ঘড়ির কাঁটা পাঁচটা ছুঁই ছুঁই করছে। আগারগাঁও থেকে মেট্রোরেলে করে মেলায় যাচ্ছি। মেট্রোতে বিকেলের দিকে এমনিতেই ভিড় থাকে। তবে এই সময় মতিঝিলমুখী মেট্রোতে যাত্রীদের ঠাসাঠাসি থাকে না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মেট্রো স্টেশনে যখন পৌঁছলাম তখন মেট্রো প্রায় খালি হয়ে গেল। অনেকেই নেমে গেলেন। সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে দেখি, মেট্রো শূন্য করে আসা অধিকাংশ যাত্রী বইমেলায় ঢুকছেন। মেট্রোর সিঁড়ি থেকেই চোখে পড়ল বইমেলার জন্য তৈরি অনেক পোস্টার। প্রতিটি পোস্টারের থিম বা বিষয় জুলাই গণ-আন্দোলন।
বাংলা একাডেমির উল্টো দিকে সোহরাওয়ার্দী প্রাঙ্গণ। আমি মেলার প্রবেশদ্বার পেরুলাম। প্রতিবারের মতোই হাতের বাঁদিকে চোখে পড়ল বাংলা একাডেমির তথ্যকেন্দ্র। সেখানে জিজ্ঞাসু পাঠকদের বেশ জটলা। সবাই জানতে চাইছেন কোন দিকে গেলে তাদের নির্দিষ্ট স্টলগুলো খুঁজে পাবেন। তথ্যকেন্দ্রের কর্মীরা উত্তর দেওয়ার জন্য শশব্যস্ত। তাদের হাতে থাকা তালিকা দেখে বলে দিচ্ছেন, কোথায় কোন স্টল বা প্যাভিলিয়নের অবস্থান। কিন্তু তাদের কাছে মেলায় আসা পাঠকের হাতে তুলে দেওয়ার মতো কোনো তালিকা নেই। কর্মীদের হাতে একটিই তালিকা, তাও কয়েক পৃষ্ঠার লম্বা তালিকা। হওয়ারই কথা। ৭০৮টি স্টলের তালিকা তো দীর্ঘ হবেই। বাংলা একাডেমি ছেপে পাঠককে যে দেবে, সে রকম ব্যবস্থা কখনোই তারা করে না। কিন্তু আমার অভিজ্ঞতা বলছে, ম্যাপের মতো করে এ রকম একটা তালিকা করা যায়। শুরুর দিন না হলেও চার-পাঁচ দিন পর বইমেলার ম্যাপ করে, তাতে স্টলের সংখ্যা দিয়ে একটা তালিকা করা অসম্ভব নয়। এতে মেলায় আসা পাঠকদের অনেক সুবিধা হতো। তারা নিজেরা মেলায় ঢুকে খুঁজে পেতেন স্টল ও প্যাভিলিয়নগুলো।
আগে দেখেছি, বইমেলার সার্বিক পরিবেশ নিয়ে সব সময় পাঠকের অভিযোগ থাকে। বিশেষ করে ধুলো নিয়ে। আজও সেই ধুলো উড়ছিল মেলায়। পানি ছিটানো হয়েছে। কিন্তু সবখানে ছিটানো হয়নি। পরিবেশ যা-ই হোক, বইমেলা আমাদের প্রাণের মেলা। প্রাণের টানে তাই অসংখ্য পাঠক গতকালও মেলায় ছুটে এসেছেন। সংখ্যাটা সন্ধ্যা ছয়টা অবধি আমার অনুমান, আগের দিনের কাছাকাছি ছিল। তবে গতকাল সাজুগুজু করা কিশোরী আর তরুণীদের তেমন দেখা পেলাম না।
প্রতিবছর দেখি ছোট ছোট স্টলগুলোর কোনো কোনোটি বেশ নান্দনিক হয়। এসব স্টলের প্রকাশকরা বেশ সুন্দরভাবে সেগুলো দৃষ্টিনন্দন করে তৈরি করেন। এবারও এ রকম বেশ কয়েকটি স্টল চোখে পড়ল- লালন বিশ্বসংঘ, উপকথা, একরঙা ঘুড়ি, উজান, ছাপাখানা ইত্যাদি। এদের মধ্যে ছাপাখানার স্টলটি দেখলাম ঝলমল করছে। স্টলের বাইরের কাঠামোর ফাঁকে ফাঁকে বেশ কিছু বাল্ব লাগিয়ে স্টলটি তৈরি করা হয়েছে। বোঝাই যায়, স্টলটির প্রকাশক বেশ ভেবেচিন্তে স্টলটা আলোকময় করে তুলেছেন। আসলে বইয়ের স্টল তো এ রকমই হতে হয়, আলোকময়। এই স্টলেই কথা হলো রুবী রহমান নামের একজন প্রকাশক ও উদ্যোক্তার সঙ্গে। মাঝ বয়সী এই নারীর ফেসবুকে একটা বুকশপ আছে। সেই বুকশপের নাম ইংরেজিতে- ‘বুক অ্যাঞ্জেল’, বাংলায়- ‘বুকপরী’। নামটা বেশ সুন্দর না?
রুবী বললেন, তিনি সবার জন্য সব ধরনের বই বিক্রি করেন। মাধ্যম সেই ‘বুকপরী’ ফেসবুক বুকশপ। ‘ছাপাখানা’ তার এক বন্ধুর স্টল। বন্ধুর অনুপস্থিতিতে স্টলের বইবিক্রির বিষয়টি দেখাশোনা করছেন। তিনিই জানালেন, এখন অনেক নতুন লেখক বই প্রকাশ করছেন। তারা ফেসবুকে লেখালেখি করে লেখক হয়ে উঠেছেন। তার ‘বুকপরী’তে এরকম প্রায় এক হাজার লেখক যুক্ত আছেন। এদের অধিকাংশই নারী, বেশির ভাগ গৃহিণী। রুবী নিজে যেমন ফেসবুকের মাধ্যমে বই বিপণন করেন, তেমনি এই নারীরা ফেসবুকে লিখতে লিখতে লেখক হয়ে উঠেছেন। রুবীর কাছ থেকেই জানা গেল, বড় বড় অনলাইন বুকশপের মতোই তার বিপণনব্যবস্থা।
অনুবাদ সব সময়ই আমাকে আকর্ষণ করে। নিজে যেমন অনুবাদ করি, তেমনি ভালো অনুবাদের বই কিনে পড়ি। আগেই ফেসবুকের সূত্রে জানা ছিল, এবার বইমেলায় মোবাশ্বেরা খানম বুশরার অনুবাদে প্রখ্যাত আমেরিকান লেখক হাওয়ার্ড ফাস্টের ‘ফ্রিডম রোড’ শীর্ষক উপন্যাসটি ‘মুক্তির পথ’ নামে প্রকাশিত হবে। দাসপ্রথা থেকে কীভাবে আমেরিকার কৃষ্ণাঙ্গরা মুক্তি পেল- সেটাই হচ্ছে বইটির বিষয়। আমি এর কিছু অংশ অনলাইন পত্রিকা ‘তীরন্দাজ’ এ পড়েছিলাম। বুশরার অনুবাদ বেশ সুখপাঠ্য। যারা মানবমুক্তি নিয়ে লেখা বই পড়তে ভালোবাসেন তারা বইটি পড়তে পারেন। প্রকাশক অভিজাত প্রকাশনী ‘সুবর্ণ’। তারা বইটি গতকাল মেলায় এনেছে। আমিনুল ইসলাম ভূঁইয়ার অনুবাদে আরও একটি উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ প্রকাশ করেছে পাঞ্জেরী- ‘বিশ্বলোক নিয়ে আমার দৃষ্টিভঙ্গি’। বইটির মূল লেখক আরভিন শ্রোয়েডিঙার। সেই সঙ্গে মেলায় তারা এনেছে কিঙ্কর আহসানের উপন্যাস ‘বিবিয়ানা’। ঐতিহ্য থেকে প্রকাশিত হয়েছে তিনটি বই। বাংলাপ্রকাশ এনেছে প্রবন্ধের বই ‘গদ্যের ম্যাজিক’। লেখক কবি মাহবুব হাসান।
বাংলা একাডেমির মূল মঞ্চে গতকাল ছিল ‘কুমুদিনী হাজং: জুইলী তারা, তারালা জুই’ আলোচনা। প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন পাভেল পার্থ। আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন মতিলাল হাজং ও পরাগ রিছিল। ‘লেখক বলছি’ মঞ্চে নিজেদের নতুন বই নিয়ে কথা বলেন কবি আতাহার খান ও কথাসাহিত্যিক পাপড়ি রহমান।
খবরের কাগজকে সাক্ষাৎকার দেন স্বকৃত নোমান ও তপন বাগচী।