বিএনপি সরকারের বয়স দুই মাস পূর্ণ হয়েছে। সরকার গঠনের পরই প্রথম ধাক্কাটা আসে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ থেকে। এতে অর্থনীতিতে নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে তীব্র জ্বালানিসংকট, করের লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত না হওয়া, ব্যাংক থেকে ঋণ গ্রহণ এবং বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের মতো বড় চার চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হচ্ছে সরকারকে। যা নতুন সরকারের জন্য অত্যন্ত কঠিন চাপ বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের কারণে জ্বালানিসংকট তৈরি হয়েছে, যা ইতোমধ্যে তীব্র আকার ধারণ করেছে। পাশাপাশি দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অবস্থা বিশেষ করে ‘জাতীয় জুলাই সনদ’ বাস্তবায়ন এবং সাম্প্রতিক ‘মব সন্ত্রাস’-এর মতো ঘটনাগুলো সরকারকে চাপে ফেলেছে। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী সংসদে এবং সংসদের বাইরে সরকারকে চাপে ফেলতে চেষ্টা করছে। তারা রাজপথে আন্দোলন-সংগ্রাম গড়ে তোলার হুমকি দিচ্ছে। তবে সরকার সব চ্যালেঞ্জ ও চাপ মোকাবিলা করে সামনে এগিয়ে যাওয়ার প্রত্যয়ে অবিচল রয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, বাংলাদেশের স্বার্থবিরোধী চক্র কিন্তু এখনো সুযোগের অপেক্ষায় রয়েছে। দেশের স্বার্থে আমাদের সবার সতর্ক থাকা জরুরি। নতুন রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তুলতে মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের পাশাপাশি এমপিদের সর্বোচ্চ মনিটরিংয়ের মধ্যে রেখেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সরকারের মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের ব্যক্তিগত কর্মকাণ্ডের সর্বোচ্চ স্বচ্ছতা বজায় রাখার জন্য নির্দেশনা দিয়েছেন তিনি। এসবের মধ্যদিয়ে বিএনপি সরকার তদবির, অনিয়ম আর দুর্নীতির বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির বাস্তবায়ন শুরু করেছে বলেও মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। ইতোমধ্যে ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ডসহ নির্বাচনি নানা প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন শুরু করেছে সরকার। মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ পরিস্থিতিতে জ্বালানি তেল নিয়ে অস্থিরতা তৈরির মাধ্যমে সরকারের ওপর এক ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে। সরকার বিভিন্নভাবে জ্বালানি সংগ্রহের চেষ্টা করছে। এরই মধ্যে নতুনভাবে দেশে জ্বালানি আনা হয়েছে। এসব জ্বালানি সরবরাহ সাময়িক সময়ের জন্য স্বাভাবিক রাখলেও দীর্ঘদিন যুদ্ধ চলতে থাকলে পরিস্থিতি সামলানো সরকারের জন্য কঠিন হবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে সাধারণ মানুষের জন্য নতুনভাবে চাপ সৃষ্টি হবে।
তথ্য মতে, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের রাজস্ব আদায়ের ঘাটতি ৭০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে এ ঘাটতি আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। অথচ উন্নয়ন ব্যয়, সামাজিক সুরক্ষা, ঋণ পরিশোধ ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার ইত্যাদি ক্ষেত্রে সরকারি তহবিলের চাহিদা অনেক। দুর্বল রাজস্ব আহরণ ও উচ্চ সরকারি দায়দেনার কারণে সরকারের আর্থিক পরিসর সংকুচিত হয়েছে। বাংলাদেশের কর আহরণের সক্ষমতা সাম্প্রতিক বছরগুলোর তুলনায় সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে। কর-জিডিপি অনুপাত বর্তমানে গড়ে ৭ শতাংশ। এটি রাজস্ব ব্যবস্থার গভীর কাঠামোগত দুর্বলতার বহি:প্রকাশ। চলতি বছরে সরকারের ব্যাংক ঋণ লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়েছে। একসময় সরকার সঞ্চয়পত্র বিক্রি করে সবচেয়ে বেশি ঋণ নিত। কিন্তু সঞ্চয়পত্রের মুনাফার হার কমে যাওয়ায় বিনিয়োগের ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের আগ্রহ কমেছে। এ কারণে সঞ্চয়পত্র বিক্রি করে খুব বেশি ঋণ নিতে পারছে না সরকার। বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে এ চ্যালেঞ্জ কাটিয়ে ওঠা অত্যন্ত কঠিন হবে। আগামী বছরগুলোতে ব্যয়ের চাপ আরও তীব্র হবে। এ বিষয়গুলো মাথায় রেখে সরকারকে সামনের দিকে এগোতে হবে।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)-এর সম্মাননীয় ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান খবরের কাগজকে বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে প্রবাসী আয় কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে সামষ্টিক অর্থনীতিতে বড় ধরনের ধাক্কা লাগতে পারে। এর মধ্যে বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের চাপ সরকারের জন্য বড় ধরনের বোঝা। এ ঋণ চাপের পেছনে বড় কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে বিভিন্ন মেগা প্রকল্পে বৈদেশিক ঋণের ব্যবহার। যা সামগ্রিকভাবে চাপ বাড়াচ্ছে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। বিশেষ করে রপ্তানি বহুমুখীকরণ, দক্ষ জনশক্তি তৈরি, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ গঠন এবং রাজস্ব আহরণ বাড়ানো- এ চারটি খাতে দ্রুত উন্নতি করা প্রয়োজন।
অর্থ ব্যবস্থাপনার চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সরকারকে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। দেশের ভঙ্গুর অর্থনীতিতে বিভিন্ন ধরনের ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। এ অবস্থায় দেশের মূল্যস্ফীতির ওপর নতুন চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। সরকার এ ক্ষেত্রে অর্থনীতিবিদ ও বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ ও দিকনির্দেশনা কাজে লাগাতে পারে। আশা করছি, সরকার আপৎকালীন সংকট উত্তরণে সমন্বিত পরিকল্পনা ও বাস্তবমুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করতে সক্ষম হবে।