মনের জোর আর অদম্য ইচ্ছাশক্তির কাছে শারীরিক প্রতিবন্ধকতা যে কোনো বাধা নয়, পটুয়াখালীর কলাপাড়া থানার গোলাম রব্বানী তারই এক উজ্জ্বল প্রমাণ। জন্ম থেকে তিনি হাঁটতে পারেন না। হাত, পায়ে জোর কম। উঠে বসতে হলেও কারও না কারও সাহায্য লাগে। তাই বলে তার জীবন থেমে থাকেনি।
মা, বাবা, দুই বোনসহ গোটা পরিবারের খরচের উৎস তার ফ্রিল্যান্সিংয়ের আয়ের টাকা। লিখেছেন- মুহাম্মদ শফিকুর রহমান
পরিবার
বাবা দর্জির কাজ করতেন। দুই বোন। তার মধ্যে একজন আবার শারীরিক প্রতিবন্ধী। বড় বোনকে রব্বানী ফ্রিল্যান্সিং শিখিয়েছেন। স্কুল, কলেজে রব্বানীর পড়াশোনা হয়নি। তবে ইউটিউব দেখে এবং তিনটি কোর্স করার মাধ্যমে ইংরেজি ভাষা শিখেছেন তিনি।
অসুস্থতার শুরু
মেরুদণ্ডের ভেতরে একটি শিরা আছে। সেটি শুকিয়ে যাওয়ার কারণে ছোটবেলা থেকেই রব্বানী হাঁটতে পারেন না। তার দুই পা চিকন হয়ে গেছে, যাতে জোর নেই বললেই চলে। চিকিৎসক বলেছিলেন, বিদেশে নিয়ে চিকিৎসা করাতে। অর্থাভাবে তা আর সম্ভব হয়নি। যতই দিন যাচ্ছে অসুস্থতা বাড়ছে। বাথরুমসহ উঠে বসার জন্যও তার অন্যের সাহায্য লাগে।
ফ্রিল্যান্সিংয়ের ভাবনা
২০১৮ সালে মোবাইলে ইউটিউব দেখতে গিয়ে জানতে পারেন, মোবাইল থেকেও ইন্টারনেটে কাজ করে আয় করা যায়। প্রথম মাসে ১০০, পরের মাসে ১ হাজার ৩০০ টাকায় আয় করে পরিবারকে দেন। মা-বাবার কাছে একটি কম্পিউটার কিনে দেওয়ার আবদার করেন। তার বাবা ব্যাংক থেকে লোন নিয়ে ৩৮ হাজার টাকায় একটি কম্পিউটার কিনে দেন।
প্রথম আয়
২০২৩ সালে ফাইবার মার্কেটপ্লেস থেকে ১৫ ডলারের কাজের মাধ্যমে প্রথম মার্কেটপ্লেস থেকে আয় করেন। ২০২৩ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত তিনি ৩০০টিরও বেশি অর্ডার সম্পন্ন করেছেন। শিগগিরই তিনি ফাইবারে টপ রেটেড সেলার হবেন বলে আশা করেন।
শিখেছেন যেভাবে
রব্বানী মূলত ইউটিউব দেখে ফ্রিল্যান্সিংয়ের কাজ শিখেছেন। তবে একপর্যায়ে কোডম্যান বিডি থেকে তিনটি স্কিলের ওপর কোর্স করেন। বিখ্যাত ফ্রিল্যান্সার মিনহাজুল আসিফসহ অনেকেরই পরামর্শ নেন। এমনকি অনলাইন কোর্সে তার ব্যাচমেটরাও তাকে সহযোগিতা করে।
কাজের গল্প
প্রথমদিকে সঠিক গাইডলাইন না পাওয়ার কারণে লক্ষ্য স্থির করা হয়নি তার। প্রথমে গ্রাফিক্স ডিজাইন তারপরে ওয়েব ডিজাইন, ডিজিটাল মার্কেটিং শেখেন। তবে বর্তমানে ডিজিটাল মার্কেটিং এবং ওয়ার্ডপ্রেস ওয়েবসাইট ডিজাইন নিয়ে ব্যস্ত তিনি। ফাইবারের লেভেল টু সেলার রব্বানী।
.jpg)
অসুস্থতা বাধা নয়
রাতে বায়ার ম্যাসেজ দিয়ে স্যাম্পল কিংবা অন্য কোনো কিছু দেখতে চাইলে বিছানা থেকে উঠে পিসি অন করে তা দেখানোর শক্তিটুকু রব্বানীর নেই। বাবা-মাকে বললে তারা রব্বানীকে বিছানায় উঠিয়ে বসিয়ে দেন। প্রতিদিন ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা কাজ করেন রব্বানী। রাতে মা-বাবাকে ডেকে তুললে তাদের কষ্ট হবে এই ভেবে অনেক রাতই কাজের মাধ্যমে কাটিয়ে দেন।
পরিবারের কর্তা
রব্বানী পরিবারের ৫ লাখ টাকা ঋণ পরিশোধ করেছেন। নতুন কম্পিউটার, মোবাইল কিনেছেন। বর্তমানে তার মাসে আয় ৫০ হাজার টাকার মতো। ওয়েব লার্নিং ইনস্টিটিউট নামে একটি এজেন্সি আছে রব্বানীর। সেখানে তিনজন কাজ করে। রব্বানী জানান, প্রায় ১০ জনকে তিনি ফ্রিল্যান্সিং শিখিয়েছেন। তারা এখন ভালো আয় করছে।
এত আনন্দ বলে বোঝানোর নয়
প্রথমবার যখন ফ্রিল্যান্সিং করে আয় করেন। আয়ের টাকা বাবা-মার হাতে তুলে দেন। সেদিনের মতো আনন্দ রব্বানীর কখনো হয়নি। পরিবারে ঈদের মতো খুশির ঝিলিক বয়ে গিয়েছিল। মাকে বলেছিলেন, ফ্রিল্যান্সিংয়ের টাকায় স্বর্ণের চেইন কিনে দেবেন। যখন মাকে সত্যিই স্বর্ণের চেইন কিনে দিতে পেরেছেন তখন তার খুব আনন্দ হয়েছিল।
ইলেকট্রিক হুইল চেয়ার
রব্বানীর জীবনের টার্নিং পয়েন্ট একটি ইলেকট্রিক হুইল চেয়ার। ২০ বছর ঘরের একটি রুমের মধ্যে তিনি থাকতেন। যেন এ এক বন্দি জীবন। খোলা আকাশ, বাইরের পৃথিবী দেখার তেমন সুযোগই ছিল না তার। ইলেকট্রিক হুইল চেয়ার কেনার পর তিনি যেন এক নতুন পৃথিবীর সন্ধান পেলেন। চেয়ারে বসে এখন ঘুরতে যেতে পারেন। তার মনে এখন মুক্তির আনন্দ।
অন্যরাও করতে পারেন
প্রায় অচল জীবনে এক সফল সচল জীবনের দৃষ্টান্ত রব্বানী। তিনি মনে করেন, মানুষ চাইলে অবশ্যই সব সম্ভব। তার মতো অসুস্থরাও ফ্রিল্যান্সিং করে টাকা আয় করতে পারে। এ জন্য রব্বানী সরকারিভাবে প্রতিবন্ধীদের ফ্রিল্যান্সিং শেখার জন্য সহযোগিতা করার দাবি জানান। প্রতিবন্ধীরা ফ্রিল্যান্সিং শিখে দেশের জন্য হাজার হাজার ডলার রেমিট্যান্স আনতে পারবে এমনটাই তার দৃঢ় বিশ্বাস।
আগামীর ভাবনা
ফ্রিল্যান্সিংয়ের টাকায় ব্যবসা করে উদ্যোক্তা হবেন। অন্যদের চাকরির ব্যবস্থা করবেন। যারা ফ্রিল্যান্সিং শিখতে আগ্রহী তাদের ফ্রিল্যান্সিং শেখাবেন। এসবই তার আগামী দিনের ভাবনা।
তারেক
.jpg)
.jpg)