আজ থেকে ঠিক ৫৫ বছর আগের কথা। বিশ্ব ইতিহাসের ভয়ংকর ঘূর্ণিঝড় ‘গোর্কি’ আছড়ে পড়েছিল দক্ষিণের জনপদের ভোলা জেলাতে। ১৯৭০ সালের ১২ নভেম্বর সর্বোচ্চ ২২৪ কিলোমিটার বেগে আঘাত হানা ঘূর্ণিঝড়ে ৫ লাখ মানুষ নিহত হয়। ১০-৩৩ ফুট উঁচু জলোচ্ছ্বাসে মানুষের পাশাপাশি অসংখ্য গবাদিপশু ও ঘরবাড়ি ডুবে যায়। সেদিন লণ্ডভণ্ড হয়ে গিয়েছিল ভোলার বিস্তীর্ণ জনপদ। জেলার মনপুরা, চর নিজাম, ঢালচর, কুকরী-মুকরীসহ গোটা এলাকা মৃত্যুপুরীতে পরিণত হয়েছিল। স্থানীয়দের মতে সেই দিন ভোলা জেলার এমন কোনো গ্রাম ছিল না, যেখানে কেউ মারা যায়নি। গোর্কির আঘাতের ভয়াবহতা এতই নির্মম ছিল যার কথা মনে করলে আজও ভয়ে কেঁপে ওঠে ভোলাবাসীর প্রাণ। ২০১৭ সালের ১৮ মে বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সাইক্লোন হিসেবে চিহ্নিত করেছে সাইক্লোন ‘গোর্কি’কে।
বিভীষিকাময় সেই ঘটনার বর্ণনা দিয়ে ভোলার মনপুরা এলাকার সত্তর ঊর্ধ্ব বাসিন্দা মো. আনোয়ার মিয়া বলেন, ‘১৯৭০ সালের ১০ নভেম্বর থেকেই গুঁড়িগুঁড়ি বৃষ্টি পড়ছিল, সঙ্গে ছিল হালকা বাতাস। ১২ নভেম্বর রাতে ঘূর্ণিঝড় প্রচণ্ডভাবে আঘাত হানে। তখন কোনো ধরনের সিগন্যাল বা আবহাওয়ার কোনো খবর ছিল না। সকালে দেখলাম, পানিতে সবকিছু ডুবে গেছে। নৌকাগুলো সব গাছের মাথায় আটকে আছে। গাছে গাছে মানুষের লাশ এবং সাপ একত্রে পেঁচিয়ে আছে। কত মানুষ যে মারা গেছে, সেই হিসাব করার মতো কোনো অবস্থা ছিল না। নদীতে লাখ-লাখ মানুষের লাশ কচুরিপানার মতো ভাসছিল। সেই কথা মনে উঠলে এখনো গা শিউরে ওঠে।’
মো. আলমগীর গোলদার বলেন, ‘ঘূর্ণিঝড়ে মারা যাওয়া মানুষদের গণকবর দেওয়া হয়েছে। এক কবরে কতজনকে দাফন করা হয়েছে সেই হিসাব করা সম্ভব হয়নি। সেই কথা মনে উঠলে এখনো গা শিউরে ওঠে। এখনো বাতাস-বৃষ্টি দেখলে বা কোনো সিগন্যালের কথা শুনলে ভয়ে ঘর থেকে বের হয়ে বাইরে বসে থাকি।’
দুর্যোগপ্রবণ দক্ষিণ উপকূলীয় অঞ্চলে ১৯৯১ সালের প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড়ের পরেই দুর্যোগ মোকাবিলার অবকাঠামোগত উন্নয়ন হয়েছে ঠিকই। কিন্তু সচেতনতা বাড়েনি। ২০০৭ সালে ঘূর্ণিঝড় সিডরে বরিশাল উপকূলীয় অঞ্চলে সাড়ে ৩ হাজার মানুষের প্রাণহানি ঘটেছিল। এই ঘটনার পর দুর্যোগ মোকাবিলায় সচেতনতা বৃদ্ধি পেয়েছে এবং আবহাওয়ার পূর্বাভাস দ্রুত জানানোর ব্যবস্থা উন্নত হয়েছে। পরিবেশবিদ ও বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, এর ফলে দেশের দুর্যোগ মোকাবিলার সক্ষমতা কিছুটা বেড়েছে।
বিভিন্ন সূত্র থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ১৯৭০ সালের ১২ নভেম্বরের ঘূর্ণিঝড় ‘গোর্কি’ ছিল সবচেয়ে ভয়াবহ, এতে প্রায় ৫ লাখ মানুষের মৃত্যু হয়। এরপর ১৯৯১ সালের ২৯ এপ্রিলের ঘূর্ণিঝড়ে ১ লাখ ৩৮ হাজার মানুষের প্রাণহানি ঘটে। ২০০৭ সালের ‘সিডর’, ২০০৯ সালের ‘আইলা’, ২০১৩ সালের ‘মহাসেন’, ২০১৬ সালের ‘রোয়ানু’, ২০১৭ সালের ‘মোরা’, ২০১৯ সালের ‘ফণী’ ও ‘বুলবুল’সহ বিভিন্ন ঘূর্ণিঝড়েও বহু মানুষের মৃত্যু হয়েছে এবং ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে ‘ইয়াস’, ‘আসানি’ ও ‘সিত্রাং’ ঘূর্ণিঝড়ে প্রাণহানি তুলনামূলকভাবে কম। তবে সবগুলো ঝড়েই ফসল এবং কাঁচাবাড়ি ঘরের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
বরিশাল পরিবেশ ও জনসুরক্ষা ফোরামের আহ্বায়ক শুভংকর চক্রবর্তী বলেন, ১৯৯১ সালের ঘূর্ণিঝড়ের পর উপকূলবর্তী এলাকায় সাইক্লোন শেল্টার নির্মাণের পাশাপাশি সবুজ বনায়ন, বিশেষত ম্যানগ্রোভ জাতীয় গাছ রোপণের মাধ্যমে ঘূর্ণিঝড়ের বিরুদ্ধে শক্তিশালী প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব হয়েছে। এ ছাড়া দুর্যোগ মোকাবিলার প্রস্তুতি ও আগাম সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করায় প্রাণহানির সংখ্যা কমে এসেছে।
বিশেষ করে সিডরের আগে এ ধরনের দুর্যোগে যেখানে লাখ লাখ লোক মারা যেত, তা হ্রাস পেয়ে এখন সেখানে হাতে গোনা কয়েকজনের প্রাণহানি হচ্ছে। তবে এতে করে এটা বলা যাবে না যে দুর্যোগ মোকাবিলায় বাংলাদেশ পুরোপুরি সক্ষমতা অর্জন করেছে।
বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপকূলীয় অধ্যয়ন ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিভাগের চেয়ারম্যান ও সহযোগী অধ্যাপক ড. হাফিজ আশরাফুল হক বলেন, উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষ ঝড়-জলোচ্ছ্বাসের সঙ্গে লড়াই করেই টিকে আছে। এখানে রাষ্ট্রের সক্ষমতার বিষয়টি মুখ্য নয়। ১৯৯১ সালের জলোচ্ছ্বাসের পর অবকাঠামোগত উন্নয়ন যা হয়েছে তা পর্যাপ্ত ও পরিকল্পিত নয়। তবে মানুষের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি পেয়েছে।
তিনি বলেন, ‘দুর্যোগ মোকাবিলায় যেমন জনসচেতনতা দরকার, তেমনি দরকার ঝড়-জলোচ্ছ্বাস ও বন্যা থেকে রক্ষায় রাষ্ট্রীয় সুপরিকল্পনার মাধ্যমে প্রয়োজনীয় আশ্রয়কেন্দ্র ও পরিকল্পিত অবকাঠামো নির্মাণ। পাশাপাশি টেকসই সবুজবেষ্টনী তৈরি করা।’
বরিশাল বিভাগের অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার (সার্বিক) মো. আহসান হাবিব বলেন, ‘দক্ষিণ উপকূলীয় অঞ্চলের মধ্যে বরিশাল বিভাগের ৬টি জেলা রয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে দুর্যোগ ঝুঁকিপূর্ণ জেলা হচ্ছে ভোলা, পটুয়াখালী ও বরগুনা। যেকোনো ঝড় বন্যার সময়ে বাতাস ও পানির তোড়ে এসব জেলার অধিকাংশ এলাকা পানিতে ডুবে যায়। ফসলের ক্ষতি হওয়ার পাশাপাশি ব্যাপক প্রাণহানির ঘটনা ঘটে। এসব দুর্যোগ মোকাবিলার সক্ষমতা সরকারের পুরোপুরি আছে তা বলার সুযোগ নেই। তবে যেটুকু আছে তা দিয়ে বিপুলসংখ্যক প্রাণহানি রোধ করা সম্ভব। দক্ষিণ উপকূলীয় অঞ্চলের ৪ হাজারের ওপরে আশ্রয়কেন্দ্র রয়েছে। পাশাপাশি গবাদিপশু-পাখির জন্য ৩০টির ওপরে কেল্লা রয়েছে। নতুন নতুন আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ হচ্ছে।’
তিনি বলেন, ‘দুর্যোগ মোকাবিলার জন্য শুধু সরকারের সক্ষমতা থাকলেই হবে না। এ জন্য মানুষকে সচেতন হতে হবে আগে। সতর্কসংকেত পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আশ্রয়কেন্দ্রে আসতে হবে। কিন্তু উপকূলের বেশির ভাগ মানুষ নিজের ভিটেমাটি ছেড়ে আশ্রয়কেন্দ্রে আসতে চায় না। আবহাওয়া বার্তার প্রতি গুরুত্ব দেয় না।
সিডরের সময়ে আবহাওয়া বার্তার প্রতি গুরুত্ব দিলে এ অঞ্চলের এত মানুষের প্রাণহানি হতো না উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, সিডরের পরে মানুষের মধ্যে কিছুটা সচেতনতা ফিরে এসেছে। সরকার আগাম সতর্কবার্তা মানুষের মাঝে পৌঁছে দেওয়ার সক্ষমতা অর্জন করেছে। ফলে ঝড়-জলোচ্ছ্বাসে প্রাণহানি অনেকাংশে হ্রাস পেয়েছে।
বরিশাল বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয় সূত্র জানায়, বিভাগের ৬ জেলায় ৪ হাজার ৯১৫টি আশ্রয়কেন্দ্র রয়েছে। এর মধ্যে বরিশাল জেলায় ১ হাজার ৭১টি, পটুয়াখালীতে ৯২৫টি, ভোলায় ১ হাজার ১০৪টি, পিরোজপুরে ৭১২টি, বরগুনায় ৬২৯টি ও ঝালকাঠিতে ৪৭৪টি।
আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে ২০ লাখ মানুষের পাশাপাশি কয়েক লাখ গবাদিপশুও রাখা যাবে। এ ছাড়া ৬ হাজার ২৪৭টি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও ১ হাজার ৬৬টি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ও দুর্যোগের সময়ে আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করা যাবে। গবাদিপশুর রক্ষায় বিভাগের ৩৫টি কেল্লাও রয়েছে।
বিভাগের ঘূর্ণিঝড় প্রস্তুতি কর্মসূচির (সিপিপি) ৩২ হাজার ৫০০ ও বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির দেড় হাজার স্বেচ্ছাসেবক রয়েছে। এ ছাড়াও, ফায়ার সার্ভিসসহ বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের অধীনে কয়েক হাজার স্বেচ্ছাসেবক রয়েছে ঘূর্ণিঝড় মোকাবিলায়।