আপনি কি জানেন, বাংলাদেশের রাজনীতিতে মূল সমস্যা কোনটি? যে সমস্যাটি দিনের পর দিন নেতৃত্বের মতো একটি মৌলিক রাজনৈতিক সংকটকে ঘণীভূত করে তুলেছে। অপেক্ষাকৃত সুশীল মানুষ কেন এ তথাকথিত রাজনীতির প্রতি বীতশ্রদ্ধ। ভালো মানুষের রাজনীতির প্রতি এ বিমুখতাই আজ রাজনীতি হয়ে উঠেছে দুষ্টচক্রের আশ্রয়স্থল। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী মিলার, বার্টান্ড রাসেল, বোগোরদাস, মিশেলস প্রমুখ রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও রাজনীতি বিশ্লেষকের মতে, তৃতীয় বিশ্বের উন্নয়নশীল দেশগুলোতে যে সমস্যাটি সবচেয়ে প্রকট তা হলো নেতৃত্ব সমস্যা।
অতীতের ঐতিহ্য অনুসরণ করে বাংলাদেশ পর্বে এসে পলিটিক্যাল ডেভেলপমেন্টের অংশ হিসেবে নেতৃত্বের মতো গুরুত্বপূর্ণ উপাদানটির ইতিবাচক বিকাশ ঘটেনি। থেমে থেমে প্রক্রিয়া চালু থাকলেও সেটা সত্যিকার অর্থে কোনো প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর ওপর দাঁড়াতে পারেনি। রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন, পেশিশক্তি প্রদর্শন, আর দলগত লুটপাটই হয়ে উঠেছে জাতীয় নেতৃত্বের মূল লক্ষ্য। রাজনৈতিক দল হয়ে উঠেছে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, রাজনীতি হয়ে উঠেছে সেরা বিনিয়োগ। আর এ টানাপোড়েনে সবসময়ই শূন্যতা তৈরি করেছে নেতৃত্বে। পরিবারতন্ত্র, পুঁজিবাদ বিশেষ করে ধনতন্ত্রের অপ্রতিরোধ্য বিকাশ, কালো টাকার সীমাহীন প্রভাব সমাজে প্রকৃত নেতৃত্ব করে তুলেছে কোণঠাসা। আর এভাবে তৈরি হওয়া রাজনৈতিক সংস্কৃতি আমাদের প্রকৃত নেতৃত্বের পাইপলাইনকে করে তুলেছে ভঙ্গুর আর উদ্দেশ্যহীন। ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ডের মতো সব অনুকূল পারিপার্শ্বিকতা থাকার পরও শুধু প্রত্যাশিত নেতৃত্ব সংকটের কারণে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই উন্নতির জন্য সহায়ক পরিবেশ সৃষ্টি করতে পারেনি।
রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রতিকূলে দাঁড়িয়ে কোনো একক দল বা সম্মোহনী ব্যক্তিত্বের আবির্ভাব এ শূন্যতা কাটাতে সক্ষম হলেও বঙ্গবন্ধুর পরে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে আর দ্বিতীয় কাউকে আমরা এখনো দেখিনি। তবে একথা সত্য, ব্রিটিশ আমলে বাংলার রাজনীতিক অঙ্গনে সম্ভাবনাময় নেতৃত্বের বিকাশ আমরা প্রত্যক্ষ করি। পূর্ববঙ্গের যোগ্য নেতৃত্বের কারণে ভারতের রাজনৈতিক অঙ্গন ছিল ঝলমলে। ব্রিটিশদের বিতাড়নের পর পাকিস্তান আন্দোলনেও মজলুম জননেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী, শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মতো নেতৃত্ব আমরা প্রত্যক্ষ করি। সত্তরের দশকে শেখ মুজিবুর রহমান ও শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের উত্থান রাজনীতিতে নতুন সম্ভাবনার সৃষ্টি করলেও পরে আর সেই ধারাবাহিকতা রক্ষা করা যায়নি। কিন্তু স্বাধীনতাত্তোর বাংলাদেশে ক্রমেই নেতৃত্বসংকট চরম আকার ধারণ করে। বাংলাদেশে বিগত ৫৫ বছরে সেটা আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। বিগত ৫৫ বছরের বাংলাদেশ প্রত্যাশিত নেতৃত্বের অভাবে সঠিক গন্তব্যে পৌঁছাতে পারেনি। নেতৃত্বসংকট সব সংকটকে ক্রমবর্ধমানভাবে বাড়িয়ে তুলেছে।
রাজনৈতিক শুদ্ধাচারের অভাব, অসম অর্থনৈতিক বিকাশ, সামাজিক স্থিতিশীলতার প্রশ্নে রাষ্ট্র বরাবরই কাঙ্ক্ষিত মান অর্জন করতে পারেনি। অন্যদিকে শিক্ষার অভাব, দারিদ্রতা, আইনের অনুশাসনের মতো মৌলিক বিষয়গুলোর সঠিক বিকাশ হয়েছে বাধাগ্রস্ত। মেধা পাচার, মেধাবীদের রাজনীতি-বিমুখতা, মুক্ত ও স্বাধীন গণমাধ্যমের অভাব, দলীয় লেজুড়বৃত্তি, প্রান্তিক নেতৃত্বের অবমূল্যায়ন, সৎ ও ভালো মানুষের রাজনীতিতে অনুপস্থিতি, কালো টাকার সীমাহীন প্রভাবকে কাজে লাগিয়ে ক্ষমতা ও আইনকে নিজের মতো করে ব্যবহার করে জনমতকে প্রভাবিত করা, দুর্নীতিপরায়ণ প্রশাসন, সামাজিক দুর্বৃত্তায়ন রাজনীতিকে প্রতিষ্ঠিত করতে গিয়ে যোগ্য নেতৃত্ব হয়েছে উপেক্ষিত। সীমাহীন দুর্নীতি পরবশ রাজনীতিকে প্রতিষ্ঠিত করতে গিয়ে সর্বত্র রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়নকে বাড়িয়ে তোলাটাই হয়ে উঠেছে স্বাভাবিক ঘটনা। রাষ্ট্রের একটি জনগোষ্ঠী এখনো সঠিক নেতৃত্ব বাছাই করতে ব্যর্থতার পরিচয় দেয়। একটা বৃহত্তর প্রজন্মকে সঠিক নেতৃত্ব বাছাই করার ক্ষেত্রে যে উল্লেখযোগ্য বিষয়গুলো মনে রাখা জরুরি সেগুলো হলো সেই জনগোষ্ঠীর শিক্ষা, মানসিক পরিপুষ্টি সাধন, প্রত্যাশিত জ্ঞান উৎপাদনের প্রতিষ্ঠানগুলোকে সচল রাখা। ফলে প্রত্যাশিত নেতৃত্ব মানবকল্যাণে ব্যয় করার মতো মানসিক সামর্থ্য রাখে শারীরিক ও মানসিক সুস্থতা, দূরদৃষ্টি, রাষ্ট্র কীভাবে টিকে থাকবে উত্থান ও পতন রোধের জন্য সামর্থ্য অর্জন করে এগুলোকে নেতার দূরদৃষ্টি দিয়ে অনুধাবন করে সিদ্ধান্ত প্রণয়নে অভূতপূর্ব ভূমিকা রাখতে পারবে।
জাতীয় সমাজকে সঠিক দিকনির্দেশনা দিয়ে অভীষ্ট লক্ষ্যের দিকে পরিচালনার জন্য নেতার এ গুণগুলো আবশ্যক। শুধু দূরদর্শী শাসক ও নেতারাই রাষ্ট্রকে উন্নত সমৃদ্ধ করতে পারে, দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণের সামর্থ্য ন্যায়পরণয়তা, আত্মবিশ্বাস, দৃষ্টিভঙ্গির প্রসারতা, সততা, স্বচ্ছতা, নিরপেক্ষতা, সংযম, দায়িত্ববোধ, বুদ্ধিমত্তা, দেশপ্রেম নেতার অন্যতম প্রধান গুণ। এ কথাও সঠিক- বাংলাদেশের রাজনীতিতে কখনই নেতৃত্ব বিকাশের জন্য যথার্থ পাইপলাইন তৈরি করা হয়নি। অগ্রজ নেতৃত্ব সবসময়ই অনুজদের রাজনৈতিক দর্শন, চেতনা পরিবর্তনের এ স্বাভাবিক প্রক্রিয়াকে ভালো চোখে দেখেনি। একটি সম্ভাবনাময় রাজনীতি বিকাশের জন্য এ প্রবণতা আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত ছাড়া আর কিছুই নয়। তবে অদূর ভবিষতে এ অবস্থানকে বদলে দিলে দেশে কাঙ্ক্ষিত নেতৃত্বের গতিধারা ফিরে আসবে বলে আমরা আশাবাদী হতে পারি। সঠিক নেতৃত্ব যেমন দেশকে এগিয়ে নেয় তেমনি অদূরদর্শী ভঙ্গুর নেতৃত্ব দেশ, জাতি ও সমাজকে পিছিয়ে দেয়। সত্তরের দশকে মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, চীন, থাইল্যান্ড, দক্ষিণ কোরিয়ার জনগণের মাথাপিছু আয় ছিল ৩৪০ থেকে ৩৫০ ডলারের মধ্যে। শুধু সঠিক নেতৃত্ব আর সঠিক পরিকল্পনার কারণে সিঙ্গাপুর, কোরিয়া, চীন, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়ার অবস্থান আজ বিশ্বসেরা। পাশাপাশি বহুমুখী সংকটে ধুঁকতে থাকা বাংলাদেশ সঠিক ও কার্যকর নেতৃত্বের অভাবে ক্রমেই যাচ্ছে পিছিয়ে। রাষ্ট্রের টিকে থাকার জন্য নেতৃত্ব আজ খুবই গুরুত্বপূর্ণ ফেনোমেনন হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।
সঠিক নেতৃত্বের কারণে মহাচীন আজ গণচীনে পরিণত হয়েছে, অন্যদিকে নেতৃত্বের দুর্বলতায় ভেঙে গেছে সোভিয়েত ইউনিয়নের মতো বৃহত্তম রাষ্ট্র। এককথায় একটি সঠিক ও কার্যকর নেতৃত্ব তৈরি করলে রাষ্ট্রের উত্থানপ্রক্রিয়া হয়ে ওঠে স্বাভাবিক। উল্টোটা হলেই বাড়ে বিপদ ও সংকট, যা রাষ্ট্রের পতনকে করে ত্বরান্বিত।
লেখক: প্রাবন্ধিক, গল্পকার ও শিক্ষা গবেষক