বিড়াল ফাহিমের খুবই প্রিয় একটি প্রাণী। সে বিড়াল পুষতে চায়, বিড়ালকে কোলে নিয়ে আদর করতে চায়, বিড়ালের সঙ্গে লুকোচুরি খেলতে চায়। কিন্তু যখনই সে বাড়িতে বিড়াল নিয়ে আসে, তখনই আম্মু খুব বকা দেন। শুধু তাই নয়, যেখান থেকে বিড়াল নিয়ে এসেছে, সেখানে দ্রুত রেখে আসতে বলেন।
এই গত শনিবারের কথা—ফাহিম তার প্রতিবেশী বন্ধু রাতুলের কাছ থেকে একটি বিড়ালছানা এনেছিল। নাদুসনুদুস দেখতে, চাঁদপানা মুখ তার। ভারী সুন্দর বিড়ালটা। ফাহিমের খুব পছন্দ হয়েছিল। কিন্তু হলো কি জানো? আম্মুর মোটেও পছন্দ হলো না। শুধু ওই বিড়াল কেন? ফাহিম যত বিড়াল এনেছিল, কোনো বিড়ালই ওর আম্মু পছন্দ করেননি। এর কারণও ফাহিমের অজানা নয়।
ফাহিমের আম্মু বিড়াল একেবারেই পছন্দ করেন না, এমনটি নয়। তিনিও আগে বিড়াল পুষতেন, আদর করতেন, কোলে নিতেন। একবারের ঘটনা—তিনি ফাহিমের নানুর কোলে বিড়াল দিয়ে কিচেনে গিয়েছিলেন। হঠাৎ নানু চিৎকার দিয়ে উঠলেন। ফাহিমের আম্মু দৌড়ে এসে দেখেন তার নানুর হাতে রক্ত আর বিড়ালের আঁচড়ের দাগ। সেই থেকে তিনি বিড়াল পছন্দ করেন না। কিন্তু ফাহিম দৃঢ় সংকল্প করেছে, সে বিড়ালকে আবার তার আম্মুর পছন্দের প্রাণীতে পরিণত করবে।
একদিন ভোরে ঘুম থেকে জেগে উঠে ফাহিম দেখল তার আম্মুর চোখে পানি। কারণ জিজ্ঞেস করলে আম্মু বললেন, বিয়ের সময় যে শাড়িটা দিয়েছিল, সেই শাড়িটা ইঁদুর কেটে টুকরো টুকরো করে ফেলেছে! আম্মু ফাহিমের দিকে শাড়িটা এগিয়ে দিয়ে চোখ মুছতে লাগলেন। সে দেখল সত্যিই ইঁদুর শাড়িটা একদম নষ্ট করে ফেলেছে। ফাহিম তার আম্মুকে সান্ত্বনা দিয়ে বলল, ‘কেঁদো না আম্মু। আব্বুকে বললে তিনি তোমার জন্য আরেকটা শাড়ি কিনে আনবেন।’
আম্মু বললেন, ‘বাবা আমি তো শাড়ির জন্য কাঁদছি না। শাড়ি তো আমার আরও আছে, এই শাড়ির চেয়েও ওগুলো বেশি মূল্যবান। কিন্তু এটা যে আমাদের বিয়ের স্মৃতি ছিল, এজন্যই আমার কষ্ট লাগছে। দুষ্টু ইঁদুরগুলোকে পায়ের তলায় পিষতে ইচ্ছে করছে এখন।’
ফাহিম মনে মনে ভাবল, বিড়াল বাড়িতে নিয়ে আসার এটাই উপযুক্ত সময়। কারণ, বিড়াল দেখলেই ইঁদুর দৌড়ে পালাবে। শিকারি একটা বিড়াল এনে ইঁদুরকে শায়েস্তা করলেই আম্মুর মন ভালো হয়ে যাবে। আর তখন বিড়াল আবার আম্মুর পছন্দের প্রাণী হয়ে উঠবে।
যেই ভাবা সেই কাজ। ফাহিম এক দৌড়ে রাতুলদের বাড়িতে গেল। রাতুলকে ওর পরিকল্পনা সম্পর্কে জানিয়ে একটি শিকারি বিড়াল দিতে বলল। রাতুল খুশি হয়ে বলল, ‘তোর আইডিয়াটা দারুণ দোস্ত! এজন্যই তো তুই আমার বেস্ট ফ্রেন্ড।’
ফাহিম মুচকি মুচকি হাসল। রাতুলের বিড়ালগুলো যেহেতু পোষ মেনেছে, তাই শিকারি বিড়ালকে ধরতে বেশি বেগ পোহাতে হয়নি। বিড়ালটা ধরে ফাহিমের হাতে দিয়ে বলল, ‘দোস্ত যা, এবার তোর পরিকল্পনা বাস্তবে রূপান্তর কর।’
ফাহিম হ্যাঁ-সূচক মাথা নেড়ে দ্রুত বাড়িতে এল। প্রতিবারের মতো এবারও আম্মু বিড়াল দেখে রেগে গেলেন। কিন্তু আম্মু বকা দেওয়ার আগেই ফাহিম বলল, ‘রাগ কোরো না আম্মু, তোমার মন ভালো করার জন্যই তো বিড়াল নিয়ে এসেছি। যে ইঁদুরগুলো তোমার শাড়ি কেটেছে, বিড়ালই পারবে ওদের সঠিকভাবে শায়েস্তা করতে।’
ওর কথা শুনে আম্মু অবাক হয়ে বললেন, ‘বাহ! তোর যে এত বুদ্ধি আগে জানতাম না। সত্যিই তো, ইঁদুরকে শায়েস্তা করার শক্তিশালী হাতিয়ার হবে এই বিড়াল। বাজান, বিড়ালটা ঘরে নিয়ে আয়।’
ফাহিম হাসতে হাসতে বিড়ালটি নিয়ে ঘরে প্রবেশ করল।
সত্যিই ফাহিমের বুদ্ধি দারুণ কাজে লেগে গেল। পরদিন সকালে ঘুম থেকে উঠেই আম্মুর ডাক, ‘ফাহিম, এদিকে আয়, দেখে যা!’
ফাহিম দৌড়ে গিয়ে দেখল, বারান্দার কোণে কয়েকটা মরা ইঁদুর পড়ে আছে। শিকারি বিড়ালটি পাশে বসে বেশ আয়েশ করে নিজের থাবা চাটছে। আম্মুর মুখে আজ আর বিরক্তি নেই, বরং এক চিলতে স্বস্তির হাসি।
আম্মু বিড়ালটির কাছে গিয়ে আলত করে ওর মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন। তারপর ফাহিমের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘ঠিকই বলেছিস বাজান, এই বিড়ালটিই আমাদের ঘরকে দুষ্টু ইঁদুরের হাত থেকে রক্ষা করবে। শুধু শিকারি নয়, এ তো দেখছি বেশ লক্ষ্মীও!’
ফাহিমের বুকটা গর্বে ভরে উঠল। আম্মু আজ বিড়ালটির জন্য এক বাটি দুধ নিয়ে এলেন। যে আম্মু বিড়াল দেখলেই এক সময় রেগে যেতেন, সেই আম্মুই এখন পরম মমতায় বিড়ালটিকে আদর করছেন। সেই থেকে শিকারি বিড়ালটি হয়ে উঠল ফাহিমের প্রিয় বন্ধু আর তার আম্মুর পছন্দের আদুরে প্রাণী। ফাহিমের ছোট ঘরটি এখন ইঁদুরমুক্ত, আর ভালোবাসায় ভরপুর।