ডিজিটাল জীবনে আমরা এখন এমন এক পর্যায়ে এসে দাঁড়িয়েছি যেখানে ব্যাংকিং, কেনাকাটা, যোগাযোগ ইত্যাদি সব কিছুই ইন্টারনেট ছাড়া কল্পনা করা যায় না। ঘরে বসেই টাকা পাঠানো, অনলাইনে বাজার করা কিংবা চাকরির জন্য আবেদন, সবকিছু হাতের মুঠোয়। কিন্তু সুবিধার এই দ্রুত সম্প্রসারণের সঙ্গে সঙ্গে বেড়েছে আরেকটি বড় ঝুঁকি, 'ডিজিটাল প্রতারণা'। আমাদের দেশে গত কয়েক বছরে অনলাইনভিত্তিক আর্থিক প্রতারণার পরিমাণ অনেক বেড়েছে। কেউ গিফট ডেলিভারির নামে টাকা হারাচ্ছেন, কেউ ভুয়া ট্রেডিং প্ল্যাটফর্মে বিনিয়োগ করে সর্বস্ব খুইয়েছেন, আবার কেউ বিভিন্ন কর্মকর্তার পরিচয়ে ফোন কল পেয়ে নিজের অ্যাকাউন্টই প্রতারকের হাতে তুলে দিয়েছেন।
ইন্টারনেট ব্যবহারের বিস্তার যেমন বাড়ছে, প্রতারণার ধরন ততই বহুমুখী হচ্ছে। দেশে এখন কোটি কোটি মানুষ স্মার্টফোন ব্যবহার করছেন, কিন্তু তাদের অনেকেই প্রযুক্তির নিরাপত্তা সম্পর্কে অজ্ঞ। প্রতারক চক্র এটি ভালোভাবেই জানে এবং সেই সুযোগেই বিভিন্ন ফাঁদ তৈরি করছে। ফেসবুক বা ইনস্টাগ্রামের মতো প্ল্যাটফর্মে ভুয়া আইডি তৈরি করে বিদেশি সেনা কর্মকর্তা, করপোরেট ব্যক্তি, চিকিৎসক বা ব্যবসায়ীর ছদ্মবেশে যোগাযোগ করা আজ খুবই সাধারণ ঘটনা। শুরুতে বন্ধুত্ব, তারপর আবেগের সেতু, শেষে ‘গিফট পাঠিয়েছি’ বলে কাস্টমস চার্জ বা কুরিয়ার ফি আদায়। একইভাবে অনলাইন শপিংয়ের নামে টাকা নেওয়ার পর পণ্য না পাঠানোর ঘটনাও নিত্যদিন ঘটছে। এসব প্রতারণার শিকার হচ্ছেন মূলত নতুন ইন্টারনেট ব্যবহারকারী, তরুণ চাকরিপ্রত্যাশী ও প্রযুক্তিতে অপরিচিত বয়স্ক মানুষ।
ফিশিং লিংক এখন সবচেয়ে বড় বিপদ। এসএমএস কিংবা মেসেঞ্জারে এমন বার্তা পাঠানো হয়—'আপনার অ্যাকাউন্ট ব্লক হয়ে যাবে', 'বিকাশে টাকা এসেছে', 'পুরস্কার জিতেছেন' ইত্যাদি। বার্তার সঙ্গে যুক্ত লিংকে ক্লিক করতেই ব্যক্তিগত তথ্য চলে যায় প্রতারকের হাতে।
আরেক ধরনের প্রতারণা চলছে হাই রিটার্ন ইনভেস্টমেন্টের নামে। ক্রিপ্টো, ফরেক্স বা কোনো অপরিচিত ট্রেডিং অ্যাপে 'মাত্র ১০ দিনে দ্বিগুণ লাভ' দেখিয়ে প্রতারক চক্র মানুষের লোভকে কাজে লাগায়। প্রথমে সামান্য লাভ দেখিয়ে আস্থার পরিবেশ তৈরি করে, এরপর বড় অঙ্কের টাকা নেওয়ার পর প্ল্যাটফর্ম উধাও হয়ে যায়। চাকরি প্রতারণাও কম নয়; ঘরে বসে উচ্চ বেতনের কাজ কিংবা বিদেশে মোটা বেতনের চাকরির আশ্বাস দিয়ে অগ্রিম টাকা আদায় করা এখন সাধারণ ঘটনা।
প্রশ্ন হচ্ছে, আমরা কেন এমন প্রতারণায় পড়ে যাই? প্রথমত, দ্রুত লাভের আশায় মানুষ সবচেয়ে বেশি দুর্বল হয়ে পড়ে। 'সহজে টাকা আসবে', এমন লোভ তৈরি হলে প্রতারকদের কৌশল সফল হওয়া সহজ হয়। দ্বিতীয়ত, প্রযুক্তি সম্পর্কে অজ্ঞতা। অনেকেই জানেন না যে, ব্যাংক বা মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস কখনোই ফোনে পিন, পাসওয়ার্ড বা ওটিপি চায় না। তৃতীয়ত, সামাজিক লজ্জা। অনেকে প্রতারণার শিকার হওয়ার পর সেটি প্রকাশ করেন না, ফলে প্রতারকরা আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো যাচাই না করে বিশ্বাস করার প্রবণতা। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম কিছু দেখলেই অনেকে সেটিকে সত্য বলে ধরে নেন।
এই সব প্রতারণা রোধের প্রথম শর্ত হলো সচেতনতা। যে কোনো আর্থিক লেনদেনের ক্ষেত্রে মৌলিক কিছু নিয়ম অবশ্যই মনে রাখতে হবে, যেমন, অপরিচিত লিংকে ক্লিক করা যাবে না, ফোনে কোনো গোপন তথ্য দেওয়া যাবে না, অনলাইন শপ থেকে কেনাকাটা করার আগে ঠিকানা ও রিভিউ যাচাই করতে হবে এবং ক্যাশ অন ডেলিভারি নেওয়া উত্তম। বিনিয়োগের ক্ষেত্রেও কাঙ্ক্ষিত লাভ যদি অস্বাভাবিকভাবে বেশি মনে হয়, তবে বুঝতে হবে এটি ঝুঁকিপূর্ণ; বরং প্রতারণা হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। পরিবারের বয়স্ক সদস্য বা স্কুল-কলেজ পড়ুয়া তরুণদেরও এসব সম্পর্কে সচেতন হওয়া জরুরি, কারণ প্রতারকরা তাদেরকেই সহজ টার্গেট হিসেবে দেখে।
ডিজিটাল নিরাপত্তা এখন শুধু ব্যক্তিগত চ্যালেঞ্জ নয়, সামাজিক চ্যালেঞ্জও। স্কুল-কলেজে ডিজিটাল লিটারেসি শিক্ষা চালু করা দরকার, যাতে শিশু-কিশোররা ছোটবেলা থেকেই অনলাইন নিরাপত্তা সম্পর্কে জানতে পারে। নিয়মিত আলোচনা হওয়া উচিত— ব্যাংকিং অ্যাপ কীভাবে ব্যবহার করতে হয়, কোন বার্তা বৈধ আর কোনটি সন্দেহজনক। স্থানীয় প্রশাসন, ব্যাংক ও এনজিও যৌথভাবে সচেতনতামূলক কার্যক্রম চালালে সাধারণ মানুষ আরও সতর্ক হবে। প্রতারণার শিকার হলে লজ্জা না পেয়ে সঙ্গে সঙ্গে রিপোর্ট করা জরুরি; কারণ দ্রুত পদক্ষেপ নিলে টাকা ফেরত পাওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেড়ে যায়।
আমাদের সামনে আরও বড় চ্যালেঞ্জ আসছে, সেটা হলো 'এআই' প্রযুক্তির অপব্যবহার। ইতোমধ্যেই ডিপফেক প্রযুক্তি ব্যবহার করে কারও কণ্ঠ বা মুখ নকল করে প্রতারণা করা শুরু হয়েছে। পরিচিত কারও কণ্ঠে ফোন এসে টাকা চাইলে অনেকেই বিভ্রান্ত হয়ে পড়ছেন। ভবিষ্যতে এ ধরনের প্রতারণা আরও বাড়বে। তাই প্রযুক্তি যত উন্নত হবে, আমাদের সতর্কতাও তত বাড়াতে হবে।
ইন্টারনেট আমাদের জীবনকে সহজ করেছে, কিন্তু সেই সঙ্গে উন্মুক্ত করে দিয়েছে নানা ঝুঁকিও। ডিজিটাল প্রতারণা ঠেকানোর শক্তি প্রথমে ব্যক্তি পর্যায় থেকেই আসতে হবে। আমরা প্রত্যেকে যদি সচেতন হই, প্রতারকদের ফাঁদ অনেকটাই রুখে দেওয়া সম্ভব। নিরাপদ ডিজিটাল জীবন শুধু ব্যক্তির নয়, পরিবারের, সমাজের এবং দেশের আর্থিক নিরাপত্তার জন্যও অপরিহার্য। ইন্টারনেট ব্যবহার বেশি হবে, এটাই স্বাভাবিক; কিন্তু তার সঙ্গে বাড়তে হবে সচেতনতা ও দায়িত্বশীলতা। তাহলেই ইন্টারনেট-নির্ভর জীবন হবে সত্যিকার অর্থে নিরাপদ এবং বিশ্বাসযোগ্য।
লেখকঃ রিয়াজুল হক, অতিরিক্ত পরিচালক, বাংলাদেশ ব্যাংক।