পবিত্র ঈদুল ফিতর সামনে রেখে নাড়ির টানে রাজধানী থেকে ঘরমুখো মানুষের যাত্রা শুরু হয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে নানামুখী উদ্যোগ ও প্রস্তুতির কথা বলা হলেও সরেজমিন দেখা যায়, সড়কের সে চিত্র পুরোটাই উল্টো। সড়কপথে যাতায়াতকারীদের প্রধান সমস্যা হলো যানজট ও অতিরিক্ত ভাড়া। যানজটের কারণে গাড়ি অনেক সময় একই স্থানে দাঁড়িয়ে থাকে। এতে গন্তব্য পৌঁছাতে অনেক সময় বেশি লেগে যায়। বাসের মধ্যে বসে থাকতে থাকতে যাত্রীদের নাভিশ্বাস ওঠে। ঈদ মৌসুমে টিকিটের চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় অধিকাংশ পরিবহন বেশি ভাড়া দাবি করে। এ সময় টিকিট পাওয়া যেন সোনার হরিণ পাওয়ার মতো। অনেকে দুর্ভোগ এড়াতে ট্রেনে ভ্রমণ করতে চান। প্রতি বছর ঈদ উপলক্ষে রেলওয়ে অগ্রিম টিকিট বিক্রি করে থাকে। সে টিকিট পেতেও রীতিমতো যুদ্ধ করতে হয়। ট্রেনের টিকিটের ক্ষেত্রে বিশেষ করে অনলাইনে সকাল ৮টায় টিকিট ছাড়লে দুই মিনিটের মধ্যে সব টিকিট শেষ হয়ে যায়। এতে যাত্রীদের চরম ভোগান্তিতে পড়তে হয়। এ অবস্থার জন্য কালোবাজারি বা দায়ী বলে অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগীরা। এসব চক্রকে আইনের আওতায় এনে শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।
রেলপথে গতকাল শুক্রবার থেকে ঘরমুখো মানুষের ঈদযাত্রা শুরু হয়েছে। রাজধানীর মানুষ দেশের বিভিন্ন স্থানে তাদের নিজ নিজ গন্তব্যে ছুটে চলছেন। সড়কপথে কয়েকদিন আগে থেকেই এ যাত্রা চলছে। এদিকে আগামী ১৭ মার্চ থেকে সদরঘাট থেকে বিশেষ লঞ্চ ও স্টিমারে যাত্রীদের ঈদযাত্রা শুরু হবে। এ উপলক্ষে রাজধানীর প্রধান নদীবন্দর সদরঘাটে বেড়েছে লঞ্চ শ্রমিক ও
কুলি-মজুরদের ব্যস্ততা।
অন্যদিকে ঈদযাত্রা নিরাপদ ও নির্বিঘ্ন করতে যাত্রী ও সাধারণ নাগরিকদের জন্য গত বৃহস্পতিবার বেশ কিছু নিরাপত্তা বিষয়ে পরামর্শ দিয়েছে পুলিশ সদর দপ্তর। ঘরমুখো যাত্রীদের জন্য রেলপথ, সড়কপথ ও নৌপথে চলাচলের ব্যাপারে পুলিশের পক্ষ থেকে বিভিন্ন নির্দেশনা দেওয়া হয়। বিজ্ঞপ্তিতে ঘরমুখো যাত্রীদের উদ্দেশে বলা হয়েছে, ভ্রমণকালে নিজের ও পরিবারের সদস্যদের নিরাপত্তার বিষয় বিবেচনায় রাখুন। চালককে দ্রুতগতিতে গাড়ি চালাতে তাগিদ দেবেন না। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে অতিরিক্ত যাত্রী হয়ে বাসের ছাদে কিংবা ট্রাক, পিকআপ ও অন্য পণ্যবাহী যানবাহনে ভ্রমণ করা থেকে বিরত থাকুন। বাসচালকদের উদ্দেশে পুলিশ সদর দপ্তর বলছে, ওভার স্পিডে গাড়ি চালাবেন না। ঝুঁকিপূর্ণ ওভারটেকিং করবেন না। ক্লান্তি, অবসাদ বা অসুস্থ অবস্থায় গাড়ি চালাবেন না। বাসে অতিরিক্ত যাত্রী ওঠাবেন না। আঞ্চলিক সড়ক-মহাসড়কে চলাচলের সময় পুলিশের নির্দেশনা মেনে চলুন। নৌপথের যাত্রীদের প্রতি অনুরোধ জানিয়ে বলা হয়েছে, জীবনের ঝুঁকি নিয়ে অতিরিক্ত যাত্রী হয়ে নৌযানে ওঠাবেন না। ছাদে যাত্রী হয়ে ভ্রমণ করবেন না। দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ায় জীবনের ঝুঁকি নিয়ে নৌযানে ভ্রমণ থেকে বিরত থাকুন। যাত্রাপথে ঝড় দেখা দিলে এদিক-ওদিক ছোটাছুটি না করে নিজের জায়গায় অবস্থান করুন। স্পিডবোটে ভ্রমণের ক্ষেত্রে লাইভ জ্যাকেট পরিধান করুন। ট্রেনযাত্রীদের প্রতি অনুরোধ জানিয়ে বলা হয়েছে, ট্রেনের ছাদে, বাফারে, পাদানিতে ও ইঞ্জিনে ঝুঁকিপূর্ণ ভ্রমণ থেকে বিরত থাকুন। ট্রেনে ভ্রমণের সময় পাথর নিক্ষেপ সম্পর্কে সতর্ক থাকুন। ট্রেনে ভ্রমণকালে মালামাল নিজ দায়িত্বে রাখুন। বিনা টিকিটে ট্রেন ভ্রমণ থেকে বিরত থাকুন।
আসন্ন ঈদযাত্রায় যানজটের ঝুঁকি রয়েছে দেশের বিভিন্ন মহাসড়কের ২০৭টি স্থানে। এর মধ্যে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে আছে ৪৫টি স্থান। সম্প্রতি যানজটের সম্ভাব্য এসব স্থান চিহ্নিত করেছে বাংলাদেশ হাইওয়ে পুলিশ। কিন্তু খবরের কাগজগুলোর সরেজমিন প্রতিবেদনে বলছে, মহাসড়কগুলোর বিভিন্ন স্থানে কোথাও ফুটপাত, দোকানপাট, গাড়ির স্ট্যান্ড, রিকশাস্ট্যান্ড গড়ে তোলা হয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয় ফিটনেসবিহীন যানবাহন বিকল হওয়া এবং অবৈধ পার্কিং। এতে করে রাস্তাগুলো সরু হয়ে যানজট তীব্র হচ্ছে। এ ছাড়া সড়ক নির্মাণকাজ চলমান থাকায় কোথাও ধুলার আস্তরণ পড়ে থাকে। ধুলা নিয়ন্ত্রণে পানি ছিটানোর ফলে তৈরি হয়েছে কাদামাটি। ঈদুল ফিতর সামনে রেখে ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের আশুলিয়া অংশে ভোগান্তির শঙ্কা বাড়ছে। ঢাকা-আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের নির্মাণকাজের কারণে সড়কের অনেক জায়গায় গর্ত তৈরি হয়েছে। দুর্ঘটনার ভয়ে যানবাহন ধীরগতিতে চলাচল করছে। সে জন্য প্রায়ই যানজট সৃষ্টি হচ্ছে। চালক ও যাত্রীরা বলছেন, ঈদে ঘরমুখো মানুষের চাপ বাড়লে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে। সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয়ের তথ্য মতে, দুই তিন দিনে প্রায় দেড় কোটি মানুষ ঢাকা ছাড়বে। এ বিশাল ঘরমুখো মানুষের জন্য সড়কের শৃঙ্খলা ফেরানো জরুরি।
ঈদযাত্রায় ভোগান্তি এড়াতে ও যানজট নিয়ন্ত্রণে সরকারকে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। কর্তৃপক্ষের নির্দেশনাগুলো শুধু সিদ্ধান্তের মধ্যেই সীমাবদ্ধ না রেখে তা কঠোরভাবে বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিতে হবে। অতিরিক্ত ভাড়া আদায়কারীদের বিরুদ্ধে প্রশাসনকে দৃশ্যমান শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে। আশা করছি, সরকার ঘরমুখো মানুষের ঈদযাত্রা সহজ ও পরিবার-পরিজন নিয়ে আনন্দময় করতে সড়কের শৃঙ্খলা রক্ষায় কঠোর নজরদারি বাড়াবে।