বাঁশবনের পাশ ঘেঁষে বয়ে যাওয়া সরু মেঠোপথটি যেন একটানা বেজে চলা সুরের মতো- নরম, শান্ত এবং ছায়াময়। সেই পথ ধরে প্রতিদিন ছুটে যায় দুই বোন- মিমি আর সুমাইয়া। মিমির বয়স ৭, সুমাইয়ার ৯। ওদের চোখে আছে কৌতূহলের দীপ্তি, আর হৃদয়ে গেঁথে আছে প্রকৃতির নির্জন সৌন্দর্য।
বাঁশবনের মাঝখানে একটা লম্বা গাছ, তার ডালে ডালে বাসা বেঁধেছে এক সাদা বক। সেই বকের বাসায় ফুটেছে তিনটি তুলার মতো ছানা। প্রতিদিন দুপুরে দুই বোন গিয়ে দাঁড়ায় সেই গাছের নিচে। তারা দেখে- মা বক ঠোঁটে করে খাবার এনে ছানাদের মুখে তুলে দেয়। ডানার নিচে আগলে রাখে। যেন সে প্রকৃতির প্রহরী, আর তার অস্ত্র শুধু নিঃশব্দ ভালোবাসা।
একদিন হঠাৎ আকাশ কালো হয়ে এল। দুরন্ত হাওয়ার গর্জন আর বিজলির ঝলকানে কেঁপে উঠল গ্রামের বুক। বজ্রপাতের আওয়াজে কাঁপতে লাগল খড়ের ঘরগুলো। মানুষ ছুটে চলল নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে। গরু-ছাগল ফিরিয়ে আনা হলো ঘরে। পাখিরাও গাছে গাছে নিজেকে গুটিয়ে নিল। শুধু নিজের বাসা থেকে একটুও নড়ল না মা বক।
সে তার তিনটি ছানাকে ডানার নিচে গুটিয়ে নিল। নিজের শরীর ভিজে চপচপে হয়ে গেছে, ঠাণ্ডায় উঠেছে কাঁপুনি, তবু ডানার ছায়া সরায় না একটুও। যেন মা বক বুঝে গেছে- প্রকৃত ভালোবাসা মানে নিজেকে বিলিয়ে অন্যকে আগলে রাখা।
ঝড় থেমে যায় রাত গভীর হলে। ভোরে সূর্য ওঠে রাঙা মুখে। মিমি আর সুমাইয়া ছুটে যায় বাঁশবনে। গাছের নিচে দাঁড়িয়ে তারা দেখে- মা বক তখনো বাসায় বসে আছে। পালক ভেজা কিন্তু তার ডানার নিচে তিনটি ছানা শুকনো, নিরাপদ এবং নিশ্চিন্ত।
মিমির চোখ ছলছল করে ওঠে। সে ফিসফিসিয়ে বলে, ‘বকমা তো আমাদের মায়ের মতোই।’
সুমাইয়া বলে, ‘মা তো এমনই হয়, আপু... নিজে কষ্ট পেলেও সন্তানকে কষ্ট পেতে দেয় না।’
দিন পেরিয়ে যায়। ছানারা ডানা ঝাপটাতে শেখে। তারা গাছের ডাল থেকে উড়ে বেড়াতে থাকে একটু একটু করে। মা বক তাকিয়ে থাকে গর্বে, কিন্তু একটুও কমে না তার দুশ্চিন্তা। এমন ভালোবাসা কেবল মা-ই পারে বহন করতে- যেখানে মুক্তি মানে সন্তানের উড়াল, আর একাকিত্ব মানে শান্তি।
এক সকালে তিনটি ছানা একসঙ্গে ডানা মেলে উড়ে যায় আকাশের দিকে। মা বক তাকিয়ে থাকে অনেকক্ষণ- চোখে নেই কান্না, নেই আহাজারি- শুধু এক ধরনের নিঃশব্দ তৃপ্তি। যেন সে বলছে, আমার কাজ শেষ, ওরা এখন নিজেদের আকাশ খুঁজে নেবে।
মিমি আর সুমাইয়া গাছের নিচে দাঁড়িয়ে চেয়ে থাকে আকাশের দিকে। তারা বুঝতে পারে, আজ তারা কিছু শিখেছে- ভালোবাসা শুধু মমতায় নয়, ভালোবাসা সাহসে, উৎসর্গে ও দায়িত্বে।
সেদিন তারা যখন বাড়ি ফিরে আসে, তখন তাদের চোখে একটুখানি বৃষ্টির মতো আলো। সেই আলোয় লেখা হয়ে যায়- মা আর তিন ছানা।