আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং দেশের চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে খবরের কাগজের সঙ্গে একান্ত সাক্ষাৎকারে কথা বলেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক সামান্তা শারমিন। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন খবরের কাগজের নিজস্ব প্রতিবেদক জিয়াউদ্দিন রাজু।
খবরের কাগজ: নির্বাচনের পরিবেশ কেমন দেখছেন?
সামান্তা শারমিন: জুলাই ছাত্র আন্দোলনের নেতৃত্ব দেওয়া ওসমান হাদির গুলিতে আহত হওয়া এবং মৃত্যুশয্যায় থাকা অবস্থাকে কটাক্ষ করে প্রধান নির্বাচন কমিশনার যে মন্তব্য করেছেন, তা থেকেই ইসির নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। এনসিপি অনেক আগেই নির্বাচন কমিশনের এই অবস্থানের সমালোচনা করে আসছে। এই নির্বাচন কমিশনের পক্ষে নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করা সম্ভব নয়। ইসি মাঠপর্যায়ে বিভিন্ন নির্দেশনা দিচ্ছে, কিন্তু সেগুলো মানা না হলেও কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নিচ্ছে না। ফলে পুরো নির্বাচনি মাঠে একেক দলের জন্য একেক রকম সুবিধা ও বৈষম্যমূলক ব্যবস্থা তৈরি হয়েছে।
খবরের কাগজ: মাঠপর্যায়ে প্রশাসনের ভূমিকা কীভাবে দেখছেন?
সামান্তা শারমিন: মাঠপর্যায়ের প্রশাসনে কোনো সংস্কার হয়নি। ডিসি, এসপি, ওসি, ইউএনও– এদের বড় একটি অংশ দলীয় সুপারিশে নিয়োগ পেয়েছেন, যারা অতীতে রাষ্ট্রক্ষমতায় (বিএনপি) ছিল তারাই প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে লোক বসিয়েছে। ফলে নির্বাচনি মাঠে স্বাভাবিকভাবেই পক্ষপাতমূলক পরিবেশ তৈরি হচ্ছে।
খবরের কাগজ: ভোটের সময় নির্বাচনি পরিবেশ কেমন হতে পারে বলে মনে করেন?
সামান্তা শারমিন: নির্বাচনি আলোচনা শুরু হওয়ার পর থেকে এখন পর্যন্ত বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের ৩০০ জনের বেশি নেতা-কর্মী নিহত হয়েছেন। বিএনপির অভ্যন্তরীণ সংঘর্ষ এবং অন্য রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সহিংসতায় তাদের ২০০ জন নেতা-কর্মী নিহত হয়েছেন। কিন্তু আমরা কী দেখতে পাচ্ছি?
এই হত্যাকাণ্ড নিয়ন্ত্রণে প্রশাসনের ব্যর্থতা এবং জড়িতদের বিচার না হওয়ায় পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠছে। ভবিষ্যতে যাতে এ ধরনের ঘটনা না ঘটে সে জন্য কোনো কার্যকর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। আমরা শুরু থেকেই বলে আসছি, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও প্রশাসনের সংস্কার ছাড়া সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়। বর্তমান পরিস্থিতি তারই প্রমাণ।
খবরের কাগজ: এনসিপি কেমন নির্বাচনি ব্যবস্থা প্রত্যাশা করে?
সামান্তা শারমিন: গণ-অভ্যুত্থানের পর যেকোনো দেশের জন্য নির্বাচন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে তা আরও বেশি জরুরি। দুর্নীতি বা দখলদারত্বের পাশাপাশি টানা তিনটি অবৈধ নির্বাচনের কারণেই জনগণ সরকার উৎখাত করেছে। মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনতে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের প্রয়োজন। কিন্তু আমরা দেখছি, সেই পরিবেশ তৈরির জন্য কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।
খবরের কাগজ: নির্বাচনি মাঠে গণমাধ্যমের ভূমিকা কেমন চান?
সামান্তা শারমিন: মাঠপর্যায়ে কাজ করা অনেক সাংবাদিককে আমি ব্যক্তিগতভাবে চিনি। মিড-লেভেলের রিপোর্টারদের সততা নিয়ে আমার কোনো সন্দেহ নেই। তবে এখানে ‘মিডিয়া হাউস পলিসি’ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রশাসনের সংস্কার হয়নি-বিষয়টি গণমাধ্যমের গভীর অনুসন্ধানের মাধ্যমে তুলে ধরা দরকার ছিল। নির্বাচনি মাঠে দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রশাসনিক কর্মকর্তারা কতটা নিরপেক্ষ, কারা কাদের সুপারিশে নিয়োগ পেয়েছেন, এসব তথ্য অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের মাধ্যমে ভোটারদের সামনে আনা প্রয়োজন। এতে হয়তো স্বল্পমেয়াদে ফল না মিললেও দীর্ঘমেয়াদে তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। পাশাপাশি একজন সংসদ সদস্যের কাজ কী, তা কিন্তু দেশের মানুষ জানেন না। শুধু রাস্তাঘাট করাই এমপির কাজ নয়। গণমাধ্যমের তা খেয়াল রাখা প্রয়োজন।
খবরের কাগজ: নতুন দল এনসিপির নির্বাচনি প্রস্তুতি কেমন?
সামান্তা শারমিন: দলগতভাবে আমরা তৈরি হতে গিয়ে ভোটের মাঠে নির্বাচনি প্রচার অনেকটাই দুর্বল। অন্তত বড় দলগুলোর চেয়ে আমরা অনেক দুর্বল। তবে আমাদের প্রচার ব্যক্তি বা পদকেন্দ্রিক নয়। অন্য দলের প্রার্থীরা নির্বাচনব্যবস্থা বা গণভোট নিয়ে কথা বলছেন না। এনসিপির প্রার্থীরা মাঠে গিয়ে সংস্কার ও গণভোটের পক্ষে কথা বলছেন। এমনকি অনেক প্রার্থী ভোটারদের বলছেন, আমাকে ভোট না দিলেও সংস্কারের পক্ষে এবং গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট দিন। অন্য কোনো দল এভাবে কথা বলছে না।
খবরের কাগজ: উপদেষ্টা পরিষদ থেকে ছাত্র প্রতিনিধি আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া ও মাহফুজ আলমের পদত্যাগকে কীভাবে দেখেন?
সামান্তা শারমিন: গণ-অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া ছাত্র উপদেষ্টারা পদত্যাগ করে আবার মাঠে ফিরে এসেছেন। আমরা চাই, যারা এই আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছেন তারা সবাই একসঙ্গে থাকুন। তবে একই সঙ্গে তাদের ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত ও স্বাধীনতাকেও সম্মান জানানো জরুরি।