দ্রুত ব্রেক কষে বাসটা থেমে গেল। শোনা যাচ্ছে একজন মানুষের চিৎকারের শব্দ। সবাই হুড়মুড় করে বাস থেকে নামে। রাইসাও নামে মাকে সঙ্গে নিয়ে। নেমে দেখে বাসের পেছনের চাকার সামনে পড়ে আছে একজন বৃদ্ধা। তার পা বেয়ে রক্ত ঝরছে। রাইসা বৃদ্ধার সামনে গিয়ে বসে। বাস থেকে আর যারা নেমেছিল, তাদের কারও কারও কাছে এটা উটকো ঝামেলা মনে হয়। তারা হাঁটা ধরে সামনের পথে। কেউ কেউ বাসে উঠে চালককে বকতে শুরু করে, কেন সাবধানে গাড়ি চালায়নি সে। তারপর যে যার মতো চলে যায়। রাইসাকে মা বলেন, ‘চলো আমরাও যাই।’
রাইসা মাথা নেড়ে বলল, ‘না, মা। আমরা একা যাব না। চলো উনাকে নিয়ে যাই।’
রাইসার কথা শুনে মা অবাক হয়ে বললেন, ‘কোথায় নিয়ে যাব উনাকে? তা ছাড়া আমরা তো তাকে চিনিও না!’
‘উনাকে এখন হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে। উনার চিকিৎসার প্রয়োজন। আর এজন্য চেনার দরকার নেই মা।’ রাইসা বলল।
রাইসার মা শাড়ির আঁচল ছিঁড়ে বৃদ্ধার পায়ে বাঁধেন। তাতে কিছুটা রক্ত পড়া বন্ধ হয়। বৃদ্ধাকে জিজ্ঞেস করেন, ‘আপনার সঙ্গে কেউ নেই?’
বৃদ্ধা কাঁদো কাঁদো গলায় বলেন, ‘না রে মা, আমার সঙ্গে কেউ নাই।’
রাইসা এবং তার মা বৃদ্ধাকে টেনে সিএনজিচালিত অটোরিকশায় বসায়। তারাও পাশে বসে। তারপর কাছের একটি হাসপাতালে নিয়ে যায়। সেখানে বৃদ্ধার প্রাথমিক চিকিৎসা হয়। সবশেষে রাইসার মা বলেন, ‘চলো এবার আমাদের কাজে যাই, রাইসা।’
রাইসা বলে, ‘এখন এটাই আমাদের কাজ মা। তুমি এই নানুটার কাছ থেকে তার বাড়ির কারও ফোন নাম্বার নিয়ে ফোন করো। বলো উনি দুর্ঘটনায় আহত হয়েছেন। এখনই যেন কেউ হাসপাতালে আসে।’
এই বলে রাইসা বৃদ্ধর চুলে হাত বুলাতে থাকে। সাদা চুলে হাত বুলাতে রাইসার ভীষণ ভালো লাগছে। এর মধ্যেই রাইসার মা বৃদ্ধার থেকে তার ছেলের ফোন নাম্বার নিলেন। ছেলেকে ফোন করে পুরো ঘটনা খুলে বললেন। সব শুনে অল্প সময়ের মধ্যে বৃদ্ধার ছেলে এসে হাজির। ছেলের কাছে বৃদ্ধাকে বুঝিয়ে দিয়ে রাইসার মা তাদের থেকে বিদায় নিলেন। রাইসাকে বললেন, ‘এবার চলো আমরা আমাদের কাজে যাই।’
রাইসা হেসে বলে, ‘চলো।’
রাইসা এবং তার মা কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশনের উদ্দেশে বেরিয়েছিলেন। সামনের সপ্তাহে মায়াপুর রাইসার নানা বাড়িতে বেড়াতে যাবেন। সে জন্য ট্রেনের টিকিট কাটতে হবে। বাংলামোটরের কাছে এসে এই ঘটনা। ফের স্টেশনের উদ্দেশে রওনা হয়ে ভাবছেন, কেন তিনি বুড়ো মানুষটাকে আর সবার মতো একা ফেলে সেখান থেকে পালাতে চেয়েছিলেন? কেন তিনি রাইসার মতো সাহস করে বিপদগ্রস্ত বৃদ্ধার পাশে দাঁড়াতে পারলেন না? তার থেকেও যে ভাবনাটা বেশি নাড়া দিল সেটা হলো- রাইসা কেমন করে পারল এমন একটি সাহসী সিদ্ধান্ত নিতে! এতটুকু বয়সের মেয়েটার মনে এত মায়া কোত্থেকে জন্ম নিল? ভাবতে ভাবতে তারা স্টেশনে এসে পৌঁছালেন। টিকিট কাউন্টারের সামনে দাঁড়িয়ে কী ভেবে মা বললেন, ‘রাইসা, এবারের মতো মায়াপুর ভ্রমণটা যদি বাতিল করি তোমার মন খারাপ হবে?’
রাইসা বলল, ‘না, মা। এবার বেড়াতে না গেলেই বরং আমার খুশি লাগবে।’
মা জিজ্ঞেস করলেন, ‘খুশি লাগবে কেন?’
রাইসা মায়ের কথার উত্তর না দিয়ে বলল, ‘মামাকে একটা ফোন করো।’
‘কোন মামাকে!’ অবাক হয়ে জানতে চাইলেন রাইসার মা।
রাইসা বলল, ‘যে নানুটা বাসের চাকার নিচে পড়ে ব্যথা পেলেন তার ছেলেকে।’
‘ফোন করে কী বলব?’
‘বলবে তিনি এখন কেমন আছেন, কোথায় আছেন?’
‘বেশ।’ এই বলে রাইসার মা বৃদ্ধার ছেলেকে ফোন করলেন। জানতে পারলেন তারা এখন পঙ্গু হাসপাতালে আছেন। বৃদ্ধার পায়ে ১০টি সেলাই লেগেছে। ছেলেটি আরও জানালো, তার মা নাকি খুব করে রাইসাকে দেখতে চাইছেন।
স্টেশন থেকে তারা ফের হাসপাতালে গেলেন। এসে দেখেন, বুড়ো মানুষটা ঘুমাচ্ছে। রাইসার তার শিয়রে বসে বৃদ্ধার কপালে হাত রাখতেই তিনি চোখ মেলে তাকান। রাইসাকে দেখে তার দুচোখ বেয়ে পানি পড়তে থাকে। বহু কষ্টে নিজের হাতখানা রাইসার মাথায় রেখে বলেন, ‘আমার মাথায় যতগুলা চুল আছে, প্রভু তোমাকে তত বছর বাঁচাইয়া রাখুক।’
পাশে বসে মেয়ের মায়ায় ভরা মুখটায় তাকিয়ে রাইসার মা ভাবছেন, এতক্ষণ যা ঘটল এও এক ভ্রমণ, বিনা টিকিটে আরেক মায়াপুর ভ্রমণ।