প্রথম অধ্যায় : মৌলিক মানবিক চাহিদা
সৃজনশীল প্রশ্ন ও উত্তর-৩
উদ্দীপকটি পড়ে নিচের প্রশ্নগুলোর উত্তর লেখ।
সুমনা একাদশ শ্রেণির একজন শিক্ষার্থী। পড়ালেখার পাশাপাশি অবসর সময়ে সে টেলিভিশন দেখে, গল্পের বই পড়ে এবং খেলাধুলা করে। যা তার মানসিক বিকাশ ও সামাজিকীকরণের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
(ক) মানবসভ্যতার ধারক ও বাহক কী?
(খ) মৌলিক মানবিক চাহিদা হিসেবে খাদ্য কেন প্রয়োজন?
(গ) উদ্দীপকে কোন মৌলিক মানবিক চাহিদা পূরণের বিষয়টি প্রকাশ পেয়েছে? ব্যাখ্যা করো।
(ঘ) উদ্দীপকে প্রকাশিত মৌলিক মানবিক চাহিদা পূরণের গুরুত্বহীনতা, বর্তমান পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে আলোচনা করো।
উত্তর: (ক) মানবসভ্যতার ধারক ও বাহক হলো বস্ত্র।
(খ) মৌলিক মানবিক চাহিদার মধ্যে প্রথম এবং সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ হলো খাদ্য। যে জৈব উপাদান গ্রহণের মাধ্যমে জীবদেহের গঠন, ক্ষয়পূরণ, বৃদ্ধি সাধন, অভ্যন্তরীণ ক্রিয়াকলাপ নিয়ন্ত্রণ, তাপ ও শক্তি, উৎপাদন, পেশি পরিচালনা এবং রোগ প্রতিরোধ করে দেহকে সুস্থ ও কর্মক্ষম রাখে তাকে খাদ্য বলে। বেঁচে থাকা, বৃদ্ধি ও বিকাশের জন্য খাদ্য অপরিহার্য। দেহকে যন্ত্রের সঙ্গে তুলনা করা যেতে পারে। যন্ত্রে যেমন তেল, মবিল না দিলে তার ইঞ্জিন চলে না, তেমনি মানুষের দেহের জন্য প্রয়োজন খাদ্যের। খাদ্য ছাড়া মানুষ বাঁচতে পারে না।
(গ) উদ্দীপকে মৌলিক মানবিক চাহিদার মধ্যে শিক্ষা ও চিত্তবিনোদনের চাহিদা পূরণের বিষয়টি ফুটে উঠেছে। সুমনা একাদশ শ্রেণিতে পড়ে। তাই সে শিক্ষার চাহিদা পূরণের মধ্যে রয়েছে। শিক্ষা মানুষের অন্যতম মৌলিক মানবিক চাহিদা। শিক্ষা হচ্ছে মানুষের বহুমুখী প্রতিভার সুষম বিকাশ। জ্ঞানের প্রসার এবং দক্ষতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে, বিশেষ করে স্কুল-কলেজের মাধ্যমে পাঠদান, প্রশিক্ষণ এবং কোনো বিষয় জানার প্রক্রিয়া হলো শিক্ষা। শিক্ষার মাধ্যমে মানবিক জ্ঞান ও দক্ষতা এক প্রজন্ম থেকে পরবর্তী প্রজন্মে স্থানান্তরিত হওয়ার মধ্য দিয়ে সমাজ টিকে থাকে। তাই শিক্ষাকে জাতির মেরুদণ্ড বলা হয়। অন্যদিকে, নির্মল আনন্দ ও আমোদ-প্রমোদ লাভের পন্থাই হলো বিনোদন। বিনোদনের মাধ্যমে মানুষের চিত্ত জাগ্রত হয়। তাই বিনোদনকে অনেক সময় চিত্তবিনোদন বলা হয়। বিনোদন মানুষের মনকে সুস্থ ও সবল রাখে। গান-বাজনা, নাচ-অভিনয়, আবৃত্তি-বিতর্ক, ভ্রমণ-পরিদর্শন ইত্যাদিসহ বর্তমানে বেতার, টিভি, নাটক-সিনেমা, বই-পত্রিকা, পার্ক-চিড়িয়াখানা, কম্পিউটার, ক্রীড়া-পর্যটন প্রভৃতি বিনোদনের প্রধান উপকরণ হয়ে উঠেছে। যার ফলে যথার্থ সামাজিকীকরণের মধ্য দিয়ে ব্যক্তির মানবিক বিকাশ ঘটে।
অতএব বলা যায়, উদ্দীপকে সুমনার শিক্ষা ও বিনোদনের চাহিদা পূরণের বিষয়টি ফুটে উঠেছে।
(ঘ) উদ্দীপকে প্রকাশিত মৌলিক মানবিক চাহিদা দুটি হলো শিক্ষা ও বিনোদন। শিক্ষা জাতীয় উন্নয়নের অন্যতম মাধ্যম। বাংলাদেশে শিক্ষিতের হার দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। অর্থনৈতিক সমীক্ষা-২০২২ অনুযায়ী দেশে সাক্ষরতার হার (৭ বছর +) ৭৫ দশমিক ২ শতাংশ। যার মধ্যে পুরুষ শতকরা ৭৭ দশমিক ৪ ভাগ এবং নারী ৭২ দশমিক ৯ ভাগ। তাই দেখা যায়, সরকারিভাবে গৃহীত বিভিন্ন উদ্যোগ শিক্ষা বিস্তারকে বেগবান করলেও এখনো প্রায় ২৪ দশমিক ৮ ভাগ লোক শিক্ষা থেকে বঞ্চিত। এক্ষেত্রে সরকার ২০১০ সাল থেকে একটি যুগোপযোগী শিক্ষানীতি প্রণয়ন ও তার বাস্তবায়ন শুরু করেছে। মুখস্থনির্ভর শিক্ষাব্যবস্থার পরিবর্তে সৃজনশীল ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে। নারী শিক্ষার ব্যাপক প্রসার ঘটানো হয়েছে। প্রাথমিক শিক্ষায় ছাত্রছাত্রী ভর্তির পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ছাত্র ৫১ শতাংশ এবং ছাত্রী ৪৯ শতাংশ। এ ছাড়া বিনামূল্যে বই বিতরণসহ উপবৃত্তি কার্যক্রম, কারিগরি শিক্ষা প্রসার, শিক্ষাক্ষেত্রে আইসিটি শিক্ষা, অবকাঠামোগত ব্যাপক পরিবর্তন বর্তমান শিক্ষাকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। অন্যদিকে, বাংলাদেশে মৌলিক চাহিদা হিসেবে খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান ও চিকিৎসাসেবা পূরণে ব্যর্থতার কারণে চিত্তবিনোদন অনেকাংশে অবহেলিত থেকে যায়। আগের গ্রামীণ ঐতিহ্যবাহী খেলাধুলা, যাত্রানুষ্ঠান, জারিগান, সারিগান, পুঁথি, কবিগান ইত্যাদি আজ খুব কমই দেখা যায়। বর্তমান বাংলাদেশে বিনোদন হিসেবে টিভি, ভিসিআর, রেডিও, সিনেমা ইত্যাদি জনপ্রিয়তা পেয়েছে। ১৯৯৩ সালে আকাশ সংস্কৃতি উন্মুক্ত করায় বাংলাদেশের জনগণ এখন দেশ-বিদেশের নানা ধরনের অনুষ্ঠান ও সিনেমা ঘরে বসে দেখতে পারছে। ঢাকা, চট্টগ্রামসহ বাংলাদেশের বড় বড় শহরে নানা রকম পার্ক যেমন- শিশুপাক, বোটানিক্যাল গার্ডেন, ফয়’স লেক, ফ্যান্টাসি কিংডম, নন্দন পার্ক ইত্যাদি বর্তমানে উচ্চবিত্ত ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির বিনোদনের অন্যতম প্রধান মাধ্যম। সুতরাং বলা যায়, বাংলাদেশের সর্বসাধারণের জন্য মৌলিক মানবিক চাহিদা পূরণের ক্ষেত্রে বিনোদন এখন পর্যন্ত তেমন কোনো গুরুত্ব পায়নি।
লেখক : প্রভাষক, সমাজকর্ম বিভাগ
শের-ই-বাংলা স্কুল অ্যান্ড কলেজ, ঢাকা
কবীর