মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত আজ অষ্টম দিনে প্রবেশ করেছে। ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের এই ভয়াবহ যুদ্ধ দ্রুত বিস্তৃতি পেয়েছে। ছড়িয়ে পড়েছে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে। যুদ্ধ যত দীর্ঘ হচ্ছে, বিশ্বজুড়ে উদ্বেগ তত বাড়ছে। জ্বালানি তেলের প্রধান উৎস মধ্যপ্রাচ্য। পৃথিবীর অনেক দেশের মতো বাংলাদেশের জ্বালানি ও তরলীকৃত তেল আসে প্রধানত মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ থেকে। বিশ্বের মোট জ্বালানির প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল পরিবহনের পথ হচ্ছে হরমুজ প্রণালি। এই পথকে ঘিরেই এখন উত্তেজনা চলছে। ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী হরমুজ প্রণালিতে চলাচল করা তেলবাহী জাহাজে হামলা করছে। জাহাজের চলাচল নিয়ন্ত্রণ করছে। ইতোমধ্যে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে এর প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। তেলের দাম বেড়ে গেছে। যুদ্ধ দীর্ঘ হলে বাংলাদেশেও এর প্রভাব পড়বে। এই শঙ্কার প্রেক্ষাপটে সরকারের পক্ষ থেকে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি তেলের ব্যবহারে কৃচ্ছ্রসাধনের নির্দেশনা এসেছে। স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী কৃচ্ছ্রসাধনের দৃষ্টান্ত স্থাপন করে সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত ও সংবিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বশীলদের এই নির্দেশনা মেনে চলতে বলা হয়েছে।
সরকারের জারি করা পরিপত্রে বলা হয়েছে, বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারি দপ্তরগুলোতে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি ব্যবহারে কঠোর সংযম আরোপ করা জরুরি।
অভিজ্ঞতায় দেখা যায়, স্বাভাবিক সময়ে সরকারি অফিসগুলোতে প্রয়োজনের অতিরিক্ত বাতি জ্বলে, শীতাপত নিয়ন্ত্রিত যন্ত্র ব্যবহারেও যথেচ্ছাচার লক্ষ করা যায়। এই অপচয়ের বিরুদ্ধেই এবার সরকারি নির্দেশনা এল। এতে বলা হয়েছে, দিনের বেলায় পর্যাপ্ত প্রাকৃতিক আলো থাকলে বৈদ্যুতিক বাতি ব্যবহার না করে জানালা-দরজা বা ব্লাইন্ড খুলে প্রাকৃতিক আলো ব্যবহার করতে হবে। দপ্তরগুলোতে বিদ্যমান আলোর অর্ধেক ব্যবহার এবং প্রয়োজনের অতিরিক্ত লাইট বন্ধ রাখতে হবে। অপ্রয়োজনীয় লাইট, ফ্যান, এয়ার কন্ডিশনারসহ অন্য বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি চালানো যাবে না। শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত যন্ত্রের তাপমাত্রা ২৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস বা তার বেশি নির্ধারণ করে চালাতে হবে। আলোকসজ্জা পরিহার, সরকারি গাড়ির ব্যবহার সীমিতকরণ এবং জ্বালানি তেল ও গ্যাস ব্যবহারে সর্বোচ্চ মিতব্যয়ী হওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি ব্যবহারে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সাশ্রয়ী ও দায়িত্বশীল হতে নির্দেশ দিয়েছে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ।
শুধু সরকারি নির্দেশ নয়, প্রধানমন্ত্রী তার নিজের দপ্তরের ৫ শতাংশ আলো এবং ৫০ শতাংশ এসির ব্যবহার কমিয়ে দিয়েছেন। এই নির্দেশের প্রতিফলন মন্ত্রিসভার বৈঠক এবং মন্ত্রীদের দপ্তরেও দেখা যাচ্ছে। পর্যায়ক্রমে দেশের সব সরকারি, আধা-সরকারি, বেসরকারি অফিস-আদালত, শপিংমল, বাণিজ্যিক কার্যালয় এবং বাসাবাড়িতে একই ধরনের উদ্যোগ বাস্তবায়নের আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। তার এই আহ্বানের মধ্য দিয়ে জ্বালানি সংকটের আশঙ্কা সম্পর্কে ধারণা করা যায়।
বিশ্ব আজ ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে। সারা পৃথিবী মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে শঙ্কিত। একটা লোকপ্রবাদ আছে–‘রাজায় রাজায় যুদ্ধ হয়, উলুখাগড়ার প্রাণ যায়।’ আমাদের মতো দেশগুলোর এখন হয়েছে সেই অবস্থা। কিন্তু অবস্থা যা-ই হোক, সংকট থেকে উত্তীর্ণ হওয়ার চেষ্টা আমাদের করতেই হবে। সরকারের এই কৃচ্ছ্রসাধনের উদ্যোগকে আমরা স্বাগত জানাই।
এখন রোজার মাস। এই মুহূর্তে সবাই সামর্থ্য অনুসারে কেনাকাটায় ব্যস্ত। ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো রমরমা ব্যবসা করছে। একে স্বাভাবিক বলেই গ্রহণ করা যায়। কিন্তু রাজধানী ঢাকাতেই দেখা যাচ্ছে, বড় শপিং মল বা মার্কেট এলাকাকে ঝলমলে আলোকসজ্জায় সজ্জিত করে ক্রেতাদের কেনাকাটায় আকৃষ্ট করা হচ্ছে। আমরা কেনাকাটার বিরোধী নই, কিন্তু এই অতিরিক্ত আলোকসজ্জার বিরোধী, বিশেষ করে এ বছর। যেহেতু জ্বালানিসংকটের আশঙ্কা রয়েছে। ফলে এবার অন্তত শপিং মল ও মার্কেটগুলোতে আলোকসজ্জা বন্ধ রাখা দরকার। সরকারের পাশাপাশি ব্যবসায়ীরা এ ব্যাপারে উদ্যোগী হলে অপচয়ের পরিবর্তে দেশ জ্বালানির দিক থেকে সাশ্রয়ী হতে পারে। ব্যবসায়ীদের প্রতি আমাদের আহ্বান থাকবে আপনারাও সাশ্রয়ী হোন। একই সঙ্গে যারা বাসাবাড়িতে বাড়তি আলো জ্বালান তারাও নিজ উদ্যোগে সহজেই সাশ্রয়ী হতে পারেন। জাতীয় এই সংকটের মুহূর্তে আমাদের সবারই সম্মিলিতভাবে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সাশ্রয়ের দিকে মনোযোগী হতে হবে। আপাতত এর কোনো বিকল্প নেই। আসুন, আমরা সবাই এ বিষয়ে সচেতন এবং সাশ্রয়ী হই।