দেশে অবৈধ পথে বিদেশ যাওয়া থেমে নেই। বিশেষ করে কক্সবাজার জেলার সীমান্ত উপজেলা টেকনাফে ক্রমেই ভয়ংকর হয়ে উঠছে মানব পাচারকারী চক্রের দৌরাত্ম্য। এ চক্রের সদস্যরা বিভিন্ন উপকূলীয় নৌঘাট ও সংলগ্ন এলাকাকে নিয়মিতভাবে মানব পাচারের কাজে ব্যবহার করছে। বিজিবি, কোস্টগার্ড, নৌবাহিনী, পুলিশ ও র্যাবের অভিযানে ভিকটিম উদ্ধার ও পাচারকারীরা আটক হলেও থেমে নেই এ কার্যক্রম। মানব পাচারকারীদের খপ্পরে পড়ে উপজেলার বহু মানুষ নিঃস্ব হয়েছে। এই চক্রের সদস্যরা রোহিঙ্গা ক্যাম্পসহ দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে তাদের সহযোগীদের মাধ্যমে রোহিঙ্গা এবং স্কুলপড়ুয়া বাংলাদেশি তরুণদের প্রলোভন দেখিয়ে টেকনাফে নিয়ে আসে। এরপর তাদের পাহাড়ি এলাকায় আটকে রেখে মোটা অঙ্কের মুক্তিপণ আদায় করে। অনেক ক্ষেত্রে টাকা আদায়ের পর ভুক্তভোগীদের সাগরপথে মালয়েশিয়ায় পাচার করা হয়। এভাবে অবৈধ পথে মানববোঝাই ট্রলারডুবির ঘটনা প্রায়ই ঘটে। এতে প্রতিনিয়তই বাড়ছে স্বজনহারা মানুষের আর্তনাদ।
খবরের কাগজের টেকনাফ প্রতিনিধির প্রতিবেদনের তথ্যমতে, উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় নিখোঁজদের পরিবারের সঙ্গে কথা বলে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে। পরিবারগুলোর বরাত দিয়ে জানা যায়, স্থানীয় কিছু প্রভাবশালী অসাধু পাচারকারী তাদের চক্রের সদস্যদের মাধ্যমে নানা প্রলোভন দেখিয়ে লোকজন সংগ্রহ করে এবং অবৈধভাবে সাগরপথে মালয়েশিয়ায় পাচার করে। সেখানে পৌঁছানোর পর ভুক্তভোগীদের কাছ থেকে টাকা আদায়ের জন্য শারীরিক নির্যাতন চালানো হয়। পরিবারগুলোর দাবি, ভয় ও আতঙ্কের কারণে অনেক সময় তারা মুখ খুলতে পারে না। পাচারকারীদের নেটওয়ার্ক অত্যন্ত শক্তিশালী এবং বিভিন্ন এলাকায় তাদের সদস্য ছড়িয়ে রয়েছে। ফলে তাদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলাও কঠিন হয়ে উঠেছে। কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তির ছত্রচ্ছায়ায় এসব সন্ত্রাসী চক্র পাচার, অপহরণ ও জিম্মি-বাণিজ্য চালিয়ে যাচ্ছে। দ্রুত এসব চক্রের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া না হলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করবে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করছেন তারা। আন্দামান দ্বীপপুঞ্জে সাম্প্রতিক নৌকাডুবির ঘটনায় ভিকটিমদের পরিবার, স্থানীয় বাসিন্দা এবং প্রশাসনের একাধিক সূত্রে টেকনাফ উপজেলার কথিত মানব পাচারকারীর নাম উঠে এসেছে। অনেকের বিরুদ্ধে মানব পাচার, অপহরণ, ডাকাতি, মাদকসহ একাধিক মামলা রয়েছে। ট্রলারডুবির ঘটনায় পাচারকারীরা আত্মগোপনে রয়েছে। তাদের ধরতে প্রশাসনের একাধিক টিম মাঠে কাজ করছে।
স্থানীয়দের মতে, মেরিন ড্রাইভ সড়কসংলগ্ন নৌঘাটগুলোকে প্রশাসনের কঠোর নজরদারির আওতায় আনলে মানব পাচার অনেকাংশে কমানো সম্ভব। পাশাপাশি পাচারকারীরা যতই প্রভাবশালী হোক তাদের চিহ্নিত করে আইনের আওতায় এনে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান তারা। অভিযোগ রয়েছে, পাচারকারীদের একটি চক্রে ২০ থেকে ৩০ জন সদস্য সক্রিয়ভাবে কাজ করছে। এদের কেউ কেউ সিএনজিচালিত অটোরিকশার মাধ্যমে ভুক্তভোগীদের আস্তানায় নিয়ে যায়, আবার কেউ কেউ মেরিন ড্রাইভ সড়ক ব্যবহার করে নৌকায় করে সাগরের মাঝপথে পাঠিয়ে দেয়। চক্রের বড় গডফাদাররা গোপন আস্তানায় অবস্থান করে মোবাইল ফোনের মাধ্যমে পুরো কার্যক্রম পরিচালনা করছে। অধিকাংশ অর্থ লেনদেন করা হয় বিকাশের মাধ্যমে। এ ক্ষেত্রে অপরাধীরা সংঘবদ্ধভাবে অপহরণ, জোরপূর্বক শ্রম আদায় এবং নারী পাচারের মতো গুরুতর অপরাধে জড়িত। মানব পাচার প্রতিরোধ দমন আইন ২০১২-এর ৭, ৮, ৯, ১০ ও ১১ ধারার আওতায় শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
মানব পাচারকারীদের দৌরাত্ম্য থামাতে সরকারকে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। যেসব এলাকায় মানব পাচারকারী চক্র সক্রিয় সেসব এলাকায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে কঠোর নজরদারি বাড়াতে হবে। বৈধপথে বিদেশযাত্রায় করণীয় বিষয়ে এবং সাধারণ মানুষ যাতে মানব পাচারকারীদের খপ্পরে না পড়ে, সে জন্য জনসচেতনতা বাড়াতে হবে। অবৈধপথে বিদেশযাত্রার ঝুঁকি বিষয়ে জেলা এবং উপজেলাগুলোতে তরুণদের নিয়ে কর্মশালার আয়োজন করা যেতে পারে। মানব পাচারকারীরা যতই প্রভাবশালী হোক, তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। আইনের সঠিক প্রয়োগের মাধ্যমে অবৈধপথে বিদেশ যাওয়া ঠেকানো সম্ভব। প্রত্যাশা করছি, সরকার অচিরেই মানব পাচারকারী চক্রের সদস্যদের দৌরাত্ম্য থামাতে কৌশলী পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।