নারীরা কর্মজীবনে পুরুষের সঙ্গে সমানতালে পাল্লা দিয়ে এগিয়ে চলছেন। রাষ্ট্র পরিচালনার পাশাপাশি সব পেশাতেই নারীরা দক্ষতার স্বাক্ষর রাখছেন। নারীকে পরিবার দেখাশোনার পাশাপাশি কর্মক্ষেত্রে নিজের স্বপ্ন পূরণের জন্য পরিশ্রম করতে হয়। আর এ দু’রকম দায়িত্ব পালনে নারীকে কতটা প্রতিবন্ধকতা ও পরীক্ষার মধ্য দিয়ে যেতে হয়, তা জানতে এবারের আয়োজন। লিখেছেন ফাহমিদা ফারজানা
পেশাজীবী মায়েদের প্রতিদিনই তাদের আদরের সন্তানকে রেখে কর্মের উদ্দেশে অফিসে ছুটে যেতে হয়। পারিবারিক সমর্থন ও কখনো সমর্থনের বিপরীতে তাদের অনেক মানসিক চাপের মধ্যে যেতে হয় বিভিন্ন পেশায়। সব বাধা পেরিয়ে যেসব মা সন্তানকে শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্রে রেখে চাকরি করছেন তারাও ভুগছেন নানা মানসিক দ্বন্দ্বে। কারণ সার্বিকভাবে ক্রমবর্ধমান প্রয়োজন সত্ত্বেও দেশে মানসম্পন্ন ডে কেয়ার বা শিশু দিবা যত্ন কেন্দ্রের সংখ্যা অপ্রতুল।
কর্মজীবী নারী যাতে অর্থনৈতিক উন্নয়নে নিজেদের ভূমিকা রাখতে পারে, সেজন্য ১৯৯১ সালে নারীর নিরাপদ ও নিশ্চিন্তে কাজ করার জন্য সরকারিভাবে প্রথমবার ডে কেয়ার সেন্টার চালু করা হয়। এরপর কেটে গেছে দুই দশকেরও বেশি সময়। এতগুলো বছরেও উন্নত মানের কোনো সরকারি শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্র নির্মিত হয়নি।
যে ক’টি আছে সেগুলোর মান নিয়েও রয়েছে আশঙ্কা। একই সঙ্গে সরকারি শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্রগুলোয় যে পরিমাণ লোকবল থাকা প্রয়োজন তা নেই। দেশে বর্তমানে মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীনে ১১৯টি এবং সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীনে ২০টি শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্র রয়েছে। এছাড়া বেসরকারিভাবে কিছু শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্র পরিচালিত হচ্ছে।বেসরকারি মালিকানায় বেশকিছু ডে কেয়ার সেন্টার গড়ে উঠলেও সেগুলোর মানও শতভাগ সন্তোষজনক নয়। তার ওপর আবার অত্যন্ত ব্যয়বহুল। কিছু বেসরকারি ডে কেয়ার শিশুদের খাবারের দায়িত্ব নিলেও বেশির ভাগই তা এড়িয়ে যায়। সেই সঙ্গে ঘড়ির কাঁটা ধরে সকাল ৬টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত শিশুদের সেবা দেয়ার সময় নির্ধারিত থাকায় জ্যামের নগরীতে সন্তান সামলাতে হিমশিম খেয়ে যান মায়েরা।
২০২৩-এর জুলাইয়ে মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে সারা দেশে জেলা পর্যায়ে ৬০টি ডে কেয়ার সেন্টার নির্মাণের ঘোষণা এলেও সে কাজেরও কোনো উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি নেই। শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্রের বিকাশ কর্মজীবী মায়েদের জীবন কিছুটা সহজ করতে পারত। কিন্তু সরকারি দিবাযত্ন কেন্দ্রের ওপর অনাস্থা আর ব্যয়বহুল বেসরকারি শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্র এ দুইয়ের মাঝে পিষ্ট হয়ে দিন দিন অসহনীয় হয়ে উঠছে অসংখ্য কর্মজীবী নারীর জীবন। তাই শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্র নির্মাণ ও বিকাশে ত্বরিত গতিতে বাস্তবায়ন করা এখন সময়ের দাবি।
কর্মজীবি মায়েদের প্রতিবন্ধকতা নিয়ে জানতে চাইলে কৃষি ব্যাংকের কর্মকর্তা মিশুক মিশু বলেন, কর্মস্থানে তাদের ডে-কেয়ার সেন্টারের সুব্যবস্থা তাদের মানসিক যন্ত্রণাকে লাঘব করতে পারে। অনেক সময় অসুস্থ শিশুকে বাসায় রেখে অফিস করতে হয়, তখন শিশুর চিন্তায় কাজে মনোযোগ দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। একরকম অস্বস্তির মধ্যে দিন কাটে।
সোনালী ব্যাংক কর্মকর্তা উম্মে কুলসুম জানান, অনেক সময় সন্তানের অসুস্থতায় ছুটি পাওয়া অনেক কষ্টসাধ্য হয়ে ওঠে। এ ক্ষেত্রে তিনি অফিস পরিচালনা পর্ষদের উদার মনোভাব পোষণের প্রতি আহ্বান জানান।
তৃণমূল পর্যায়ে বিশেষত বেসরকারি সংস্থা বা পোশাকশিল্পে নিয়োজিত নারীদের মাতৃত্বকালীন ছুটি ছয় মাস রয়েছে। তবে এই ছুটির সময়টা কোনো কোনো মায়ের জন্য অপ্রতুল। নারীর মাতৃত্ব ও কর্মজীবন দুটো সামলাতে গিয়ে নারীরা ঠিক কোন জায়গায় সমস্যার সম্মুখীন হয় এ বিষয়ে জানতে আন্তর্জাতিক বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার কর্মী রাজিয়া সুলতানা বলেন, চাকরিজীবী হিসেবে অফিসের কাজ ও সংসার সামলানো কঠিন হয়ে পড়ে। ফুল টাইম অফিস করা যেমন দায়িত্ব, তেমনি বাসায় এসে একজন মা হিসেবে সব দায়িত্ব পালন করতে হয়। কখনো এমন সিচুয়েশন এসেছে যে, সন্তান অনেক অসুস্থ তবুও তাকে রেখে আমাকে ফুল টাইম অফিস করতে হচ্ছে।
আবার অনেক সময় অফিস শেষে বাসায় এসে কাজ করতে ইচ্ছা না করলেও একজন মা হিসেবে সেটা মেনে নিয়ে সব সামলাতে হয়। আসলে সর্বোপরি নারীকে সব দিক সামলাতে হয়। কর্মক্ষেত্রে তিনি নারীদের জন্য নারীবান্ধব পরিবেশ তৈরি করার কথা বলেন। কেননা একজন নারী যখন মা হয় তখন ছয় মাস মেটারনিটি লিভ নিতে হয়। তখন সহকর্মীদের মাঝে কাজ ভাগ করে নিতে হয় তখন তারা সহানুভূতি না দেখিয়ে, তারা এটাকে বোঝা মনে করে। কিন্তু এটি তো জাতি গঠনের একটা অংশ, তাই বিষয়টি সবাইকে সহজভাবে মেনে নিতে হবে।
একজন নারীর জন্য কর্মক্ষেত্রে সফল হওয়ার ব্যাপারে সহকর্মীদের সংবেদনশীলতার প্রয়োজন রয়েছে। এর ফলে কর্মক্ষমতা ও দক্ষতাকে তিনি আরও বেশি কাজে লাগাতে সক্ষম হন। গবেষণায় দেখা গেছে, কর্মক্ষেত্রে নারী যতটা সহনশীল ও সহমর্মী সহকর্মী পান, সেই কর্মক্ষেত্রে নারী ততটাই স্বাচ্ছন্দ্যভাবে কাজ করতে সক্ষম হন।
বেসরকারি ব্যাংকে কর্মরত তামান্না ইসলাম বলেন, কর্মক্ষেত্রে সফল হওয়ার ব্যাপারে সহকর্মীদের সংবেদনশীলতার প্রয়োজন আছে। বর্তমানে আমি ছয় মাসের অন্তঃসত্ত্বা। কিন্তু আমি অন্তঃসত্ত্বা হওয়ার পর সহকর্মীরা আমাকে এমনভাবে সহযোগিতা করছেন আমি মাঝে মাঝে ভুলে যাই যে আমি অন্তঃসত্ত্বা । সহকর্মীরা হেল্পফুল হওয়ায় আমার তেমন স্ট্রেস হয় না, যা আমাকে আমার দায়িত্ব পালন করতে সহায়তা করছে।
/ফাহমি
.jpg)