ঘরে মায়ের মৃত্যু, দীর্ঘ সময় সন্তানদের খোঁজ না নেওয়ার ঘটনা–এটা কোনো বিচ্ছিন্ন পারিবারিক দুর্ঘটনা নয়। বরং এটি সমাজের গভীর মূল্যবোধগত সংকটের বহিঃপ্রকাশ। একজন যুগ্ম সচিব, একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক বা অন্য কোনো উচ্চপদস্থ পেশাজীবী হওয়া বড় পরিচয় নয়, বড় পরিচয় হলো একজন মানুষ হিসেবে আপনি কতটা দায়িত্বশীল। একজন অসুস্থ, শয্যাশায়ী মায়ের খোঁজ যদি সন্তানেরা না নেয়, তা শুধু পারিবারিক ব্যর্থতা নয়, মানবিকতারও ব্যর্থতা।

আমরা এখন কী দেখছি? অভিভাবকরা সন্তানদের সফল মানুষ বানাতে ব্যস্ত, কিন্তু ভালো মানুষ হিসেবে গড়ে ওঠার শিক্ষা দিতে তারা ব্যর্থ। কারণ বর্তমানে সমাজে সন্তানের সাফল্যকে মাপা হয় তার চাকরি, আয়, ডিগ্রি কিংবা সামাজিক অবস্থান দিয়ে। কিন্তু মানবিকতা, দায়িত্ববোধ ও পারিবারিক সম্পর্কের মূল্যবোধ শেখানোর ক্ষেত্রে পরিবার ও সমাজ উভয়েই পিছিয়ে পড়ছে। 

কর্মসংস্থানের বিস্তার, নগরায়ণ এবং মানুষের গড় আয়ু বৃদ্ধির ফলে যৌথ পরিবার ভেঙে যাচ্ছে। একই সঙ্গে সন্তানদের ছোটবেলা থেকেই প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশে বড় করা হচ্ছে। বাবা-মায়ের প্রধান লক্ষ্য হয়ে উঠেছে সন্তানকে ভালো স্কুলে পড়ানো, বিদেশে পাঠানো কিংবা উচ্চপদে প্রতিষ্ঠিত করা। কিন্তু তাকে একজন সংবেদনশীল ও দায়িত্বশীল মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার বিষয়টি অনেক ক্ষেত্রেই উপেক্ষিত থেকে যাচ্ছে।

সামাজিক এই সমস্যার শিকড় অনেক গভীরে প্রোথিত। তাই এর সমাধানও সহজ নয়। তবে শিক্ষাব্যবস্থায় নৈতিকতা, পারিবারিক মূল্যবোধ ও সামাজিক দায়বদ্ধতাকে আরও গুরুত্ব দিতে হবে। পাশাপাশি গণমাধ্যম, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে মানবিক সম্পর্কের গুরুত্ব নিয়ে সচেতনতা তৈরিতে ভূমিকা রাখতে হবে। বৃদ্ধ বাবা-মায়ের দেখভাল নিশ্চিত করতে রাষ্ট্র চাইলে কিছু আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা নিতে পারে। কারণ সমাজে মানবিকতা ও নৈতিকতার চর্চা না বাড়লে এমন মর্মান্তিক ঘটনা ভবিষ্যতেও ঘটতেই থাকবে।

- অধ্যাপক, সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

বৃদ্ধার করুণ মৃত্যু বিচারহীনতার সংস্কৃতিতে এ রকম ঘটনা বাড়ছে

প্রকাশ: ০৩ জুন ২০২৬, ১১:১২ এএম
আপডেট: ০৩ জুন ২০২৬, ১১:১৭ এএম
বিচারহীনতার সংস্কৃতিতে এ রকম ঘটনা বাড়ছে
অ্যাডভোকেট মনজিল মোরসেদ

সমাজে পারিবারিক ও সামাজিক বন্ধন ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়ছে, যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। কারণ একজন মা ঘরে একা মারা যাওয়ার পর দীর্ঘ সময় ধরে লাশ পড়ে থাকা এবং সন্তানদের কারোর খোঁজ না নেওয়া শুধু পারিবারিক ব্যর্থতা নয়, এটি সামগ্রিক সামাজিক অবক্ষয়েরও প্রতিফলন। 

সামাজিক সম্প্রীতি ও পারিবারিক সম্পর্কের ভিত্তি দুর্বল হয়ে যাওয়ার পেছনে রাষ্ট্রেরও দায় রয়েছে। পরিবার ও সমাজের বন্ধনকে শক্তিশালী রাখতে কার্যকর উদ্যোগের ঘাটতি রয়েছে। গত দেড় বছরে বিভিন্ন অনিয়ম, অস্থিরতা, সহিংসতা এবং সামাজিক শৃঙ্খলার অবনতির কারণে মানুষের মানসিক জগতে নেতিবাচক পরিবর্তন এসেছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে সমাজের বিভিন্ন স্তরে যে অসহিষ্ণুতা ও সহিংস আচরণ দেখা গেছে, তা মানুষের মূল্যবোধ ও পারস্পরিক দায়বদ্ধতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।

আসলে আইন থাকলেই অপরাধ কমে না। অপরাধ কমে যখন বিচার দ্রুত ও নিশ্চিত হয়। বাংলাদেশে বিচার-প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা এবং বিচার পাওয়ার অনিশ্চয়তা মানুষের মধ্যে আইনের প্রতি আস্থা কমিয়ে দিয়েছে। ফলে অপরাধ বা দায়িত্বহীন আচরণের ক্ষেত্রেও অনেকের মধ্যে ভয় কাজ করে না।

কোনো অপরাধের বিচার যদি ১৫-২০ বছর পর হয়, তাহলে তা সমাজের জন্য কার্যকর বার্তা হয়ে উঠতে পারে না। অপরাধ সংঘটনের এক-দুই বছরের মধ্যেই বিচার ও শাস্তি নিশ্চিত করা গেলে তা অন্যদের জন্য শিক্ষা এবং সতর্কবার্তা হিসেবে কাজ করে। এ জন্য বিচারব্যবস্থার জটিলতা দূর করতে সরকারের দীর্ঘমেয়াদি ও সমন্বিত মহাপরিকল্পনা প্রয়োজন।

সামাজিক অবক্ষয়, পারিবারিক বন্ধনের দুর্বলতা এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতি দূর করতে না পারলে এ ধরনের মর্মান্তিক ঘটনা আরও বাড়বে। তাই এখনই সরকারকে সামাজিক শৃঙ্খলা পুনর্গঠন এবং দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে প্রয়োজন রাষ্ট্রের কার্যকর পদক্ষেপ। 

- সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী এবং হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশের (এইচআরপিবি) সভাপতি