সারা দেশে তীব্র লোডশেডিং ইতোমধ্যে জনজীবনে ভয়াবহ প্রভাব ফেলেছে। জেলা শহরগুলোয় বিদ্যুৎ সরবরাহ চাহিদার অর্ধেকেরও নিচে নেমে এসেছে। এমনিতেই গরমের তীব্রতার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে বিদ্যুতের চাহিদা। কিন্তু উৎপাদন ঘাটতির কারণে সেই চাহিদা পূরণ করা যাচ্ছে না। ফলে দেশে বর্তমানে প্রায় ২ হাজার মেগাওয়াট পর্যন্ত লোডশেডিং হচ্ছে। শহরের তুলনায় গ্রামাঞ্চলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ। তীব্র গরমের মধ্যে বিদ্যুৎ না থাকায় সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ চরমে পৌঁছেছে। শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা ব্যাহত হচ্ছে, অফিস আদালতের কার্যক্রমেও বিঘ্ন ঘটছে। একইসঙ্গে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও কৃষিজীবীরা পড়েছেন চরম দুশ্চিন্তায়। বিদ্যুৎ নির্ভর ছোট ও মাঝারি শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো স্বাভাবিকভাবে উৎপাদন করতে পারছে না। অনেক জায়গায় বিদ্যুৎ না থাকায় কলকারখানা বন্ধ রাখতে হচ্ছে, ফলে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে এবং আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন ব্যবসায়ীরা। অন্যদিকে কৃষি খাতে সেচ কার্যক্রমে বিঘ্ন ঘটায় ফসল উৎপাদনেও শঙ্কা দেখা দিয়েছে। পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক না হলে এই সংকট দীর্ঘমেয়াদে আরও গভীর প্রভাব ফেলতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা আশঙ্কা করছেন।
বর্তমান বিদ্যুতের দাম বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের প্রকৃত উৎপাদন খরচের তুলনায় অনেক কম। যার ফলে সৃষ্ট বিশাল ঘাটতি মেটাতে হচ্ছে সরকারি ভর্তুকি দিয়ে। বৈশ্বিক যুদ্ধের প্রভাবে জ্বালানি সংকটের ভর্তুকির বোঝাও অনিয়ন্ত্রিত হয়ে পড়েছে। এমন কারণ দেখিয়ে পাইকারি ও খুচরা বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে সরকার। এপ্রিলের শুরুতে বিদ্যুৎ বিভাগের পেশ করা একটি প্রস্তাব এখন মন্ত্রিসভার অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে, যেখানে পাইকারি বিদ্যুতের দাম বর্তমানের প্রতি ইউনিট ৭ টাকা ৪ পয়সা থেকে সর্বোচ্চ ১ টাকা ২০ পয়সা বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়েছে। ইতোমধ্যে গত বৃহস্পতিবার বিকেলে বিদ্যুৎ ঘাটতি বেড়ে ১ হাজার ৯০০ মেগাওয়াটে ঠেকেছে, যা গত সপ্তাহের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ। প্রস্তাবিত রূপরেখা অনুযায়ী, পাইকারি দাম প্রতি ইউনিটের ৫০ পয়সা বাড়ালে ভর্তুকি কমবে ৫ হাজার কোটি টাকা, এক টাকা বাড়ালে কমবে ১০ হাজার কোটি টাকা এবং ১ টাকা ২০ পয়সা বাড়ালে ভর্তুকি কমবে ১২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা।
পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশ (পিজিসিবি) এবং বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) তথ্যানুযায়ী, দেশে বর্তমানে ১৩৬টি বিদ্যুৎকেন্দ্র রয়েছে। এর মধ্যে জ্বালানি সংকট ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে বর্তমানে ৩৩টি কেন্দ্রে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। সচল থাকা বাকিগুলোর উৎপাদন সক্ষমতা ২৮ হাজার ৯১৯ মেগাওয়াট হলেও বাস্তবে উৎপাদিত হচ্ছে মাত্র ১২ থেকে ১৪ হাজার মেগাওয়াট। অর্থাৎ অর্ধেকের বেশি সক্ষমতা ব্যবহার করা যাচ্ছে না, যার প্রধান কারণ জ্বালানি সংকট। পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির তথ্য অনুযায়ী, অনেক এলাকায় ৩০ থেকে ৪৬ শতাংশ পর্যন্ত লোডশেডিং করা হচ্ছে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এপ্রিল থেকে জুন এই সময়ে দেশে তাপমাত্রা বৃদ্ধির সঙ্গে বিদ্যুতের চাহিদাও বেড়ে যায়। তবে এবার বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের কারণে পরিস্থিতি স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি খারাপের দিকে যাচ্ছে। তারা আশঙ্কা করছেন, জ্বালানি সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতি না হলে সামনের দিনগুলোতে লোডশেডিং আরও বাড়তে পারে। ঢাকার জ্বালানির চাহিদা দেশের অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় অনেক বেশি, যা একটি বৈষম্য তৈরি করছে। এই বৈষম্য কমাতে পরিকল্পিতভাবে বিদ্যুৎ বণ্টন ও ব্যবস্থাপনা করতে হবে। উন্নয়ন বাজেটের মতো বিদ্যুৎ বরাদ্দেও বৈষম্য রয়েছে, যা দেশের উন্নয়নকে এককেন্দ্রিক করে তুলছে। এই পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসতে হলে তথ্য নির্ভর পরিকল্পনা, জবাবদিহি ও নিয়মিত মনিটরিং নিশ্চিত করতে হবে।
পাইকারি ও গ্রাহক পর্যায়ে বিদ্যুতের মূল্য বৃদ্ধির যে প্রস্তাব বিদ্যুৎ বিভাগ দিয়েছে, তা অভ্যন্তরীণ ও বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে জরুরি হলেও সাধারণ গ্রাহকদের জন্য দুর্ভোগের সৃষ্টি করবে। এমনিতেই নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণি মূল্যস্ফীতির চাপে দিশেহারা। তার ওপর বিদ্যুতের মূল্য বৃদ্ধি হলে গ্রাহকের সামগ্রিক জীবনযাত্রার ওপর চরম নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাই এই পরিস্থিতিতে বিদ্যুতের মূল্য বৃদ্ধির ক্ষেত্রে সরকারকে গ্রাহকদের স্বার্থ বিবেচনায় রাখতে হবে। দেশজুড়ে লোডশেডিংয়ের প্রভাবে জনজীবনে যে ভোগান্তি সৃষ্টি হয়েছে তা কমাতে সরকারকে কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।