ছেলেবেলার কথা। শহরে থাকি আর তীর্থের কাকের মতো অপেক্ষায় থাকি কখন শীতকাল আসবে। প্রতি শীতেই আমরা পরিবারসমেত গ্রামের বাড়ি গিয়ে থাকি। গ্রামের তখনকার প্রাকৃতিক পরিবেশ ছিল খুবই নির্মল। মানুষে মানুষে আন্তরিকতা ও সৌহার্দ ছিল চোখে পড়ার মতো। এখনকার মতো অতটা জটিল ছিল না সামাজিকতা। তখনকার প্রতিটি বাড়িতেই খেজুরের রস জাল করে গুড় তৈরি করা হতো। বাড়ির আঙিনা, রাস্তা বা ভিটায় দু-চারটা খেজুরগাছ ছিল সবারই। তখনকার কয়েক বাড়ির খেজুরগাছ একেকজন গাছি কাটত। রস যা পেত তা ভাগ করে নিত। তিন দিন নিত গাছের মালিক আর বাকি তিন দিন নিত গাছি। আর একদিন গাছকে জিরোনোর সময় দিত। সেদিন কোনো গাছই কাটা হতো না।
তখনকার দিনে আমাদের খেজুরগাছ কাটত আমাদেরই পার্শ্ববর্তী দাদন মামা। তিনি বিকেলবেলা একটা বিশাল সাইজের দা ধার দিতেন। দীর্ঘসময় ধরে ধার দিতে দিতে দা একেবারে চক চক করে ফেলতেন। সকালে গাছ থেকে রস পেড়েই তিনি হাঁড়িগুলো ধুয়ে রোদে শুকাতে দিতেন। তার পর বিকালে আবার দা ধার দিয়ে সে হাঁড়িগুলো বাঁশে বেঁধে গাছের তলায় নিয়ে যেতেন। তার পর মাজায় বাঁধা ঠুসিতে করে একটা করে হাঁড়ি নিয়ে গাছে চড়তেন। এভাবেই গাছি দাদন মামা খেজুরের গাছ কেটে হাঁড়ি বসিয়ে আসতেন।
তখনকার সময় আমরা বাড়িতে গেলে সে দুবার আমাদের গাছের রস খাওয়াতেন। রাত এগারোটায় বড় বড় গাছ থেকে লাল টকটকে খেজুরের রস পেড়ে আমাদের জন্য হাঁড়ি ভরে নিয়ে আসতেন। বড় গাছের রস খেতে অনেক মিষ্টি হতো। তাই তো বড় গাছের রস পেড়েই রাতে আমাদের খেতে দিতেন। সকালে আবার সে রস পাওয়া যেত।
এমনি একদিন গ্রামে গিয়েছি। তখন দাদন মামা বাড়ির পাশ দিয়ে প্রবাহিত পালদী নদী পার হয়ে নদীর ওপারে চরে গিয়েছেন আমাদের জন্য গাছ থেকে রস আনতে। শীতে আমাদের পারলী নদীতে থাকে হাঁটু পানি। কোথাও কোথাও আবার পানি একেবারে নেই বললেই চলে। তাই নদী পার হতে কোনো নৌকার প্রয়োজন পড়ত না। নদীর ওপারের চরে তার বিশ থেকে পঁচিশটি গাছ রয়েছে। গাছগুলো বড় বড়। রাতে যদি সে গাছ হতে রস না পাড়তেন, তা হলে হাঁড়ি ভরে বাকি রস মাটিতে পড়ে যেত। তাই তিনি রাতে গিয়ে রস পেড়ে নিয়ে আসতেন। তিনি গাছ থেকে হাঁড়িগুলো নামিয়ে একটা একটা করে গাছের গোড়ায় রাখতেন। কিন্তু একদিন হঠাৎ করেই ঘটে গেল এক অভাবনীয় ঘটনা।
তিনি সবেমাত্র অর্ধেক গাছের রস পেড়েছেন। অমনি চরের একপাশ থেকে দেখতে পান কি যেন একটা মুখে আগুন জ্বালিয়ে সামনের দিকে আসছে। প্রথমে আগুনটা ছিল অনেক দূরে। এটা যতই তার কাছে আসতে থাকে ততই আগুনের লেলিহান শিখাটা বড় বড় বলে মনে হয় তার কাছে। কাছে আসতেই দেখেন দানব আকৃতির মতো একটা মহিলা মুখে আগুন জ্বালিয়ে তার দিকে আসছে। প্রথমে বিষয়টি তিনি আমলে নেননি। গ্রামের মেঠোপথ ধরে কেউ কোনো জায়গা থেকে এলে পাটকাঠি ধরিয়ে এভাবেই আসা-যাওয়া করে থাকেন। তাতে ভূত-প্রেত থেকে শুরু করে শিয়াল পর্যন্ত কাছে আসে না। তাই দাদন মামা মনে করেছিলেন কেউ হয়তো পাটকাঠি জ্বালিয়ে এদিকে এসে নদী পার হবেন। কিন্তু না। ওইটা কাছে আসতেই তার আকৃতি পুরোপুরি দেখতে পান তিনি। বিশাল আকৃতি আর মুখে আগুন ধরানো সেটা ছিল আলেয়া নামের এক ধরনের পেত্নী। আলেয়া পেত্নীকে দেখেই তিনি রস আর হাঁড়ি ফেলেই লাফিয়ে নদী পার হয়ে সড়ক ধরে দিলেন দৌড়। তার পর বাড়ির উঠানে গিয়েই ধপাস করে উপুড় হয়ে পড়ে গেলেন। বাড়ির মানুষজন তার আওয়াজ পেয়ে তাকে আগুনের সেঁক দিলেন। আফতা ফকিরের তেল পড়া, পানি পড়া খাওয়ালেন এবং শরীরে মাখালেন। এতে তিনি ধীরে ধীরে সুস্থ হতে লাগলেন। তার জীবদ্দশায় তিনি আর কোনোদিন চোকদারকান্দি চরে খেজুরের গাছ কাটতে যাননি।
মিরাপাড়া, রিকাবীবাজার
মুন্সীগঞ্জ
তারেক/
.jpg)
.jpg)
.jpg)