শহরের প্রধান সড়কে এখন রঙিন বাতির ঝলকানি। দোকানে দোকানে নতুন জামার পসরা। কেউ কিনছে তার পছন্দের পাঞ্জাবি, কেউ ঝালরঅলা ফ্রক, কেউবা চকচকে জুতো। ছোটরা নতুন জামা-জুতো নিয়ে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেদের দেখতে ব্যস্ত- কেমন লাগছে তাদের নতুন সাজে।
কিন্তু শহরের এক কোণে, রেললাইনের ধারের ছোট্ট বস্তিটায় ঈদের কোনো আনন্দ আসেনি। সেখানে দ্রুত সন্ধ্যা নেমে আসে। চারদিকে কেমন বোঁটকা গন্ধ। আতরের সুবাস নেই।
রাকিব তার মায়ের পাশে বসে আছে মুখ শুকনো করে। তার সামনে ধোয়া পুরোনো একটা পাঞ্জাবি। কলারটা ছেঁড়া, কিন্তু তার মা যত্ন করে সেলাই করে দিয়েছেন। মুনিয়া পাশের ঘরে বসে তার ছেঁড়া স্যান্ডেলটা সুতো দিয়ে বাঁধার চেষ্টা করছে।
রাকিব তার মাকে বলল, আম্মা, এবারও কি নতুন কিছু হবে না?
ওর কথা শুনে মা একটু চুপ করে থাকলেন। তারপর রাকিবের মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন, ঈদ তো শুধু জামা দিয়ে হয় না বাবা। মনে খুশি ধরে রাখো। ঈদ তখন মধুর হয়ে উঠবে।
এই বলে মা যেন তার মুখটা আড়াল করলেন। চোখের কোণে যে অশ্রু চিকচিক করে উঠেছে! সেটা তিনি রাকিবকে দেখতে দিতে চান না।
রাকিব জানে কথাটা ঠিক। তবু তার বুকের ভেতরে কেমন একটা কষ্ট এসে দোল খায়।
ঈদের আর মাত্র দুদিন বাকি।
সেদিন বিকেলে হঠাৎ বস্তির গলির ভেতরে ভেসে এলো একটা মাইকের শব্দ, সেখানে বলা হচ্ছে- শুনুন শুনুন! খুশির গাড়ি এসেছে!
এই গাড়িতে যে উঠে বসবে, সে পাবে নতুন জামা আর নতুন জুতো! ঈদ সবার জন্য!
ঘোষণা শুনে বস্তির লোকজন যেন থমকে গেল।
কেউ বলল, আরে, এটা নিশ্চয়ই কোনো ফন্দি হবে!
কেউ বলল, যা হোক, দেখে আসি না গিয়ে!
স্কুলমাঠের পাশে গিয়ে সবাই দেখল- সেখানে একটা পিকআপ দাঁড়িয়ে আছে। তার গায়ে একটা ব্যানার আটকানো। সেখানে রঙিন অক্ষরে লেখা, সবার জন্য ঈদ- ঈদগাড়ি।
গাড়ির গায়ে আঁকা আছে চাঁদ-তারা। আর হাসিখুশি শিশুদের চমৎকার ছবি।
গাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে আছেন একজন মাঝবয়সী ভদ্রলোক। গায়ে সাদা পাঞ্জাবি, পরিপাটি দাড়ি, মাথায় টুপি। চোখে মমতার ঝিলিক স্পষ্ট। তিনি মাইকে বললেন, কেউ ভয় পাবে না। এটা আনন্দের গাড়ি। যাদের আনন্দের এই ঈদে নতুন জামা কেনা হয়নি, জুতো কেনা হয়নি- কেবল তারাই উঠবে এই গাড়িতে। আমরা তাদের মুখে হাসি ফুটিয়ে তুলতে চাই।
রাকিব এসময় মুনিয়ার হাত ধরল। বলল, চল, আমরাও যাই।
মুনিয়া বলল, যদি মিথ্যে হয়!
রাকিব বলল, গাড়ির মানুষটাকে দ্যাখ, উনি নিশ্চয়ই মিথ্যে বলবেন না!
এরই মধ্যে বস্তির বাচ্চারা এক এক করে লাইনে দাঁড়িয়ে গেছে। গাড়ির ভেতরে ঢুকে পড়ছে। গাড়ির ভেতরে ঢুকে তারা অবাক হয়ে গেল।
গাড়ির ভেতরটা ছোট্ট দোকানের মতো সুন্দর করে সাজানো। তাকে তাকে ভাঁজ করা নতুন জামা। ছোট, মাঝারি, বড়- সব মাপের। এক পাশে স্যান্ডেল, জুতো। ভেতরে কয়েকজন আপু-ভাই হাসিমুখে বাচ্চাদের মাপ নিচ্ছেন। তাঁরা সবাই এমনভাবে কথা বলছেন, যেন এটাই স্বাভাবিক, ঈদে সবার নতুন জামা থাকবে। নতুন জুতো থাকবে। যারা ভেতরে ঢুকছে, নতুন জামা-জুতো নিয়ে হাসিমুখে ফিরে আসছে।
রাকিবের আগে মুনিয়া গেল। তাকে একটা হালকা গোলাপি ফ্রক পরিয়ে দেওয়া হলো। ফ্রকের গলার দিকে ছোট ছোট সাদা ফুল তোলা। দেখতে ভারি সুন্দর লাগছে! সে গাড়ির গায়ে ফিট করা আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চুপ করে তাকিয়ে রইল। তার চোখ চকচক করছে।
রাকিব পেলো সাদা পাঞ্জাবি আর নীল স্যান্ডেল। পাঞ্জাবিটা গায়ে দিতেই মনে হলো বুকটা তার টানটান হয়ে গেছে। ভীষণ ভালো লাগছে ওর।
গাড়ির ভেতরের ছোট্ট আয়নায় সবাই পালা করে নিজের নিজের মুখ দেখছে। হাসছে। হাসিটা এমন, যেন অনেকদিন পর বুক ভরে শ্বাস নিচ্ছে সবাই।
সবশেষে সেই ভদ্রলোক বললেন, শোনো, এই ঈদগাড়ি কোনো জাদুর গাড়ি নয় কিন্তু। এটা আমাদের সবার খুশির গাড়ি। আমরা এখানে যারা এসেছি, তাদের মধ্য থেকে কেউ নিজের ঈদের খরচ কমিয়েছে, কেউ তার সঞ্চয় করা টাকা দিয়েছে, কেউ সময় দিয়েছে। আমরা এটুকু জানি- ঈদের আনন্দ ভাগ না করলে তা পরিপূর্ণ হয় না। তাই এই ব্যবস্থা। এটাকে কেউ করুণা ভেবো না।
রাকিব সাহস করে তাঁকে জিজ্ঞেস করল, চাচা, আপনি এটা কেন করছেন?
তিনি একটু হেসে বললেন, আমি ছোটবেলায় ঈদের সময় নতুন জামা পেতাম না। জুতোও পেতাম না। দূর থেকে অন্যদের জামা-জুতো দেখে খুব খারাপ লাগত। তখনই আমি একটা প্রতিজ্ঞা করি- আমি বড় হয়ে যদি কখনো সামর্থ্যবান হই, তাহলে আমি একটা গাড়ি ভরে আনন্দ নিয়ে আসব। আর সেটা বস্তিতে বস্তিতে বিলি করব। আজ আমার সেই স্বপ্নটারই বাস্তবায়ন চলছে বলতে পারো। আমার সেই স্বপ্নের সঙ্গে আজ অনেকেই জড়িয়ে গেছে। যারা এই কাজে টাকা দিয়ে, সময় দিয়ে আমাকে সাহায্য করছে।
সেদিন সন্ধ্যায় বস্তির আকাশটা অন্যরকম রঙে সেজে উঠেছিল। কারণ তখন খুশির আলো কেবল দোকানে দোকানে জ্বলছিল না- জ্বলছিল বস্তির শিশুদের চোখেও।
ঈদের দিন সকালে মহল্লার মসজিদের সামনে দাঁড়িয়ে ছিল রাকিব, মুনিয়া আর তাদের মতো আরও অনেক শিশু।
নতুন জামা-জুতোয় সবার মুখ ঝকঝকে আনন্দে ভরপুর। তাদের ঠোঁটের হাসি দেখে মনে হচ্ছিল, ঈদের চাঁদটাই যেন নেমে এসেছে মাটিতে।
রাকিব মায়ের দিকে তাকাল। মা চুপচাপ চোখ মুছলেন। তারপর তিনি বললেন, দেখলে বাবা, ঈদ শুধু ওই আকাশের চাঁদেই থাকে না, মানুষ চাইলে তা মাটিতেও নামিয়ে আনতে পারে!
সেদিন রাকিবও মনে মনে একটা প্রতিজ্ঞা করল- বড় হয়ে সেও একদিন ওই ভদ্রলোকের মতো ঈদগাড়ি নিয়ে মহল্লায় মহল্লায় ঘুরে বেড়াবে। যাদের ঘরে ঈদের সময় ঈদ আসে না, তাদের ঘরে ঈদের আনন্দ পৌঁছে দেবে।