গ্রামজুড়ে সুব্রত এখন কিংবদন্তি। বেকারের জন্য সুব্রত খুবই জনপ্রিয় মানুষ। সারা দিন এ বাড়ি ও বাড়ি ঘুরে বেড়ায়, আড্ডা মারে, কেউ কাজের কথা বললে কানের পাশ দিয়ে বাতাসের স্পিডে উড়ে যায়। গ্রামবাসী তাকে আদর করে ডাকত- টিটিসিএম। ফুল মিনিং টোটো কোম্পানির ম্যানেজার।
সুব্রত পাশ দিয়ে হাঁটলে গ্রামের লোকজন বলে উঠত, এই টিটিসিএম! কেমন আছ? কত বাড়ি ঘুরলা আজ?
যে নামটা মা-বাবা স্নেহ করে রেখেছিল, সুব্রত সেই নাম গ্রামের কেউ ব্যবহার করে না। নতুন নাম টিটিসিএম।
বেকার হলেও সুব্রত ওস্তাদ দায়িত্বশীল প্রেমিক। গ্রামে আছে এক পরীর মতো মেয়ে, তবে সামনের দুই দাঁত একটু উঁচু- নাম সরুবালা। দাঁত দুটি এমন বেঁকে আছে যেন সব সময় হাসছে। সুব্রত তাকে দেখে মন প্রাণ সঁপে দিয়েছে।
কিন্তু সমস্যা হলো সরুবালার বাবা ঘোষণা দিয়েছেন, ডাক্তার ছাড়া মেয়েডা বিয়া দেব না।
আর্টসে পড়া সুব্রত তখন বুক ফুলিয়ে বলেছিল, ও নিয়া তুমি চিন্তাই করবা না। আমি ছয় মাসে ডাক্তার হইয়া দেখামু।
বড় ডাক্তার না হলেও চলে, সুব্রত ভর্তি হয়ে গেল যুব উন্নয়ন কেন্দ্রের পশু চিকিৎসক কোর্সে। ছয় মাস ঘাম ঝরিয়ে, গরুর লেজ ধরে, ছাগল তাড়া খেয়ে, হাঁস-মুরগির সঙ্গে যুদ্ধ করে সে শেষমেশ সার্টিফিকেট পেল।
এখন সে মস্ত বড় পশু চিকিৎসক। নিজের নামের আগে লম্বা তকমা- ডা. সুব্রত কুমার মণ্ডল, এফসিআরএফ, যুব উন্নয়ন ফরিদপুর-ঢাকা।
সাইনবোর্ডে ডা. শব্দটা এমন বড় যে, তিন গ্রাম দূর থেকেও দেখা যায়। অন্যদিকে বাকি লেখাগুলো এমন ছোট, চশমা ছাড়া পড়া যায় না। বেলেশ্বর বাজারে সে নতুন ডিসপেনসারি খুলেছে। গরু-ছাগলের ওষুধও বিক্রি করে। এখন গ্রামের মানুষের মুখে মুখে শুধু এক নাম, গরুর ডাক্তার সুব্রত।
এদিকে হঠাৎ সরুবালাদের বাড়ির এক বিরাট গরু অসুখে পড়ল। এত বড় গরু যে তাকে দেখে মনে হয় ছোটখাটো হাতি! শিং দুটি এমন লম্বা, চাইলেই মানুষ গুতো দিয়ে ফুটো করে ফেলতে পারে।
সরুবালা বাবাকে বলল, বাবা, বেলেশ্বর বাজারে নাকি খুব ভালো পশুর ডাক্তার আইছে। নাম ডা. সুব্রত।
শুনেই সরুবালার বাবা ডাক্তার ডেকে আনলেন। সুব্রত শুনে খুশিতে গর্বে গর্বিত হয়ে গেল। বুঝল, এখন বিয়েটা পাক্কা।
কিন্তু বাড়িতে গিয়ে গরুটাকে দেখে সুব্রতর সাহস ভ্যানিশ! গরুর চোখদুটো লাল, শিং দুটো বাঁকা করে তাকিয়েছে এমনভাবে, যেন বলছে, ডাক্তারকে আজ ছাড়ুম না।
সুব্রত প্রথমেই ভয় পেল। তবুও ডাক্তার সেজে কাছে গেল। ভয়ে হাত কাঁপছে, হাঁটু দুলছে। গরুর গায়ে আলতো হাত দিল…
অমনি গরু মোচড় দিয়ে উঠল। মেজাজ গরম করে হুউউউ শব্দ করে সুব্রতের দিকে তাকাল।
এই দৃশ্য দেখে সুব্রতের শরীরের রক্ত বাষ্প হয়ে গেল। ঠ্যাং কাঁপতে লাগল। গরু যখন দ্বিতীয় বার ফুঁ দিল, সুব্রত আর না সাহস পেল না, দিল দৌড়।
ডাক্তার হওয়ার গুষ্টি কিলাই! বলতে বলতে সে খেতের আল, পুকুরঘাট, ধানের গোলা, সবার পাশ কাটিয়ে দৌড় দিল।
এদিকে সরুবালার বাবা ব্যস্ত ঘরের কাজে। বাইরে এসে দেখলেন, একটু আগে যে গরু কাত হয়ে ছিল, সেটা এখন উঠে দাঁড়িয়েছে! একটু বাদেই ঘাস খেতেও শুরু করল।
তিনি ভাবলেন, ওরে বাবা, ডাক্তার তো জাদুকর। গরুটা মুহূর্তেই ঠিক করে দিল। আর টাকা-পয়সাও নিল না। কত ভালো মানুষ।
আর সুব্রত? সে তখন অর্ধমাইল দূরে দৌড়াতে দৌড়াতে নিজেই বলছে, ডাক্তার হইয়া গেছি ঠিকই, কিন্তু গরুর চিকিৎসা আর কখনো না।
সন্ধ্যা হওয়ার আগেই খবর ছড়িয়ে গেল, ডা. সুব্রত গরুর গায়ে একবার হাত দিলেই ঠিক হয়ে যায়।
সরুবালার বাবা বলল, এমন ভালো ডাক্তার ছেলে পাইলে সরুবালারে তার হাতেই দিমু!
সরুবালা তখন লজ্জায় মুখটা আঁচলে ঢেকে ফিসফিস করে বলল, টিটিসিএম… মানে, ডাক্তার বাবু তো দৌড়াইতে দৌড়াইতে আমার হৃদয়ে ঢুইকা পড়েছে।
এভাবেই টিটিসিএম সুব্রত গরুর ভয়ে দৌড়ালেও সরুবালার চোখে সে হয়ে উঠল গ্রামের সবচেয়ে সাহসী এবং জাদুকরী ডাক্তার।