দেশের ছয় ভাগের এক ভাগ হলো সাতটি জেলায় বিস্তৃত উত্তর-পূর্বাঞ্চলের হাওরাঞ্চল। এপ্রিলে অতিবৃষ্টির কারণে এসব অঞ্চলে ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। এতে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। চলতি বোরো মৌসুমে ৯ দশমিক ৬৩ লাখ হেক্টর জমিতে ধানের আবাদ করা হয়েছে। শুকানোর অভাবে অনেক ধান পচে নষ্ট হয়েছে। এতে ভারী হচ্ছে কৃষকের কষ্ট। যদিও গত সপ্তাহে সরকার ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তিন মাস সহায়তা দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। জলাবদ্ধতা ও বন্যার কারণে হাওরের সরকারি ধান-চাল সংগ্রহ শুরু হবে ১৫ মে থেকে। টানা বৃষ্টিতে এক সপ্তাহের ব্যবধানে কিশোরগঞ্জের হাওরাঞ্চলে কৃষিশ্রমিকের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। ২ হাজার টাকা মজুরি দিয়েও ধান কাটার শ্রমিক পাওয়া যাচ্ছে না সেখানে। কৃষিবিদ, আবহাওয়াবিদ, পানি বিশেষজ্ঞ এবং জলবায়ুবিশারদরা বলছেন, ফসলের এ ক্ষতির জন্য অকালবৃষ্টি দায়ী। এপ্রিলের শেষে অতিবর্ষণ, উজানের ঢল, পাহাড়ি নদীগুলো উপচে পড়ায় প্লাবিত হয়েছে হাওরের বিস্তীর্ণ এলাকার ফসল। অনেক কৃষক ধান কাটার সময় পাননি। কৃষকের জন্য এটা সীমাহীন ক্ষতি। শুধু ধানই নয়, বিভিন্ন স্থানে তরমুজ, মুগডাল, বাদাম, সূর্যমুখীসহ নানা ফসলের ক্ষতি হয়েছে। হাওরাঞ্চলে বজ্রপাত ও দুর্যোগ পরিস্থিতি নতুন চাপ তৈরি করেছে। কৃষক পরিবারগুলো আরও উদ্বেগে রয়েছে। অব্যাহত প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে ফসল ঘরে তোলা তাদের জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে।
এদিকে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মাঠপর্যায়ের তথ্য ও কেন্দ্রের তথ্যের মধ্যে যথেষ্ট গরমিল লক্ষ করা গেছে। বেসরকারি সংস্থার তথ্যের সঙ্গেও সরকারি তথ্যের মিল নেই। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ক্ষয়ক্ষতির হিসাবের ভিত্তিতে ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তা ও পুনর্বাসনের কার্যক্রম হাতে নেওয়া হয়। সরকারি হিসাবে গরমিল থাকলে সমস্যা সৃষ্টি হতে পারে। সংশ্লিষ্ট অন্য মন্ত্রণালয় এবং বেসরকারি সংস্থার মাধ্যমে নির্ভুল চূড়ান্ত হিসাব তৈরি করা প্রয়োজন। এতে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার ও সম্পদের বিবরণও থাকতে পারে।
ভারী বর্ষণ ও উজানের ঢলে বিস্তীর্ণ ফসলের মাঠ তলিয়ে যাওয়ায় সুনামগঞ্জের হাওরে হাজার কোটি টাকার ফসলের ক্ষতি ও হবিগঞ্জের অনেক কৃষক সব হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়েছেন। শ্রমিকসংকটের কারণে অনেক কৃষক সময়মতো ধান কাটতে পারছেন না। ফলে ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়ছে। একদিকে উৎপাদন খরচ বেড়েছে, অন্যদিকে বিক্রয়মূল্য কমে যাওয়ায় লোকসানে পড়তে হচ্ছে। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর বলছে, বিভিন্ন জেলায় কয়েক হাজার হেক্টর জমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং হাজার হাজার কৃষক ক্ষতির মুখে পড়েছেন। রোদ না থাকায় ধানে চারা গজাচ্ছে। ফলে চালের গুণগত মান নষ্ট হচ্ছে। এ অবস্থায় কৃষকের ঋণ, শ্রম ও ভবিষ্যৎ জীবিকার ওপর বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে।
সরকারের পক্ষ থেকে ধান কেনার যে শর্ত দেওয়া হয়েছে তা অনেক ক্ষেত্রে কৃষকের জন্য বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। সরকারি নিয়ম অনুযায়ী, একজন কৃষক সর্বোচ্চ ৭৫ মণ পর্যন্ত ধান বিক্রি করতে পারবেন এবং পুরো অর্থ দেওয়া হবে ব্যাংকিংব্যবস্থার মাধ্যমে। তবে চলতি মৌসুমে হাওরের বাস্তবতায় এ মানদণ্ড পূরণ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। এ পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে স্থানীয় ফড়িয়া ও দাদন ব্যবসায়ীরা কৃষকদের কাছ থেকে ভেজা বা অঙ্কুরিত ধানের অজুহাতে স্বল্পমূল্যে ধান কিনে নিচ্ছেন। অনেক কৃষক ঋণ নেওয়ায় বাধ্য হয়ে কম দামে ধান বিক্রি করছেন। এ পরিস্থিতিতে সরকারকে মাঠপর্যায়ে নজরদারি বাড়াতে হবে। প্রকৃত কৃষকরা যাতে সরাসরি ধান বিক্রি করতে পারেন, অর্থাৎ ধান-চাল সংগ্রহের সরকারি নীতিমালা সহজ করতে হবে। আশা করছি, হাওরবাসীর হাহাকার অবস্থা থেকে স্বস্তি দিতে এবং তাদের নানামুখী সংকট নিরসনে সরকার সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণ করবে।