‘বাবা, দেখি আমাকে ধরতে পারো কি না?’ খিলখিল করে হাসল মনামি। আমার মেয়ে।
পাহাড়ের ঢালে বেড়াতে এসেছি আমরা। আমি, আমার স্ত্রী সোহানী আর আমাদের একমাত্র কন্যা। চাদর বিছিয়েছে সোহানী। হাসতে হাসতে ফ্লাস্ক থেকে কাপে চা ঢালছে সে। মনামি ছোটাছুটি করছে। হাসছে। বাচ্চারা খোলামেলা পরিবেশ পেলে খুশি হয়।
তিন বছর ধরে কাজ থেকে ছুটি পাইনি। এআই চিপস বানায় ফ্যালকন কোম্পানি। সুলটু গ্রহের এলিয়েনরা কোম্পানির পরিচালক। পৃথিবীটা ওরাই দখল করে নিয়েছে। আমি সামান্য একজন সুপারভাইজার। রোবট আর মানুষের মিশেলে সাইবর্গরা দিনরাত খেটেখুটে এআই চিপস বানায়। সেই চিপস বিক্রি করতে বাজারে নামানো হয়েছে লাখ লাখ সাইবর্গ।
যারা পুরোপুরি মানবকর্মী, তাদের কেউ যদি কাজেকর্মে গুরুতর কোনো ভুল করে, অমনি তাদের সাইবর্গ বানিয়ে পদাবনতি করে দেওয়া হয়। বিক্রয়কর্মী হিসেবে কাজে লাগিয়ে দেওয়া হয়। এআই চিপস বিক্রির টার্গেট দেওয়া হয়। ওই বিক্রয়কর্মীদের ফ্যামিলিকে সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয় সুলটু গ্রহে। বছরে ২-৫ লাখ এআই চিপস বিক্রি করে দেখাও, তবেই তুমি আবার সাইবর্গ থেকে মানুষ হতে পারবে। ফিরে পাবে নিজ পরিবার।
সে জন্য দুই বছর আমি কোনো ছুটি চাইনি। শুধু কাজ করেছি।
‘বাবা, আমাকে ধরো।’ হাসতে হাসতে ছুটল মনামি।
দৌড় দিলাম। পেছনে সোহানী ডাকল, ‘শুনছ?’
ঘুম ভেঙে গেল আমার। মনামি, সোহানী, চা, পাহাড়–এসব যে স্বপ্ন, বুঝতে সময় লাগল।
বাইরে কে যেন বারবার ডাকছে। প্লাগ থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করলাম। বারান্দায় এসে দাঁড়ালাম। বাইরে একজন যুবক। গায়ে অ্যাপ্রোন। হাসিমুখে বলল, ‘কেমন আছেন ভাইজান?’
‘কী চান?’
‘ভাই, আমার নাম হ্যালিডে। আমি একজন ডেন্টিস্ট। বাসায় বাসায় গিয়ে মানুষের দাঁতের চিকিৎসা করি। আপনি চাইলে আপনার দাঁত চেক করে দিতে পারি। যদি আপনার দাঁত তোলার প্রয়োজন হয়, তাহলে একটা দাঁত তোলার বিনিময়ে আরেকটা দাঁত তোলা একদম ফ্রি।’
বেশ মজা পেলাম।
‘তার মানে একটা দাঁত তোলার বিনিময়ে আমার ভালো দাঁতও তুলে ফেলবেন আপনি!’
‘না স্যার। আপনি চাইলে বদলে আপনার স্ত্রীর দাঁতও তুলে দিতে পারি।’
আমার মন খারাপ হয়ে গেল। তাকে বিদায় দিলাম। রুমে ঢুকে বিছানায় গা এলিয়ে দিলাম। চোখ বন্ধ করে একটু আগের স্বপ্নটা আবার দেখতে চাইলাম।
‘বাসায় কে আছেন? একটু শুনবেন?’ বাইরে আবার কে যেন ডাকছে।
বের হয়ে দেখি, একজন তরুণী।
‘হ্যালো স্যার। হাউ আর ইউ?’ হাসিমুখে বলল মেয়েটি।
‘কী চাই?’
‘স্যার, আমি একজন ডাক্তার। মেডিসিন বিশেষজ্ঞ। চিকিৎসা শাস্ত্রে আমার গ্রেড ৫.০।’
ওরে বাবা! এ যে দেখছি মস্ত বড় ডাক্তার। ফাইভ পয়েন্ট জিরো তো সর্বোচ্চ ডিগ্রি!
‘আমার কাছে কী চান?’ হাসিমুখে জানতে চাইলাম।
‘না মানে, জানেন তো এখন রোগী পাওয়া কত কষ্টকর ব্যাপার। মানুষের রোগবালাই নেই বললেই চলে। তাই আমি বাসায় বাসায় যাচ্ছি। আপনার যদি সর্দি-জ্বর থাকে তাহলে আমি আপনার প্রেসক্রিপশন লিখে দেওয়ার বিনিময়ে বাসার আরেকজনের ফ্রি চেকআপ করে দেব।’
‘প্রয়োজন নেই।’ গম্ভীরমুখে বললাম।
‘আপনার স্ত্রীকে ডাকুন। তার হয়তো প্রয়োজন।’ মেয়েটি বিব্রত হয়ে বলল।
জবাবে মেয়েটির মুখের ওপর দরজা বন্ধ করে দিলাম।
মাথার পেছনে চুলের ভেতর হাত ঢুকিয়ে একটা বোতামে চাপ দিলাম। অমনি মাথার খুলি খুলে গেল। ভেতর থেকে কৃত্রিম মগজটা বের করলাম। ভালো করে পরিষ্কার করে আবার ভেতরে বসিয়ে দিলাম।
আয়নায় নিজেকে দেখলাম। বাইরে থেকে দেখে কেউ বলতে পারবে না যে আমি একজন সাইবর্গ।
আলমারি থেকে এআই চিপস ভর্তি ব্যাগটা বের করলাম। বেরিয়ে পড়ার সময় হয়েছে। আমিও এখন বাড়ি বাড়ি যাব। চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে বলব, ‘চিপস নেবেন। চিপস। এআই চিপস। একটা নিলে আরেকটা ফ্রি!’