গতকাল থেকে কুয়াশা ডানা মেলে আছে। আকাশের নিচে পুরো রাজ্যজুড়ে। নিয়মকানুনের ঠিকঠিকানা নাই। যখন মন চায় ঘুমাতে যায়। যখন মন চায় জেগে থাকে। কুয়াশার নিয়ম হলো রাত থেকে সকালে সূর্য ওঠা পর্যন্ত জেগে থাকা। এর পর তল্পিতল্পা গুটিয়ে বিশ্রামে যাওয়ার কথা। সন্ধ্যা পর্যন্ত ঘুমের সময়। কিন্তু আজ হলোটা কী এই বিশালদেহী কুয়াশার? সকাল গড়িয়ে দুপুর পেরিয়ে বিকেল। অথচ ঘুমাতে যাওয়ার বিন্দুমাত্র লক্ষণ নেই! ধূসর রঙের বিশাল ডানা মেলে আছে অবিরাম। কী হলো কেউই কিছু বুঝে উঠতে পারছে না।
বনের সবচেয়ে বয়স্ক পাখি মদনটাক মাথা নেড়ে বলল, কী আর বলব। আমি জীবনেও এমন কাণ্ড দেখিনি আজকের মতো। হ্যা দেখেছি। বহু বছর আগে একদিন কুয়াশা এমন করেছিল। তখন চারদিকে শোরগোল পড়ে যায়। তবে দুপুরের পর চলে গিয়েছিল। কিন্তু আজ তো দেখছি একেবারেই অদ্ভুত কাণ্ড!
গুটিশুটি হয়ে পাতার ফাঁকে ঝুলে থাকা বয়স্ক চালতা জোড়া উঁকি দিয়ে বলল, উহ্! ঠাণ্ডায় একেবারে জমে গেলাম।
পালকের মধ্যে মাথা গুঁজে থাকা সাদা কালো দোয়েল বলল, এবার এত ঠাণ্ডা পড়েছে! একেবারে শরীর অবশ হয়ে যাচ্ছে।
কথা শুনে পাশের গাছ থেকে সাঁই করে উড়ে এলো লম্বা ঠোঁটের পাতি মাছরাঙা। মুখ থেকে ধোঁয়া বের হতে হতে বলল, আসলেই এবার অনেক শীত!
‘চুইট’ ‘চুইট’ করতে করতে ছোট্ট মৌটুসি মাছরাঙাকে উদ্দেশ্য করে বলল, হায় হায় বল কী! পানিতে ঝাপাঝাপিতে যার অভ্যাস সেই তুমিই যদি এ কথা বল, তা হলে আমাদের কী অবস্থা এবার বোঝ?
সবুজ রঙের হরিয়াল পাখি বলল, মৌটুসি ভাই! তুমি তো চিকন ঠোঁটে সারা দিন ফুলের মধু খাও। তাই তোমার শরীরটা মোটামুটি গরম থাকার কথা।
এভাবে এক এক করে টিয়া, ময়না, কাক, শালিক, বাবুই, বক, ঘুঘু, কাঠঠোকরা, কোকিলসহ বনের সব পাখি এসে জড়ো হয় বনের সবচেয়ে বয়স্ক পাকুর গাছে। সবারই আলোচনা শীতের তীব্রতা নিয়ে।
কাগজের টুকরায় বানানো কানটুপি পড়ে বুড়োর মতো কাশতে কাশতে কাঠবিড়ালি এসে বলল, উহ হু হু... ঠাণ্ডা তো একেবারে কমছেই না। একটু রোদেরও দেখা নেই। শরীরটায় যে খানিক ওম নেব, তারও উপায় নেই।
কুয়াশার বিশাল ডানার আড়াল থেকে সূর্যটা বেরিয়ে আসার সাহস করছে না মোটেই। সূর্যের বিশ্রাম ঘরে যাওয়ার সময় হতে বেশ বাকি। এখনো যদি কুয়াশা তার ডানা গুটাত, সূর্যের কিছুক্ষণের তাপে একটু হলেও স্বস্তি পাওয়া যেত। সবাই আশা নিয়ে অপেক্ষা করছে, এই বুঝি রোদের দেখা মিলবে।
কিন্তু সবার আশায় গুড়ে বালি দিয়ে দিন ফুরিয়ে গেল। কুয়াশার বিরামের নাম নেই। ঘুম নেই। সূর্যের আলো নেই। তাপ নেই। সন্ধ্যা নেমে আসার সাথে সাথে শীত গেল আরও বেড়ে। সবার দুর্ভোগও যায় বেড়ে। রাতে প্রচণ্ড ঠাণ্ডায় জামগাছের দুটো চড়ুই ছানা মারা যায়।
চোখ মুছতে মুছতে ঝুঁটি শালিক বলল, ঠাণ্ডায় আমার ছ’দিন বয়সী বাচ্চাটাও মারা গেছে।
সকালে আবার নতুন করে সবাই আশায় বুক বাঁধে। কিছুক্ষণের মধ্যে হয়তো কুয়াশা চলে যাবে। ঠাণ্ডা কমে যাবে। কিন্তু কুয়াশা যায় না। গতকালের মতো একই রকম থাকে সারা দিন। বনের পশুপাখি সবাই ঠাণ্ডায় কাবু।
দুপুরে বটতলায় সবাই একত্রিত হয়। প্রার্থনার জন্য। ছোট-বড় সবাই প্রার্থনা সভায় অংশগ্রহণ করে।
প্রার্থনা শেষে সবাই যার যার অবস্থানে চলে যায়। শীতে জড়সড় হয়ে বসে থাকে। কেউ পাতার ফাঁকে। কেউ শুকনো খড়ের আড়ালে। কেউ নিজ পালকে মুখ গুঁজে চোখ বন্ধ করে ঠাণ্ডার হাত থেকে বাঁচার চেষ্টা করছে।
দুপুর গড়িয়ে প্রায় বিকেল। হঠাৎ হুতুম পেঁচা চোখে আলোর রশ্মি অনুভব করে। চোখ খুলে দেখে ঠিকভাবে তাকাতে পারছে না। ঝলমলে আলো। পেঁচার নড়াচড়ার শব্দে দোয়েল চোখ মেলে অবাক হয়। আহ্! ওই তো দেখা যাচ্ছে সূর্য। ঝলমলে রোদ। সবাই আনন্দে চিৎকার করে ওঠে। ডানা মেলে, পা ছড়িয়ে রোদ পোহায় যে যার মতো।
আস্তে আস্তে সূর্য কমলা রঙ ধারণ করে। ঘুমের সময় হয়ে এল বুঝি। সূর্য ডুবে যায়। সবার শরীরটা একটু গরম তো হলো। সূর্য ডুবে গেলেও গত কয়েক দিনের মতো ঠাণ্ডার তীব্রতা তেমন বাড়ে না। সারা রাত ধরে তাপমাত্রা স্বাভাবিক থাকে। গাছের পাতাও ভেজে না। সবাই বেশ আরামের ঘুম দেয়।
ভোরবেলা ঝলমলে রোদে সবার ঘুম ভাঙে।
কী ব্যাপার আজ কুয়াশা কই? বিন্দুমাত্র কুয়াশার চিহ্ন পর্যন্ত নেই। কী হলো কুয়াশার?
সবুজ পাখি হরিয়াল মুচকি হেসে বলল, কুয়াশা ভাই দুদিন নির্ঘুম ছিল তো। তাই মনে হয় ঘুম থেকে উঠতে ভুলে গেছে।
হরিয়ালের কথায় সবাই হো হো করে হেসে উঠল।