ঢাকা ১০ শ্রাবণ ১৪৩১, বৃহস্পতিবার, ২৫ জুলাই ২০২৪

অমিত সুখ

প্রকাশ: ০৫ জুলাই ২০২৪, ০১:০৩ পিএম
আপডেট: ০৫ জুলাই ২০২৪, ০১:৩১ পিএম
অমিত সুখ
অলংকরণ: নিয়াজ চৌধুরী তুলি

ভাত দেও না ক্যা?
কী দিয়া দিমু? ঘরে ভাত আর নুন ছাড়া ত খাওনের কিছুই নাই।
একটা ডিমও ভাইজা দিতে পারবা না?
থাকলে ত দিমু।
বেহানবেলা মনডাই খারাপ হইয়া গেল। কী দিয়া যে কী করুম। মাইনষের তে টাকা ধার করতে করতে এহন নতুন কইরা চাইতে শরম করে।
ক্যা, নদীর কামাই নাই? নদীত মাছ পড়ে না?
কামাই আর কই? নদীত যাইয়া কী করুম? মাছ নাই। জালে পড়ব কী? জালে এহন আর মাছ ওডে না।
ঠিকই কইছেন। নদীত মাছের থেইক্কা জাইল্লা বেশি। মাছ বড় না অইতেই বেবাক ধইরা লইয়া আহে। জাইল্লাগো লাইগা মাছ বড় অইতে পারে না।
আইচ্ছা, থাহো দেহি ঘরে। আমি গেলাম। দেহি কিছু করবার পারিনিহি।
আইচ্ছা দেহেন।
কাসু মাঝি ছয় মাস হয় বিয়ে করেছে। বউ এখনো পোয়াতি হয়নি। কী সুন্দর চেহারা। গরিব ঘরের মেয়ে। বিয়ের সময় রহিমার সঙ্গে বেশিকিছু দিতে পারেনি আজগর মাঝি। তবে রহিমার জন্য পঞ্চাশ হাজার টাকার অলংকার দিয়েছে। ঘরের আসবাবপত্র দিয়েছে পঞ্চাশ হাজার টাকার। মোট এক লাখ টাকার বরাদ্দ রেখেছে আজগর মাঝি। মেয়েকে সুখী দেখার জন্য আজগর মাঝি এনজিও থেকে কিস্তিতে ঋণ নিয়েছে। ঘরে এখনো বিয়ে দেওয়ার মতো দুই মেয়ে রয়েছে আজগর মাঝির। কোনো ছেলে নেই। তাই কাসুকে নিজের ছেলের মতোই মনে করে সে। আজগর মাঝি দোকানে বসা। পাশ দিয়ে কাসু যেতেই-
বাবা কাসু, কই যাও?
আস্সালামুআলাইকুম। নদীর পাড় যামু।
ক্যা?
কাম আছে।
নদীত জাল বাও না?
না।
ক্যান?
নদীত মাছ থাকলে ত জাল বামু। হারা দিন ভাগিদার লইয়া খাইটা পাঁচ-দশটা মাছ পাইলে নিজে রাখুম কী আর ভাগিদারগোরে দিমু কী। হের পরে মাহাজনের দেনা ত আছেই।
কথা খারাপ কও নাই। হগলেই এই কথা কয়। আমি নদীত জাল বাওয়া ছাইড়া দিছি। তয় আডে-বাজারে গেলে কইতে পারি মাছের কী দাম।
আমি আহি আব্বা।
কাসু নদীর পাড়ে গিয়ে এক ধ্যানে বসে থাকে। নদীর দিকে তাকিয়ে দীর্ঘ নিঃশ্বাস নেয়। নদীর মাঝ পথ ধরে তেলের জাহাজ ধীরে ধীরে চলতে থাকে। মাছ ধরার ট্রলার দেখা যায় খুব কম। কাসু হঠাৎ উঠে দাঁড়াতেই বাল্যবন্ধু ফজলু কাসুর সামনে এসে দাঁড়ায়।
কী রে কাসু, এইহানে কী করতাছত?
কী আর করুম। নদীরে ভালা কইরা দেখতাছি। নদী আমাগোরে পেটে লাথি মারছে। খাওন দেয় না।
হেই কথা কইয়া লাভ নাই। নদীত আগে কত রহম মাছ পড়ত। এহন এক ইলিশ মাছ। তাও আবার ছোডখাডো। বাজারে নিলে কয় জাটকা। ধরতে গেলে সরকারি বাহিনীর লগে কত দইছই।
দইছই ত করবই। অগো বাপের টাকা দিয়া জাল কিনি ত। হের লাইগা আমাগো জাল পোড়াইয়া দেয়।
আসলে হালারা বড় ডাকাইত। ফজলু বলে।
ল দেহি, আচমত চাচায় জাল বোনতাছে। হেইয়ানে জামু।
ল যাই।
কাসু ও ফজলু আচমত মাঝির কাছে যায়। আচমত মাঝি তার দুই ছেলে নিয়ে জাল বুনে। সেখানে তারা সুখ-দুখের আলাপ করে। আলাপ করতে করতে বিকেল হয়ে যায়। কাসুর রহিমার কথা মনে পড়ে। ঘরে কেউ নেই। রহিমা একা ঘরে থাকবে কেমন করে- ভাবতে ভাবতে বলে- ল ফজলু, মেলা বেলা হইয়া গেছে। তর ভাবি ঘরে একলা। যাইতে হইব।
ক্যা, ভাবিরে কী কেউ লইয়া যাইব?
আরে কী কছ!
যা যা হক্কাল কইরা যা।
ফজলু কাসুরে ছাইড়া দে। ঘরে নতুন বউ। আচমত মাঝি বলেন।
কাসু বলে- হ চাচা, বাড়িত যাইতাছি। তয় আপনের লগে একটু কথার কাম আছে।
কও বাবা।
আমারে কয়ডা টাকা দেওন যাইব? নদীত নামলেই টাকা শোধ কইরা দিমু।
আইচ্ছা। তয় কত টাকা লাগব তর?
তিন হাজার টাকা দিলে ভালা অয়।
নেও। তয় সময়মতো শোধ কইরা দিবা, বাবা।
আপনে চিন্তা করবেন না, চাচা। টাকা আপনে পাইয়া যাইবেন।
কাসু টাকা পেয়ে খুশি মনে হাঁটতে থাকে। বাজারে গিয়ে চাল, ডাল, তেল ও গুড়ের জিলাপি ক্রয় করে ইজি বাইকে চড়ে বাড়ি যায়। বাইক থেকে নেমে গুনগুন করে গান গাইতে গাইতে ঘরের সামনে গিয়ে বলে, রহিমা দরজা খোল।
ক্যাডা?
আরে তোমার স্বামী কাসু মাঝি।
এমন কইরা কন ক্যা? শরম লাগে না।
এহন আর শরমের কাম কী। তুমি আমার পরান পাখি। কে কী কইব আমার তাতে কী যায় আহে। ব্যাগ ধরো, বাজারে গেছিলাম।
আহেন। ঘরে আইয়া পড়েন।
হোন বউ। বিয়ার আগে বাবার লগে মাছ ধরছি নদীত। কত মাছ যে পাইছি। আর এহন...।
পাইবেন। পাইবেন। আবার মাছে আপনার নাও ভইরা যাইব।
মাছ পামু কইত্তে? মানুষ গেছে হারমাইদ হইয়া। কেউ হাচা কথা কয় না। বুঝলা বউ, বিশ্বাস! বিশ্বাস হারাইয়া গেছে।
তয় যান, মুখ-হাত ধুইয়া আহেন। পাশের ঘরের থেইকা পিডা দিয়া গেছে। খাইতে দিমু।
ক্যাডা দিয়া গ্যাছে?
চাচি আম্মা।
হোন বউ, আইজ রাখছ ভালা কথা। কাইল তনে দিলে আর রাখবা না।
ক্যা?
বোঝবা না। তুমি বোঝবা না। আমি তহন ছোড। আমার মা-বাবায় মরার পরে অরা আমারে অনেক কষ্ট দিছে। চাচি আমারে মাইরা ফালাইতে চাইছে। আল্লায় আমারে বাঁচাইয়া রাখছে।
কী কন?
হ। ঠিকই কইছি। বাপ মরার পরের তন আল্লায় আমারে অনেক টাকা দিছে। নদীত নামলেই মাছ পাইছি। মেলা মাছ। টাকা আর টাকা। আমার টাকা দেইখা চাচির মাইয়া আঞ্জুরে আমার লগে বিয়া দিতে চাইছে।
হের পর?
হের পর আর কী। আমি না কইয়া দিছি। এহনো আমার পিছনে লাইগা রইছে। পারলেই ছোবল দিতে চায়।
আপন চাচিও এমন হয়?
হয়। হয় বউ।
বাদ দেন ওইসব কথা। আপনে পিডা না-খাইলে ঘরে মুড়ি আছে। গুড় দিয়া মাইখা খান।
হ। তাই দেও। হেইডাই ভালা।
রহিমা বাজার থেকে আনা সওদাগুলো একে একে গুছিয়ে রেখে টিনের পাত্র থেকে মুড়ি ও গুড় নিয়ে কাসুর সামনে দেয়। কাসু অপলক দৃষ্টিতে রহিমার দিকে তাকিয়ে থাকে-
বউ তুমি খাইবা না?
আপনে খান।
তুমি কিছু খাইছ?
আপনে খাইলেই ত আমার খাওন। 
এইডা কোনো কথা? তোমার খিদা লাগে নাই বুঝি?
বিনা কামে থাকলে আমাগো খিদা। কামে কামে থাকলে আমাগো খিদা লাগে না।
তোমার কথা হুইনা আমার একটা কথা মনে পইড়া গেল।
কী কথা?
আমার মায়ও এমন আছিল। বাবায় কত কইত খাইয়া লও। হের পরে কাম কইর। কে হোনে কার কথা? মায় না-খাইতে না-খাইতে একদিন ক্যান্সারে মইরা গেল। টাকার অভাবে মায়েরে ভালা ডাক্তার দেখাইতে পারি নাই। আইজ মায়ের কবরের ওপরে কত গাছ। ফলও ধরে। পাখিয়ে খায়। মাইনষেও খায়।
আমার মনে অয় আপনের মায় আপনেরে দোয়া দিয়া গেছে। আবার আপনে আগের দিন ফিরা পাইবেন।
ঠিকই কইছ বউ। হেইডাই যেন অয়। যাও হক্কাল হক্কাল রান্দনবারণ সাইরা লাও।
কাসু মাঝি গুড় দিয়ে মুড়ি মেখে খেয়ে চকির ওপর শুয়ে পড়ে। মাথার ওপর টিনের চালের মাঝে মাঝে ফুটো হয়ে আছে। ফুটো দিয়ে চাঁদের জোছনা চুয়ে চুয়ে পড়ে। ফুটোতে চোখ পড়তেই কাসু মনের সুখে গান ধরে-
টাকা পয়সায় নাইরে সুখ
বুকের মইধ্যে ভীষণ দুখ
সুখপাখিটা উইড়া গেছে দূরে...। কণ্ঠে গান থাকতেই বিল্লাল মাঝি 
ফোন দেয়।
কাসু ফোন ধরে। ফোনে শুধু জে জে করতে থাকে কাসু। কথা শেষে বিছানা থেকে লাফিয়ে ওঠে।
রহিমা খাওন হইছে?
আর একটু। অহনেই খাওন দিমু।
দেও। দেও। তয় হোন ভালা খবর আছে।
রহিমা রান্নাঘর থেকে ছুটে এসে বলে, কী খবর?
খবর আছে বউ। কাইল শ্যামরাজ যামু।
কই যাইবেন?
শ্যামরাজ।
এইডা আবার কোনহানে?
ক্যা, আমাগো ভোলার দক্ষিণে। হেনে অনেক মাছ পাওয়া যায়। আমাগো দিন ফিইরা যাইব।
হ। দেহেন। আল্লায় যেন আমাগো দিন ফিরায়। এহন কি কেউ গরিব আছে। ঘরে ঘরে বড়লোক। সবাইর ঘরেই টাকা। সবারই হাতে হাতে মোবাইল। দেশে চাউল-ডাইলের অভাব নাই।
ঠিকই কইছ বউ। শুধু আমাগো ঘরেই অভাব।
আপনে চিন্তা কইরেন না। আল্লায় দিলে কতক্ষণ। আপনে বহেন। আমি খাওন আনতাছি।
যাও।
কাসু রহিমাকে নিয়ে মনের আনন্দে তৃপ্তিসহকারে রাতের খাবার খায়। খাওয়ার মধ্যেই কাসু রহিমার দিকে থেকে থেকে চেয়ে থাকে। রহিমা কাসুর দিকে তাকিয়ে লজ্জা পায়।
খাইতে বইয়া আমার দিকে চাইয়া থাকলে হইব?
না। তয় তোমারে এত সুন্দর লাগতাছে। কইয়া বুঝাইতে পারুম না।
কী যে কন। আগে খাওন শেষ করেন।
রহিমার কথায় কাসুও একটু লজ্জা পায়। তাড়াতাড়ি খাবার খাওয়া শেষ করে বিছানায় যাওয়ার প্রস্তুতি নেয়। তারপর দুজনেই শুয়ে পড়ে বিছানায়। সুখ-দুখের কথা বলে-
দেহ বউ, বেহানে ঘরে খাওনের কিছু আছিল না। এহন দুজনে পেট ভইরা ভাত খাইছি। সবই আল্লার ইচ্ছা।
ঠিকই কইছেন। হারা দিন টাকা টাকা করলে ঘরে সুখ আহে না।
ঠিক কইছ। তোমারে বিয়াকরণের সময় আমার শ্বশুর তোমার গলায় আর কানে পঞ্চাশ হাজার টাকার স্বর্ণ দিছে। ঘরের মালামাল দিছে। কত টাকা খরচা হইছে। সবই ত বেইচা নাওয়ের পিছনে দিছি। তোমারে স্বর্ণ ফিরাইয়া দিতে পারি নাই।
মাছ বেইচা টাকা অইলে কিন্না দিয়েন।
হ বউ, আমার ইচ্ছা আছে। তয় তুমি ঠিকই কইছ। মাইনষে মাছ ধইরা বেইচা বেইচা কত টাকার মালিক হইয়া যাইতাছে। আমার বেলায় এমন ক্যা?
এই কথা কইয়েন না। আল্লায় ভালা জানে। 
আমাগো ঘরে পোলা-মাইয়া আইব। আমরা বাপ-মা অমু। আমার যে কী খুশি লাগতাছে। 
আপনের মুখে না কিছু আটকায় না।
খারাপ কী কইলাম?
না, ভালাই কইছেন।
জানো বউ, আমি লেদাকালের তন দুঃখে দুঃখে মানুষ অইছি। শান্তি দেহি নাই। চাচার সংসারে বড় অইছি। আমারে ওরা কথায় কথায় মারছে। স্কুলে যাইতে পারি নাই। অনেক কষ্টে থ্রি পর্যন্ত পড়ছি। আমার ইচ্ছা আল্লায় আমারে পোলা দিলে ওরে আমি লেহাপড়া হিগামু।
মানুষ করুম। দেহো বউ, আমাগো বিছানায় চান্দের আলো ঝরতাছে। টিন ফুটা হইয়া গেছে। এইবার নদীত মাছ পাইলে বেইচা চালে নতুন টিন লাগামু।
হ, তাই কইরেন।
তোমার লাইগা একটা লাল শাড়ি আনুম। নতুন শাড়ি পইরা ঠোঁটে রং লাগাইবা। আমি দেহুম। সাজলে যে তোমারে কী সুন্দর লাগে। বিয়ার রাইতে তোমারে কী যে সুন্দর লাগছিল কইয়া বুঝাইতে পারুম না।
আপনের ভালা লাগলে আমি সাজুম। আপনে আমারে মন ভইরা দেখবেন।
হ, এহনই ত আনন্দ। বুকের লগে বুক লাগাইয়া দুজনে এক হইয়া যামু। ভাসতে থাকুম সুখের সাগরে।
আপনেরে এত সুন্দর সুন্দর কথা হিগাইছে ক্যাডা?
হিগান লাগে না। মনের মইধ্যে আগেই জমা আছিল। কইতে পারি নাই। আইজ মনডা ভালা। হের লাইগা তোমার লগে সুখ-দুখের আলাপ করতাছি।
জানেন, বিয়ার আগে আপনে যহন আমাগো বাড়ির পাশে দিয়া যাইতেন তহন আমি আপনেরে চাইয়া চাইয়া দেখতাম। আর মনে মনে কইতাম- আহা রে মানুষডা দেখতে কী সুন্দর! আমি যদি জীবনের লাইগা পাইতাম তারে। ঠিকই আল্লায় আপনেরে আমার লাইগা পাওয়াইয়া দিছে।
আমিও মণ্ডলের দোকানে বইয়া বইয়া যহন টিভি দেখতাম তহন মনে মনে ভাবতাম- আমার যদি সুন্দর একখান বউ হইত। তোমারে পাইয়া আমি খুশি। আমারে ছাইড়া যাইবা না, কও বউ?
যামু না। যামু না। হুনছি গরিবের মাইয়ারা স্বামী ছাইড়া যায় না। গরিবের সংসারে অনেক শান্তি।
ঠিকই কইছ। আমাগো টাকা না থাকতে পারে। সুখের অভাব নাই। আমরা রাইতে ঘুমাইয়া যেই শান্তি পাই, বড়লোকেরা হেই সুখ পায় না।
বউ তুমি আমার আরও কাছে আহো। আমার পরানের মইধ্যে তোমারে আদর কইরা রাহি। রাইতটা বড় সুখের লাগতাছে।
আমি আপনের পরানের মইধ্যে ডুইবা গেছি। আমারে সুখ দেন। সুখের সাগরে ডুইবা যাইতে চাই আমি।
কাসু মাঝি ও রহিমা সুখের সাগরে ভাসতে ভাসতে হারিয়ে যায় অনেক দূরে। ভাঙা জানালার ফাঁক দিয়ে ঝিরঝিরে হাওয়া ঢোকে ঘরের ভেতর। তাদের অন্তরে ঢোকে জোছনাফুলের ঘ্রাণ।

তবুও খুঁজি

প্রকাশ: ১২ জুলাই ২০২৪, ০২:০৩ পিএম
আপডেট: ১২ জুলাই ২০২৪, ০২:০৩ পিএম
তবুও খুঁজি

কতদিন দেখি না, আর দেখি না কোথাও 
শিমুল ফুলের মতন রাঙা মুখখানি
কবে যেন স্মৃতির খাতায় ঢুকে গেছে জ্ঞাতসারে 
রাখিনি খবর কোনো;
কত অভয় বিকেল 
আর কত সাহসী সকাল পালিয়েছে সেই কবে 
ফিরেও চায়নি একবার
তবুও আমি ওপথে সকাল হয়ে ঝরি
বিকেলের পথ ধরে সন্ধ্যা নামাই 
রাতের গাঢ় অন্ধকার গলে নামে আমার নিগাঢ় অসুখ
বিষাদ শুয়ে থাকে চোখে 
নিরাকার হয়ে যাই নিমিষেই 
তবুও খুব মনে পড়ে
আমি বারবার খুঁজি 
খুব করে খুঁজে বেড়াই 
শিমুল ফুলের মতন রাঙা মুখখানি 
স্মৃতির খাতায় যে ঢুকে গেছে জ্ঞাতসারে।

প্রজাপতি দুই ছত্র

প্রকাশ: ১২ জুলাই ২০২৪, ০২:০১ পিএম
আপডেট: ১২ জুলাই ২০২৪, ০২:০১ পিএম
প্রজাপতি দুই ছত্র

এক.

সন্ধ্যায় 
    প্রজাপতি
         ঢুকে পড়ে
            ঘরে
তাতেই তো ঘরখানা নড়ে

দুই.

আমার এমন বসবাস
ঘরে ফিরে দেখি-
বিছানায় পড়ে আছে
           প্রজাপতির লাশ

প্রজাপতিটি নবম শ্রেণিতে পড়ত
                আমার বিশ্বাস

সে এক অদৃশ্য নারী

প্রকাশ: ১২ জুলাই ২০২৪, ০১:৫৮ পিএম
আপডেট: ১২ জুলাই ২০২৪, ০১:৫৮ পিএম
সে এক অদৃশ্য নারী

বাইরে তাকিয়ে দেখি আদিগন্তে আদিম নেশায় 
আহা কী সুনসান হা হা নীরবতা দাঁড়িয়ে রয়েছে!
হৃদয়ে চাঁদের মতো একফালি রতিকান্ত মুখ; 
পাশের গলির মোড়ে একা একটা কুকুর দেখি-
হাবভাবে মনে হয় দুশ্চরিত্র পুরুষ কুকুর; 
লাট সাহেবের মেয়ে কুকুরের সীমানা প্রাচীরে

পা উঁচিয়ে  আরামে  পেশাব করছে বেগানা লম্পট;
অদূরে বেশ্যার ঘরে ফূর্তিবাজ লোভী মহাজন
গলা ছেড়ে গান গায় বেসুরে গলায়- টাকা তুমি 
কেন যে সময় মতো আইলা না! বেলা ডুবু ডুবু 
কামানে ফুরিয়ে গেছে গোলা ও বারুদ- খেলা শেষ।
অলৌকিক জ্যোৎস্নাজলে একদিন স্নান করে যারা 

পাহাড়ে বেড়াতে যায় তারা ঘরে এখনো ফেরেনি;  
সবুজ স্তনের বাটে মুখ ঘষে জিভের ডগায়
ওরা কি মেঘের কোলে বৃষ্টি দেখে ময়ূরীর চোখে? 
আগুনে নির্ভীক নগ্ন পা রেখে যে সন্ন্যাসিনী হাঁটে, 
অন্ধকারে প্রাণ খুলে একাকী দুঃখের গান গায়
সে এক অদৃশ্য নারী, যে আমার সঙ্গে সঙ্গে থাকে।

ভোট

প্রকাশ: ১২ জুলাই ২০২৪, ০১:২৬ পিএম
আপডেট: ১২ জুলাই ২০২৪, ০১:২৬ পিএম
ভোট
অলংকরণ: নিয়াজ চৌধুরী তুলি

সামনে পঞ্চায়েত ভোট, একই সঙ্গে নিউটাউন পারিজাত অ্যাপার্টমেন্টেও ভোটের দামামা বেজে উঠেছে। অকালবোধনের মতো অকালভোট। বর্তমান কমিটি এক বছরও পুরোয়নি, অপোনেন্ট পার্টি উঠেপড়ে লেগেছে তাদের তাড়াতে।

স্টাডির জানলায় বসে, ব্যালকনির রেলিঙের পাশে দাঁড়িয়ে সুভাষবাবু বেশ টের পাচ্ছেন এসব উত্তেজনা। পাশের ফ্ল্যাটের আট বছরের টোরা সুভাষবাবুর বন্ধু; সে এসে বলল, ‘আমাদের ইলেকশন হবে, তুমি জান? কই, আমরা তো একদিনও ডিসকাস করিনি! এদিকে পাপা, মাম্মা সবাই বিজি টক করছে আবাউট ইট।’ 

সুভাষবাবু কুণ্ঠিত মুখে বললেন, ‘আমি তো তেমন কিছু জানি না, তুমি এসে বলবে, তবে তো আলোচনা শুরু করব?’ 

টোরা ব্যস্ত হাতে লেখার টেবিল, বুকশেলফ ইত্যাদি জায়গায় খুঁজে যায় তার রোজকার মুখশুদ্ধি। চকোলেট, মিষ্টি মৌরি, আমসত্ত্ব প্রভৃতি রেডি থাকে ওর জন্য। সুভাষবাবুর একমাত্র নাতি তার বাবা-মা’য়ের সঙ্গে থাকে মুম্বাইয়ে। বছরে অবশ্য অনেকবার যাতায়াত, তবু ফাঁকা লাগে। চার বছর আগে যখন পাকাপাকিভাবে নিউটাউনের এই ফ্ল্যাটে থাকতে এলেন তিনি, তখন থেকেই টরা তার বন্ধু। ওর বাবা-মা’ও হাঁফ ছেড়ে বেঁচেছে এই বন্ধুত্বে, এক প্রকার কৃতজ্ঞই তারা। কোভিডের কাল থেকেই ওরা ব্যস্ত ওয়ার্ক ফ্রম হোমে। বাচ্চাটা কোয়ালিটি টাইম কাটাচ্ছে সামনের ফ্ল্যাটের কাকুর সঙ্গে, এর থেকে বড় পাওয়া আর কী হতে পারে!

টোরা ঝাঁজিয়ে ওঠে, ‘খালি টেবিলচেয়ারে বসে বই পড়লে তুমি জানবে, কী হচ্ছে? নিচে দাদুরা বসে রোজ আড্ডা দেয়, তুমি যাও না।’
ওরে বাবা, একেবারে ললিতার কথার প্রতিধ্বনি; শুনেছে নিশ্চয়ই। সুভাষবাবুর স্ত্রী ললিতাকে ‘দিয়া’ বলে ডাকে টরা। ‘আমি যে বই পড়তে সব থেকে ভালোবাসি; তাই তো তোমায় এত রকম গল্প বলতে পারি।’ 

-‘স্টোরিগুলো তুমি ভালো বল। বাট দিয়া লিটিল আপসেট আবাউট ইওর বুকরিডিং, মাম্মাকে বলছিল।’ সুভাষবাবুর হাসি পেয়ে যায়, টরা ভাগ্যিস তা খেয়াল করেনি; সে আমসত্ত্ব মুখে দিয়ে বলল, ‘তুমি ইলেকশনে দাঁড়াবে? পাপা দাঁড়াবে। তুমি কিন্তু ভোট দেবে ওই ভালো আঙ্কেলকে; আমাদের জন্য স্লিপ, দোলনা… সব কিছু বানিয়ে দিয়েছে সে। আর পুজোর সময় কত্তো মজা করেছি, বল?’ 

-‘আচ্ছা তাই দেব, কিন্তু তুমি জান, ইলেকশন কী?’ 
-‘ইয়েস, পাপাকে আস্ক করেছিলাম, বুঝিয়ে দিয়েছে।’ 

এবারের কমিটির সেক্রেটারি ছেলেটি খুব অ্যাকটিভ। এক বছরের মধ্যে আবাসনের কত কাজ যে করেছে।… লাস্ট পনেরো বছরেও তা হয়নি! আশ্চর্য, তবু এদের সরানোর জন্য অপোজিট পার্টি উঠেপড়ে লেগেছে। কমিটি মানেই জনগণের টাকা; পুরনো কমিটি তার ওপর আধিপত্য করে গেছে বহুদিন। কমিউনিটির টাকায় ক্যাম্পাসে রোজই পার্টি লেগে থাকত; পারটিকুলার কিছু মানুষকে নিয়ে। মুষ্টিমেয় সেই মানুষগুলোই অপোজিট পার্টি। সব রকম সুযোগ-সুবিধা তারা ভোগ করে। যেমন, খালি গ্যারেজে বাইরে থেকে গাড়ি এনে ঢুকিয়ে রাখা, বাস্কেটবল কোর্ট বা জিমে নিজেদের আধিপত্য বজায় রাখা, সবার পয়সায় হওয়া কালচারাল প্রোগ্রামে শুধু তাদেরই অংশগ্রহণ; ওদের তোষামোদী দল ছাড়া, অন্যরা গিয়ে হাঁ করে দাঁড়িয়ে থাকে। এখানেই শেষ নয়, আস্তে আস্তে অনেক খবর পাওয়া যাচ্ছে; ওরা নাকি ইচ্ছেমতো আবাসন ফান্ড থেকে টাকা ধার নিত, নিজেদের কাজ মেটানোর জন্য। কী কাণ্ড, সুভাষ বাবু যত শোনেন তত অবাক হন। টরা আর সুভাষবাবু মিলে নিভৃতে দুটি নাম দিয়েছেন এখানকার জনগণের; আসলে টোরাই দিয়েছে, জি পার্টি অ্যান্ড বি পার্টি। জি ফর গুড, বি ফর ব্যাড। হয়তো ওর বাবা-মা’র মুখে শুনেছে; বাচ্চাদের কান বাঁচিয়ে কথা বলা খুব মুশকিল। 

সুভাষবাবু প্রথম থেকেই কারুর সঙ্গে বিশেষ মেশেন না; বরং তার স্ত্রী সিনিয়র লেডিস গ্রুপের সক্রিয় সদস্য। দিব্যি কিটি পার্টি করে বেড়ায়। কমিটি মিটিং সে-ই অ্যাটেন করে। বজ্জাত লোকগুলোর সঙ্গেও হেসে কথা; তবে পছন্দ যে করে, তা নয়। ললিতার বক্তব্য, ‘সংসারে সব ধরনের মানুষ থাকে, সবাইকে নিয়ে চলতে হয়, না হলে একা হয়ে যেতে হয়। সবাই তো তোমার মতো একা থাকতে পারে না?’ কী উত্তর দেবেন এর সুভাষবাবু? অপছন্দ হলে কেমন করে হেসে গল্প করা যায়… তিনি ভেবেই পান না! 

ললিতা বলছিল, ভোট হবে। অবশ্য মেইলে তো নোটিফিকেশন আসতেই থাকে। যেহেতু মোট ফ্ল্যাট এক শ কুড়ি; হাউসিং বোর্ডের নিয়ম অনুযায়ী তার ওয়ান থার্ড অর্থাৎ চল্লিশ জন বোর্ড মেম্বার নিয়ে কমিটি হবে। বাজার দোকান যাওয়ার পথে লোকজনের সঙ্গে টুকটাক কথা হয়, আবাসনের ভোটের আঁচ সুভাষবাবুও পান। এই তো সেদিন বি পার্টির লিডার ছেলেটি তাকে রাস্তায় ধরেছিল, ‘কাকু, আপনাকে ভোটে দাঁড়াতে হবে; আমরা খুব চাই, আপনি আমাদের সঙ্গে থাকুন।’ সুভাষবাবু মৃদু হেসেছেন, আসলে ওদের যা ইমেজ হয়েছে, তাতে সুভাষবাবুর মতো নিরপেক্ষ কিছু ভালো মানুষ দরকার নিজেদের দলে। তাদের দেখিয়ে ওরা ছড়ি ঘোরাবে। ইচ্ছে ছিল মুখের ওপর বলে দেন, ‘এ কমিটি তো দারুণ চলছে, তিন বছর থাকার কথা; কত কী-ই না করছে এরা। ভালো আছি সবাই, কী দরকার ছিল, হল্লা করে এদের সরিয়ে নতুন ইলেকশনের?’ কিন্তু শেষ অব্দি আর ঘাঁটালেন না, নিজেকে সংবরণ করে বললেন, ‘ভোটার হিসেবে থাকব, নমিনেশন দিয়ে দাঁড়ানো সম্ভব নয়।’ 

কথার উপস্থাপন কি রুঢ় হলো? হোক, তিনি হাঁটা দিলেন গেটের দিকে; ছেলেটাকে দেখলেই তীব্র মদের গন্ধ পান সুভাষবাবু। এটা অবশ্য পুরোটাই তার মানসিক প্রবলেম; সব সময় কি আর কেউ মদ খেয়ে থাকে? আসলে ওই লিডার এবং তার দলবলের মস্তানির ঠেলায় ফ্ল্যাটের নিরীহ লোকেদের প্রাণ ওষ্ঠাগত। সুভাষবাবুই তো আজ চার বছর ধরে সইছেন, অন্যরা আরও অনেক বছর। ঠিক তার ফ্ল্যাটের নিচেই গজবখানা খুলে বসেছে। এদিকমুখো সব ফ্ল্যাটেরই এই এক যন্ত্রণা। সারভেন্টস রুমের ফাঁকা ঘরে মদের আড্ডা, প্রত্যেক উইকেন্ডে; সঙ্গে উপরি পাওনা অশ্লীল শব্দ, খিস্তি। নতুন কমিটি এসেও এটা বন্ধ করতে পারেনি, তবে কিছুটা ম্রিয়মাণ হয়েছিল। প্রতিবাদী যে নেই তা নয়; কিন্তু সংখ্যায় বড়ই নগণ্য। ঝাঁকড়া চুলের একটি মেয়ে আছে, তানিয়া, ব্যাংকে কাজ করে; সে মাঝে মাঝে মেইলে প্রতিবাদ করে। কী চমৎকার ভাষার বাঁধুনি; সুভাষবাবু প্রতিটা মেল খুঁটিয়ে পড়েন। এতগুলো মানুষ যা করতে পারে না, তরুণী মেয়েটি তা করতে পারে। এসব কারণে তার পরিবার এবং অন্যান্য স্বল্পসংখ্যক প্রতিবাদী পরিবার ক্যাম্পাসে এতদিন একঘরে ছিল, প্রাপ্য সুবিধাগুলো পেত না। 

মেইন গেটের বাইরে বেরোতেই দোকানের সারি চোখে পড়ে; হঠাৎ হঠাৎই বিনা কারণে মেলা বসে যায় এ অঞ্চলে। পাশেই বিরাট সেভেন স্টার ক্লাব; ওদের বদান্যতায় সব সময় কোনো না কোনো অনুষ্ঠান চলতে থাকে। সুভাষবাবু বেরিয়েছেন চিকেন কিনতে। ললিতা আজ তার লেডিস ক্লাবের সবাইকে চিকেন পকউরা খাওয়াবে। গেটের কাছে রিটায়ার্ড বৃদ্ধদের আড্ডা জমে উঠেছে। ওরা ডাকাডাকি করছিল চা খেতে। সব সময় এড়িয়েও যাওয়া যায় না; ভদ্রতায় লাগে। তাই চিকেন নিয়ে ফেরার পথে ওদের সঙ্গে পাঁচ মিনিটের জন্য বসলেন। আবাসনের ভোট নিয়ে উত্তপ্ত আলোচনা চলছে সেখানেও। সুভাষবাবু চুপ করে শুনছিলেন; হাওয়া দেখলেন, স্ট্যান্ডিং কমিটি এবং সেক্রেটারির দিকেই। 

ওদিকে ললিতা ফোন করছে চিকেনের জন্য, সুভাষবাবু খালি চায়ের কাপটা বিনবক্সে ফেলে উঠতে গেলেন। অন্যরা হাত চেপে ধরলেন, ‘আরে, এখনই উঠছেন যে বড়? এমনিতেই আসেন না, একটু বসে যান।’ 

-‘সুভাষবাবু থলি দেখিয়ে বললেন, এটা এখুনি কিচেনে দিতে হবে।’
-‘এটা কোনো সমস্যা? সিকিউরিটি দিয়ে আসবে। আর আপনি আমাদের কীর্তন গ্রুপে আসছেন না কেন? এটা ঠিক হচ্ছে না মশাই; আসবেন, একসঙ্গে খানিক গল্পগুজবও তো হবে? মাসের শেষ রোববার, মনে রাখবেন কিন্তু।’ 

সুভাষবাবু চিরকালের কমিউনিস্ট, তাও তিনি মাথা নাড়লেন, ‘আচ্ছা’। লিফটে উঠে হাঁফ ছেড়ে বাঁচলেন।

সন্ধ্যা হতেই গরম চিকেন পকউরা আর ফ্লাস্কে করে ঘন দুধের চা নিয়ে ললিতা সিনিয়র লেডিস গ্রুপের কিটি পার্টিতে চলে গেল। এর একটু পরেই নিচে মদের আড্ডা শুরু হবে। আজ জোরদার বৈঠক চলবে। কারণ নেক্সট উইকেই ভোট। ইতোমধ্যে ব্যাড পার্টি ক্যাম্পেনিংও করে গেছে। ফ্ল্যাটে ফ্ল্যাটে গিয়ে সবাইকে বলছে, কিন্তু এক্সিসটিং কমিটির কাউকে দেখা যাচ্ছে না প্রচারে। সুভাষবাবু ভাবেন, ওরাও সামান্য প্রচার করলে মন্দ হতো না। মনে মনে ভাবেন, ওদের কি একবার বলবেন তিনি? তার পরই নিজেকে গুটিয়ে নিয়ে ভাবেন, থাক, যা হচ্ছে হোক। কপালে যদি ওই বদ পার্টি থাকে, আসবে; তিনি কী-ই বা করতে পারেন!

দেখতে দেখতে পরের সপ্তাহ শেষ হতে চলল। সুভাষবাবুর ছেলে কোনো রকম খবর না দিয়ে বাবা-মা’কে সারপ্রাইজ দিতে বউ-বাচ্চা নিয়ে হাজির! কী কাণ্ড, বাড়িতে খুশির ঝড়, এবার নাতিবাবুর সঙ্গে টোরার ভয়ংকর ভাব হয়ে যাওয়ায় সুভাষবাবু একটু করনার্ড; কিন্তু এর আনন্দ আবার অন্যরকম। 

এ উইকে নিচে গজবখানা চলল উইকেন্ডেতেও। সুভাষবাবু খুশির মেজাজে অত আর পরোয়া করলেন না। কিন্তু ছেলে প্রতিবারের মতোই রেগে আগুন! সুভাষবাবু এবং তার স্ত্রী, কোনোমতে ছেলেকে সামলালেন। বয়স হয়েছে তাদের, এজন্যই দুর্জনকে এড়িয়ে থাকা; ছেলেও বুঝে স্থির হলো। কাল ভোট, আজ নিচের আড্ডাখানায় মহা কলরব; তীব্র মদের গন্ধ এবং অশ্লীল কথার ঝড় চলল বহুক্ষণ। এবার দুশ্চিন্তা আর উত্তেজনা অনেক বেশি। কারণ এতদিন বসে বসে জিতে যাওয়া পার্টিকে লড়াই করে জিততে হচ্ছে। তার পর বর্তমান কমিটি এত ভালো ভালো কাজ করেছে, ছলাকলা করেও তাদের হারাতে বহু বেগ পেতে হবে। সুভাষবাবু দরজা-জানলা বন্ধ করে শুতে পারেন না, কিন্তু খিস্তি এবং মদের তীব্র গন্ধ থেকে বাঁচতে তাই করলেন। কাল সন্ধ্যার ফ্লাইটে ছেলেও বেরিয়ে যাবে। 

হঠাৎ মাঝরাতে ঘুম ভেঙে গেল সুভাষবাবুর; নিচে কীসের গণ্ডগোল? ছেলের গলাও তো পাচ্ছেন! তড়িঘড়ি নিচে নেমে এলেন তিনি, ক্যাম্পাসে প্রচুর পুলিশ! সেক্রেটারি ছেলেটিকে তারা নানান জিজ্ঞাসাবাদ করছে। আর বারবার বলছে, ওই গুণ্ডাটার কথা, মদের আড্ডার লিডার যে। আবাসনে একাধিক গাড়ির মধ্যে বহু নিষিদ্ধ বস্তু ঠাসা, খবর পেয়ে নাকাচেকিংয়ে এসেছে ওরা। সেক্রেটারি ছেলেটি আচমকা এই ঝামেলায় ঘাবড়ে গেছে; অন্যের খালি গ্যারেজে বহুদিন ধরেই গাড়িগুলো ঢুকিয়ে রেখেছে মাস্তান ছেলেটা। এ নিয়ে আবাসনের বাসিন্দাদের যথেষ্ট অসন্তোষ ছিল, কিন্তু মদপার্টির ভয়ে তারা চুপ ছিল। 

পুলিশ ফ্ল্যাটে গিয়ে খুঁজে পায়নি ওকে, কোথায় দিয়ে পালাল? গেটে তো গিজগিজে পাহারা! পুলিশ নাকি সব ফ্ল্যাট চেক করবে, কোথাও যদি গা ঢাকা দিয়ে থাকে? তা আবার সম্ভব নাকি, এতগুলো ফ্ল্যাট? পুলিশের লোকজন বলল, ‘কালপ্রিটকে চাই আমাদের, সেক্রেটারি, প্রেসিডেন্ট, থানায় যাবেন আপনারা।’ 

প্রায় রাত কাবার হতে চলল, কোনোক্রমে থানায় যাওয়া আটকাল সেক্রেটারি, প্রেসিডেন্ট। পুলিশ বলে গেল, ‘কলকাতার বাইরে যাবেন না, আমাদের না বলে।’ 

সারা রাত যুদ্ধের পর, পারিজাত অ্যাপার্টমেন্ট ঘুমোতে যাবে কিনা ভাবছে, আর ঠিক তখনই পুলিশ ব্যাক করল। -‘টু সি ফ্ল্যাটে আর একবার হানা দিতে হবে।’ প্রায় সবাই তখনো নিচে দাঁড়িয়ে। পুলিশ সেক্রেটারিকে সঙ্গে যেতে বলল, আরও কয়েক জনের সঙ্গে কী মনে করে সুভাষবাবুও সঙ্গী হলেন। 

ঘন ঘন বেলের আওয়াজে টু সি ঘুম চোখে দরজা খুলল। মাস্তানের ফ্ল্যাট ওর ওপরেই। সবাই চেনে এই ফ্ল্যাটের লোকজনকে। চল্লিশোর্ধ্ব গৃহস্বামী রজত, গুণ্ডার বন্ধু। চোখ কুঁচকে খানিকক্ষণ তাকিয়ে থাকার পর বলল, ‘আপনারা তো দেখে গেলেন?’ 

‘আবার দেখব, সরুন…’ গট গট করে পুলিশ ভেতরে ঢুকে যায়।- ‘ওই ঘরটা দেখান তো, যেখানে আপনার অসুস্থ শালাবাবু শুয়ে আছেন?’ 

এবার রজতের স্ত্রী সামনে এসে দাঁড়ায় -‘আপনারা তো দেখে গেলেন, উনি একে মেন্টাল পেশেন্ট, তার ওপর ক্যানসারে আক্রান্ত, লাস্টস্টেজ; প্লিজ উনাকে জাগাবেন না।’ 

রজতের শালাবাবু এমন অসুস্থ? উপস্থিত সবাই অবাক হলো, জানত না কেউ! ভেতরে বাকবিতণ্ডা চলছে, মিনিট খানেকের মধ্যে সবাইকে অবাক করে পুলিশের হাত ধরে বেরিয়ে এল বি গ্রুপের মাস্তান লিডার; সঙ্গে রজত, রজতের স্ত্রী। সবাইকে প্রিজন ভ্যানে তোলা হলো; পুলিশ আধিকারিক সেক্রেটারি, প্রেসিডেন্টকে বলে গেল, ‘আমাদের না জানিয়ে আপনারা শুধু কলকাতা ছাড়বেন না প্লিজ।’ 

সেক্রেটারির বিস্ময়ের ঘোর কাটেনি, অন্যদেরও এক অবস্থা। তবু ঘাড় নেড়ে জানাল, ‘আচ্ছা।’ ধোঁয়া উড়িয়ে গাড়ি বেরিয়ে গেল; সবাই গুঞ্জন করতে লাগল, এই পরিস্থিতিতে কাল ভোট করা সম্ভব? সারা রাত প্রায় জাগা সবাই। 

সেক্রেটারি ছেলেটি কিছু বলতে যাচ্ছিল, আগাগোড়া চুপ থাকা সুভাষবাবু এগিয়ে এসে বললেন, ‘ভোট কালই হোক।’
সবাই সমস্বরে বলে উঠল, ‘ইয়েস, এতদিনের প্রস্তুতি, নির্বিঘ্নে ভোট কালই হবে! হিপ হিপ হুড়রে…’

ত্রিপুরা উপাখ্যান ও সাবিনার কথা

প্রকাশ: ১২ জুলাই ২০২৪, ০১:১৫ পিএম
আপডেট: ১২ জুলাই ২০২৪, ০১:১৫ পিএম
ত্রিপুরা উপাখ্যান ও সাবিনার কথা
অলংকরণ: নিয়াজ চৌধুরী তুলি

গত সংখ্যার পর

ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামী ও বামপন্থি তাত্ত্বিক শ্রীযুক্ত পান্নালাল দাশগুপ্তের বিপ্লবী রাজনৈতিক পরিচিতির সঙ্গে আরও একটি পরিচিতি যোগ হতে পারে। ঢাকার বাংলা ভাষা আন্দোলনকে পশ্চিম বাংলার মানুষের কাছে যে কয়েকজন মানুষ বরণীয় করে তুলতে উদ্যোগী হয়েছিলেন, শ্রীদাশগুপ্ত তাদের প্রধান। এদের উদ্যোগেই কলকাতায় ‘একুশে ফেব্রুয়ারি’ উদযাপন কমিটি গড়ে ওঠে। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের সমর্থনে বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ নিবন্ধ প্রকাশিত হয় পান্নালাল দাশগুপ্তের। এতে ত্রিপুরার নিরাপত্তা নিয়ে তিনি গুরুতর শঙ্কা প্রকাশ করেন। কারণ ভৌগোলিক অবস্থানের ফলে ক্ষুদ্র রাজ্যটিকে দখল করার বিশেষ সামরিক সুবিধে ছিল পাকিস্তানের। পান্নালাল দাশগুপ্ত বলেন- ‘ত্রিপুরা রাজ্যটি পাকিস্তানের ভেতরে একটা প্রতিকূল সশস্ত্র গোঁজ হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে। চট্টগ্রাম বন্দর থেকে ঢাকার রেল ও রোডের যাতায়াত পথ ত্রিপুরায় অবস্থিত ভারতীয় কামানের পল্লার মধ্যে। আবার পূর্ববাংলার অনেকগুলো শহর ত্রিপুরার ঘাঁটিগুলোর আক্রমণের মধ্যে অবস্থিত। মুক্তিফৌজরাও ত্রিপুরার ঘাঁটিগুলোকে অবাধ আক্রমণের কাজে ব্যবহার করতে পারছে। অথচ ত্রিপুরার তিন দিকেই পাকিস্তান।’ 

কৌশলগত দিক থেকে আগরতলা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে রাজধানী ঢাকার সঙ্গে তার ভৌগোলিক নৈকট্যের কারণে। ঢাকা থেকে ট্রেনে চেপে আখাউড়া, কসবা যাওয়া মানেই আগরতলার বুকের ভেতরে ঢুকে পড়া। সড়কপথে আড়াই-তিন ঘণ্টার মধ্যেই পৌঁছে যাওয়া যায়- আগরতলা এতই কাছের! সে কারণেই অবিভক্ত সিলেট, কুমিল্লা, নোয়াখালী, চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রামের সীমান্তঘেঁষা এই ভারতীয় অঞ্চলে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বিদ্রোহী বাঙালি সদস্য থেকে শুরু করে লাখ লাখ দেশত্যাগী মানুষ স্রোতের মতো ঢুকে পড়ে। 

অনেক কথা বলে চলেছেন সার্জন রথীন দত্ত, মনে করার চেষ্টা করেছেন আরও বেশি। অনেকটাই ক্লান্ত হয়েছেন তিনি। চোখ বন্ধ করে চেয়ারটায় খানিকক্ষণ বসে থাকলেন। উঠে গিয়ে চোখেমুখে পানি দিলেন। রুমটায় এসি চালু ছিল। দত্ত বাবু ভজহরিকে ডেকে বললেন- এসিটা বন্ধ কর ভজহরি, দরজা-জানালা খুলে দে। মল্লিকা সেনগুপ্ত কিছুটা অবাক হয়ে বলেন- বাইরে কিন্তু বেশ গরম পড়েছে, স্যার। এসি বন্ধ থাকলে আপনার অসুবিধে হবে না? 

রিপোর্টারের প্রশ্নের উত্তর এল সঙ্গে সঙ্গে- না রে মেয়ে, অসুবিধা বিশেষ কিছু হবে না। কেমন গুমট হয়ে গেছে। দরজা-জানালা কিছুক্ষণ খোলা থাক- জোরে ফ্যান চলুক। ঘরে বাইরের বাতাস ঢুকুক। 

এরপর স্মৃতি রোমন্থনের মতো, মুখে হাসি টেনে আবারও শুরু করলেন সার্জন রথীন দত্ত: 
শোন, ১৯৭১ সালে খুব গরম পড়েছিল। সে বছর শীতও নেমেছিল জাঁকিয়ে। সেই শীতের মধ্যেই বাংলার ছেলেরা রাইফের ট্রেনিং দিয়েছে। পাহাড় কাটা জমিতে তাঁবু টানিয়ে থেকেছে। লাখো রিফিউজি খোলা জায়গার টিন, বাঁশ, ছন, তাঁবুর ক্যাম্পে থেকেছে। 
রথীন দত্ত আবারও শুরু করলেন একটু বিরতি নিয়ে। 

অদ্ভুত একটা সময় গেছে তখন; মানুষ কতটা অমানুষ হতে পারে, এবং মানুষ কতটা মানুষ হতে পারে, দুটোই পরিষ্কার দৃষ্টান্ত সৃষ্টি করেছে ১৯৭১! একদিকে ধর্মের নামে মানুষ খুন, ধর্ষণ, লুণ্ঠন চলছে; অন্যদিকে ধর্ম নেই, বর্ণ নেই, গোত্র নেই- শুধুই মনুষত্ব! জানিস, আমাদের ডাক্তারি পেশাটাকে কোনো পেশা মনে হয়নি তখন। শুধুই মনে হতো আমরা সবাই যেন আমাদের ভাইদের, আমাদের বোনদের, আমাদের সন্তানদের জন্য কাজ করছি। নিজের অজান্তেই ওপারের যুদ্ধটা কখন যে আমাদের যুদ্ধ হয়ে গেছে, ওদের যন্ত্রণাটা কখন যে আমাদের যন্ত্রণা হয়ে গেছে- বুঝতেই পারিনি! 

মল্লিকা সেনগুপ্ত বুঝলেন সার্জন দত্ত হয়তো আরও কিছু বলবেন। অতএব, সঙ্গে সঙ্গেই বললেন- আচ্ছা স্যার, আপনি বলছিলেন খুবই গরম ও ঠাণ্ডা পড়েছিল সেবার। তার মধ্যে লাখো উদ্বাস্তু! কেমন ছিল পরিস্থিতি? 

ওই যে বললাম, লোকে লোকারণ্য ত্রিপুরা। প্রতিটি বাড়িতে, প্রতিটি অফিসে, হাসপাতালে, মসজিদ-মন্দিরে, পাহাড়ে- সমতলে লাখো ছিন্নমূল মানুষ। 

বুঝলে, পাকিস্তানের সৈন্যদের হত্যাযজ্ঞ শুরুর পর থেকে ভারতের দুটি রাজ্যে সবচেয়ে বেশি শরণার্থীর সমাগম ঘটে। একটি পশ্চিমবঙ্গ, অন্যটি ত্রিপুরা। ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের মোট ৪ হাজার কিলোমিটারের মতো সীমান্ত। এর মধ্যে ৮৩৯ কিলোমিটার ত্রিপুরার সঙ্গে। দীর্ঘ লাগোয়া সীমান্তের কারণে দেশত্যাগীদের একটি বড় অংশ ঢুকে পড়ে ত্রিপুরায়। শীর্ষ রাজনৈতিক নেতৃত্বের একটি বড় অংশও আসে। মোটকথা, আগরতলা বাংলাদেশের যুদ্ধের অন্যতম প্রধান ঠিকানা হয়ে দাঁড়ায়। আগরতলা, উদয়পুর, ধর্মনগর, বিশালগড়, বিলোনিয়া, মেলাঘর, খোয়াই, কৈলাশহর, সাব্রুমের নাম অঙ্গাঙ্গিভাবে যুক্ত হয় বাংলাদেশের যুদ্ধের সঙ্গে। 

সার্জন দত্তের স্নানেরর সময় হয়েছে, পুরনো গৃহকর্মী ভজহরি আগেই স্মরণ করিয়ে তার দায়িত্ব সেরেছে। একবার তাড়াও দিয়ে গেছে। অতএব, দত্ত বাবু বিপাকে পড়লেন। দীর্ঘদিনের নিয়ম না ভেঙে দোতলায় উঠে যাওয়াই ঠিক করলেন। কিন্তু চেষ্টা করেও পারলেন না। তার মনে হতে থাকল- বলি না আরও কিছু কথা, নতুনরা জানুক, শুনুক; এখনো বলার যে সময়টুকু আছে তার ব্যবহার করাই তো ভালো। 

৬. 
সার্জন দত্ত এরপর যা যা বলে গেলেন তা গুছিয়ে নিলে এ রকম দাঁড়ায়: 
শেখ মুজিব তখন বাংলার অবিসংবাদী নেতা। কিন্তু সেই এক ট্র্যাডিশন পাকিস্তানের! আইয়ুব খানের বিদায়ের পর নতুন প্রেসিডেন্ট হলেন আরেক জেনারেল- সেনাবাহিনী প্রধান ইয়াহিয়া খান। কৌশলগত কারণে তিনি দেশে নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করলেন। ভাবলেন নির্বাচন দিলেই পরিস্থিতি ঠাণ্ডা হবে। নির্বাচন হলো ১৯৭০ সালের ডিসেম্বরে। কিন্তু সেনা গোয়েন্দাদের রিপোর্ট ভুল প্রমাণ করল আওয়ামী লীগ। পাকিস্তান ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলিতে মোট ১৬৭ আসন লাভ করল দলটি। পূর্ব পাকিস্তানে পেল ২৮৮টি। অর্থাৎ ন্যাশনাল ও প্রভিনশিয়াল- দুই অ্যাসেম্বলিতেই নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেল শেখ মুজিবুর রহমানের দল। স্বভাবতই জেনারেলরা রুষ্ট হলেন- রেজাল্ট তাদের মনঃপুত হলো না। 

মল্লিকা সেনগুপ্ত: সেদিনের নির্বাচনি ফলাফল মানা হয়নি, বইপত্র পড়ে যতটা জানি আমরা।

সার্জন দত্ত : না, মানেনি। কারণ ওদের ডিকশনারিতে গণতন্ত্র শব্দটি নেই। অতএব, নির্বাচনি ফলাফল মানা হয়নি। কারণও ছিল। নির্বাচনের ফল মানলে শেখ মুজিব পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হবেন। কিন্তু কোনো বাঙালির হাতে কি পাকিস্তানের ক্ষমতা দেওয়া যায়! এমনটা ভাবতেই পারত না পাকিস্তানিরা! অতএব, চলল ষড়যন্ত্র। মার্চ মাসের ৩ তারিখে জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন ডাকা হলো। চারদিকে বিপুল প্রস্তুতি। কিন্তু মার্চের ১ তারিখে হঠাৎ রেডিওতে একটি ঘোষণা দিয়ে সামরিক প্রেসিডেন্ট অধিবেশন স্থগিত ঘোষণা করলেন। ফলে পরিস্থিতি আরেক দফা উত্তপ্ত হলো। 

এরই মধ্যে, ৭ মার্চ রমনার বিশাল ময়দানে সুবিশাল এক জনসভা ডেকে তার মানুষকে আরেক দফা তুঙ্গে নিলেন শেখ মুজিব। সভা তো নয়- জনসমুদ্র! ২০ লাখ মানুষের সামনে তিনি দাবি পেশ করলেন সেনাবাহিনীকে অবিলম্বে ব্যারাকে ফিরিয়ে নিতে হবে। জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে হবে। সেনাবাহিনীর হাতে যেসব হত্যাকাণ্ড ঘটেছে তার সুষ্ঠু বিচার করতে হবে। আরও ঘোষণা দিলেন- দাবি মানা না পর্যন্ত সারা পূর্ব বাংলায় চলবে পরিপূর্ণ অসহযোগ। রেল, ট্রেন চলবে না। অফিস-আদালত চলবে না। ফেক্টরি বন্ধ থাকবে। হলোও তাই। শেখের নির্দেশে চলতে থাকল পূর্ববঙ্গ। কার্যত সেদিন থেকে পাকিস্তানের কর্তৃত্ব সম্পূর্ণভাবে অস্বীকার করল বাঙালি। 

মল্লিকা সেনগুপ্ত: কিন্তু স্যার, একটা কথা বলি। আপনারা ভারতে বসে এতসব খবর জানলেন কী করে? সীমান্ত, যোগাযোগ- সব তো বন্ধ ছিল?

সার্জন রথীন দত্ত: ওই যে বললাম- লাগোয়া সীমান্ত। ওই যে বললাম- টান, মাটির টান। তার মধ্যে কলকাতা, আগরতলার পত্রপত্রিকাগুলো বিস্তারিত সবকিছু রিপোর্ট করেছে। বিবিসিসহ বিদেশি রেডিওগুলো দিনকার ঘটনার বিবরণ দিয়েছে। বর্ডারে লোকজন যাতায়াত করেছে। ফলে খবর চাপা থাকেনি।

ঢাকা নগরীতে পাকিস্তান সেনাবাহিনী প্রথম আক্রমণ শুরু করে ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাত ১১টার দিকে। পরদিন সকালেই ত্রিপুরায় বসে আমরা খবরটা পাই। প্রথম রাতেই প্রায় এক লাখ নিরীহ মানুষকে হত্যা করা হয়। ঢাকা ইউনিভার্সিটির কয়েকটি ছাত্রাবাসে ঘুমন্ত ছাত্রদের ওপর চলে চরম নিষ্ঠুরতা। শত শত ছাত্রকে খুন করা হয়। বাঙালি পুলিশ ও বর্ডার বাহিনীর সদর দপ্তরগুলোতে আক্রমণ চালানো হয়। অগণিত পুলিশ ও বাঙালি বর্ডার গার্ড নিহত হন। এই পরিস্থিতিতে ২৬ মার্চ, অর্থাৎ ২৫ মার্চ মধ্য রাতে, শেখ মুজিব দেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। সে রাতেই সেনাবাহিনী কমান্ডোরা ধানমন্ডির বাড়ি থেকে তাকে গ্রেপ্তার করে ক্যান্টনমেন্টে নিয়ে যায়। ওর বাড়িটি তছনছ করা হয়, সেনারা সব দলিলপত্র নিয়ে যায়। আগরতলায় বসে আমরা সেই ঘটনা অবগত হই পরের দিন। আমার পরিচিত অধ্যাপক মিহির দত্ত ছিলেন কলেজের শিক্ষক। পণ্ডিত মানুষ। ওর কাছে একটা ফিলিপ্স ফিলেটা রেডিও ছিল। ওর বাতিক ছিল রেডিও মনিটর করার। ব্যক্তিগতভাবে গোপন বেতারের সম্প্রচার রেকর্ড করতেন তিনি। ফলে পরিস্থিতি জানতে সুবিধে হলো, গুরুত্বপূর্ণ পাকিস্তানি রণপ্রস্তুতি ভারতীয় কর্তৃপক্ষের হাতে ধরা পড়ল। 

চলবে...

১ম পর্ব

২য় পর্ব

৩য় পর্ব

৪র্থ পর্ব

৫ম পর্ব

৬ষ্ঠ পর্ব

৭ম পর্ব

৮ম পর্ব

৯ম পর্ব

১০ম পর্ব