বাঙালির আত্মনিয়ন্ত্রণের অর্ধ শতাব্দী পেরিয়ে গেছে। বাংলাদেশ পর্বে জাতি নির্মাণের অনেক পরিকল্পনা ও স্বপ্ন সমকালীন রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে থাকলেও পরবর্তীতে সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে সেটা ফিকে হয়ে যায়। ব্যর্থ হয় রাজনীতি, নেতাদের রাজনৈতিক দর্শন ও বিপ্লবী চেতনার। ব্রিটিশ শাসন-পরবর্তী পাকিস্তান আমল পেরিয়ে বাংলাদেশ আমলে আমরা এর আরও অভূতপূর্ব ভয়াবহতা প্রত্যক্ষ করি। অথচ রাজনৈতিক দল ও তার অংশীজনরা মিলে এই দীর্ঘসময় শাসনব্যবস্থার এই জনপ্রিয় দুটি ধারণাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে পারত। ১৯৭২ থেকে ৭৫, ১৯৭৫-৮২-১৯৯১ অথবা ২০০৮-২০২৪ সাল-পরবর্তী সময়ে জনগণের জন্য গণতন্ত্র ও আমলাতন্ত্র প্রতিষ্ঠার ধারণা রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে ছিল ধোঁকা। অথচ আধুনিক কল্যাণকর রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ধারণায় টিকে থাকতে হলে এই দুটি বিষয়কে অবহেলার কোনো সুযোগ ছিল না।
গত দিনগুলোতে ক্ষমতাসীন কোনো রাজনৈতিক দল, শাসন সংগঠক এই দুটিকে প্রতিষ্ঠা করার পক্ষে ছিল না, মৌখিকভাবে মনে হলেও বাস্তবতা ছিল সম্পূর্ণ উল্টো। আধুনিককালে রাষ্ট্রব্যবস্থায় আমলাতন্ত্র ও গণতন্ত্রকে শক্তিশালী ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত করার জন্য যে বিষয়গুলোর বিকাশ ও প্রকাশকে প্রয়োজনীয় মনে করে প্রতিষ্ঠিত করার দরকার ছিল সেগুলো কোনো কালেই অগ্রাধিকার পায়নি উল্টো সব সময়ই ছিল উপেক্ষিত। অর্থনৈতিক বৈষম্য কমিয়ে আনা, শিক্ষার ব্যাপক বিস্তার, আইনের অনুশাসন ও রাজনৈতিক ব্যবস্থায় জবাবদিহিতার সংস্কৃতি, ব্যক্তি স্বাতন্ত্রবাদের বিকাশ এবং অপজিশন শক্তি বিরোধীদলের স্বাধীন বিকাশ ও সঠিক সমাধানে গণতন্ত্রকে দাঁড় করানোর অন্যতম শর্ত ছিল। কিন্তু কোনো কালেই কোনো প্রশাসন কিংবা কোনো রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত এগুলো টেকসই করার কোনো চেষ্টা করেনি। অর্থব্যবস্থার ওপর সরকারের কোনো রূপ নিয়ন্ত্রণ না থাকা, সমাজে আর্থিক ভারসাম্য নষ্ট হওয়া, বৈষম্য বৃদ্ধি পাওয়া, শিক্ষাব্যবস্থাকে ধ্বংস করে আপন ন্যারেটিভ তৈরিতে ব্যস্ত হয়ে পড়া, ধনী গরিবের মধ্যে আইন প্রয়োগের ভিন্নতা, সবার জন্য আইন সমান না হওয়া, গণতন্ত্র ধ্বংসের মৌলিক কারণ বলে মনে করা হয়। ব্যক্তি স্বাধীনতায় বিগত কোনো সরকারই বিশ্বাসী ছিল না, সেই সঙ্গে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ হিসেবে বিরোধীদলকে দমন করে নিশ্চিহ্ন করার হীন পরিকল্পনা গণতন্ত্রকে চিরস্থায়ীভাবে ধ্বংস করে দিয়েছে। একটি শক্তিশালী বিরোধীদলকে বলা হয় গণতন্ত্রের পাহারাদার অথচ ক্ষমতাসীন কোনো দলই বিরোধীদলের প্রতি সহানুভূতিশীল ছিল না, উল্টো জেল-জুলুম আর নির্যাতনের মাত্রা বাড়িয়ে প্রতিপক্ষকে সমূলে শেষ করে দেওয়াই ছিল ক্ষমতাসীন প্রতিটা দলের মূল লক্ষ্য। বিরোধীদলকে দমনের প্রতিযোগিতা সেই সঙ্গে রাজনৈতিক অস্থিরতা সব মিলিয়ে মানুষের মত প্রকাশের স্বাধীনতা ও গণতন্ত্র মুখ থুবড়ে পড়েছে বিগত দশকগুলোতে বারবার। উল্লেখিত কারণগুলো শুধু গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পথকেই রুদ্ধ করেনি একটি আধুনিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পথকে করে তুলেছে জটিল ও সমস্যাসঙ্কুল।
কোনো রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানই প্রাতিষ্ঠানিকভাবে শক্তিশালী কাঠামোর ওপর দাঁড়াতে পারেনি। রাজনৈতিক সহিংসতা, হানাহানি আর হিংসাত্মক কর্মকাণ্ড আমলাতন্ত্রের মতো আধুনিক জনকল্যাণকর পদ্ধতির বিকাশ ও উদ্দেশ্যকে প্রবাহিত করেছে ভিন্ন খাতে। রাজনৈতিক শক্তিকে ভক্তি করতে গিয়ে আমলাতন্ত্র হয়ে উঠেছিল তৈলমর্দনকারী মোসাহেবি এক অর্থব প্রতিষ্ঠানের প্রতিভূ। দেশের সেবাযন্ত্রের পৃষ্ঠপোষক না হয়ে ক্ষমতার গা ঘেঁষে অবস্থান করায় তারা হয়ে উঠেছিল এক অদৃশ্য শোষক। রাষ্ট্র উত্থানের ঊষালগ্নে ম্যাক্সোওয়েবারের আদর্শ আমলাতন্ত্রের আদলে দেশের আমলাতন্ত্রের বিকাশ হলেও বিভিন্ন সময়ে সেটা হয়ে উঠেছিল সরকারি দলের আজ্ঞাবহ দাস হিসেবে। রাজনৈতিক লেজুড়বৃত্তি আর তাদের এজেন্ডা বাস্তবায়নকারী হয়ে উঠেছিল আমলাতন্ত্র। আমলাতন্ত্র আর রাজনৈতিক শক্তি পরস্পর মিলে মিশে গণতন্ত্র আর আমলাতন্ত্রকে করে তুলেছে অথর্ব ও অকার্যকর। আধুনিক রাষ্ট্রে গণতন্ত্র সেরা শাসনব্যবস্থা আর আমলাতন্ত্র সেরা প্রশাসনব্যবস্থা এই ধারণার বদলে নেতিবাচক ভাবে ঘটেছে উভয় ব্যবস্থার বিকাশ। আমলাতন্ত্রের সীমাহীন রাজনৈতিকীকরণ প্রক্রিয়া এই প্রবণতাকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে। অদূর ভবিষ্যতে আমলাদের সেবাধর্মী মানসিকতার উত্থান ও শিক্ষা সংস্কার সাধন করে সমাজে অর্থনৈতিক বৈষম্য কমিয়ে সমাজে মানুষের ব্যক্তি স্বাতন্ত্রবাদ ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং গণতন্ত্রকে জাগ্রত করে– এমন প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে না পারলে অন্তত এটা নিশ্চিত করে বলা যায় এ দেশে গণতন্ত্র ও আমলাতন্ত্রের মতো জনপ্রিয় ব্যবস্থা কোনো দিনই দাঁড়াতে পারবে না। টেকসই হবে না। আর এটা করতে যত দেরি হবে রাষ্ট্র হিসেবে স্বাধীন বাংলাদেশের মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হবে সমানভাবে।
লেখক: প্রাবন্ধিক, গল্পকার ও শিক্ষা গবেষক
[email protected]