শ্রাবণ মাস। আকাশে-মাঠে শুধু মেঘ, জমিনে কাদা আর কাজের ব্যস্ততা। মাঠজুড়ে সবুজ পাটগাছ মাথা দুলিয়ে হাওয়ার সঙ্গে খেলা করে। কিন্তু রিফাত জানে, এ খেলা নয়—এ যে তার বাবার ঘামে ভেজা ফসল।
পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ে রিফাত। ছোট হলেও মাঝে মধ্যে বাবার সঙ্গে মাঠে যায়। জমি চাষের সময় কিংবা আগাছা নিড়ানোর দিন বাবাকে সাহায্য করে। পাট একটু বড় হলে খেতে দিতে হয় সার। সেই সময় খেতে গরমে যেন আগুন ঝরে! রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে যখন পাট কাটার সময় আসে, তখন বাবা আর গ্রামের অন্য কৃষকরা যেন যুদ্ধ করেন। কাঁধে পাটের বোঝা তুলে নিয়ে যান নদীর ধারে। কাদামাখা পানিতে জাগ দিতে হয় পাট—আর তার কয়েক সপ্তাহ পর পচা পানিতে নেমে আঁশ ছাড়াতে হয়।
তারপর সেই আঁশ উঠানে শুকানো, নাড়ানো, পাহারা দেওয়া—কারণ হঠাৎ বৃষ্টি নামলে সব পরিশ্রম বিফলে যেতে পারে। রিফাত দেখেছে, বাবা কত কষ্ট করেন। আর তাই সে চেষ্টা করে পাশে থাকতে। সাহায্য করতে।
এতসব কষ্টের পর আসে হাটে যাওয়ার দিন। পাট বিক্রি হয় ভালো দামে। বাবা খুশি। আর খুশি হয়ে বাজার থেকে কিনে ফেলেন মায়ের জন্য লাল রঙের শাড়ি। দাদির জন্য রঙিন প্রিন্টের একখানা নতুন জায়নামাজ। দোকানে ইলিশ মাছ দেখে একটা কিনে ফেলেন। রিফাতের মন ভরে ওঠে আনন্দে।
বাজার শেষে বাবা তাকে হাটের এক দোকানে খাওয়ানোর জন্য নিয়ে গেলেন। পাপড়, শিঙাড়া আর চটপটি—রিফাত জীবনে কখনো এত মজা করে খাননি! তার মনে হলো, এ যেন পুরস্কার...বাবার কষ্টের পুরস্কার!
সন্ধ্যায় তারা বাড়ি ফিরে এল। চাঁদের আলো ছড়িয়ে পড়েছে উঠানজুড়ে। বাতাসে ভাসছে ভাদ্র মাসের ভেজা ঘ্রাণ আর সেই সঙ্গে ইলিশ মাছের ম-ম গন্ধ। মা রান্নাঘরে ইলিশ রাঁধছেন। বাবা চুপচাপ চুলার পাশে বসে আছেন, রান্নার ধোঁয়ার মধ্যেও তার চোখে প্রশান্তি।
রিফাত উঠানে মাদুরে শুয়ে দাদির কোলে। দাদি তার ছোটবেলার গল্প বলছেন। রিফাত চোখ বন্ধ করে শুনছে আর ইলিশের গন্ধে মনটা ভরে যাচ্ছে।
এই তো গ্রামবাংলার জীবন। পাটের আঁশে বাঁধা এক কঠিন সংগ্রাম, আর সেই সংগ্রামের শেষে একটুখানি আনন্দ—একটুখানি জ্যোৎস্না রাত, একটুখানি ইলিশের গন্ধ।