ঢাকা ২৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩, বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

সর্বশেষ
কংগ্রেসে যোগ দিচ্ছেন মমতা হরিণাকুন্ডুতে বজ্রপাতে কৃষকের মৃত্যু ইসরায়েলের আগ্রাসন পুরো বিশ্বের জন্য বিপদ: এরদোয়ান সিলেটে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনকালে প্রশাসনের অভিযান মুকসুদপুরে নিখোঁজের ৫ দিন পর ইজিবাইকচালকের মরদেহ উদ্ধার চট্টগ্রাম কাস্টমসের বিল অব এন্ট্রি ও বিল অব এক্সপোর্ট কার্যক্রম ২৪ ঘণ্টা বন্ধ থাকছে প্রথমবার মাথাপিছু আয় ৩ হাজার ডলার ছাড়াল ব্যক্তিগতভাবে আমি মৃত্যুদণ্ড বিরোধী: আইনমন্ত্রী বাংলা কিউআর: ক্যাশলেস বাংলাদেশের পথে নতুন বিপ্লব ভ্যানচালকের আর্জেন্টিনা প্রেম মধ্যপ্রাচ্যে আবারও পূর্ণমাত্রার যুদ্ধের আশঙ্কা: আন্তোনিও গুতেরেস বাংলাদেশের হজ ব্যবস্থাপনায় প্রশংসা সৌদি হজমন্ত্রীর অত্যন্ত শক্তিশালী এল নিনোর সম্ভাবনা বাড়ছে: ইইউ পর্যবেক্ষণ সংস্থা বিছানা নাপাক হলে ঐ ঘরে নামাজ পড়া যাবে কি? পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি ও কার্য উপদেষ্টা কমিটি গঠন যুক্তরাষ্ট্র-ইরান পাল্টাপাল্টি হামলা, মধ্যপ্রাচ্যে শান্তিচুক্তি অনিশ্চিত কারাগারে বিশ্বকাপ ফুটবল খেলা দেখার ব্যবস্থা করলেন টাঙ্গাইলের ডিসি বরাদ্দ অর্থের ব্যয় নিশ্চিত করতে হবে চার স্তরে মজুত, জলাতঙ্কের ভ্যাকসিনের কোনো সংকট নেই: স্বাস্থ্যমন্ত্রী নারী ও শিশুর সুরক্ষায় প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপ প্রয়োজন: সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ভোটের দায়িত্বে মারা গেলে ১০ লাখ টাকা পাবে পরিবার মার্কিন বাণিজ্য চুক্তি পোশাক শিল্পের জন্য অশনি সংকেত: ড. মোস্তাফিজুর রহমান ইরানকে আলোচনা বিলম্ব করার ‘মূল্য দিতে হবে’: ট্রাম্প আড়াইহাজারে চাঁদাবাজির অভিযোগে এসআই প্রত্যাহার পাবনায় সন্তানের সামনে বাবাকে গুলি করে হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার ৩ গাজীপুরে বাস উল্টে বিশ্ববিদ্যালয়ের ২৩ শিক্ষার্থী আহত সিংগাইরে চোর সন্দেহে গণপিটুনিতে মৃত্যু: ১৫০ জনের বিরুদ্ধে মামলা চার দিনের সংগীত উৎসবে মেতে উঠছে ঢাকা সরকারি ভাতা বিতরণে নগদের প্রতি আস্থা অব্যাহত আলিয়ঁসে শুরু  হচ্ছে তিন শিল্পীর ‘ত্রিবন্ধন’
Nagad desktop

কমান্ডার আবদুল হামিদ উচ্চবিদ্যালয়

প্রকাশ: ১৩ ডিসেম্বর ২০২৪, ০১:১৩ পিএম
কমান্ডার আবদুল হামিদ উচ্চবিদ্যালয়
আঁকা মাসুম

স্কুলের নাম কমান্ডার আবদুল হামিদ উচ্চবিদ্যালয়। এই স্কুলের ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ে দিপু। সবে ভর্তি হয়েছে। পড়াশোনায় তেমন মন নেই। সারা দিন শুধু টইটই করে ঘুরে বেড়ায়।
এই স্কুলের নামটা কমান্ডার কেন? কার নামেই-বা রাখা হয়েছে? হঠাৎ করেই দিপুর মাথায় ভাবনাটা চলে আসে।
প্রতিদিনের মতো আজকেও প্রাত্যহিক সমাবেশ শেষ করে সবাই নিজ নিজ ক্লাসে গেল। দিপুও আছে তার ক্লাসে। প্রথমে বাংলা ব্যাকরণ ক্লাস হলো। সমাস তো মাথার ওপর দিয়ে গেল। গণিত হলো, ওটাও দৈত্যের মতো ঘাড় মটকে চলে গেল। এরকম পরপর তিনটি ক্লাস হয়ে গেল। কিন্তু কোনো স্যারকে সে প্রশ্নটা জিজ্ঞেস করতে পারল না। 
টিফিনের পর আবার ক্লাস শুরু হলো। বিজ্ঞান ক্লাস। নিউটনের মাধ্যাকর্ষণতত্ত্ব পড়তে গিয়ে নিজেই মাধ্যাকর্ষিত হয়ে কল্পনায় উড়তে লাগল। শেষ পিরিয়ডে আছে বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয়। মতিন স্যার ক্লাসে ঢুকলেন। সবার প্রিয় শিক্ষক তিনি।
ঢুকেই দিপুকে উদ্দেশ্য করে বললেন, তুমি কি আজ নতুন এসেছ?
দিপু জবাব দিল, জি স্যার।
মনোযোগ সহকারে পড়াশোনা করবে।
মতিন স্যারের সুন্দর করে কথা বলা দেখে এবার প্রশ্ন করার সাহস পেল দিপু। সে বলল, স্যার একটা প্রশ্ন করতে পারি?
মতিন স্যার বললেন, কী প্রশ্ন?
দিপু বলল, আচ্ছা স্যার, এই স্কুলের নামটা কমান্ডার আবদুল হামিদ উচ্চবিদ্যালয় হলো কীভাবে?
স্যার বললেন, খুব ভালো প্রশ্ন করেছ। এই স্কুলের নাম কীভাবে হলো তা সবার জানা জরুরি। তোমরা তো মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে বইয়ে পড়েছ। তাহলে শোনো সবাই এই স্কুলের নামের ইতিহাস।
১৯৭১ সালে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী আমাদের ওপর অস্ত্র, গোলাবারুদ নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ল। ২৫ মার্চ রাতেই হাজার হাজার ঘুমন্ত মানুষকে হত্যা করল তারা। শুরু হয়ে গেল মুক্তিযুদ্ধ। শুধু কী শহরে! শহরের পাশাপাশি দেশের আনাচে-কানাচে সবখানে।
তখন মে মাস। কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা ভারতের আগরতলা থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে আমাদের এই স্কুলে এলেন। তখন এটা স্কুল ছিল না। ছোট একটা ঘর ছিল। চারদিকে ঝোপঝাড়। অনেকেরই জানা ছিল না যে এখানে একটা ঘর আছে।
সেই সুযোগটাই কাজে লাগিয়েছিলেন মুক্তিযোদ্ধারা। ছোট ঘরে সবাই থাকতে শুরু করল। মুক্তিযোদ্ধাদের দলনেতা আবদুল হামিদ। কমান্ডার আবদুল হামিদ। যেমন তার বুদ্ধি, তেমন তার অস্ত্র চালানোর দক্ষতা। এখান থেকেই কমান্ডার আবদুল হামিদের দল প্রথম মিশনে অংশ নিলেন। তিনজন রাজাকার ও দশজন মিলিটারিকে শেষ করে দিলেন সোনাতলায়। এরপর একেক করে হাটখোলারগাঁও, বিজয়পুর, নবীনগরসহও আরও কয়েকটি গ্রামে মুক্তিযোদ্ধারা মিশন চালিয়ে পাকিস্তানিদের পরাজিত করলেন। এভাবে কেটে গেল অনেকদিন। 
তখন ডিসেম্বর। মুক্তিযুদ্ধের শেষের দিকের কথা। এখান থেকে আড়াই মাইল দূরের তিনপাড়া গ্রামে পাকিস্তানি সেনারা ঘাঁটি গেড়েছে। এই খবর শুনে কমান্ডার আবদুল হামিদ তার সহযোদ্ধাদের তৈরি হতে বললেন। পরের দিন হামলা করা হলো। দীর্ঘ সময় গোলাগুলির পর একপর্যায়ে অনেক সেনা মারা গেল। এ সময় হঠাৎ একটা গুলি এসে কমান্ডার আবদুল হামিদের বুকে লাগল। সঙ্গে সঙ্গে তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়লেন। কমান্ডার আবদুল হামিদের রক্তে সবুজ ঘাস লাল হয়ে গেল। মুখে হাসি নিয়ে তিনি মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়লেন। দেশ স্বাধীন হলো। তার বছর দুয়েক পর সেই ঘরে চালু হলো প্রাথমিক স্কুল। বীর মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার আবদুল হামিদের স্মরণে স্কুলটির নাম রাখা হলো কমান্ডার আবদুল হামিদ প্রাথমিক বিদ্যালয়। ধীরে ধীরে এটি উচ্চবিদ্যালয়ে পরিণত হলো।
মতিন স্যারের গলায় আবেগ, চোখে পানি। ক্লাসের সবার চোখ ভিজে উঠছে। 
দিপু বলল, এসব কথা আপনি কীভাবে জানলেন স্যার?
স্যার বললেন, কারণ আমার বাবা ছিলেন আবদুল হামিদের দলের একজন। বাবাই আমাকে মহান কমান্ডার আবদুল হামিদের গল্প শুনিয়েছেন।
দিপু বলল, স্যার আপনার বাবা একজন মুক্তিযোদ্ধা! তিনি আমাদের গর্ব এবং অহংকার। 
স্যার বললেন, তোমাদের সবাইকে মুক্তিযুদ্ধের কথা জানতে হবে। মুক্তিযোদ্ধাদের গল্প জানতে হবে। 
স্যারের কথা শেষ হতেই ছুটির ঘণ্টা বেজে উঠল। হঠাৎ কী হলো কে জানে! ষষ্ঠ শ্রেণির সবাই লাইন ধরে ক্লাস থেকে বের হয়ে জাতীয় পতাকার সামনে গিয়ে স্যালুট করল। তাদের দেখাদেখি পুরো স্কুলের ছাত্রছাত্রী, শিক্ষক ও শিক্ষিকা জাতীয় পতাকাকে স্যালুট করল। লাল সবুজের পতাকা তখন আকাশে পতপত করে উড়ছে।

ঈদের ছড়া

প্রকাশ: ২২ মে ২০২৬, ০২:১২ পিএম
ঈদের ছড়া
এঁকেছেন মাসুম

লাল গরু

আবদুল লতিফ 

বাবার সাথে গেল খোকা 
ঈদের পশুর হাটে 
নানান রকম পশু দেখে 
খোকার সময় কাটে। 

নানান রঙের নানান পশু 
নানান রকম শিং 
কারও গলায় ঘণ্টা বাজে 
টুংটাং টিংটিং।

টুকটুকে লাল একটা গরু 
শিং দুটো তার বাঁকা 
খুব সুন্দর দেখতে যেন 
রংতুলিতে আঁকা।

এমন গরু দেখে খোকার 
জুড়ায় দুই নয়ন 
সেই গরুটা দেখে বাবারও 
ভরে ওঠে মন।

লাল গরুটা কিনে নিয়ে 
ফিরল বাড়ি শেষে 
ফিরল বাড়ি বাবা-ছেলে
খুশির নায়ে ভেসে।

 


কোরবানির পশু কেনা

মুহাম্মদ রফিক ইসলাম 

 

গেল খোকা
পশুর হাটে 
          ঈদের খুশি মনে,
লাল গরুটা
পছন্দ খুব
         দেখে জনে জনে।
খোকা বলে
কিনতে হবে
         এই গরুটা ভালো, 
ইয়া বড়
শিং আছে তার
         লেজখানি যার কালো।
মুচকি হেসে
বলেন বাবা
         নাও তাহলে এটা,
মনের খায়েশ 
পূর্ণ হলেই 
         আল্লাহ খুশি, ব্যাটা।

 

 


ঈদ এলে 

মো. দিদারুল ইসলাম 

 

ঈদ এলে ছেলে-বুড়ো রাত করে ভোর,
খুকুমণি হাতে তোলে মেহেদির ফোঁড়।

ঈদ এলে শহরের অলিগলি ফাঁকা,
অনেকেই ছেড়ে যায় রাজধানী ঢাকা।

ঈদ এলে সারা গাঁয়ে পড়ে যায় ধুম,
খোকনের চোখজুড়ে নাহি থাকে ঘুম।

ঈদ এলে গরিবের মনে নাই সুখ,
আঁখি সদা জলে ভরা দুখ আর দুখ।

ঈদ এলে উঁচু-নিচু ভেদাভেদ নাই,
সকলেই মিলেমিশে ঈদগাহে যাই।

 


ঈদ এল গাই চলো!

শ্যামল বণিক অঞ্জন 

 

খুশির পরাগে সাজে প্রজাপতি মন
উল্লাসে শোরগোলে মাতোয়ারা ক্ষণ! 
আকাশের কোণে হাসে এক ফালি চাঁন
ঈদ এল গাই চলো সাম্যেরই গান!
কোলাকুলি গলাগলি বুকে রাখি বুক
ঈদে থাক সকলেরই হাসিভরা মুখ!

রেজার লাল গরু

প্রকাশ: ২২ মে ২০২৬, ০২:০৪ পিএম
রেজার লাল গরু
এঁকেছেন মাসুম

ফুরফুরে বাতাস আর কাঁচা মাটির গন্ধে রেজার মনটা বেশ ফুরফুরে হয়ে আছে। বাবা সরকারি চাকরি করেন বলে সারা বছর ইটের দেয়ালে বন্দি থাকতে হয়। কিন্তু এবারের ঈদটা একদম অন্যরকম। ফুলপুরে দাদাবাড়ি মানেই অন্য এক জগৎ। রেজার বাপ-দাদারা খাঁটি ‘ধানিপানি’ গেরস্ত। উঠানভর্তি ধানের গোলা আর গোয়ালভর্তি গরু–এসব দেখেই রেজা বড় হয়েছে গল্পের ছলে।
গ্রামে আসার পর থেকে রেজার দিন কাটছে চাচাতো ভাই মাহিরের সঙ্গে। ওরা দুজনেই ক্লাস ফাইভে পড়ে, যেন হরিহর আত্মা। মাঠ-ঘাট আর বন-বাদাড় চষে বেড়ানোই এখন ওদের প্রধান কাজ। ঈদের দুদিন আগে শুরু হলো আসল উত্তেজনা–গরু কেনা।
হাটে গিয়ে রেজার সে কী আনন্দ! চারদিকে শত শত গরু। এর মধ্যেই হঠাৎ এক কাণ্ড ঘটল। একটা গরুর খুব কাছ দিয়ে যাওয়ার সময় সপাৎ করে রেজা একটা লাথি খেল। ব্যথা যতটা না লেগেছে, তার চেয়ে লজ্জা পেল বেশি। মাহির তো হেসেই কুটিপাটি! শেষমেশ চাচা এসে রেজার ধুলো ঝেড়ে দিয়ে হাসিমুখে বললেন, ‘আরে পাগলা। গরু তো একটু-আধটু গুঁতা-লাথি মারবেই। সাবধানে থাকতে হয়।’
অনেক খোঁজাখুঁজির পর বাবা আর চাচা মিলে বিশালাকার একটা লাল টুকটুকে বলদ কিনলেন। যেমন তার শিং, তেমনি তার গায়ের রং। রেজা শুরু থেকেই তার ফোনে ছবি তুলছিল। হাটে যাওয়া, দরদাম করা, আর শেষে লাল গরুর সঙ্গে বীরের মতো দাঁড়িয়ে ছবি তোলা–কিছুই বাদ রাখল না সে।
বাড়ি ফিরে এসেই রেজার নতুন মিশন শুরু হলো। বাবা, চাচা-চাচি, আর দাদা-দাদিকে নিয়ে উঠোনে একটা দারুণ ফ্যামিলি সেলফি তুলল। তার পর সেই বিশাল গরুর ছবির সঙ্গে ক্যাপশন দিয়ে ফেসবুকে পোস্ট করল–‘এবার কোরবানিতে জেলার সবচেয়ে বড় গরু কোরবানি দিচ্ছি আমরা!’
পোস্ট দেওয়া মাত্রই লাইক আর কমেন্টের বন্যা বয়ে গেল। মুহূর্তেই ছবিটা ভাইরাল। এমনকি দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ সেই ‘বিশাল’ গরু দেখতে রেজার দাদাবাড়িতে ভিড় জমাতে লাগল। রেজা তো খুশিতে আত্মহারা!
কিন্তু গোল বাধল ঈদের আগের রাতে। চারদিকে চমৎকার জোছনা ফুটেছে। উঠোনটা যেন রুপালি আলোয় ভেসে যাচ্ছে। রেজার দাদা, যিনি স্থানীয় মসজিদের ইমাম, সবাইকে নিয়ে সেই উঠানে বসলেন। তবে আজ দাদাকে বেশ গম্ভীর দেখাচ্ছে।
দাদা রেজার দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বললেন, ‘দাদুভাই, তুমি নাকি ফেসবুকে আমাদের কোরবানির খবর ছড়িয়ে দিয়েছ?’
রেজা গর্বের সঙ্গে বলল, ‘হ্যাঁ দাদা! সবাই বলছে আমাদের গরুটা নাকি জেলার সেরা।’
দাদা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, ‘রেজা, কোরবানি তো কোনো প্রতিযোগিতা নয়। এটা একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য। গরু কত বড় হলো, দাম কত হলো–এসব জাহির করার নাম কোরবানি নয়। আমরা যদি মনে লৌকিকতা রাখি, তবে সেই ত্যাগের কোনো মূল্য নেই। লোক দেখানো ইবাদতকে ইসলামে পছন্দ করা হয়নি।’
দাদার কথাগুলো রেজার মনে তীরের মতো বিঁধল। সে বুঝতে পারল, সে নিজের অজান্তেই একটা পবিত্র বিষয়কে স্রেফ প্রচারের আলোয় নিয়ে এসেছে। নিজের ভুল বুঝতে পেরে রেজার চোখের কোণ ভিজে উঠল। সে তখনই ফোনটা বের করল এবং সবার সামনেই ফেসবুক থেকে সেই ভাইরাল হওয়া পোস্ট আর ছবিগুলো ডিলিট করে দিল।
জোছনা রাতে দাদা আশীর্বাদের হাত রেজার মাথায় বুলিয়ে দিলেন। রেজা বুঝতে পারল, বড় গরু কেনায় নয়, মনের অহংকার বিসর্জন দেওয়াতেই কোরবানির আসল সার্থকতা।

ক্যাবলা আর কোরবানির গরু

প্রকাশ: ২২ মে ২০২৬, ০২:০২ পিএম
ক্যাবলা আর কোরবানির গরু
এঁকেছেন মাসুম

সকাল থেকেই পাশের বাড়িতে যেন সাইরেন বাজছে, এমন উচ্চৈঃস্বরের প্যাঁ প্যাঁ ক্রন্দন।
পটলা জানালা দিয়ে উঁকি দিয়ে দেখল। হ্যা, যা ভেবেছে তাই ঠিক। ক্যাবলাটাই এই ক্রন্দন-সাইরেন বাজাচ্ছে। কিন্তু বিষয়টা কী? একটু 
দেখতে হয়।  
দরজা খুলে পা বাড়াল পটলা। ক্যাবলার মেজো কাকার কাছে জানতে পারল, কোরবানির গরুর সঙ্গে সেই সকাল থেকেই ক্যাবলাটা দুষ্টুমি শুরু করেছে। হঠাৎ গরুর পিঠে উঠে বসায় গরুর ছোটাছুটি এবং ক্যাবলা চিতপটাং। তেমন কিছু ব্যথা না পেলেও কান্নার জোর ক্রমেই বেড়ে চলেছে। সহ্য করতে না পেরে ওর বাবা কান্না-সন্ত্রাসের হাত থেকে বাঁচতে পাশের বাড়িতে গিয়ে উঠেছে। কত মানুষই তো কাঁদে, কিন্তু এমন বিশ্রী কান্না খুব একটা শোনা যায় না।
পটলা এগিয়ে গেল ক্যাবলার কাছে।
–কী রে, এখনো ফুল চার্জ? অনেক তো হলো, এবার থাম দেখি।
 পটলার কথা শেষ না হতেই বাড়ির উঠানে গড়াগড়ি দিয়ে ডাবল জোরে কান্না শুরু হলো। কান্নার গুঁতোয় পটলাও স্থান ত্যাগ করল দ্রুত।
গরুটাও আর সহ্য করতে পারল না। হুংকার দিয়ে দড়ি ছিঁড়ে ক্যাবলাকে তাড়া করল। মুহূর্তেই ক্যাবলার কান্না বন্ধ। বাবা গো মাগো বাঁচাও বাঁচাও বলে ছুটতে লাগল ক্যাবলা। তার পিছনে সমানতালে কোরবানির গরু লালু।
হাইস্কুলের মাঠে গিয়ে বড় আমগাছে উঠে প্রাণে বাঁচল বেচারা। কিন্তু গাছের তলায় দাঁড়িয়ে সমানে হাম্বা হাম্বা ডেকে তার সর্বশরীর কাঁপিয়ে তুলল লালুটা। এভাবেই কাটল ঘণ্টাখানিক।
গাছের ডালে ভয়ে কেঁপে কেঁপে নেতিয়ে পড়ল ছোঁড়াটা। শরীরে কাঁপুনি ধরে গেল। কিছুক্ষণের মধ্যেই লোক জড়ো হয়ে গেল গাছতলায়।
লালুটা কাউকে কিছু বলছে না। যেন তার একমাত্র টার্গেট গাছে চড়া ওই কান্না-সন্ত্রাসী ক্যাবলা। ওকেই তার চাই। ছোঁড়াটার বিশ্রী কান্নায় লালুটা খুবই বিরক্ত, রাগও হয়েছে খুব। এটা তার চোখের ভাষাতেই বুঝিয়ে দিচ্ছে।
দুপুরের পর বাবা-মা আর আত্মীয়-স্বজনের সহযোগিতায় গাছ থেকে নামানো হলো ক্যাবলাকে। যেন সাক্ষাৎ মৃত্যুর হাত থেকে ফিরে আসা। লালুকেও নিয়ে যাওয়া হলো বাড়িতে। ক্যাবলা গাছ থেকে নেমেই নিজেই নিজের কান ধরে উঠবস করল কয়েকবার। বলল, ঢের শিক্ষা হয়েছে। আর দুষ্টুমি নয়। এখন থেকে রোজই অন্তত একটা ভালো কাজ করব। আমাকে সবাই ক্ষমা করো। 
 ক্যাবলার ওপর থেকে সবার রাগ চলে গেল। পরের দিনই মাটির ব্যাংকে জমানো টাকা দিয়ে পাঁচটি পথশিশুর জন্য ঈদের পোশাক কিনে দিল ক্যাবলা। বাবা-মা খুশি হলেন খুব। ক্যাবলাকে আদর করে টিলু কাকা বললেন, সামর্থ্য অনুযায়ী আমরা সবাই এবার ঈদে পাঁচজনকে না পারি, কমপক্ষে একটি পথশিশুকে ঈদে জামা কিনে দেব। আমাদের এলাকার একটা শিশুও যেন ঈদের আনন্দ থেকে বঞ্চিত না হয়। সবার আনন্দেই এবার ঈদ হবে প্রাণের ঈদ। সত্যিকারের ঈদ।
টিলু কাকার কথায় সবাই সমর্থন দিল। হাততালি দিল। হাত বাড়িয়ে দিল। অন্যরকম এক আনন্দে হেসে উঠল হিজলপুর।

বাঘের পিঠে মিলি

প্রকাশ: ১৫ মে ২০২৬, ০৪:৩৯ পিএম
আপডেট: ১৫ মে ২০২৬, ০৪:৪০ পিএম
বাঘের পিঠে মিলি
এঁকেছেন মাসুম

বড় একটা বন। সেই বনে বাস করত বিশাল একটা বাঘ। বাঘটাকে সবাই মামা বলে ডাকত। বাঘটা খুব ভালো। কাউকে কিছু বলত না। সবার সাথে ভালোভাবে চলত। 
মিলি একদিন গেল ওই বনে। যেতেই সামনে হাজির হলো বাঘটি। 
মিলি ভয় করে বলল, ‘বাঘ মামা, তুমি হাসো কেন? তুমি কী আমাকে খেয়ে ফেলবে?’
বাঘ মুচকি হাসি দিয়ে বলল, ‘আরে না। তোমার খেলার সাথি হতে চাই।’
–তুমি আমার খেলার সাথি হবে?
মিলি হা হা হো হো হি হি হাসল। একটু ভেবে আরও একটু হাসল। সবগুলো দাঁত বের করে। হো হো হি হি করে। 
বাঘ বলল, ‘বাহ! বাহ! তোমার হাসি কী ভালো। আরও হাসো। আরও হাসো। হাসতে থাকো। আমি দেখতে থাকি।’
মিলি খুশি হয়ে বলল, ‘আমার খেলার সাথি হতে চাও ভালো কথা। আমার বাসায় যাবে কীভাবে? তোমাকে দেখলে সবাই মেরে ফেলবে।’
বাঘ বলল, ‘বিকেল হলে তুমি আসবে। আমরা এক সাথে খেলব। মজা করব। তোমাকে পিঠে নিয়ে ঘুরব।’
বাঘটির নরম কথায় মিলি খুব খুশি হলো। বলল, ‘তা হলে ঠিক আছে।’ তার পর বাঘ মিলিকে পিঠে তুলে নিল এবং সারা বন ঘুরে দেখাল। মজার মজার কথা শোনাল।
একটু পর মিলি ঘুম থেকে উঠল। আর বলল, ‘কই বাঘ! কই বন! কই আমি! ইশ! দুর ছাই। ওহ বুঝতে পেরেছি। তা হলে আমি ঘুমের ঘোরে বাঘের পিঠে ছিলাম।’
মিলি আবার হা হা হো হো হি হি করে হাসতে হাসতে ঘুমিয়ে পড়ল।

কুটুনের মা

প্রকাশ: ১৫ মে ২০২৬, ০৪:৩৬ পিএম
কুটুনের মা
এঁকেছেন নিয়াজ চৌধুরী তুলি

কুটুনের মন খারাপ। আজ তার পরীক্ষার রেজাল্ট দিয়েছে। গণিতে কুটুন নম্বর কম পেয়েছে। গণিত বুঝতে তার অসুবিধা হয়। অসুবিধা হয় বলে অঙ্ক করতে ভয় পায়। ভয়ে কখনো কখনো সে অঙ্ক না করে পাশে সরিয়ে রেখে দেয়। তাতে তার গণিতে ফলাফল ভালো হয়নি।
কুটুন বসে আছে ঘরের বারান্দায়। মা এসেছেন। কুটুন ইশকুল থেকে ফিরে কিছু খায়নি। হাতমুখ ধুয়ে বারান্দায় চলে এসেছে। মা বললেন, ‘কুটুন, চলো ছাদে যাই। নতুন বাতাস এসেছে।’
মাথা ঘুরিয়ে কুটুন মাকে দেখতে পেয়েছে। মা কুটুনের মাথায় হাত রাখলেন। আচমকা কুটুনের কান্না পেয়ে গেছে। তবে সে কাঁদেনি। তার মনে প্রবল কৌতূহল দেখা দিয়েছে। মা বলেছেন ‘নতুন বাতাস এসেছে’। বাতাস কেমন করে নতুন হয় সে বুঝতে পারছে না। কুটুন উঠে পড়ল। সে মায়ের সঙ্গে ছাদে গিয়ে দাঁড়াল। 
মা বললেন, ‘বাতাস বয়ে যাচ্ছে বুঝতে পারছ?’
কুটুন বলল, ‘নতুন বাতাস এসেছে বুঝলে কীভাবে, মা?’
মা বললেন, ‘তুমি যখন ইশকুলে যাচ্ছিলে তখন কি বাতাস এমন ঠাণ্ডা ছিল?’
কুটুন অবাক হয়ে বলল, ‘না মা। তখন গরম লাগছিল। বাতাসে গরম ভাব ছিল।’
মা বললেন, ‘সেই গরম বাতাস চলে গেছে। সেখানে এসে পড়েছে এখন ঠাণ্ডা বাতাস। তাতেই বুঝেছি নতুন বাতাস এসেছে।’
কুটুনের ভালো লাগছে। মা কী সুন্দরভাবে বুঝিয়ে বললেন নতুন বাতাস এসেছে তা কীভাবে বোঝা গেছে। মায়ের হাতে ফানুস। মা ফানুস গুছিয়ে রাখলেন। ফানুসের ভেতর যেখানে আগুন জ্বালাতে হয়, মা সেখানে আগুন জ্বালিয়েছেন। মা আর কুটুন হাত উঁচু করে ফানুস উড়িয়ে দিল আকাশে। বাতাসে ভেসে ভেসে ফানুস ধীরে ধীরে উপরে উঠে যাচ্ছে।
মা বললেন, ‘দেখো কুটুন, আমাদের ফানুস উপরে উঠে যাচ্ছে।’
কুটুন বলল, ‘মা, কত উপরে উঠবে এই ফানুস?’
মা বললেন, ‘অনেক উপরে। ওই মেঘেদের কাছে।’
ফানুস দেখতে ছোট হয়ে যাচ্ছে। ফানুস চলে গেছে মেঘের কাছাকাছি।
মা বললেন, ‘তুমি কি জানো কুটুন, ফানুস কেমন করে ওড়ে?’
কুটুন বলল, ‘ফানুসের ভেতর আগুন থাকে। ফানুসে যে আগুন আছে, সেই আগুনের তাপে ফানুসের ভেতরের বাতাস গরম হয়ে হালকা হয়েছে। হালকা বাতাস ফানুসকে উপরের দিকে উড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে।’ 
মা বললেন, ‘ফানুসে যদি আগুনের শিখা না থাকত তা হলে কি ফানুস উড়তে পারত?’
কুটুন বলল, ‘পারত না, মা। ওই আগুন হচ্ছে ফানুসের ওড়ার শক্তি। তা হলে আগুন না থাকলে ফানুস উড়বে কীভাবে!’
নরম গলায় মা বললেন, ‘তোমার মন খারাপ, বাবা!’
গণিতে কম নম্বর পেয়েছে। মাকে বলা হয়নি। কুটুন বলল, ‘হ্যাঁ মা। পরীক্ষার রেজাল্ট দিয়েছে। গণিতে নম্বর কম পেয়েছি। অঙ্কে খুব ভয় পাই।’ 
মা আকাশের দিকে তাকিয়ে আছেন। কুটুন তাকিয়েছে আকাশের দিকে। আকাশে ফানুস দেখা যাচ্ছে। মা বললেন, ‘তোমার ভেতরেও ফানুসের মতো আগুনের শিখা আছে। তুমি যাকে বলেছ শক্তি। তোমার ভেতরের সেই আগুন তুমি জ্বালাওনি বলে তোমার মন খারাপ হয়ে যায়।’
কুটুনের মন ভালো হয়ে গেছে। মনে হচ্ছে সত্যি তার ভেতর ফানুসের মতো আগুন আছে। সেই আগুনকে সে কাজে লাগাতে চায়।
মা বললেন, ‘কোনো একদিন অঙ্কের উত্তর মেলেনি বলে তুমি অংক করতে ভয় পাও। তুমি অংকের বই দূরে সরিয়ে রেখেছ। তাতে তোমার ভেতরের আগুনের শিখা নিভে গেছে। তুমি গণিতে ভালো করতে পারছ না।’ 
নিজের ভেতর শক্তি অনুভব করছে কুটুন। তার বিশ্বাস হচ্ছে সে চেষ্টা করলেই পারবে। মা বলেছেন তার ভেতর আগুনের শিখা আছে। সেই আগুন হচ্ছে শক্তি। নিজের ভেতরের শক্তিকে কাজে লাগাবে।
মাকে জড়িয়ে ধরেছে কুটুন। মা তার ভেতর নিভে যাওয়া আগুনের শিখা জ্বালিয়ে দিয়েছেন। এখন থেকে সে আর কিছুতেই ভয় পাবে না। ভয় পেলে নিজের ভেতরের আগুনের শিখা নিভে যায়। আগুনের শিখা নিভে গেলে শক্তি ফুরিয়ে যায়।
মা বললেন, ‘আকাশের তারা কখনো হারিয়ে যায় না। শুধু মেঘ তাদের ঢেকে রাখে। তোমার ভেতরের শক্তিও হারিয়ে যায়নি।’ 
কুটুন মাকে জড়িয়ে ধরে বলল, ‘মা তুমি খুব ভালো। আর কোনো দিন আমার মন খারাপ হবে না। আর কোনো কাজে ভয় পাব না।’ 
মা কুটুনের কাঁধে হাত রাখলেন। মা আর কুটুন দুজনই তাকিয়ে আছে আকাশে ফানুসের দিকে। কুটুনের চোখ পানিতে ভিজে উঠেছে। কুটুন কাঁদছে আনন্দে।