স্কুলের নাম কমান্ডার আবদুল হামিদ উচ্চবিদ্যালয়। এই স্কুলের ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ে দিপু। সবে ভর্তি হয়েছে। পড়াশোনায় তেমন মন নেই। সারা দিন শুধু টইটই করে ঘুরে বেড়ায়।
এই স্কুলের নামটা কমান্ডার কেন? কার নামেই-বা রাখা হয়েছে? হঠাৎ করেই দিপুর মাথায় ভাবনাটা চলে আসে।
প্রতিদিনের মতো আজকেও প্রাত্যহিক সমাবেশ শেষ করে সবাই নিজ নিজ ক্লাসে গেল। দিপুও আছে তার ক্লাসে। প্রথমে বাংলা ব্যাকরণ ক্লাস হলো। সমাস তো মাথার ওপর দিয়ে গেল। গণিত হলো, ওটাও দৈত্যের মতো ঘাড় মটকে চলে গেল। এরকম পরপর তিনটি ক্লাস হয়ে গেল। কিন্তু কোনো স্যারকে সে প্রশ্নটা জিজ্ঞেস করতে পারল না।
টিফিনের পর আবার ক্লাস শুরু হলো। বিজ্ঞান ক্লাস। নিউটনের মাধ্যাকর্ষণতত্ত্ব পড়তে গিয়ে নিজেই মাধ্যাকর্ষিত হয়ে কল্পনায় উড়তে লাগল। শেষ পিরিয়ডে আছে বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয়। মতিন স্যার ক্লাসে ঢুকলেন। সবার প্রিয় শিক্ষক তিনি।
ঢুকেই দিপুকে উদ্দেশ্য করে বললেন, তুমি কি আজ নতুন এসেছ?
দিপু জবাব দিল, জি স্যার।
মনোযোগ সহকারে পড়াশোনা করবে।
মতিন স্যারের সুন্দর করে কথা বলা দেখে এবার প্রশ্ন করার সাহস পেল দিপু। সে বলল, স্যার একটা প্রশ্ন করতে পারি?
মতিন স্যার বললেন, কী প্রশ্ন?
দিপু বলল, আচ্ছা স্যার, এই স্কুলের নামটা কমান্ডার আবদুল হামিদ উচ্চবিদ্যালয় হলো কীভাবে?
স্যার বললেন, খুব ভালো প্রশ্ন করেছ। এই স্কুলের নাম কীভাবে হলো তা সবার জানা জরুরি। তোমরা তো মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে বইয়ে পড়েছ। তাহলে শোনো সবাই এই স্কুলের নামের ইতিহাস।
১৯৭১ সালে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী আমাদের ওপর অস্ত্র, গোলাবারুদ নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ল। ২৫ মার্চ রাতেই হাজার হাজার ঘুমন্ত মানুষকে হত্যা করল তারা। শুরু হয়ে গেল মুক্তিযুদ্ধ। শুধু কী শহরে! শহরের পাশাপাশি দেশের আনাচে-কানাচে সবখানে।
তখন মে মাস। কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা ভারতের আগরতলা থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে আমাদের এই স্কুলে এলেন। তখন এটা স্কুল ছিল না। ছোট একটা ঘর ছিল। চারদিকে ঝোপঝাড়। অনেকেরই জানা ছিল না যে এখানে একটা ঘর আছে।
সেই সুযোগটাই কাজে লাগিয়েছিলেন মুক্তিযোদ্ধারা। ছোট ঘরে সবাই থাকতে শুরু করল। মুক্তিযোদ্ধাদের দলনেতা আবদুল হামিদ। কমান্ডার আবদুল হামিদ। যেমন তার বুদ্ধি, তেমন তার অস্ত্র চালানোর দক্ষতা। এখান থেকেই কমান্ডার আবদুল হামিদের দল প্রথম মিশনে অংশ নিলেন। তিনজন রাজাকার ও দশজন মিলিটারিকে শেষ করে দিলেন সোনাতলায়। এরপর একেক করে হাটখোলারগাঁও, বিজয়পুর, নবীনগরসহও আরও কয়েকটি গ্রামে মুক্তিযোদ্ধারা মিশন চালিয়ে পাকিস্তানিদের পরাজিত করলেন। এভাবে কেটে গেল অনেকদিন।
তখন ডিসেম্বর। মুক্তিযুদ্ধের শেষের দিকের কথা। এখান থেকে আড়াই মাইল দূরের তিনপাড়া গ্রামে পাকিস্তানি সেনারা ঘাঁটি গেড়েছে। এই খবর শুনে কমান্ডার আবদুল হামিদ তার সহযোদ্ধাদের তৈরি হতে বললেন। পরের দিন হামলা করা হলো। দীর্ঘ সময় গোলাগুলির পর একপর্যায়ে অনেক সেনা মারা গেল। এ সময় হঠাৎ একটা গুলি এসে কমান্ডার আবদুল হামিদের বুকে লাগল। সঙ্গে সঙ্গে তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়লেন। কমান্ডার আবদুল হামিদের রক্তে সবুজ ঘাস লাল হয়ে গেল। মুখে হাসি নিয়ে তিনি মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়লেন। দেশ স্বাধীন হলো। তার বছর দুয়েক পর সেই ঘরে চালু হলো প্রাথমিক স্কুল। বীর মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার আবদুল হামিদের স্মরণে স্কুলটির নাম রাখা হলো কমান্ডার আবদুল হামিদ প্রাথমিক বিদ্যালয়। ধীরে ধীরে এটি উচ্চবিদ্যালয়ে পরিণত হলো।
মতিন স্যারের গলায় আবেগ, চোখে পানি। ক্লাসের সবার চোখ ভিজে উঠছে।
দিপু বলল, এসব কথা আপনি কীভাবে জানলেন স্যার?
স্যার বললেন, কারণ আমার বাবা ছিলেন আবদুল হামিদের দলের একজন। বাবাই আমাকে মহান কমান্ডার আবদুল হামিদের গল্প শুনিয়েছেন।
দিপু বলল, স্যার আপনার বাবা একজন মুক্তিযোদ্ধা! তিনি আমাদের গর্ব এবং অহংকার।
স্যার বললেন, তোমাদের সবাইকে মুক্তিযুদ্ধের কথা জানতে হবে। মুক্তিযোদ্ধাদের গল্প জানতে হবে।
স্যারের কথা শেষ হতেই ছুটির ঘণ্টা বেজে উঠল। হঠাৎ কী হলো কে জানে! ষষ্ঠ শ্রেণির সবাই লাইন ধরে ক্লাস থেকে বের হয়ে জাতীয় পতাকার সামনে গিয়ে স্যালুট করল। তাদের দেখাদেখি পুরো স্কুলের ছাত্রছাত্রী, শিক্ষক ও শিক্ষিকা জাতীয় পতাকাকে স্যালুট করল। লাল সবুজের পতাকা তখন আকাশে পতপত করে উড়ছে।