জোছনা রাতের গল্প। ১৯৯৩ সাল। তখন তরুণ বয়স। উপন্যাস পড়ার প্রতি প্রচণ্ড নেশা ধরে গেল। রাতে ২ থেকে ৩টা বই পড়ে শেষ করি এমন নেশা। সন্ধ্যায় বই নিয়ে মশারির ভেতরে ঢুকেছি; কখন যে সকাল হয়ে গেছে একদম টের পাইনি।
সূর্যের আলো যখন ঘরে প্রবেশ করেছে, তখন বুঝতে পেরেছি সকাল হয়েছে। তখন শুধু হুমায়ূন আহমেদের বই পড়েছি। মিসির আলী, নিষাদ, দেবী, হিমু ছিল লেখকের অনবদ্য রচনা।
পড়তে পড়তে এক সময় আর বই কেনার সাধ্য নেই। বই কেনার জন্য এত টাকা কোথায় পাব? নেশাও জমে উঠেছে বেশ। তার বই না পড়লে ভালোও লাগে না। তখনই জানতে পাড়ি জেলা শহরে হুমায়ূন আহমেদের নামে একটি পাঠাগার রয়েছে। নাম হুমায়ূন আহমেদ পাঠক সংসদ। সেখানে সদস্য হলে প্রতিমাসে ১০ টাকার বিনিময়ে যত খুশি তত বই পড়া যায়। আমার এলাকা থেকে জেলা শহর ছয় মাইলের মতো দূরত্ব। তখনকার সময় রিকশাই ছিল একমাত্র পরিবহন। আসতে-যেতে ভাড়া ৪০ টাকার প্রয়োজন। অগত্যা প্রতিদিন হেঁটেই পাঠাগার থেকে তিনটি করে বই নিয়ে আসতাম। পড়ার আনন্দে এতটা দূরত্বের পথ তখন মনেই হতো না। পড়তে পড়তে লেখকের লেখা পৌনে দুই শ বই পড়া শেষ হয়ে গেল। আর বই নেই। তা হলে এবার কী পড়ি? জটিলতা শুরু হলো। তাই তখনকার ঈদসংখ্যাই একমাত্র ভরসা।
মুদি দোকান থেকে কেজি দরে ঈদসংখ্যা কিনে পড়তে থাকলাম। ১০ কেজি, তারপর ২০ কেজি করে ম্যাগাজিন কিনি তখন। এভাবেই অন্যান্য লেখক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, ইমদাদুল হক মিলনসহ আরও অনেক লেখকের লেখাও পড়তে থাকলাম। এর মধ্যে ঘটে গেল অভাবনীয় এক ঘটনা। জানতে পারলাম, পাঠাগারে আসছেন হুমায়ূন আহমেদ। অনেক কষ্টে পাঠাগারের উদ্যোক্তা হাসান ভাই রাজি করিয়েছেন হুমায়ূন আহমেদকে। তিনি আমাদের পাঠাগারে আসবেন।
পাঠাগারে আনন্দ-উৎসবের আমেজ শুরু হলো। কে ছবি তুলবেন- এটা নিয়ে ভাবনা শুরু হয়ে গেল। অবশেষে তখনকার বিখ্যাত চিত্রশিল্পী আবুল খায়েরকে ডাকা হলো। তিনি রাজি হলেন। চিত্রশিল্পী শিশির হুমায়ূন আহমেদকে উপহার দেওয়ার জন্য রবীন্দ্রনাথের অবয়ব আঁকা একটি অসাধারণ ছবি পাঠাগারে পাঠালেন। সব জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে তিনি এলেন। তবে তিনি একা আসেননি। সঙ্গে এসেছেন মেয়ে শীলা এবং বিপাশা। নোভা আসেননি। তার মার্শাল আর্টের ক্লাস থাকায় আসতে পারেননি। শীলা এবং বিপাশা তখন অনেক ছোট। পাঠাগারের নাম শুনে হুমায়ূন আহমেদ বললেন, আমি মরে যাওয়ার আগেই আমাকে মেরে ফেললে। আমার নামে পাঠাগার হবে মরার পর। তিনি হাস্যরসে ভরিয়ে তুললেন সবাইকে। কথার জাদুকরের প্রতিটি বাক্যই যেন অমলিন তখন আমাদের কাছে।
এরপরই ঘটল আসল ঘটনা। বন্ধু জনকণ্ঠের জেলা সাংবাদিক। তার বাসা বাহেরপাড়ায় দাওয়াত পড়ল। একদিন আগে গিয়ে সেখানে হাজির হলাম। বন্ধুর বোনের বিয়ে। বাড়িতে পৌঁছেই দেখি লোকে লোকারণ্য। সব আত্মীয়স্বজন চলে এসেছেন। তাদের সঙ্গে ছোট ফুটফুটে অনেক ছেলেমেয়ে এসেছে। ২৫ থেকে ৩০ জনের কম হবে না।
সবাই ব্যস্ত। বিয়েবাড়ি বলে কথা! বাবুর্চি চলে এসেছেন। গরু জবাই করে গোশত বানানো কমপ্লিট। লেবুগাছতলার পাশে মসলা পেষা হচ্ছে। বাড়িময় অদ্ভুত এক আনন্দের বন্যা বয়ে যাচ্ছে। তখন রাত ১০টা। আকাশে বিশাল চাঁদ উঠেছে। জোছনার আলোয় চারদিক থইথই। সব ছেলেমেয়ে আমার কাছে এসে বসে আছে। তার কারণ, আমি একটা ছোট মেয়েকে গল্প শোনাচ্ছি। সেখানে একে একে সবাই এসে ভিড় করল।
তারা বলল, রাতে আমার সঙ্গে থাকবে। আমিও আর না করতে পাড়িনি। গল্প শোনাচ্ছি রাক্ষস-খোক্কস, ভূত-প্রেতের। সবাই মজা করে গল্প শুনছে। তার পর শুরু করলাম হুমায়ূন আহমেদের গল্প। তার বইতে কত সুন্দর করে ধ্রুব এষ প্রচ্ছদ আঁকেন। কী সুনিপুণ হাতের ছোঁয়ায় হুমায়ূন আহমেদ জোছনাকে মায়াবী করে তোলেন। তারই একটা উপন্যাসে পড়েছি, জোছনা রাতে পানির মধ্যে নেমে শুধু মুখটুকু বের করে জোছনা দেখতে হয়। তার মজাই নাকি আলাদা। বাচ্চাদের হুমায়ূন আহমেদের গল্পটাই মেরে দিলাম। গল্প শুনতে শুনতে মধ্যরাত হয়ে গেল।
ভরা পূর্ণিমার জোছনা তখন চারদিকে আলোকময় করে তুলেছে। মনে হচ্ছে এখন দিন। সবাই ঘুমিয়ে পড়েছি। হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেলে দেখি, একজনও আমার পাশে নেই। চিন্তায় পড়ে গেলাম। বের হয়ে দেখি বাহেরপাড়া বিশাল দীঘিতে গলা ডুবিয়ে জোছনা দেখছে সবাই। শুধু মাথা ক’টা দেখা যায়। তখনই সব বাচ্চাকে ডেকে তুললাম। আমার জীবনে এ এক স্মরণীয় ঘটনা।
অলিউর রহমান ফিরোজ
মিরাপাড়া, রিকাবীবাজার
মুন্সীগঞ্জ
তারেক
.jpg)
.jpg)
.jpg)