রাজধানীর রূপনগর থানাধীন শিয়ালবাড়ীতে পোশাক ও রাসায়নিক কারখানায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ১৬ জনের প্রাণহানি ঘটেছে। এ ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় সংস্থাগুলোর গাফিলতি ভবন মালিক কিংবা ব্যবসায়ী কেউই এ প্রাণহানির দায় এড়াতে পারেন না। শিয়ালবাড়ীর বাতাসে পোড়া গন্ধ এখনো বিরাজমান। এরই মধ্যে চট্টগ্রামের সিইপিজেডে পোশাক কারখানায় ভয়াবহ আগুনের ঘটনা ঘটেছে। যা রীতিমতো শঙ্কার বিষয়। রাজধানীসহ সারা দেশের অনেক আবাসিক এলাকায় এখন গড়ে উঠেছে ঝুঁকিপূর্ণ রাসায়নিকের গুদাম। এ যেন এক মৃত্যুফাঁদ। এ পর্যন্ত রাসায়নিকের গুদামে আগুন লেগে গত ১৪ থেকে ১৫ বছরে বহু মানুষের মৃত্যু হয়েছে। আহতও হয়েছে অনেকে। প্রতিবার আগুন লাগার পর আবাসিক এলাকায় কেন রাসায়নিকের গুদাম তা নিয়ে আলোচনা-সমালোচনার ঝড় ওঠে। সরকার চাপে পড়ে এসব গুদাম সরানোর উদ্যোগ নেয়। কিন্তু সেই উদ্যোগ আর বাস্তবায়ন হয় না। অনুসন্ধানে জানা যায়, রাসায়নিকের ব্যবসার সঙ্গে জড়িতদের বেশির ভাগই প্রভাবশালী। এরা বিগত দিনে সরকারের ঊর্ধ্বতন পর্যায়ে বিভিন্ন ধরনের অনৈতিক লেনদেন করে রাসায়নিকের গুদাম সরানোর প্রক্রিয়া থামিয়ে রাখেন। সবচেয়ে বেশি রাসায়নিকের গুদাম পুরান ঢাকায়। এ ছাড়া তেজগাঁও এবং মিরপুরের বিভিন্ন আবাসিক এলাকায় গড়ে তোলা হয়েছে এ ধরনের গুদাম। এ ধরনের গুদামে ফসফেট, ক্লোরিন, ব্লিচিং পাউডারসহ বিভিন্ন রাসায়নিক ও দাহ্য পদার্থ মজুত করা হয়। রাজধানীতে আগে যেসব অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছিল, সেখানে গঠিত তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন অনুযায়ী আবাসিক এলাকা থেকে রাসায়নিকের গুদাম সরানোর সুস্পষ্ট সুপারিশ ছিল। আমরা লক্ষ্য করেছি, বাংলাদেশে রাসায়নিক দ্রব্য পরিবহন ও গুদামজাতকরণের ক্ষেত্রে যুগোপযোগী কোনো আইন বা বিধিমালা নেই। এ ক্ষেত্রে সরকারি সংস্থাগুলোও নিষ্ক্রিয় দর্শকের ভূমিকা পালন করে। এ ছাড়া রাজনৈতিক তদবির বা প্রভাবশালীদের দাপট তো রয়েছেই।
গত ১৪ অক্টোবর রাজধানীর মিরপুরের গার্মেন্টস কারখানা ও কেমিক্যাল গোডাউনে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় ১৬ জন নিহত হলেও এ সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। ১৬ বছর আগে নিমতলীতে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে পুড়ে মৃত্যু হয় ১২৪ জনের। ২০১৯ সালের ২০ ফেব্রুয়ারিতে ঢাকার চকবাজারের চুড়িহাট্টার আগুনে পুড়ে ৭১ জনের মৃত্যু হয়। এরপর পুরান ঢাকা থেকে সব রাসায়নিক গুদাম অস্থায়ী ভিত্তিতে সরিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ নেয় শিল্প মন্ত্রণালয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জনবসতির মধ্যে রাসায়নিকের গুদাম থাকায় ঝুঁকিতে আছে সাধারণ মানুষ। এ ছাড়া বিভিন্ন সময়ে স্থপতি ও নগরবিদরা অভিযোগ করে বলেছেন, নগরীতে আইন-কানুন, নিয়ম, বিধি-বিধান থাকা সত্ত্বেও এর বাস্তবায়নে কর্তৃপক্ষীয় তদারকিতে অবজ্ঞা, অবহেলা ও ব্যাপক দুর্নীতি রয়েছে। তাছাড়া জবাবদিহি না থাকার কারণে এ কার্যক্রমের লাগাতার পুনরাবৃত্তি ঘটছে। এ দাহ্য বস্তুর বিপণন, মজুত ও ব্যবসাকে নিয়ন্ত্রিত করার জন্য একাধিক প্রতিষ্ঠান আছে। কিন্তু দিনে দিনে অবৈধ রাসায়নিকের গোডাউন ছড়িয়ে পুরো শহরটাকে টাইম বোমা বানানো হয়েছে।
শিল্প সচিব মো. ওবায়দুর রহমান খবরের কাগজকে বলেন, আগে ঝুঁকিপূর্ণ রাসায়নিকের গুদাম কেন সরানো হয়নি তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তবে এবারে আবাসিক এলাকা থেকে রাসায়নিকের গুদাম সরাতে সরকার কঠোর অবস্থানে। শিল্প মন্ত্রণালয় থেকে রাসায়নিকের গুদাম সরাতে পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। রাজধানীসহ সারা দেশে আবাসিক এলাকার মধ্যে কোথায় রাসায়নিকের গুদাম আছে তার তালিকা করা হচ্ছে। এরপর এসব গুদাম সরকার নির্ধারিত জায়গায় স্থানান্তর করা হবে।
আমরা মনে করি কোনো অবস্থাতেই রাসায়নিকের গুদাম জনবসতির মধ্যে রাখা যাবে না। এ ব্যাপারে সরকারকে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। শ্রম সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদনকে আমলে নিতে হবে। শিয়ালবাড়ীর অগ্নিকাণ্ড ও হতাহতের ঘটনায় যাদের দায় ও গাফিলতি রয়েছে, বিষয়টি তদন্ত করে তাদের সবাইকেই বিচারের আওতায় আনতে হবে। আশা করছি, সরকার অচিরেই শিল্পপার্ক স্থাপনের মাধ্যমে রাসায়নিকের গুদাম সরিয়ে নিতে একটি সমন্বিত টেকসই পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।