ডাউন সিনড্রোম হলো একটি জেনেটিক বা বংশানুগতিক সমস্যা, যা শিশু জন্মের সময় ক্রোমোজোমের অতিরিক্ত কপির কারণে দেখা দেয়। সাধারণ মানুষের দেহের প্রতিটি কোষে ৪৬টি ক্রোমোজোম থাকে, যা সমানভাবে মা ও বাবার কাছ থেকে আসে। ডাউন সিনড্রোমে ২১তম ক্রোমোজোমে অতিরিক্ত কপি থাকে, যাকে ‘ট্রাইসমি ২১’ বলা হয়। এর ফলে শিশুর শারীরিক ও মানসিক বিকাশে বিশেষ বৈশিষ্ট্য দেখা দেয়।
প্রকারভেদ
ডাউন সিনড্রোম তিন ধরনের হয়ে থাকে—
১. ট্রাইসোমি ২১: সবচেয়ে সাধারণ প্রকার (প্রায় ৯৫ শতাংশ ক্ষেত্রে)। প্রতিটি দেহকোষে ২১ নম্বর ক্রোমোজোমের তিনটি কপি থাকে।
২. ট্রান্সলোকেশন ডাউন সিনড্রোম: প্রায় ৪ শতাংশ ক্ষেত্রে। ক্রোমোজোম ২১-এর অংশ অন্য ক্রোমোজোমের সঙ্গে যুক্ত হয়।
৩. মোজাইক ডাউন সিনড্রোম: প্রায় ১ শতাংশ ক্ষেত্রে। কিছু কোষে ২১ নম্বর ক্রোমোজোমের তিনটি কপি থাকে, বাকিগুলোতে দুটি কপি থাকে।
প্রতিটি প্রকারের ক্ষেত্রে শিশুর শারীরিক বৈশিষ্ট্য এবং মানসিক বিকাশের প্রভাব ভিন্ন হতে পারে। তবে, সঠিক চিকিৎসা ও যত্নের মাধ্যমে শিশুর জীবনযাত্রা অনেকাংশে স্বাভাবিক রাখা সম্ভব।
ঝুঁকি
ঝুঁকি বাড়ে বিশেষ করে নিম্নলিখিত ক্ষেত্রে —
মায়ের বয়স বেশি: ৩৫ বছরের বেশি বয়সে ঝুঁকি বৃদ্ধি পায়। উদাহরণস্বরূপ, ৩৫ বছর বয়সের মায়ের প্রতি ৩৫০ জনের মধ্যে একজন এবং ৪০ বছর বয়সে প্রতি ১০০ জনের মধ্যে একজন শিশু আক্রান্ত হতে পারে।
পূর্ববর্তী সন্তান আক্রান্ত: আগের শিশুর ডাউন সিনড্রোম থাকলে পরবর্তী গর্ভধারণে ঝুঁকি বাড়ে।
বাবা-মায়ের ক্রোমোজোমে ত্রুটি: বাবা হলে ৩ শতাংশ এবং মা হলে ১২ শতাংশ সম্ভাবনা থাকে। গবেষণায় দেখা গেছে, পরিবেশগত কারণ, ধূমপান, কিছু ওষুধের ব্যবহারও ঝুঁকি সামান্য বাড়াতে পারে। তবে জেনেটিক কারণই প্রধান।
গর্ভাবস্থায় শনাক্তকরণ
ডাউন সিনড্রোম শিশুর জন্মের আগে শনাক্ত করা সম্ভব। ব্যবহৃত পদ্ধতিগুলো হলো—
আল্ট্রাসনোগ্রাফি (১১-১৪ সপ্তাহ): গর্ভস্থ শিশুর ঝুঁকি মূল্যায়ন করা হয়।
অ্যামনিওসেন্টেসিস: ক্রোমোজোম পরীক্ষা করে নিশ্চিত করা হয়।
মায়ের রক্ত পরীক্ষা: অতিরিক্ত ক্রোমোজোম ২১ শনাক্ত করা যায়।
লক্ষণ ও শারীরিক জটিলতা
ডাউন সিনড্রোম শিশুরা জন্মের সময় বিশেষ কিছু বৈশিষ্ট্য নিয়ে আসে। সাধারণ লক্ষণগুলো হলো—
মাংসপেশির শিথিলতা (ফ্লপি বেবি)
দুই চোখের কোণ উপরের দিকে বাঁকানো
হাতের তালুতে একক রেখা
চ্যাপ্টা নাক, ছোট ও নিচু কান
জিভ বের হয়ে থাকা
জন্মের সময় কম ওজন ও উচ্চতা
শারীরিক জটিলতার মধ্যে রয়েছে—
জন্মগত হৃদরোগ
অন্ত্রের অস্বাভাবিকতা
শ্রবণ ও দৃষ্টিশক্তির সমস্যা
থাইরয়েডের ত্রুটি
সংক্রমণের ঝুঁকি বেশি
ঘাড়ের হাড়ের সমস্যা
রক্তের রোগ।
যত্ন ও সহায়তা
ডাউন সিনড্রোমের কোনো প্রতিকার নেই, তবে সঠিক যত্ন শিশুর জীবনমান উন্নত করতে পারে। প্রধান পদক্ষেপগুলো হলো—
পুষ্টিকর খাবার ও শারীরিক যত্ন: শিশুর বৃদ্ধি ও স্বাস্থ্য নিশ্চিত করতে সাহায্য করে।
ফিজিক্যাল থেরাপি: পেশি শক্তি বৃদ্ধি ও চলাফেরার ক্ষমতা উন্নত করে।
স্পিচ ও ল্যাঙ্গুয়েজ থেরাপি: যোগাযোগ দক্ষতা ও সামাজিক বিকাশে সহায়ক।
বিশেষ শিক্ষাব্যবস্থা: শিক্ষার মানসিক ও শিখন সক্ষমতা বৃদ্ধি করে।
নিয়মিত শিশু বিশেষজ্ঞের পর্যবেক্ষণ: শারীরিক সমস্যা দ্রুত শনাক্ত ও চিকিৎসা করা সম্ভব হয়।
পরামর্শ
মায়ের বয়স: বেশি বয়সে সন্তান গ্রহণের ঝুঁকি বেশি। তাই সঠিক বয়সে সন্তান ধারণ করা উচিত।
পূর্ববর্তী শিশু: আগের সন্তান ডাউন সিনড্রোমে আক্রান্ত থাকলে পরবর্তী গর্ভধারণে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
সামাজিক সমর্থন: পরিবার ও সমাজের সহযোগিতা শিশুর বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ।
লেখক: প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান, জাতীয় রোগী কল্যাণ সোসাইটি


